•গল্প•
•প্রাঙ্গণে মোর•
অজয় কুমার দত্ত
. এই বাড়িটা আমার নয়। সরু গলি~তার পাশেই তিনতলা এই ফ্ল্যাটটা কক্ষনো আমার নয়। ফ্ল্যাটটা আসলে তস্কর। তস্করও নয়~দস্য…
•গল্প•
•প্রাঙ্গণে মোর•
অজয় কুমার দত্ত
. এই বাড়িটা আমার নয়। সরু গলি~তার পাশেই তিনতলা এই ফ্ল্যাটটা কক্ষনো আমার নয়। ফ্ল্যাটটা আসলে তস্কর। তস্করও নয়~দস্যু। ও কেড়ে নিয়েছে আমার ছেলেবেলা। ধ্বংস করেছে শৈশব। এ ফ্ল্যাট কিছুতেই আমার নয়। হ্যাঁ ছিল। এটা আমার ছিল প্রোমোটার ফ্ল্যাট তৈরি করার আগে। যখন এটা টালির ঘর ছিল। পাঁচ ইঞ্চি দেয়ালের ওপর টালির চাল। সিমেন্ট রঙের মেঝে। তিনটে ঘর। তার মধ্যে একটা ছিল মেঝেতে লাল বর্ডার আঁকা। ওটা আমার কাকুর ঘর। আর আমি ছোটবেলায় দিনরাত পড়ে থাকতাম এ ঘরে। কাকুর একটা গ্রামোফোন ছিল। বাক্সের মতো বড়ো~হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দম দিতে হয় গান বাজানোর জন্য। ৭৮ স্পিডের....ওকে বলে আরপিএম....আমরা স্পিডই বলতাম। থালার মতো রেকর্ডের দু'পিঠে দু'টো গান। রেকর্ড অনেকটা শ্লেটের মতো~চাপ লাগলেই ভেঙে যেত। কাকু আমায় গ্রামোফোন চালানো শিখিয়ে দিয়েছিল। এত মোটা S-এর মতো চকচকে আর্মে পেরেকের মতো পিন। একটা পিনে দু'টো গান~তারপরই পাল্টাতে হতো। পরে লাল দাগ দেওয়া দামী পিন কিনলো কাকু যা দিয়ে চারটে পর্যন্ত গান বাজানো যায়।
এসবই আমার স্কুল জীবনের কথা। মফস্বল শহরের নরম মাটিতে আমরা বড়ো হয়েছি। আমরা বলতে আমি আর পাঁচ বছরের বড়ো দাদা। জীবন বড়ো আশ্চর্য। দাদাকে আমি নায়কের মতো ভালোবাসতাম। ও ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হয়। শক্ত চেহারায় ফুটবল খেলতো বেশ। কিন্তু আমাকে কেন যেন দেখতে পারতো না। হয়তো জন্ম নিয়ে ওর এতাবৎকাল ধরে প্রাপ্য আদর ভালোবাসায় ভাগ বসিয়েছি বলে! কারণে অকারণে কান মুলে দিত। বাবাও আমাকে ভালো চোখে দেখতো না কোনদিন। কারণ রেজাল্ট স্কুলে কখনোই ভালো হতো না আমার।
ওখানকার স্কুলে যখন পড়ি তখন বয়স ছিল বছর দশেক। দশবছর বড়ো কম সময় না। পাড়াটা বাল্যকে বেঁধে ফেলেছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। ছোট ছেলেমেয়েরা একসাথেই খেলাধূলা করতাম। একটা বল ছিল মাঝারি সাইজের। ওটা দিয়ে ফুটবল ছাড়াও দু'একটা অন্যরকম খেলাও খেলতাম। যেমন বলটাকে সবাই লুকিয়ে রাখবে~ আর একজন সাজবে পুলিশ যার কাজ ওটাকে খুঁজে বার করা। আর ছোট বলটা দিয়ে ক্রিকেট তো হতোই~সঙ্গে মাঝে মাঝে ক্রিং ক্রিং খেলা হতো। আমি এই খেলাটা বিশেষ পছন্দ করতাম না কারণ ওটাতে গায়ে বল ছুঁড়ে