Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

নকশালবাড়ি একটি স্ফুলিঙ্গ/অমৃত মাইতি

আজ বারবার মনে হচ্ছিল নকশালবাড়ির কথা। স্মৃতিতে কখন কোন ঘটনা আলোকিত হবে তা পরিবেশ পরিস্থিতি খানিকটা বলতে পারে। তখন আমি ছাত্র আন্দোলন করি। সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। তবু পত্রপত্রিকায় যেটুকু বুঝেছিলাম বা শুনেছিলাম তা থেকেই আগ্রহ তৈরি …


আজ বারবার মনে হচ্ছিল নকশালবাড়ির কথা। স্মৃতিতে কখন কোন ঘটনা আলোকিত হবে তা পরিবেশ পরিস্থিতি খানিকটা বলতে পারে। তখন আমি ছাত্র আন্দোলন করি। সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। তবু পত্রপত্রিকায় যেটুকু বুঝেছিলাম বা শুনেছিলাম তা থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ওই ভূখণ্ডে যাওয়ার। ১৯৬৯ সালে ডিসেম্বর মাসে আমি গিয়েছিলাম নকশালবাড়ি। আমি এই বিষয়ের আলোচক নই। তবে নকশালবাড়ি আমার একটি চেতনা।

নকশালবাড়ি, অর্থাৎ ১৯৬৭ সালের ২৫শে মে সেই ঐতিহাসিক কৃষক বিদ্রোহ ও সত্তরের দশকের উত্তাল ছাত্র-যুব আন্দোলন—যা বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত ও আবেগের নাম। বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সেই স্বপ্ন, অনেক আবেগ এবং সেইসঙ্গে বহু প্রাণহানির স্মৃতি আজও প্রবীণ-নবীন অনেকের মনেই আলোড়ন তোলে। 

সেই সময়কার আন্দোলনের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক:

উৎস: পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি অঞ্চলে জোতদার ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষকদের রুখে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এই আন্দোলনের শুরু।

নেতৃত্ব দিয়েছিলেন চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, সুশীতল রায়চৌধুরী এবং জঙ্গল সাঁওতাল কোদারু মাহাতো  সুনীতি ঘোষ সরোজ দত্তর মতো নেতারা ।  এঁরা আন্দোলনের প্রধান রূপকার ছিলেন।  ১৯৬৯ সালে গঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ( মার্কসবাদী লেনিনবাদী)

       সাম্যবাদী আদর্শে প্রভাবিত উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু মেধাবী ছাত্র-যুবক শহর ছেড়ে গ্রামের কৃষকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন। শোষণ মুক্তির জন্য  জীবনকে বাজি রেখে ছাত্র ছাত্রী যুবক যুবতীরা এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আবেগ ও আদর্শকে বিশ্বাস করা যৌবনের ধর্ম। বজ্র কন্ঠে ধ্বনিত হল শোষণ মুক্তির গান।

মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান।পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে এবং মুক্তির লড়াইয়ে আত্মত্যাগের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ একটি কালজয়ী গান।

মোরা ঝঞ্ঝার দূত: কাজী নজরুল ইসলামের লেখা তারুণ্যের ও বিদ্রোহের এক অমর সৃষ্টি।

কারার ঐ লৌহ-কপাট: পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং অন্যায়কে গুঁড়িয়ে দেওয়ার গান।

সুকান্তের "শোনরে মালিক শোনরে মজুতদার তোদের প্রাসাদে জমা হলো কত মৃত মানুষের হাড়। হিসাব বিধিবি তার?"ক্ষুধার্ত কৃষক প্রান্তিক চাষী মজুর এই সমস্ত গানে উদ্বুদ্ধ হয়।

এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসেই নয়, বাংলা সাহিত্য ও গণসঙ্গীতেও এক স্থায়ী ছাপ ফেলে গেছে। 

ইতিহাসের পাতায় সেই উত্তাল সময় সম্পর্কে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। 

