Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

নকশালবাড়ি একটি স্ফুলিঙ্গ/অমৃত মাইতি

আজ বারবার মনে হচ্ছিল নকশালবাড়ির কথা। স্মৃতিতে কখন কোন ঘটনা আলোকিত হবে তা পরিবেশ পরিস্থিতি খানিকটা বলতে পারে। তখন আমি ছাত্র আন্দোলন করি। সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। তবু পত্রপত্রিকায় যেটুকু বুঝেছিলাম বা শুনেছিলাম তা থেকেই আগ্রহ তৈরি …


আজ বারবার মনে হচ্ছিল নকশালবাড়ির কথা। স্মৃতিতে কখন কোন ঘটনা আলোকিত হবে তা পরিবেশ পরিস্থিতি খানিকটা বলতে পারে। তখন আমি ছাত্র আন্দোলন করি। সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। তবু পত্রপত্রিকায় যেটুকু বুঝেছিলাম বা শুনেছিলাম তা থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ওই ভূখণ্ডে যাওয়ার। ১৯৬৯ সালে ডিসেম্বর মাসে আমি গিয়েছিলাম নকশালবাড়ি। আমি এই বিষয়ের আলোচক নই। তবে নকশালবাড়ি আমার একটি চেতনা।

নকশালবাড়ি, অর্থাৎ ১৯৬৭ সালের ২৫শে মে সেই ঐতিহাসিক কৃষক বিদ্রোহ ও সত্তরের দশকের উত্তাল ছাত্র-যুব আন্দোলন—যা বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত ও আবেগের নাম। বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সেই স্বপ্ন, অনেক আবেগ এবং সেইসঙ্গে বহু প্রাণহানির স্মৃতি আজও প্রবীণ-নবীন অনেকের মনেই আলোড়ন তোলে। 

সেই সময়কার আন্দোলনের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক:

উৎস: পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি অঞ্চলে জোতদার ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষকদের রুখে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এই আন্দোলনের শুরু।

নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, সুশীতল রায়চৌধুরী এবং জঙ্গল সাঁওতাল কোদারু মাহাতো  সুনীতি ঘোষ সরোজ দত্তর মতো নেতারা ।  এঁরা আন্দোলনের প্রধান রূপকার ছিলেন।  ১৯৬৯ সালে গঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ( মার্কসবাদী লেনিনবাদী)

       সাম্যবাদী আদর্শে প্রভাবিত উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু মেধাবী ছাত্র-যুবক শহর ছেড়ে গ্রামের কৃষকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন। শোষণ মুক্তির জন্য  জীবনকে বাজি রেখে ছাত্র ছাত্রী যুবক যুবতীরা এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আবেগ ও আদর্শকে বিশ্বাস করা যৌবনের ধর্ম। বজ্র কন্ঠে ধ্বনিত হল শোষণ মুক্তির গান।

মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান।পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে এবং মুক্তির লড়াইয়ে আত্মত্যাগের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ একটি কালজয়ী গান।

মোরা ঝঞ্ঝার দূত: কাজী নজরুল ইসলামের লেখা তারুণ্যের ও বিদ্রোহের এক অমর সৃষ্টি।

কারার ঐ লৌহ-কপাট: পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং অন্যায়কে গুঁড়িয়ে দেওয়ার গান।

সুকান্তের "শোনরে মালিক শোনরে মজুতদার তোদের প্রাসাদে জমা হলো কত মৃত মানুষের হাড়। হিসাব বিধিবি তার?"ক্ষুধার্ত কৃষক প্রান্তিক চাষী মজুর এই সমস্ত গানে উদ্বুদ্ধ হয়।

এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসেই নয়, বাংলা সাহিত্য ও গণসঙ্গীতেও এক স্থায়ী ছাপ ফেলে গেছে। 

ইতিহাসের পাতায় সেই উত্তাল সময় সম্পর্কে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। 

১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি থেকে শুরু হওয়া সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন কালক্রমে ভারতের বিশাল এলাকাজুড়ে, বিশেষ করে অনুন্নত ও বনাঞ্চল অধ্যুষিত কেন্দ্রীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে 'রেড করিডোর' নামে এক বিস্তৃত বলয়ে ছড়িয়ে পড়ে। 

প্রাথমিক ভাবে ভৌগোলিক বিস্তার ঘটে পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু হয়ে আন্দোলনটি দ্রুত বিহার, ওড়িশা, এবং অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম অঞ্চলে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।

চূড়ান্ত বিস্তার:  এই বিদ্রোহের প্রভাব প্রায় ১৮০টি জেলা পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যা মূলত মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে (ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ) কেন্দ্রীভূত ছিল।

বর্তমান অবস্থা: সরকারের কঠোর পদক্ষেপে বর্তমানে নকশাল আন্দোলনের প্রভাব অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বামপন্থী চরমপন্থা-প্রভাবিত অঞ্চলগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ ও কঠোর নজরদারির ফলে প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে।  

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব:

কৃষক ও ভূমিহীন প্রান্তিক চাষীদের আন্দোলন: জোতদার ও জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার আদায়ে এই আন্দোলন এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

শহুরে বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র সমাজ নকশাল আন্দোলন শুধু গ্রামাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং কলকাতা সহ বিভিন্ন শহরের মেধাবী ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদেরও গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি: বাংলা শিল্প ও সাহিত্যের জগতে এই আন্দোলনের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে, যা পরবর্তীতে বহু আখ্যান ও সৃষ্টির বিষয়বস্তু হয়েছে।