মারার বিধান ছিল। বড়ো লাগতো যে! সমবয়সীদের মধ্যে মহুল ছিল আমার খুব অনুগত। একটু ছোট আমার চেয়ে~দু' ক্লাশ নীচে পড়তো একই স্কুলের প্রাইমারীতে। ফাইভ ক্লাশে উঠে মেয়ে স্কুলে চলে গেল। তার দু'বছর আগেই আমি হাই স্কুলে। আমার একটা বদ দোষ ছিল। কারণে অকারণে হাত চালাতাম। বেশির ভাগটাই মহুলের ওপর। দাদার কাছে খাওয়া কানমলার শোধ তুলতাম ওকে পিটিয়ে। মার খেয়ে ওর চোখ কাতর হয়ে উঠতো, কিন্তু কাঁদতো না একটুও। বরং অনুতাপে আমিই ওকে জড়িয়ে ধরতাম পরে। মা বারণ করে দিয়েছিল কখনো ওকে জড়িয়ে না ধরতে। কিন্তু মহুল এত ভালো মেয়ে। মারার পর বড়ো কষ্ট হতো আমার। আদর না করলে ও স্বাভাবিকই হবে না। ও আমার খেলার সাথী। সবসময়ের সঙ্গী।
একদিন বন্ধুদের সাথে খেলার পর শেষ বিকেলে ও আর আমি বের হলাম এ গলি ও গলি ঘুরতে। আমাদের এই অঞ্চলটায় আমবাগান অনেক। আমবাগান পেরিয়ে জহুরা কালীমন্দির। মহুল বললো~মন্দিরে যাবি? আমি রাজি হয়ে গেলাম। আমি তখন বছর বারো হয়তো। নাবালক হয়তো নি, তবে কিশোরই বলা চলে। নির্জন পথে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। মন্দির আর আসে না! আমি মা'র সঙ্গে বারদু'এক এসেছি আগে। আত্মবিশ্বাস ছিল অনেকটাই, কিন্তু এবার বোধহয় চিড় ধরলো । ভুল দিকে কি চলে এলাম! এদিকে সন্ধ্যা নেমে আসে। লোকজনেরও কোন দেখা নেই। মহুল বললো~ফিরে চল। আর যেতে হবে না। যদি হারিয়ে যাই! আমিও মাথা নেড়ে পেছন ফিরি। আমবাগানের কাছে এসে আমি বলি~একটু দাঁড়া। আসলে আমার তখন খুব ছোট বাইরে পেয়েছে। একদৌড়ে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে জলবিয়োগ করে হালকা হয়ে এলাম। মহুলও দেখি উসখুস করছে। জিজ্ঞেস করতে বলে~কিছু না। আমরা হাঁটি। খানিকবাদে আর থাকতে না পেরে মহুল বললো~তুই একটু দাঁড়া নারে। আসবি না কিন্তু এদিকে! বলেই চলে গেল গাছের আড়ালে। ওর ছিল খুব ভুতের ভয়। আমার মাথায় দুষ্টবুদ্ধি চাপলো~মুখে হাত চাপা দিয়ে নাঁকিসুরে আওয়াজ করে উঠলাম। মহুল চিৎকার করে দৌড়ে চলে এল। ওর অবস্থা সঙ্গীন। ভয় পেয়ে ইজেরের দড়ি ভুল টেনে গিঁট পাকিয়ে ফেলেছে। টানাটানি করেও সুবিধা করতে পারলো না। আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে মাথা নীচু করে ফেলে। আমি দড়ি খুলতে সাহায্য করি, কিন্তু পেরে উঠি না। একটা কাঁচের টুকরো কুড়িয়ে পেলাম। ওটা দিয়ে ঘষতে একটু পরেই দড়ি কেটে গেল। মহুল ঝট করে ইজের নামিয়ে জামা আড়াল করে বসে পড়ে। আমার হাতের পিঠে অনুভব করি ওর ভিজে ওঠা সুকোমল প্রসূনকলির মতো স্ফুটনোন্মুখ নারীসুষমা। মহুল উঠে পড়েই হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে। বলে~তুই কাউকে বলবি না বল, কাউকে না! ওর হাত দু'হাতে চেপে ধরি~তাই কি পারি মহুল? মা জহুরা কালীর কিরে, কাউকে বলবো না।