১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি থেকে শুরু হওয়া সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন কালক্রমে ভারতের বিশাল এলাকাজুড়ে, বিশেষ করে অনুন্নত ও বনাঞ্চল অধ্যুষিত কেন্দ্রীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে 'রেড করিডোর' নামে এক বিস্তৃত বলয়ে ছড়িয়ে পড়ে। 

প্রাথমিক ভাবে ভৌগোলিক বিস্তার ঘটে পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু হয়ে আন্দোলনটি দ্রুত বিহার, ওড়িশা, এবং অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম অঞ্চলে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।

চূড়ান্ত বিস্তার:  এই বিদ্রোহের প্রভাব প্রায় ১৮০টি জেলা পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যা মূলত মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে (ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ) কেন্দ্রীভূত ছিল।

বর্তমান অবস্থা: সরকারের কঠোর পদক্ষেপে বর্তমানে নকশাল আন্দোলনের প্রভাব অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বামপন্থী চরমপন্থা-প্রভাবিত অঞ্চলগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ ও কঠোর নজরদারির ফলে প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে।  

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব:

কৃষক ও ভূমিহীন প্রান্তিক চাষীদের আন্দোলন: জোতদার ও জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার আদায়ে এই আন্দোলন এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

শহুরে বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র সমাজ নকশাল আন্দোলন শুধু গ্রামাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং কলকাতা সহ বিভিন্ন শহরের মেধাবী ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদেরও গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি: বাংলা শিল্প ও সাহিত্যের জগতে এই আন্দোলনের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে, যা পরবর্তীতে বহু আখ্যান ও সৃষ্টির বিষয়বস্তু হয়েছে।

১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি অঞ্চলে শুরু হওয়া কৃষক বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেনি, বরং বাংলা সংস্কৃতি ও গণসংগীতের জগতেও এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। বিপ্লবের আগুনে পুড়ে সেই সময়ের শিল্প-সাহিত্যে রাষ্ট্রবিরোধী লড়াই, নিপীড়ন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রতিধ্বনিত হয়। 

নকশালবাড়ি আন্দোলনের গণসংগীতের বৈশিষ্ট্য

সত্তরের দশকের এই গণসংগীতগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার। এদের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল শোষিতের কণ্ঠস্বর: শোষিত, প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া মানুষের মুখের ভাষা এবং গ্রামীণ সুর এতে প্রাধান্য পেত।

সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক: দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ এবং বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী বার্তা ছিল গানের প্রধান উপজীব্য।

শহিদ বন্দনা: আন্দোলন চলাকালীন নিহত শহিদদের আত্মত্যাগ এবং বীরত্বগাথা এই গানগুলোর মাধ্যমে অমরত্ব লাভ করেছিল। 

এই ধারার উল্লেখযোগ্য গান ও শিল্পী

সেই উত্তাল সময়ে বহু কবি, সুরকার ও গায়ক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নকশাল আন্দোলনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে গান রচনা করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস: প্রখ্যাত এই শিল্পী ও সুরকার শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য ভাটিয়ালি ও লোকসুরকে গণসংগীতে ব্যবহার করেন। তাঁর গাওয়া ও সুর করা গানগুলি গণআন্দোলনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

দিলীপ বাগচী: নকশালবাড়ি আন্দোলনের সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ে তিনি এই ধারার গান নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

 অজিত পাণ্ডে ("তরাই কান্দে গো---কান্দে আমার হিয়া" গানের জন্য পরিচিত), বিনয় চক্রবর্তী এবং প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীরাও সেই সময়ের দ্রোহের গানকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। 

এছাড়াও, পরবর্তীকালে বিভিন্ন কবি ও সুরকারের লেখায় নকশালবাড়ির আদর্শ ও শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি গণসংগীতের রূপ নিয়েছে। 

