Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

জন্মদিনে ফিরে দেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্মদিনে ফিরে দেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
-------------------------
সন্দীপ কাঞ্জিলাল


আমি কবি, শুঁড়ি নয়।
--------------------------------
'এয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়' এর একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। অপর দু জন  হলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যো…


জন্মদিনে ফিরে দেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
-------------------------
সন্দীপ কাঞ্জিলাল


আমি কবি, শুঁড়ি নয়।
--------------------------------
'এয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়' এর একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। অপর দু জন  হলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়  আর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়  আমার ক্ষুদ্র আলোচনা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ্ববিখ্যাত পিকাসো বলেছিলেন " ছবি আঁকা শুধু ঘর সাজানো নয়; ছবি হলো হাতিয়ার,  আমার লড়াইয়ের অস্ত্র যা দিয়ে আত্মরক্ষা করি, শত্রুকে আঘাত করি।" যেমন " গোর্নিকা " ছবি।

জীবনে অসম্ভব বিড়ম্বনার মধ্য দিয়ে যেতে হলেও শেষদিন পর্যন্ত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়েননি নিজের বিশ্বাসের প্রতি আনুগত্য। দারিদ্র্যের যন্ত্রণা তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারেনি। তিনি কেন লিখতেন তার ভাষায় বলি " জীবনকে আমি যে ভাবে যতভাবে উপলব্ধি করেছি, অন্যকে তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে ভাগ করে দেওয়ার তাগিদে আমি লিখি "। তাই তিনি রবীন্দ্র যুগের রোমান্টিকতা এবং কল্লোলিয়দের বাস্তব সাহিত্য সৃষ্টি করার যে অপচেষ্টা তার থেকে বেরিয়ে এসে সময়ের বাস্তবতার নির্যাসকে ঢেলে দিলেন সাহিত্যে, তবে রোমান্টিকতা যে একদম ছিলনা একথা বলা যাবেনা। তাই তিনি নিজেই বললেন " উপন্যাসে ও কাব্য সৃষ্টি করা যায়, কল্পনা পার হয়ে যেতে পারে বাস্তবতার সীমা।" কেননা কোনো সার্থক শিল্প কখনো ও একরৈখিক হতে পারে না। তিনি প্রানপনে চেষ্টা করে ছিলেন চলতি ভাবধারা থেকে বেরিয়ে সাহিত্যকে নতুন কিছু দিতে। তাই তিনি "দিবারাত্রির কাব্য"তে সুপ্রিয়াকে দিয়ে বলেন "...যে জীবনকে সে মহাকাব্য বলে জেনে রেখেছিল সে একটা সাধারণ কবিতা ও নয়।" এই " দিবারাত্রির কাব্য " যে কবিতা দিয়ে শুরু " প্রাতে বন্ধু এসেছে পথিক, / পিঙ্গল সাহারা হতে করিয়া চয়ন/ শুষ্ক জীর্ণ তৃণ একগাছি "। এই পথিক তো আসলে সেই পথিক যে নিরন্তর পথ খুঁজে বেড়ায়, খুঁজে বেড়ায় তার পরম আকাঙ্খিত কে, কিন্তু হেরম্বেের কাছে সুপ্রিয়া কিছুই পায়না। "ক্ষতবুক তৃষার প্রতীক / রাতের কাজল- লোভী কাতর নয়ন,/ ওষ্ঠপুটে মৃত মৌমাছি " হেরম্বের কাছে সুপ্রিয়ার এই হল প্রাপ্তি।

"ওষ্ঠপুটে মৃত মৌমাছি " এই লাইনটির মানে গভীর অর্থবহ। ব্যবহৃত নারী বা তার মধু খেয়ে যাওয়া মৌমাছি, প্রতিদানে কি দেয় এক নারীকে, কাম না প্রেম? নারীর হৃদয় কিছুই পায়না! সে থাকে অতৃপ্ত! মধু লোভী মৌমাছি ফুলের কোনো প্রত্যাশা মেটায় না। সে মৃত মৌমাছি! এক শব্দের ছবি সৃষ্টি করলেন তিনি।

শব্দমদ বেচা শুঁড়ি হতে চাননি। তাই কবিতা লেখা নিয়ে কোনো উপদেশ তিনি ধার ধারেন নি। গদ্যের মতো পদ্যে ও তার জীবনের ক্ষুদ্রাংশ ধরা পড়েছে। আর তার মধ্যে তার শিল্পী মনের পরিচয় পাওয়া যায়। জীবন কে ভাবুকের চোখে নয়, বাস্তববাদীর চোখে দেখতে চেয়েছেন। তাই প্রথম কবিতার কাহিনি তে " আমি তো খেয়েছি খুদ, আমি তো করেছি উপবাস,/ আমি তো ভুগেছি রোগ চাষী মাঝি মজুরের সাথে,/ অকারণে আমি তো মরেছি লক্ষবার"। তবে মৃত্যু নয়, জীবনই কাম্য। " বেঁচে থাক জীবনের রসঘন কবিতা " -- এটা তার একান্ত প্রার্থনা।


মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। সেজন্য তার সমগ্র চিন্তা ভাবনাকে প্রভাবিত করেছিল বিজ্ঞান চেতনা। তিনি প্রচলিত কোনো কিছু কে স্থায়ী ও অবিচল সত্যরূপে মেনে নিতে চাননি। সমস্ত কিছু তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন। তাই তার কবিতা ও বাস্তবমুখী। বাস্তব যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে বুঝতে চেয়েছেন জীবনের ভাবকে। সর্বোপরি জীবনের জয়গানে সর্বদা মুখর ছিলেন। ' জীবন মরন ' কবিতায় বলেন - "মরণেরে বাদ দিয়ে / জীবনের মানে খোঁজা দায়/....মরে মরে বেঁচে থাকা/ জীবনের সেরা অহংকার "।

প্রেম কে তিনি দেখেছেন নেশার মতো। মনের মধ্যে সঞ্চিত হয়ে থাকা বাস্তব প্রেম কে এক অসম্ভব কল্পনায় সমাজ সংসারের বাইরে নিয়ে গিয়ে তিনি মুক্তি খোঁজেন। তিনি মনে করেন এই প্রেমই পৃথিবীতে দুঃখের কারণ।  এই প্রেম সাংঘাতিক এক যন্ত্রণার ব্যাপার! তাই প্রেম চিরকাল টেকে না। প্রেম যদি চিরকাল কারোর মধ্যে বাঁচতো, তবে সেই মানুষকে আর বাঁচতে হতো না। তাই " দিবারাত্রির কাব্যে " দ্বিতীয় ভাগের সূচনা কবিতায় লিখলেন ".... মৃত্যু মুক্তি দেয়না যাহাকে / প্রেম তার মহামুক্তি,-/ নতুন শরীর মুক্তি নয় মুক্তির আভাস "।

জীবন নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা সকল লেখকের লক্ষ্য,  তবে জীবন কে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গীই লেখককে স্বাতন্ত্র দেয়। সর্বক্ষেত্রেই শিল্প সাফল্যের কথা তিনি মনে রাখেন নি।আগামী দিনের জন্য তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে জীবনের মানে বোঝাতে চেয়েছেন। সারা জীবন কেটেছে দুঃখ আর দারিদ্র্যে। তাকে নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। শুধু নিজের মনের কথা তিনি "সুকান্ত ভট্টাচার্য " নামের কবিতায় বললেন, " বসন্তের কোকিল কেশে কেশে রক্ত তুলবে / সে কিসের বসন্ত! "

--------------------
লেখক - কবি,প্রাবন্ধিক। পেশায় - শিক্ষক।