মহুলের খুব প্রিয় ছিল গ্রামোফোনটা। আমার কাছে বায়না করতো গান শোনাবার। কাকু কোলকাতায় চাকরি করে। বাড়ি আসে দু'তিন মাসে একবার। তার না থাকার সময় গ্রামোফোনে আমার একাধিপত্য। খুব সাবধানে রেকর্ড গুলো বার করে গান শুনতাম। একদিন গান চালাবার সময় মা হঠাৎ ডাকলো। ফিরে আসতে আসতে মিনিট পাঁচেক। এর মধ্যেই কান্ড ঘটিয়ে বসে আছে মহুল। রেকর্ডটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। মহুল ওস্তাদি করে পাল্টাতে গিয়ে ভারি S-এর মতো আর্মটা হাত ফস্কে পড়ে রেকর্ডের ওপর। পেরেকের মতো স্টাইলাস পিনটা সজোরে লেগে রেকর্ডটা ফেটে যায়। আমি এসে দেখি মহুল মুখ করুণ করে বসে আছে। ব্যাপারটা বুঝে ওকে বকতে গিয়েও থমকে যাই। কাকুর বড়ো প্রিয় রেকর্ড ওটা~কোয়েলিয়া গান থামা এবার। কার গান ঠিক জানি না, একটু ভাঙা ভাঙা বয়স্কা মহিলার গলা। কিন্তু মনটা যেন কেমন করে ওঠে শুনলে।
পরের শনিবার কাকুর আসার কথা। কাকুকে আমি খুব ভালোবাসি। আমার জন্য, মহুলের জন্য গল্পের বই বা অন্য কিছু আনবেই। তাই হাঁ করে বসে আছি বিকেল থেকে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। এখন টিপটিপ করে~কিন্তু খানিক আগেই জোর হয়েছে একপশলা। আমাদের বাড়ির সামনে রাস্তাটায় একটু বৃষ্টি হলেই জল জমে। জলভরা রাস্তায় মোটর চললে বেশ লাগে দেখতে। কেমন জাহাজ জাহাজ, না না জাহাজ নয়~লঞ্চের মতো মনে হয়। আর রিক্সায় চাপলে তো একদম ময়ূরপঙ্খী। নৌকোর মত জলকেটে এগিয়ে যায় সাইকেল রিক্সা~ঢাকনা খুলে দিলে মনে হয় পাল তুলে চলেছে অথৈ নদীতে। বড়ো হয়ে ভাবি রিক্সা চালাবো। কেউ বলার থাকবে না। নিজের মতো চলে যাবো যেদিকে খুশি প্যাডেল করে করে। পিছনে বসাবো মহুলকে। শুধু আমি আর মহুল~ আর কেউ না।
এমনি একটা রিক্সায় চড়ে কাকু এলো। ছাতাটা খুলে নামতেই আমি দৌড়ে গেলাম। হাতে একটা ব্যাগ। আমি ব্যাগটা নিয়ে নিই। জানি ওতে আর যাই থাকুক না কেন, একটা রেকর্ড আছেই। কাকু হাত পা ধুয়ে বসতেই মা চা আর ঝালমুড়ি দিয়ে গেল। কাকুর প্রিয় খাবার। এই বর্ষায় পেঁয়াজ লঙ্কাকুচি তেল দিয়ে মুড়ি একদম অমৃত। আমারও ভীষণ ভালো লাগে। খাওয়া হতেই আমার আর তর সইছে না। কি রেকর্ড আনলো দেখতে হবে তো! কাকু বলে~পড়াশোনা নেই? এখনি গান শুনতে হবে? বড়ো হয়ে পড়াশোনা করে চাকরি বাকরি করতে হবে না? প্রশ্রয় মাখা