নকশালবাড়ি আন্দোলনের আদর্শ এবং তৎকালীন বাংলা সাহিত্য ও গণসংগীতে এর প্রভাব বাংলা শিল্প সাহিত্য অস্বীকার করতে পারবে না না। দার্জিলিং জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম নকশালবাড়ি। ১৯৬৭ সালের ২৫ মে, ভূমিহীন কৃষক ও । ওপর জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে এই গ্রামে যে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের সূচনা হয়, তা ইতিহাসে 'নকশালবাড়ি আন্দোলন' নামে পরিচিত। 

নকশালবাড়ি প্রকৃতপক্ষে একটি স্ফুলিঙ্গ ছিল, কারণ—

বিপ্লবে স্থির বিশ্বাস নিয়ে শুরু করেছিলেন নির্ভিক নেতৃত্ব।চারু মজুমদার, কানু সান্যাল এবং জঙ্গল সাঁওতালের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি ছিল ভারতের বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম তীব্র ও প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ।

এই স্ফুলিঙ্গ দাবানলের বিস্তার লাভ করে।এখনো স্মৃতিকে পুলকিত করে। 

মতাদর্শগত পরিবর্তন: ভারতের মূলধারার কমিউনিস্ট রাজনীতির বাইরে গিয়ে, মাও সে তুং-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই আন্দোলনটি রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ডাক দেয়। 

পশ্চিমবঙ্গ: দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি ব্লকে চারু মজুমদার, কানু সান্যাল এবং জঙ্গল সাঁওতালের নেতৃত্বে এই সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের সূচনা হয়। পরবর্তীতে এই রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলে এর প্রভাব পড়ে।

অন্ধ্র প্রদেশ: পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার পর, ১৯৬৮ সালের দিকে এই আন্দোলনটি অন্ধ্র প্রদেশে (বিশেষ করে শ্রীকাকুলাম অঞ্চলে) ব্যাপকভাবে দানা বাঁধে।

বিহার: বিহারের ভোজপুর এবং এর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে নকশাল আন্দোলনের আদর্শ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।

ওড়িশা: সম্বলপুর, কান্ধমাল, দেওগড়, ঝাড়সুগুদা ও জাজপুরের মতো ওড়িশার বিভিন্ন অংশে এই মাওবাদী-অনুপ্রাণিত আন্দোলনটি নিজের বিস্তার ঘটিয়েছিল।

ছত্তীসগঢ়: তৎকালীন মধ্যপ্রদেশ (বর্তমান ছত্তীসগঢ়) রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী ও কৃষকদের মধ্যে এই আন্দোলনটি ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে।

পরিশেষে বলি নকশালবাড়ি এই শিরোনামটি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। আন্দোলন আকারে না হলেও প্রচারটা ছিল খুবই। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলিতেও একটা আবেগ তৈরি হয়েছিল যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের তীব্রতা এবং গভীরতার কারণে জনপ্রিয়তা বহুদূর বিস্তৃত হয়েছিল। শত অত্যাচারেও লড়াকু মানুষ মাথা নত করেনি। তাই মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস এবং ভরসা তৈরি হয়েছিল। নকশালবাড়ি জিন্দাবাদ।

 নকশালবাড়ি একটি স্ফুলিঙ্গ ( দ্বিতীয় পর্ব)/অমৃত মাইতি

অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম কৃষক বিদ্রোহ ছিল ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে সংঘটিত একটি ঐতিহাসিক সশস্ত্র কৃষক ও আদিবাসী সংগ্রাম। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি আন্দোলনের আদর্শে অনুপ্রাণিত এই আন্দোলন প্রধানত দরিদ্র ও ভূমিহীন গিরিজানদের (আদিবাসী) অধিকার রক্ষায় জমিদার ও জোতদারদের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল। 

