অরুণ কুমার সাউ, তমলুক:* জ্যৈষ্ঠ মাসের পবিত্র ফলহারিণী অমাবস্যা তিথিকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক থানার অন্তর্গত আস্তাড়া গ্রাম। শাস্ত্র মতে, ‘ফলহারিণী’ হলেন তিনি, যিনি ভক্তের কর্মফল হরণ করে জী…
অরুণ কুমার সাউ, তমলুক:* জ্যৈষ্ঠ মাসের পবিত্র ফলহারিণী অমাবস্যা তিথিকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক থানার অন্তর্গত আস্তাড়া গ্রাম। শাস্ত্র মতে, ‘ফলহারিণী’ হলেন তিনি, যিনি ভক্তের কর্মফল হরণ করে জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ও অশুভ শক্তি দূর করেন। তন্ত্রসাধনা ও আত্মশুদ্ধির এই বিশেষ তিথিতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আস্তাড়া গ্রামে শনিবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়েছে জাগ্রত ফলহারিণী মায়ের আরাধনা।
এই পূজার সূচনা পর্বের পেছনে রয়েছে এক শতাব্দী প্রাচীন অলৌকিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এক সময় সমগ্র বাংলায় যখন দুরারোগ্য কলেরা মহামারী রূপ নিয়েছিল, তখন আস্তাড়া গ্রামেও ঘরে ঘরে স্বজন হারানোর হাহাকার শুরু হয়। গ্রামবাসীদের এই চরম সংকটের দিনে এক পল্লীবাসীর স্বপ্নে আবির্ভূত হন দেবী ফলহারিণী। মহামারী থেকে রক্ষা পেতে তিনি মায়ের আরাধনার নির্দেশ দেন। মায়ের সেই স্বর্গীয় আদেশকে শিরোধার্য করে গ্রামে শুরু হওয়া এই পূজা আজ এক শতকেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়ে আসছে। গ্রামের বাস স্ট্যান্ডের কাছে প্রথম যে পূজার সূচনা হয়েছিল, তা আজ 'আদি পুজো' হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীকালে দক্ষিণপাড়ায় পূজার চল শুরু হয়। বর্তমানে আস্তাড়া গ্রামে মোট তিনটি ভিন্ন মন্দিরে এই ফলহারিণী কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। স্থানীয় শিক্ষক সুবীর চৌধুরী জানান,- সময়ের সাথে সাথে পূজাটি তিনটি ভাগে বিভক্ত হলেও মায়ের প্রতি আমাদের ভক্তি ও আবেগে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি। বরং প্রতি বছরই উৎসবের জাঁকজমক ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। এবারের ফলহারিণী উৎসবের আনন্দ আস্তাড়া গ্রামবাসীর কাছে একটু ভিন্ন ও বিশেষ। কারণ, আস্তাড়া পশ্চিমপাড়ার পূজাটি এবার গৌরবময় ৫০তম বছরে (সুবর্ণ জয়ন্তী) পদার্পণ করেছে। এই উপলক্ষ্যে শনিবার বিকেলে পশ্চিম পাড়ার মণ্ডপে এক বর্ণাঢ্য উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহিষাদলের ভারত সেবাশ্রমের মহারাজ স্বামী মুক্তেশ্বরানন্দজী, মহিষাদল রাজবাড়ির রাজবংশধর সৌর্যপ্রসাদ গর্গ, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রক্তদানের কাণ্ডারী সন্দীপ চক্রবর্তী,আস্তাড়া গ্রামের পঞ্চায়েত প্রতিনিধি ভবানী মাইতি সহ বিশিষ্ট গুণিজন।জাগ্রত মায়ের চরণে অঞ্জলি দিয়ে নিজেদের ও পরিবারের মঙ্গলকামনা করতে শনিবার বিকেল থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণগুলিতে ভক্তদের ঢল নামে।
তমলুক সহ সমগ্র পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ আস্তাড়া গ্রামে ছুটে আসেন। শতাব্দী প্রাচীন নিয়ম ও পরম্পরা মেনে এই পূজায় আজও পাঁঠা বলির প্রথা প্রচলিত রয়েছে, যা প্রত্যক্ষ করতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে।
বিশেষ এই তিথিতে আস্তাড়ার প্রতিটি শক্তিপীঠে বিশেষ পূজা, হোম, যজ্ঞ ও রাত্রি জাগরণের মধ্য দিয়ে মায়ের আরাধনা চলে। মহামারীর সেই পুরোনো অন্ধকার দিন পেরিয়ে আজ ঐতিহ্য, ভক্তি আর উৎসবের আবহে মুখরিত আস্তাড়া গ্রামবাসী মায়ের কাছে শুধুই সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রার্থনা করছেন।