কথায় আমি লাজুক হাসি। চাকরি বাকরি আমার ভালো লাগে না। ওর চেয়ে ভালো লাগে গল্পের বই পড়তে, কবিতা পড়তে। সবাই যদি চাকরি করে তবে কবিতা লিখবে কে? গান গাইবে কে? নিদেনপক্ষে গান শুনবে কে? কাকু ব্যাগ খুলে বার করলো রেকর্ড। বড়ো কাগজের কভারের মাঝখানে গোল করে কাটা। কুচকুচে কালো রেকর্ডের মাঝে লাল লেভেল~ তাতে চৌকো খোপের মধ্যে একটা ছেলে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে। হিন্দুস্তান কোম্পানির রেকর্ড। আর একরকম রেকর্ড ছিল তাতে দেখতাম একটা কুকুর চোঙ দেওয়া গ্রামোফোনের কাছে মুখ নিয়ে শুনছে। এটা এইচ এম ভি অর্থাৎ হিজ মাস্টার্স ভয়েস। এর পেছনেও এক গল্প আছে সেটা পরে জেনেছি। এছাড়াও কলম্বিয়ার রেকর্ড ছিল আকাশী রঙা লেভেলে।
গ্রামোফোনের হাতল ঘুরিয়ে দম দিয়ে রেকর্ডটা চাপিয়ে দিতেই ঘর একদম ভরে উঠলো দরাজ গম্ভীর কন্ঠে~
আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ। দেবব্রত বিশ্বাস। কাকুর অত্যন্ত প্রিয় শিল্পী। উনি নাকি কাকুর অফিসেই মানে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করতেন। গান শুনে পাশের বাড়ি থেকে মহুলও চলে এসেছে ততক্ষণে। ওর জন্যে উপহার এসেছে বই~নালক। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নালক। সেই অবন ঠাকুর, ছবি লেখে! রেকর্ডগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতেই কাকুর নজরে এলো একটা রেকর্ড ভাঙা। মহুলের মুখ শুকিয়ে গেছে। আমি আমতা আমতা করে বলি~কাকু, ওটা ভেঙে গেছে।
কে ভাঙলো? খুব রেগে গিয়েই কাকুর মুখটা দুঃখে ভরে যায়। আমি সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে বলে উঠি~আমারই হাত থেকে আর্মটা পড়ে গেছিল রেকর্ডের ওপর। কাকু দুঃখিত মুখে ঘাড়ে নাড়ে~ইস! কোয়েলিয়া! বেগম আখতারের গান! আমি ঠিক জানি কাকু ওই রেকর্ডটা আবার কিনবে। না কিনে পারবেই না! রাগপ্রধান গান কাকু একমনে শোনে। এতক্ষণ মহুল ভীরু পাখির মতো আমার পাশে বসে ছিল। অপরাধ বোধে তাকিয়ে ছিল নীচের দিকে। কাকুর নজর এড়িয়ে আমার হাত চেপে ধরে। তাকিয়ে দেখি ওর চোখে জল আর কৃতজ্ঞতা পাশাপাশি ভাসছে।
* * *
রেকর্ডের উল্টো পিঠের গানটা বড়ো প্রিয় আমার।
যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি।