এই বিদ্রোহের মূল বৈশিষ্ট্য এবং ইতিহাস আলোচনা করা যেতে পারে।

পটভূমি ও সূত্রপাত

জমিদারের অত্যাচার: শ্রীকাকুলামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসীদের উপর জমিদার ও মহাজনরা অমানুষিক শোষণ চালাত। কৃষকদের উৎপাদিত ফসল ও জমি জোর করে কেড়ে নেওয়া হতো। নকশালবাড়ির আগুন ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে শ্রীকাকুলামেও বিদ্রোহ দানা বাঁধে। এ যেন আগুন উন্মুখ মোমবাতি। শুধু সুযোগের অপেক্ষা।

আন্দোলনের শুরু ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে স্থানীয় কৃষকরা জমিদারদের শস্য ও জমি দখল করে বিদ্রোহের সূচনা করেন। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন ভেম্পতাপু সত্যনারায়ণ এবং আদিভাতলা কৈলাসাম। এছাড়াও পঞ্চাদি কৃষ্ণমূর্তি, সুব্বারাও পানিগ্রাহী প্রমুখ বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবী এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সশস্ত্র রূপ: আন্দোলনটি শুধু প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, জমিদারদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের রূপ নেয়। কৃষকদের নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলা হয়। সশস্ত্র এই আন্দোলন দমনে ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে।

১৯৭০ সালের জুলাই মাসে ভেম্পতাপু সত্যনারায়ণ এবং আদিভাতলা কৈলাসাম পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনেরও বেশি বিপ্লবীকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং হাজার হাজার মানুষকে কারারুদ্ধ করা হয়। তীব্র রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের কারণে ১৯৭২ সালের মধ্যে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। বিদ্রোহ সীমিত হলেও বিদ্রোহের দাবানল ইতিহাস তৈরি করে যা আজও প্রেরণা দেয় বঞ্চিত মানুষদের।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব

যদিও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় শক্তির কাছে এই সশস্ত্র সংগ্রাম পরাস্ত হয়, তবে ভারতের কমিউনিস্ট ও নকশাল আন্দোলনের ইতিহাসে শ্রীকাকুলাম এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এটি প্রমাণ করেছিল যে ভারতের প্রান্তিক কৃষকরা নিজেদের অধিকারের জন্য জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম। আমরা মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী হলেও নকশাল বাড়ি আন্দোলন আমাদের মনকে সব সময় চেতনায় জাগিয়ে রাখে।

১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়িতে শুরু হওয়া সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন খুব দ্রুত অবিভক্ত বিহারে (বর্তমান বিহার ও ঝাড়খণ্ড) ছড়িয়ে পড়ে। বিহারে এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল ভোজপুর জেলা, যেখানে নিম্নবর্ণের ভূমিহীন কৃষকরা সামন্ততান্ত্রিক জমিদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ির সফল অভ্যুত্থান এবং চারু মজুমদারের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিহারে নকশাল আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন জগদীশ মাহতো, রামেশ্বর আহির এবং রামনারেশ দুসাধ। এই অঞ্চলের দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণির মানুষেরা উচ্চবর্ণের জমিদারদের নির্মম শোষণ ও ভূমিহীনতার শিকার ছিলেন। নকশাল আন্দোলন তাঁদের মাঝে সমতা ও অধিকারের নতুন আশা জাগিয়ে তোলে। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ভোজপুর অঞ্চলে কৃষকরা বন্দুক ও দেশীয় অস্ত্র হাতে নিয়ে সামন্ত প্রভুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই শুরু করে, যা ওই এলাকায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। 

নকশাল আন্দোলনের এই বিস্তৃতির ইতিহাস ও প্রভাব ওড়িশায় পিছিয়ে পড়া মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি থেকে শুরু হওয়া সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ ও মাওবাদী মতাদর্শ ওড়িশার রাজনীতি, অর্থনীতি এবং জনজীবনে এক সুদূরপ্রসারী  ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ওড়িশার আদিবাসী অধ্যুষিত ও খনিজ-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে এই আন্দোলনের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। আমি রাজনৈতিক কারণে বেশ কিছুদিন ওড়িশায় গরিব মানুষের সঙ্গে কাটিয়েছি। সম্বলপুর এলাকাতে কাজ করার সময় মানুষের মধ্যে গল্পটি নকশালবাড়ি সম্পর্কে জীবন্ত ছিল।

