তমলুকের দাপুটে তৃণমূল নেতা, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, বর্তমান তৃণমূল কাউন্সিলর চঞ্চল কুমার খাঁড়া গ্রেপ্তার। আদালতে তোলা হলে, ৭ দিনের পুলিশ হেফাজতএকেই বোধহয় বলে সময়ের পরিহাস! যে তমলুক শহরে এক সময় কার্যত একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার কর…
তমলুকের দাপুটে তৃণমূল নেতা, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, বর্তমান তৃণমূল কাউন্সিলর চঞ্চল কুমার খাঁড়া গ্রেপ্তার। আদালতে তোলা হলে, ৭ দিনের পুলিশ হেফাজত
একেই বোধহয় বলে সময়ের পরিহাস! যে তমলুক শহরে এক সময় কার্যত একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতেন শাসকদলের দাপুটে নেতা চঞ্চল খাঁড়া, সেই শহরেই এখন তাঁকে চোর-প্রতারকের তকমা গায়ে সেঁটে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তমলুক সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সহ-সভাপতি, তমলুক পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান তথা বর্তমান কাউন্সিলর চঞ্চল খাঁড়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা দুর্নীতির অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছিল শহরের অন্দরে। তোলাবাজি থেকে শুরু করে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকার প্রতারণা, এমনকি প্রভাব খাটিয়ে ভয় দেখিয়ে নিজের ইচ্ছামতো কাজ আদায় করারও ভুরি ভুরি অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তবে তৎকালীন শাসকদলের এই প্রভাবশালী নেতার ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পেতেন না সাধারণ মানুষ। ক্ষোভ ছিল, কিন্তু তা ছিল চাপা।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, দৃশ্যমান কোনও বড় ব্যবসা বা আয়ের উৎস না থাকলেও রাতারাতি কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন চঞ্চল। তাঁর এই রকেটের গতিতে সম্পত্তি বৃদ্ধি নিয়ে বিজেপি নেতৃত্বও দীর্ঘদিন ধরেই সরব ছিল। তবে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে বলেই মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
বর্তমানে রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর সেই আবহেই এবার জেলায় জেলায় একের পর এক দুর্নীতির পুরনো ফাইলের ধুলো ঝাড়তে শুরু করেছে পুলিশ প্রশাসন। তাতেই ফেঁসে গেলেন তমলুকের এই প্রাক্তন পুরপ্রধান।
বিবাদের সূত্রপাত ও চিকিৎসকের অভিযোগ
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার সূত্রপাত তমলুক শহরের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের ধারিন্দা এলাকায়। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে বসবাস করেন চিকিৎসক পার্থসারথি মান্না। তাঁর অভিযোগ, বাড়ির পাশের প্রায় ছয় ডিসমল জমি নিয়ে স্থানীয় একটি ক্লাবের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বিবাদ চলছিল। ওই জমি তিনি বৈধভাবে কিনলেও গায়ের জোরে তা দখল করে সেখানে দিনের পর দিন মদ ও জুয়ার আসর বসানো হত বলে অভিযোগ। আর সেই গোটা বেআইনি কারবারের নেপথ্যে তৎকালীন শাসকদলের প্রভাবশালী নেতা চঞ্চল খাঁড়ার প্রত্যক্ষ মদত ছিল বলেই দাবি ওই চিকিৎসকের।
চিকিৎসক পার্থসারথি বাবুর অভিযোগ, ২০২১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলেই চঞ্চল খাঁড়ার সাঙ্গোপাঙ্গরা তাঁকে অকথ্য গালাগালি ও প্রাণনাশের হুমকি দিত। তৎকালীন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও লাভ হয়নি। একাধিকবার পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও চঞ্চলের ‘প্রভাবে’ সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। তবে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের সেই চেনা ভূমিকা বদলাতে শুরু করেছে বলেই দাবি স্থানীয়দের।
নাটকীয় গ্রেফতারি
অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে ওই জমি দখল ও হুমকির মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চঞ্চল খাঁড়াকে তাঁর তমলুকের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর থানায় নিয়ে গিয়ে চলে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ। বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি মেলায় এবং চিকিৎসকের ওপর অত্যাচারের প্রমাণ হাতে আসায় রাতেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। শুক্রবার ধৃত নেতাকে তমলুক আদালতে তোলা হলে বিচারক জামিনের আবেদন খারিজ করে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন।
শহরের এক বাসিন্দার কথায়: “সময় সত্যিই বদলেছে। এক সময় যাঁর নাম শুনলেই শহরের মানুষ ভয়ে মুখ বন্ধ রাখতেন, আজ তিনি নিজেই আইনের জালে বন্দি।”
এ বিষয়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা জানান, চঞ্চল খাঁড়া-র বিরুদ্ধে এক চিকিৎসককে হেনস্থা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। পাশাপাশি তাঁকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও দায়ের হয়। এই ঘটনায় আগেই তমলুক থানায় লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই চঞ্চল খাঁড়াকে গ্রেফতার করে আদালতে তোলা হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আরও প্রতারণা-সহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সব বিষয় খতিয়ে দেখে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, পূর্ব মেদিনীপুরের তথা তমলুকের রাজনীতিতে এই ঘটনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। একদা ‘অপরাজেয়’ নেতার এই শ্রীঘর বাস জেলার বাকি দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের জন্য একটা বড়সড় বার্তা বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
কাজল মাইতির রিপোর্ট, দেশ মানুষ