ঝড় এসেছে,ওরে,এবার ঝড়কে পেলেম সাথি। আমার জীবনেও ঝড় এসেছে বিগত কুড়ি বছরে। কাকু চলে গেল মায়া কাটিয়ে। মাও মারা গেছে। বাবা তো সেই কবেই! এ আমার কাছে বড়ো ঝড় নয়? এই ঝড়কে সাথি করে আমি একা একাই বড়ো হয়ে গেলাম। পাশ করে কোলকাতায় চাকরি পেয়েছি। তাই দেশের বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। একটা এক কামরার ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। ছোটবেলায় ভাবতাম না~রিক্সা চালাবো! লেখাপড়া করে কি হবে! সবাই চাকরি করলে কবিতা লিখবে কে! গান শুনবে কে! আজ মনে হলে হাসি পায়। শৈশব বড়ো অবুঝ। তবে গান শোনার নেশাটা রয়ে গেছে। মহুলের খবর অনেকদিন পাই না। পাই না~মানে নেওয়া হয় নি। কোলকাতায় স্থায়ী হবার পরপর মাসে দু'মাসে একবার করে যেতাম দাদার কাছে, বৌদির কাছে। দাদা এখনও আমাকে তেমন পছন্দ করে না। তবে ঠকায় নি। ওরা আমার জন্য দু'টো ঘর আলাদা করে রেখেছে তিনতলায়। গেলে মহুলের সঙ্গে দেখা হতো। ও-ও বড়ো হয়েছে অনেকটা। ওখানকার কলেজ থেকে বিএ পাশ করে বসে আছে। হয়তো স্কুলের দিদিমণি হবে! কেমন যেন দূরের মনে হয় ওকে। চোখাচোখি হলে লজ্জা পায়।
ছোটবেলায় আর একটা কথা খুব মনে হতো। স্বপ্ন ছিল যে বড়ো হলে রোজগার করে একটা গ্রামোফোন কিনবো। কাকুরটা ততদিনে খারাপ হয়ে গেছে। সেকেলে হয়ে যাওয়ার জন্য রিপেয়ারও হয় না। তাই আমি যখন চাকরি পেলাম
~কয়েকমাস টাকা জমিয়ে কিনেই ফেললাম একটা। এতদিনে ওর নাম হয়ে গেছে রেকর্ড প্লেয়ার। গ্রামোফোন এখন আর কেউ বলে না। ছিমছাম চেহারা। ব্রিফকেসের মতো দেখতে~ এখানে ওখানে বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। দম দেওয়ার ব্যাপারটাই নেই। ইলেকট্রিকে চলে আবার ব্যাটারীতেও চালানো যায়। স্টাইলাস পিনও পাল্টাতে হয় না। একটা পিনেই বহুদিন। প্লেয়ারটা কেনার আগে থেকেই রেকর্ড কিনে জমাতে শুরু করেছিলাম। সেই চার পাঁচটা রেকর্ডই আমার সম্বল। রেকর্ডের চেহারারও বদল হয়েছে। আকারে একটু ছোট, কিন্তু গান আঁটে চারটে। তার নাম ইপি মানে এক্সটেন্ডেড প্লে। সাতটাকা করে দাম। একই রকম দেখতে দু'টো গানের এসপি রেকর্ডও পাওয়া যায় চারটাকা করে। এসপি মানে স্ট্যান্ডার্ড প্লে।প্রতি মাসে একখানা করে কিনতাম। আর একরকম ছিল বড়ো সাইজের। মানে কাকুর রেকর্ডের থেকে আর একটু বড়ো। সেগুলোকে বলে এলপি বা লংপ্লে। ওগুলোতে বারোটা করে গান ধরে। এক এক পিঠে ছ'টা করে। টানা বেজে যায়~বারবার পাল্টাতে হয় না। ওগুলো বত্রিশ টাকা দাম নিত।
কি যেন বলছিলাম! ও হ্যাঁ মহুলের কথা। ওকে মনে হতেই ছেলেবেলাটা যেন ফিরে এলো।