যদিও তখন বাস্তবতা এই আন্দোলন হারিয়ে ফেলেছিল তবুও ওড়িশার নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাবকে প্রধান কয়েকটি ধাপে  আলোচনা করা করা যেতে পারে।

ভৌগোলিক বিস্তার ও উপজাতীয় অঞ্চলে প্রভাব- 

দক্ষিণ ওড়িশা: নকশাল আন্দোলনের মূল আদর্শ এবং 'শ্রেণীশত্রু খতম' নীতি ওড়িশার কোরাপুট, মালকানগিরি, রায়গাদা, এবং নবরঙ্গপুর জেলার দুর্গম আদিবাসী অঞ্চলে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পরবর্তীতে এই আদর্শ অন্ধ্রপ্রদেশ ও ছত্তিশগড় সীমান্ত সংলগ্ন দণ্ডকারণ্য অঞ্চলে এক শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করে।

উত্তর ওড়িশার মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার (এমসিসি) সুন্দরগড়, ময়ূরভঞ্জ ও কেওনঝড় জেলাতেও তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। 

আর্থ-সামাজিক এবং উন্নয়নমূলক প্রভাব

ভূমি অধিকার ও বনজ সম্পদ: নকশালবাদীরা প্রাথমিকভাবে প্রান্তিক ও ভূমিহীন আদিবাসীদের অধিকার, জমি বেদখল রোধ এবং অরণ্যের সম্পদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলে সমর্থন আদায় করে।

আন্দোলনের সশস্ত্র রূপের কারণে ওড়িশার দুর্গম এলাকাগুলোতে রাস্তাঘাট, সেতু, স্কুল এবং সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। এটি ঐসব অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে দেয়। শোষণ অত্যাচারীর জর্জরিত উন্মত্ত মানুষের একজনও জাগরণ।

সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন: নকশাল ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে বহু সাধারণ আদিবাসী, পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মী প্রাণ হারান। 

প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও নিরাপত্তা জোরদারকরণ--

নকশাল দমনের লক্ষ্যে ওড়িশা সরকার রাজ্য পুলিশ, স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ (SOG) এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর (CRPF) যৌথ অভিযান করে।

উন্নয়নমূলক কর্মসূচি, যেমন রাস্তা নির্মাণ ও সরকারি প্রকল্পের সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার ফলে মাওবাদীদের প্রভাব হ্রাস পেতে থাকে।

বর্তমান পরিস্থিতি--

বিগত কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিক সরকারি অভিযান ও আত্মসমর্পণের ফলে ওড়িশায় সক্রিয় নকশাল বা মাওবাদীদের সংখ্যা এক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক (MHA) এবং রাজ্য পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওড়িশায় নকশাল-প্রভাবিত জেলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বারগড় জেলা সম্পূর্ণ নকশাল-মুক্ত বলে ঘোষিত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি জেলায় গত কয়েক বছর ধরে কোনো মাওবাদী কার্যকলাপের খবর পাওয়া যায়নি। 

নকশালবাড়ি আন্দোলন ওড়িশাকে দীর্ঘকাল অশান্ত রাখলেও, এটি পরবর্তীতে রাজ্য প্রশাসনকে আদিবাসী উন্নয়ন ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর প্রতি নজর দিতে বাধ্য করেছিল। এই আন্দোলনের এটাই সাফল্যের দিক। 

ছত্তিশগড়ের নকশালবাড়ি আন্দোলন বলতে মূলত ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছত্তিশগড় (তদানীন্তন মধ্যপ্রদেশ) অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া বামপন্থী চরমপন্থী বা মাওবাদী আন্দোলনকে বোঝায়। এটি মূলত রাজ্যের উপজাতীয় ও আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ছত্তিশগড়ের বস্তার, দান্তেওয়াদা, সুকমা এবং কাঙ্কেরের মতো দুর্গম বনাঞ্চলগুলো এই আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র বা ‘রেড করিডোর’ হিসেবে গড়ে ওঠে। কারণ, আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, জল-জঙ্গল-জমির ওপর অধিকার রক্ষা এবং স্থানীয় বনজ সম্পদ ও খনির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদে এই আন্দোলন গতি পায়। 

