সুখ নেই, স্বস্তি আছে।
শ্রাবণী সামন্ত।
..............................
তিন প্রজন্মের বাস বিহারে। বাপ-ঠাকুরদার ক্ষেতমজুরি করেই দিন গুজরান হয়েছে। কাঠা সাতেক জমি ছিল বটে, গেল বছর সেটাও লোভী থাবার গ্রাসে চলে গেছে। কত কাঁহাতক আর ধারবাক…
সুখ নেই, স্বস্তি আছে।
শ্রাবণী সামন্ত।
..............................
তিন প্রজন্মের বাস বিহারে। বাপ-ঠাকুরদার ক্ষেতমজুরি করেই দিন গুজরান হয়েছে। কাঠা সাতেক জমি ছিল বটে, গেল বছর সেটাও লোভী থাবার গ্রাসে চলে গেছে। কত কাঁহাতক আর ধারবাকিতে সংসার চলে। জগা তো খাটতেও পারে না তেমন। হ্যাঁ, এই জগা নামেই সে গ্রামে পরিচিত। তার একটা পোশাকি নাম আছে বটে, সে নাম তো কেবল ভোটার কার্ডে। নির্বাচন এলে তবেই রামশরণের খোঁজ পড়ে। বউ আর দুই ডাগর ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার ছোটই ছিল। ছেলেটি বছর দুই আগে ক্যানসারে চলে গেছে। বছর আঠেরোর সোমত্ত মেয়েকে নিয়ে বউ জমিদারের জমা তে কাজ করে কোনওভাবে পেট চালিয়ে নেয়। গ্রামে জগার মন টেঁকেনা। গতর খাটাতেও পারে না। দুর্ঘটনায় ডান হাত প্রায় অকেজো, ভারি কাজে ডাক্তারি নিষেধ। পেট চালানোর তাগিদে বছরভর তাই ভিন রাজ্য বাংলাতেই। এ মেলা, সে মেলা ঘুরে বেড়ায়। যেখানে হোক বসে পড়ে সামান্য কিছু নিয়ে। তার পসরা বলতে কিছু শুকনো গাছ আর গোলমরীচের সাইজের কিছু রঙীন বল। যারা জলে পড়লেই ম্যাজিকের মত সতেজ হয়, ফুলে ওঠে। কতই বা উপায় হয়!! এ'সবের বিক্রিবাটা তেমন আর কই!
সে'বার মুকুটমণিপুর ড্যামের ধারে ফুটপাতের গায়ে মাথা নীচু করে বসে থাকা মধ্যবয়সী মানুষটিকে দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারলুম না। তার অজান্তে একটি ছবিও নিলুম। জানিনা অপরাধ হল কিনা! বলগুলির দাম করলুম কেবল। গাছের দাম জানতে চাইলুম না, পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল বলেই। গাজন মেলা থেকে এমন গাছ বাড়ি নিয়ে গিয়ে জলে দিয়ে দেখেছি চাঙ্গা হবার বদলে উল্টো পথে হাঁটছে। অথচ ওদের কাছে বোতলে গাছগুলোর তরতাজা রূপ দেখে বোতলসমেত কিনতে চাইলে বেচতে অস্বীকার করে। কারণ জানা নেই। তাই এর কাছ থেকে আর গাছ নেবার পথে হাঁটিনি।
"তুমহারা ঘর কিধর?"--জানতে চাইলে ফ্যাঁসফেঁসে নীচু গলায় মুখ তুলে জানায়--উধার। একটু সময় লাগল "উধার"– এর মর্ম বুঝতে! উধার মানে শ'পাঁচেক কিমি দূরে বিহারের বেগুসরাই। এই মরসুমে এ'খানে রাস্তার ধারে ফুটপাতে রোজই বসে। চেনা ফেরিওয়ালাদের মত কোনও হাঁকডাক নেই। পসরা খুবই সামান্য...কিছু অরবিজ বল আর সেলাজিনেলা!! এমন খটমট নামে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। পয়সা নিয়ে দরকার। তাই "অরবিজ কা ভাও ক্যয়া হ্যায়?"--বলতে খদ্দেরকে ভিনগ্রহের জীব মনে করে। শেষে আমাকেই বুঝিয়ে বলতে হয়।
ভরা মরসুমে, শীতের পরশ গায়ে মেখে বাংলার নানা প্রান্ত থেকে বেড়াতে আসা কত যে উচ্ছ্বল নর-নারী তার সামনে দিয়ে যাচ্ছে আসছে। শীতের মুকুটমণিপুর যেন উদ্ভিন্নযৌবনা যুবতীর কলকাকলী ! আল্পনা আঁকা পথে পথচারীর শেষ নেই। স্রোতের মত চলে যাচ্ছে।---সে'দিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই।
তার নাম জানতে চাইলে বলে 'জগা'। তারপর খানিক ইতস্তত করে বলে রামশরণ রাই। আদতে বিহারী ব্রাহ্মণ। তার কাছে খদ্দের নেই বললেই চলে। চারদিকে অজস্র রঙিন পসরা, খাবার দাবার। সে'সব ফেলে তার কাছে কোনও খদ্দের আসতে দেখলুম না গত দু'দিন যাবৎ। এক প্যাকেট অরবিজ দশ টাকা দিয়ে কিনলুম। তার বিক্রিবাটা আদৌ হয় বলে মনে হল না। রাতের আস্তানা জানতে চাইলে বললে, কাছেই পি এইচ ই বাংলোর রাস্তায় এক দোকানঘরের চাতাল। কোনও কোনওদিন মেলা কমিটির তরফ থেকে মিলে যায় চাল-আলুর প্যাকেট। সাথে অল্প ডাল-সোয়াবীন– গরীব ভিখিরিকে দেওয়া প্রোটিনের আশ্বাস আর কী! ওই দু'টো ফুটিয়ে খেয়ে নেয়। আবার কোনওদিন মেলায় পংক্তি ভোজনেই চলে যায় রামশরণের। মেলাগুলোই যে ওর ভরসা। এই যেমন পরবর্তী লক্ষ্য বিষ্ণুপুর মেলা। আবার জানতে চাই--"আপ আউর ক্যয়া কাম করতে হ্যাঁয়?" আবার মাথা হেঁট। বাড়ি ফিরতে মোটেও মন নেই তার। ডান হাত যে অচল। ক্ষেতি করবে কেমন করে। দেশে থাকলে গঞ্জনালাঞ্ছনার শেষ নেই। তার থেকে এ জীবন যে অনেক ভালো। হয়ত সুখ নেই, কিন্তু স্বস্তি আছে। পেটভরা খেতে না পেলেও গরম ভাতের সুবাস আছে। ভালোবাসা না পেলেও নিজের মত করে বাঁচার ঠাঁই আছে। এসব ভাবতে ভাবতে ছেলের ডাকে পা বাড়ালুম ড্যামের দিকে।।।
