নিজস্ব সংবাদদাতা, মেদিনীপুর ও খড়গপুর: যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে মেদিনীপুরের গর্ব, আমতলার সর্ববৃহৎ ক্ষুদিরাম মূর্তি! প্রশাসনের উদাসীনতায় ক্ষোভ, আন্দোলনের হুঁশিয়ারি সমাজকর্মী রাহুল কোলে।ভারী বর্ষণ আর খামখেয়ালি প্রশাসনিক সিদ…
নিজস্ব সংবাদদাতা, মেদিনীপুর ও খড়গপুর: যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে মেদিনীপুরের গর্ব, আমতলার সর্ববৃহৎ ক্ষুদিরাম মূর্তি! প্রশাসনের উদাসীনতায় ক্ষোভ, আন্দোলনের হুঁশিয়ারি সমাজকর্মী রাহুল কোলে।
ভারী বর্ষণ আর খামখেয়ালি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জেরে যে কোনো মুহূর্তে ধূলিসাৎ হতে পারে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম মহানায়ক শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতি। মেদিনীপুর শহরের উপকণ্ঠে, খড়গপুর ২২৮ গ্রামীণের অন্তর্গত আমতলায় অবস্থিত ক্ষুদিরাম পার্ক। আর এই পার্কের বুকেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে জেলার সর্ববৃহৎ শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর আবক্ষ মূর্তি। কিন্তু বর্তমানে এই ঐতিহাসিক স্মারকটির অস্তিত্বই চরম সংকটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় কাঁসাই সেতুর (Bridge) নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই বিপত্তির সূত্রপাত। সেতুর কাজের জন্য মূর্তির ঠিক পাদদেশ ঘেঁষে বিপুল পরিমাণ মাটি কেটে গভীর গর্ত তৈরি করা হয়েছে। বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই গভীর গর্তটি ক্ষুদিরাম বসুর আবক্ষ মূর্তিটির স্তম্ভ থেকে মাত্র এক মিটার দূরত্বে অবস্থিত। বর্তমান বর্ষার মরশুমে পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছে। এলাকার মাটি মূলত বেলে প্রকৃতির, যা সামান্য জলেই ধুয়ে যায়। ফলে লাগাতার বৃষ্টিতে মূর্তির নিচের আলগা মাটি ধসে গিয়ে জেলার বৃহত্তম এই ক্ষুদিরাম মূর্তিটি যে কোনো মুহূর্তে উল্টে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই আবক্ষ মূর্তিটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৯৮ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন (DYFI) জেলা কমিটির উদ্যোগে এই মূর্তিটি স্থাপন করা হয়েছিল। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের (INA) প্রখ্যাত প্রাক্তন ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সায়গল স্বয়ং এই আবক্ষ মূর্তিটির উন্মোচন করেছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বামপন্থী নেতৃবৃন্দ দীপক সরকার ও মহম্মদ সেলিম। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা এই গৌরবময় স্মারকটি আজ প্রশাসনের চূড়ান্ত উদাসীনতার শিকার। এখনো পর্যন্ত প্রশাসনের তরফ থেকে মূর্তিটি রক্ষা করার জন্য কোনো প্রতিরোধমূলক বা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব নাগরিক সমাজ ও ডিএম অফিসে স্মারকলিপি:
ইতিমধ্যেই এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বুদ্ধিজীবী মহল। সাংবাদিক তথা শিক্ষক বুদ্ধদেব দাস এবং শিক্ষক সুদীপ খাঁড়া সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি আপামর জনসাধারণের সামনে নিয়ে আসেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ডিওয়াইএফআই (DYFI) কর্মীবৃন্দও জেলাশাসকের (DM) দপ্তরে যোগাযোগ করে দ্রুত পদক্ষেপ করার দাবি জানিয়েছেন।
এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে আজ আমতলার ক্ষুদিরাম পার্কে সরাসরি মাঠ পরিদর্শনে যান মেদিনীপুর সদরের বিশিষ্ট সমাজকর্মী রাহুল কোলে এবং শিক্ষক দিলীপ প্রামাণিক। তাঁরা দুজনে মূর্তির চারপাশের ধসে যাওয়া মাটি ও সংলগ্ন গর্তের ভয়াবহ রূপ সচক্ষে খতিয়ে দেখেন।
পরিস্থিতি দেখে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সমাজকর্মী রাহুল কোলে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, "এই আবক্ষ মূর্তিটি আমাদের মেদিনীপুর তথা গোটা জেলার গর্ব। আমাদের ইতিহাস, আমাদের আবেগ এবং আগামী প্রজন্মের কাছে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। যেকোনো মূল্যে এই মূর্তি আমাদের রক্ষা করতেই হবে।" তিনি আরও যোগ করেন, "এখানকার মাটি বেলে মাটি, যা জলের তোড়ে সহজেই ধুয়ে যায়। যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে এবং মূর্তির যা উচ্চতা ও ওজন, তাতে এটি ভূপতিত হওয়া এখন স্রেফ কয়েকদিনের অপেক্ষা মাত্র। প্রশাসন যদি আর ২৪ ঘণ্টাও ঘুমিয়ে থাকে, তবে মেদিনীপুর তার এক ঐতিহাসিক সম্পদ হারাবে। আমরা আর হাত গুটিয়ে বসে থাকব না। অবিলম্বে প্রশাসন যদি কংক্রিটের গার্ডওয়াল বা মাটি আটকানোর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে আমরা স্থানীয় সাধারণ মানুষদের সাথে নিয়ে ওই স্থানেই বৃহত্তর ও তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শনে বাধ্য হব।"
এখন দেখার, স্থানীয় সমাজকর্মী ও যুব সংগঠনের এই চরম হুঁশিয়ারির পর জেলা প্রশাসন তথা সেতু নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে কি না, নাকি মেদিনীপুরের এই ঐতিহাসিক গৌরব ধূলিসাৎ হওয়ার অপেক্ষা করে।