বিদ্রোহ ও সংঘাত, সশস্ত্র সংঘর্ষ: নকশালপন্থীরা ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করে এবং সরকারবিরোধী গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। এর ফলে কয়েক দশক ধরে মাওবাদী বিদ্রোহী এবং ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতে বহু স্থানীয় আদিবাসী, নিরাপত্তা কর্মী এবং বিদ্রোহীদের প্রাণহানি ঘটে। ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা, ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং কঠোর পুনর্বাসন নীতির ফলে ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চল থেকে বামপন্থী চরমপন্থা অনেকাংশে প্রশমিত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই অঞ্চলগুলোকে বামপন্থী চরমপন্থামুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। এখানে ২৮৭ জন নকশালপন্থীকে হত্যা করা হয়েছিল। এত সংখ্যক নকশাল হত্যা থেকে বোঝা যায় আন্দোলনে তীব্রতা কত গভীর ছিল।

ত্রিপুরায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব মূলত ১৯৬৭-৭০ সালের দিকে ছাত্র ও যুব সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তু সমস্যা, বেকারত্ব, এবং জমির অধিকারকে কেন্দ্র করে এই মতাদর্শ ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করে। 

১৯৬৭ সালের নকশালবাড়িতে শুরু হওয়া সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের আদর্শ অনুপ্রাণিত হয়ে ত্রিপুরার কিছু প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও যুবনেতা মাওবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। 

ত্রিপুরার পাহাড়ি ও সমতল এলাকার ভূমিহীন কৃষক, গরিব ভাগচাষি এবং উপজাতি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের প্রশ্নটি এই আন্দোলনে গুরুত্ব পায়। এছাড়া, সংরক্ষিত বনভূমিতে জুম চাষের অধিকার না পাওয়া নিয়েও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। ত্রিপুরার বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে আগরতলা ও তার আশেপাশের এলাকায় গোপনে ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)’ বা সিপিআই (এম-এল) এর শাখা গঠিত হয়।নকশালপন্থীদের ‘শ্রেণি-শত্রু খতম’ নীতি এবং সশস্ত্র পথকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বহু নকশালপন্থী নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার ফলে সত্তরের দশকের শেষের দিকে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। যদিও মূল নকশালবাড়ি আন্দোলন একপর্যায়ে থমকে যায়, পরবর্তীতে ত্রিপুরার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর আদর্শ ভিন্ন মাত্রায় ও রাজনৈতিক ধারায় প্রভাব ফেলেছিল। বর্তমানে ভারতের সামগ্রিক নকশাল-মাওবাদী বিদ্রোহ মূলত ত্রিপুরায় নিষ্ক্রিয়।

পূর্ব পাকিস্তানে ,অধুনা বাংলাদেশে নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিস্তৃতি মূলত মাওবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত কিছু বিপ্লবী দল ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবীর হাত ধরে ঘটেছিল। ভারতের দার্জিলিংয়ের নকশালবাড়িতে ১৯৬৭ সালে কৃষক অভ্যুত্থানের পর, পূর্ব বাংলার বিভিন্ন গোপন কমিউনিস্ট গ্রুপ ও কর্মী এর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়।

পূর্ববঙ্গে এই বিস্তৃতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করা হলো।

আদর্শনৈতিক প্রভাব: ১৯৬৭ সালে চারু মজুমদার ও কানু সান্যালের নেতৃত্বে শুরু হওয়া নকশালবাড়ি আন্দোলন পূর্ববঙ্গে (পূর্ব পাকিস্তানের) উগ্র বামপন্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করে। তখন পূর্ব বঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী), পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এবং পরবর্তীতে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির মতো দলগুলো এর আদর্শ গ্রহণ করে।