আমি আমার বাল্যকালটাকে হারাতে চাই না। তাই বাড়ি গেলেই কখনও ঘুড়ি ওড়াই ছাদে লাটাই হাতে। কখনো ছোট ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলি। বর্ষায় জল জমলে নেমে পড়ি জলভরা রাস্তায়। বেশ কথাটা না? জলভরা রাস্তা! জলভরা সন্দেশ শুনেছি। দারুণ খেতে। চন্দননগরে পাওয়া যায়। আমাদের অফিসের অপূর্ব দা মাঝে মাঝে নিয়ে আসেন। ওর বাড়ি ওখানেই কিনা! সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ে বাড়ির সামনেটা জলে ভরে গেছে। মহুলের কথা মনে হতেই ঠিক করে ফেলি বাড়ি যাব এই শনিবার। শেয়ালদা থেকে রাতের ট্রেন ভোরবেলা পৌঁছে দিল আমায় ছেলেবেলার দেশে। স্টেশন থেকে রিক্সা নিয়ে বাড়ি~সোজা গিয়ে বাঁ দিকে মনস্কামনা মন্দিরের কাছেই। হাতে ব্রিফকেসের মতো সেই রেকর্ড প্লেয়ার। ব্যাগে কয়েকটা রেকর্ড।
দাদার একটাই ছেলে পিকলু। আমি ওর কাকু। আমার কাছে রেকর্ড প্লেয়ার। অতীত বোধহয় এমনি করেই ফিরে ফিরে আসে। আমাকে দেখেই ছুটে এলো। গান বাজানোর যন্ত্রটা দেখে ও খুব খুশি। আমিও জলখাবার খেয়ে নিয়ে বসলাম ওটা। কয়েকটা গান বাজাতেই দরজায় কার আবছায়া! মহুল পিসি এসেছে, মহুল পিসি~ পিকলু ঝলমল করে ওঠে। তাকিয়ে দেখি সবুজ শাড়ি পড়া খুব মিষ্টি চেহারার আমার ছেলেবেলার সেই সঙ্গী। আয় আয়~কেমন আছিস? একটু হেসে সেই মেয়ে বললো~কখন এসেছো?
আমি ওর চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি।
কি সুন্দর হয়েছিস রে দেখতে মহুল! আমি মুগ্ধ হয়ে যাই।
লজ্জায় মুখ নামিয়ে চুপ করে থাকে মহুল। আমার চেনা সেই প্রগলভা কিশোরী আজ কত সংযতা! ভ্রু পল্লবী একই রকম ভাবে তুলে সে বললো~কই বললে না কখন এসেছ?
আমি বলি~এই খানিক আগে। রাতের গাড়িতে।
অনেকদিন পর এলে এবার। আমি ঠিক বুঝেছি যে তুমি এসেছ।
কি করে?
গান শুনতে পেলাম যে! রেকর্ড প্লেয়ারে তখন বাজছে~প্রেম একবার এসেছিল নীরবে।
মহুল বললো~রবীন্দ্রসঙ্গীত নেই? আমি মাথা নাড়ি। ও কেমন করে তাকালো আমার দিকে। রবীন্দ্রসঙ্গীত নেই একটা বাঙালি ছেলের কাছে এটা যেন কি অদ্ভুত একটা ব্যাপার! লজ্জায় তখনি ঠিক করলাম যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড কিনতে হবে এবং সেটা আজই। মহুল ভালোবাসে যখন~ কিনতেই হবে। বিকেল হতেই বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের এই মফস্বল শহরে বড়ো ইলেকট্রনিক্সের দোকান একটাই অতুল মার্কেটে। ওরা রেকর্ডও রাখে। ওটা আমার স্কুলের বন্ধু মৃদুলদের দোকান। গিয়ে দেখি বাবার বয়স হয়ে যাবার পর ও-ই এখন মালিক হয়ে বসেছে। আমায় দেখে খুব খুশি। খাতির করে বসিয়ে চা-বিস্কিট খাওয়ালো। রেকর্ড কিনবো জেনে বলে~প্লেয়ার কিনেছিস নাকি? কোন মডেল? আমি বলি~জিএফ৫৩৩।
ইস্, ৬৩৩ কিনলে পারতিস! ওটায় দু'টো বক্স~স্টিরীও। আমি নিরাশ হয়ে বলি~আমারটায় স্টিরীও হবে না?