১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি অঞ্চলে শুরু হওয়া কৃষক বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেনি, বরং বাংলা সংস্কৃতি ও গণসংগীতের জগতেও এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। বিপ্লবের আগুনে পুড়ে সেই সময়ের শিল্প-সাহিত্যে রাষ্ট্রবিরোধী লড়াই, নিপীড়ন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রতিধ্বনিত হয়। 

নকশালবাড়ি আন্দোলনের গণসংগীতের বৈশিষ্ট্য

সত্তরের দশকের এই গণসংগীতগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার। এদের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল শোষিতের কণ্ঠস্বর: শোষিত, প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া মানুষের মুখের ভাষা এবং গ্রামীণ সুর এতে প্রাধান্য পেত।

সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক: দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ এবং বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী বার্তা ছিল গানের প্রধান উপজীব্য।

শহিদ বন্দনা: আন্দোলন চলাকালীন নিহত শহিদদের আত্মত্যাগ এবং বীরত্বগাথা এই গানগুলোর মাধ্যমে অমরত্ব লাভ করেছিল। 

এই ধারার উল্লেখযোগ্য গান ও শিল্পী

সেই উত্তাল সময়ে বহু কবি, সুরকার ও গায়ক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নকশাল আন্দোলনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে গান রচনা করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস: প্রখ্যাত এই শিল্পী ও সুরকার শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য ভাটিয়ালি ও লোকসুরকে গণসংগীতে ব্যবহার করেন। তাঁর গাওয়া ও সুর করা গানগুলি গণআন্দোলনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

দিলীপ বাগচী: নকশালবাড়ি আন্দোলনের সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ে তিনি এই ধারার গান নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

 অজিত পাণ্ডে ("তরাই কান্দে গো---কান্দে আমার হিয়া" গানের জন্য পরিচিত), বিনয় চক্রবর্তী এবং প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীরাও সেই সময়ের দ্রোহের গানকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। 

এছাড়াও, পরবর্তীকালে বিভিন্ন কবি ও সুরকারের লেখায় নকশালবাড়ির আদর্শ ও শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি গণসংগীতের রূপ নিয়েছে। 

নকশালবাড়ি আন্দোলনের আদর্শ এবং তৎকালীন বাংলা সাহিত্য ও গণসংগীতে এর প্রভাব বাংলা শিল্প সাহিত্য অস্বীকার করতে পারবে না না। দার্জিলিং জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম নকশালবাড়ি। ১৯৬৭ সালের ২৫ মে, ভূমিহীন কৃষক ও । ওপর জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে এই গ্রামে যে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের সূচনা হয়, তা ইতিহাসে 'নকশালবাড়ি আন্দোলন' নামে পরিচিত। 

নকশালবাড়ি প্রকৃতপক্ষে একটি স্ফুলিঙ্গ ছিল, কারণ—

বিপ্লবে স্থির বিশ্বাস নিয়ে শুরু করেছিলেন নির্ভিক নেতৃত্ব।চারু মজুমদার, কানু সান্যাল এবং জঙ্গল সাঁওতালের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি ছিল ভারতের বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম তীব্র ও প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ।

এই স্ফুলিঙ্গ দাবানলের বিস্তার লাভ করে।এখনো স্মৃতিকে পুলকিত করে। 

মতাদর্শগত পরিবর্তন: ভারতের মূলধারার কমিউনিস্ট রাজনীতির বাইরে গিয়ে, মাও সে তুং-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই আন্দোলনটি রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ডাক দেয়। 

পশ্চিমবঙ্গ: দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি ব্লকে চারু মজুমদার, কানু সান্যাল এবং জঙ্গল সাঁওতালের নেতৃত্বে এই সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের সূচনা হয়। পরবর্তীতে এই রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলে এর প্রভাব পড়ে।

অন্ধ্র প্রদেশ: পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার পর, ১৯৬৮ সালের দিকে এই আন্দোলনটি অন্ধ্র প্রদেশে (বিশেষ করে শ্রীকাকুলাম অঞ্চলে) ব্যাপকভাবে দানা বাঁধে।

বিহার: বিহারের ভোজপুর এবং এর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে নকশাল আন্দোলনের আদর্শ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।

ওড়িশা: সম্বলপুর, কান্ধমাল, দেওগড়, ঝাড়সুগুদা ও জাজপুরের মতো ওড়িশার বিভিন্ন অংশে এই মাওবাদী-অনুপ্রাণিত আন্দোলনটি নিজের বিস্তার ঘটিয়েছিল।

ছত্তীসগঢ়: তৎকালীন মধ্যপ্রদেশ (বর্তমান ছত্তীসগঢ়) রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী ও কৃষকদের মধ্যে এই আন্দোলনটি ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরিশেষে বলি নকশালবাড়ি এই শিরোনামটি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। আন্দোলন আকারে না হলেও প্রচারটা ছিল খুবই। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলিতেও একটা আবেগ তৈরি হয়েছিল যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের তীব্রতা এবং গভীরতার কারণে জনপ্রিয়তা বহুদূর বিস্তৃত হয়েছিল। শত অত্যাচারেও লড়াকু মানুষ মাথা নত করেনি। তাই মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস এবং ভরসা তৈরি হয়েছিল। নকশালবাড়ি জিন্দাবাদ।