প্রচার ও সাহিত্য: 'দেশব্রতী' ও 'লিবারেশন'-এর মতো নকশালপন্থী পত্রিকা ও মুখপত্রগুলো গোপনে পূর্ব বঙ্গে যেত এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত। বিশিষ্ট বামপন্থী বুদ্ধিজীবী সিরাজুল আলম খান, বদরুদ্দীন উমর ও আরো অনেকে এই চিন্তাধারার প্রসারে ভূমিকা রাখেন।

শ্রেণিশত্রু খতম ও সশস্ত্র সংগ্রাম: নকশালদের 'শ্রেণিশত্রু খতম' (জোতদার ও অত্যাচারী ধনীক শ্রেণী) নীতিটি পূর্ব বাংলার সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর ও সুন্দরবনের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে নকশালপন্থীদের অবস্থান বেশ জটিল ছিল। একদিকে অনেক নকশালপন্থী বামকর্মী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়েন। অন্যদিকে, নকশালদের একটি অংশ তৎকালীন মাওবাদী চীনের অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে 'দুই কুকুরের লড়াই' আখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতা করেছিল। 

এ বিষয়ে বিস্তারিত ও প্রামাণ্য তথ্যের জন্য আমজাদ হোসেনের প্রবন্ধ অথবা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিলপত্র  পড়া উচিত। 

অসমে নকশালবাড়ি আন্দোলন মূলত ১৯৬৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ ও তার সংলগ্ন অঞ্চলের নকশালবাড়ি কৃষক বিদ্রোহেরই একটি আদর্শগত ও মনস্তাত্ত্বিক বিস্তার। অসমের চা-শ্রমিক এবং প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে এই উগ্র-বামপন্থী চিন্তাধারার প্রভাব পড়েছিল এবং সত্তরের দশকে গুয়াহাটি ও ডিব্ৰুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এই আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হয়েছিলেন। অসমের গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী ভূমিহীন কৃষক এবং চা-বাগানের শ্রমিকদের দুরবস্থা এই আদর্শের প্রচারকদের আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে অসমের কমিউনিস্ট নেতা এবং বুদ্ধিজীবীদের একাংশ চারু মজুমদারের ‘শ্রেণীশত্রু খতম’ ও সশস্ত্র বিপ্লবের দর্শনে অনুপ্রাণিত হন। সত্তরের দশকে অসমের উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, বিশেষ করে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিব্ৰুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু মেধাবী ছাত্র ও তরুণ এই নকশালপন্থী মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাঁরা পড়াশোনা ছেড়ে সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রচার শুরু করেন। ১৯৭০-এর দশকের প্রথমার্ধে এই আন্দোলন যখন অসমের বিভিন্ন অংশে প্রসারিত হতে শুরু করে, তখন রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার অত্যন্ত কঠোর হাতে তা দমন করে। পুলিশি ধরপাকড় এবং সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বহু নকশালপন্থী কর্মী ও ছাত্রনেতাকে কারারুদ্ধ করা হয়, যার ফলে অসমের সক্রিয় আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।  কিন্তু যে কথা কোনোদিন অস্বীকার করা যাবে না নকশালবাড়ি আন্দোলনের বার্তা দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল মানবিক মানুষের মধ্যে।

১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে অসমের নকশালপন্থী বিচ্ছিন্ন দলগুলি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন যেমন উলফা (ULFA)-এর সাথে আদর্শগত ও কৌশলগত আদান-প্রদান চালিয়েছিল বলে সরকারি গোয়েন্দা সূত্রে অভিযোগ ওঠে। তবে অসমের মূল নকশালবাড়ি আন্দোলনটি মূলত ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০-এর দশকের প্রারম্ভিক সময়ের ছাত্র-কৃষক জাগরণ ও পরবর্তী দমনের ইতিহাস হিসেবেই চিহ্নিত। 