হবে না কেন? খুব হবে। তবে একটা অ্যামপ্লিবক্স লাগাতে হবে। চিন্তা করিস না, আমি করে দেব। এই বলে রেকর্ড দেখাতে লাগলো।
আমি বলি~রবীন্দ্রসঙ্গীত নেই?
রবীন্দ্রসঙ্গীত নিবি! এবার পাঁচ সাতটা লংপ্লে বার করে দিল। নে পছন্দ কর। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্বন্ধে আমার ধারণা খুব কম। একটা পছন্দ হয়ে করলাম~ঘন নীল রঙের কভার। ওপরে একটা গাছ থেকে ফুল ঝরছে আর তার নীচে দাঁড়িয়ে দু'হাতে ঘোমটায় মুখ টানা এক মেয়ে। গলায় সাদা ফুলের মালা, হাতে ফুলেরই গহনা। ছবিটা দেখে আমার মহুলের কথা মনে পড়ে গেল। এটাই কিনবো ঠিক করলাম। নীচে লেখা সঙস অব রবীন্দ্রনাথ। সবচেয়ে নীচে ইংরেজীতে শিল্পীর নাম হেমন্ত মুখার্জী।
একটা নিবি? এই রেকর্ডটাও নে। আমি দিচ্ছি। মৃদুল বললো।
না রে, দু'টো কিনতে পারবো না রে। বাজেট কম।
এটা আমি তোকে দিচ্ছি। দাম দিতে হবে না। এতদিন পরে দেখা হলো! বলে দেবব্রত বিশ্বাসের লংপ্লে টাও প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে তুলে দেয় আমার হাতে। ঋতুরঙ্গের গান~সবক'টা ঋতুর গান আছে এতে। কৃতজ্ঞতায় বুকে জড়িয়ে ধরি মৃদুলকে।
বাড়ি যেতে যেতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চা খাওয়ার তর সইলো না~রেকর্ড প্লেয়ার চালিয়ে দিলাম। রবীন্দ্রগানে ঘর ভরে গেল। জানতামই না এ গান প্রাণে এত নাড়া দেয়! মনের এত গভীরে পৌঁছোয়! প্রথম গান হতে না হতেই মহুল এসে পড়েছে। গুণগুণ করে ও-ও গলা মেলায়~
তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ
ওগো ঘুম-ভাঙানিয়া।
এমনি করেই শেষ হয়ে গেল ছ'টা গান। মহুল চুপ করে আছে। আমারও মুখে কথা নেই। আমায় রবীন্দ্রসঙ্গীত চেনাল মহুল। অনেকক্ষণ পরে ও বললো~আর চালাবে না? ওর কথায় আমি উঠে উল্টো পিঠটা চালিয়ে দিলাম।
প্রাঙ্গণে মোর শিরীষশাখায় ফাগুন মাসে কী উচ্ছ্বাসে ক্লান্তিবিহীন~বাজতে বাজতে হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। ট্রান্সমেইন্স সিস্টেম থাকার দরুণ রেকর্ড প্লেয়ারটা গান শোনাতেই লাগলো অন্ধকারে ক্লান্তিবিহীন
...ক্লান্তিবিহীন ফুল ফোটানোর খেলা।
ক্ষান্তকূজন শান্তবিজন সন্ধ্যাবেলা....
সন্ধ্যাবেলার অন্ধকারে গান শুনতে শুনতে আমি মহুলের হাতের পাতা ছুঁই। মহুলও মুঠো করে ধরে আমার হাত। সময় এগিয়ে চলে সারা গায়ে কথাহীনতা মেখে।
©অজয়
২৩-৫-২০২০