ভুটানের নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব বলতে সাধারণত সিকিম ও নেপাল সীমান্তে  নকশালবাড়ি অঞ্চল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভুটানে বামপন্থী ভাবধারার বিস্তার এবং পরে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের ঘটনাকে বোঝায়।

২০০১-২০০২ সালের দিকে ভুটানে রাজতন্ত্র উৎখাত করে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যে 'কমিউনিস্ট পার্টি অফ ভুটান (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী)' বা সংক্ষেপে সিপিবি (এমএলএম) গঠিত হয়। 

এই দলের মূল লক্ষ্য ছিল ভুটানের ওয়াংচুক রাজবংশের পতন ঘটানো। তাদের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য 'ভুটান টাইগার ফোর্স' নামে একটি সশস্ত্র শাখাও তৈরি করা হয়েছিল। তবে ভুটানের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভারত-ভুটান যৌথ সামরিক অভিযানের কারণে এই আন্দোলন খুব বেশি সক্রিয় হতে পারেনি। পরবর্তীতে ভুটানের বেশিরভাগ রাজনৈতিক কর্মী ও বিদ্রোহীকে গ্রেপ্তার করা হয় অথবা তারা নির্বাসনে চলে যান।

________________________

 #আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নকশালবাড়ি আন্দোলন#

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু বামপন্থী আন্দোলনের প্রভাব পড়ে নকশালবাড়ি আন্দোলনের উপর।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নকশালবাড়ি আন্দোলন বলতে বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে বিশ্বজুড়ে ঘটে চলা উগ্র-বামপন্থী, সাম্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী গণজাগরণকে বোঝায়। এটি কেবল ভারতের নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান  হিসেবে  নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত পরিস্থিতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

চীন ও মাও সে তুং-এর প্রভাব

আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত বিভাজন: ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট শিবিরে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মতাদর্শগত বিরোধ (Sino-Soviet split) চরম আকার ধারণ করে।

নকশালবাদীরা সোভিয়েত ইউনিয়নের সংসদীয় বা 'সংশোধনবাদী' পথের বিরোধিতা করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) এবং মাও সে তুং-এর 'কৃষক-ভিত্তিক সশস্ত্র বিপ্লবের' পথকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে নকশাল আন্দোলনকে পরিচালিত করে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও কমিউনিস্ট পার্টি নকশালবাড়ি আন্দোলনকে "ভারতের বসন্তের বজ্রপাত" (Spring Thunder) বলে আখ্যায়িত করে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল।

বিশ্বজুড়ে ছাত্র ও শ্রমিক অসন্তোষ

ষাট ও সত্তরের দশকের বিশ্ব:--  বিশ্বজুড়েই তখন পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ চলছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ: ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে (যেমন ১৯৬৮ সালের ফ্রান্সের ছাত্র আন্দোলন ও মে-বিপ্লব) তীব্র ছাত্র ও শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। নকশাল আন্দোলন এই বিশ্বব্যাপী তরুণ প্রজন্মের বুর্জোয়া-বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আবেগেরই ভারতীয় রূপ ছিল।

লাতিন আমেরিকা: কিউবান বিপ্লব এবং চে গেভারার গেরিলা যুদ্ধের আদর্শ নকশালবাড়ি আন্দোলনের কর্মীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল ।

নকশাল ধারণার বিশ্বায়ন:

পরবর্তীকালে, নকশালবাড়ি শব্দ বা মতাদর্শটি একটি আন্তর্জাতিক পরিভাষা বা প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। তৃতীয় বিশ্বের (এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা) অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও বুর্জোয়া শাসন উৎখাতের জন্য যেসকল সশস্ত্র কৃষক ও আদিবাসী সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল, তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রায়শই "নকশাল-মাওবাদী" ধারার আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নকশালবাড়ি কেবল ভারতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে, বিশ্বজুড়ে উগ্র-বামপন্থী বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম এবং মাওবাদী মতাদর্শের প্রসারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

_________________________________________