Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ক্যাসিওসিয়া সাহিত্য পত্রিকা দৈনিক সেরা সম্মাননা

আমজাদকাকা
               প্রদীীপ সেন

   মাঝে মাঝে ফিরে দেখা। জীবনের অনেকটা পথ চলে এসেছি। হয়তো নাতিদীর্ঘ জীবনের অন্তিম বাঁকটা খুব একটা দূরে নয়। যেখানে পথটা কোনো নদীঘাটে গিয়ে মিশবে কল্পনায় সেই ঘাট যেন চোখের সামনে ক্রমশ ভেসে উঠছে। …



আমজাদকাকা
               প্রদীীপ সেন

   মাঝে মাঝে ফিরে দেখা। জীবনের অনেকটা পথ চলে এসেছি। হয়তো নাতিদীর্ঘ জীবনের অন্তিম বাঁকটা খুব একটা দূরে নয়। যেখানে পথটা কোনো নদীঘাটে গিয়ে মিশবে কল্পনায় সেই ঘাট যেন চোখের সামনে ক্রমশ ভেসে উঠছে। ব্যস্ত জীবনে মাঝে মধ্যে যেটুকু অবকাশ মেলে, স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসি। অতীত কখনো সুখের কখনো বা বেদনার। স্মৃতি মধুরই হোক বা বেদনার, স্মৃতিমন্থন সুখেরই হয়। যেমন যেদিন মা আমাকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে গেলেন, সেই দৃশ্যটা মনের মাঝে আজও ছবির মতো স্পষ্ট। কতটুকুই বা ছিলাম আমি? সাতে পা দিয়েছি। ঐটুকু বয়েসে ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে রাখার ক্ষমতা দিয়ে ঈশ্বর আমার উপকার ও অপকার দুইই করেছেন। সত্তোরে পা-রাখা আজকের আমি বিরলে বসে মায়ের কথা ভেবে চোখের পাতা ভেজাই। ঈশ্বরকে বলি, অতোটা স্মৃতিধর করে আমার ব্যথাকে চিরস্থায়ী করে রেখে দিয়ে আমাকে ব্যথা দিয়ে তাঁর কী লাভ!
     পেশাগত দিক থেকে অবশ্য উত্তম স্মৃতির সুবিধে অনেক। ভাবি, যদি স্মৃতি আর একটু প্রখর হতো! সেদিন ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে গিয়ে মুখ ফস্কে বলে ফেললাম, না বুঝে বুঝেছি বলবে না। ওটা ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার স্বভাব। ওরা সমস্বরে বললো, স্যার, বুঝিনি ওকথার অর্থ।
বুঝিয়ে বলুন না, প্লিজ। মুহূর্তে আমজাদ কাকার মুখটা ভেসে উঠলো মনে মনে। একথা তাঁর মুখেই শোনা। ছাগল যদি তিনটে বাচ্চা দেয়, দুটো একসাথে দুধ পান করে। তৃতীয়টা মাথা দিয়ে ঢু মেরে মেরে সহোদর-সহোদরাদের সরিয়ে দুধ খেতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর ভরপেটা দুটো যখন আনন্দে লাফাতে থাকে উনোপেটা তৃতীয়টিও তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে থাকে।
 হ্যাঁ, আমজাদকাকা। আমাদের কৃষিকাজে সাহায্য করতেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত আমার বাবার বয়েসি আমজাদকাকা। আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। সময়টা ঊনিশ শ ঊনষাট। আমাদের পাটক্ষেতে, মুলোক্ষেতে আগাছা নিড়ানোর দায়িত্ব ছিল আমজাদকাকার। আমার বাবা মুক্তমনা মানুষ ছিলেন। মানুষকে মর্যাদা দিতেন, অকৃত্রিমভাবে ভালো বাসতেন। উত্তরাধিকারসূত্রে আমি সেই গুণটাই পেয়েছি। সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই -এই আপ্তবাক্য আমার মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
   আমাদের অনেকগুলো গরু ছিল। গাভীগুলো নানা নামের ছিল -  লক্ষ্মী, কমলা, সরস্বতী..। বিসু, মহেশ ইত্যাদি নাম ছিল ষাঁড়গুলোর। লাল রঙের মহেশ ও লক্ষ্মী আমার খুব প্রিয় ছিল। সেদিন আমার বাৎসরিক পরীক্ষা। খেয়েদেয়ে স্কুলে যাবো।  মা নেই, বাবাতো আছেন। পরীক্ষা দিতে যাবার আগে বাবাকে প্রণাম করে যাওয়া আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। মনে করতে পারছি না এই সংস্কার আমি কার কাছে পেয়েছিলাম নাকি স্বতপ্রণোদিত হয়েই করতাম। স্কুলে যাওয়ার সময়েও বাবা সামনে থাকলে প্রণাম করে স্কুলে যাওয়ার রীতি ছিল আমার। পরীক্ষা দিতে যাবো উঠোনে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। আমজাদকাকা হাত-দাটা ধার দিচ্ছেন জঙ্গল পরিস্কার করবেন বলে। সে সময় আমাদের এখানে খুব হাল্কা জনবসতি ছিল। শেয়াল দিনেদুপুরে ছাগলছানা তুলে নিয়ে যেত। রাতে কাছেই বাঘের ডাক শোনা যেত। বনবেড়াল, খরগোশ, শকুন, পেঁচা খুব কাছ থেকে দেখেছি। পাখির ডাক শুনতে পেলে আমজাদ কাকাকে জিজ্ঞেস করতাম ওটা কোন্ পাখি। বৌ কথা কও, বুলবুল, ইষ্টিকুটুম, ডাহুক, পাতিহাঁস, দোয়েল, ফিঙে ইত্যাদি পাখিগুলো চিনিয়েছেন আমজাদকাকা।
  বাবাকে প্রণাম করে আমজাদকাকাকে টুক করে একটা প্রণাম করতে ডান হাতটা তাঁর ডান পায়ে ছোঁয়াতেই চমকে ওঠেন আমজাদকাকা। প্রতিবাদ করে বলেন, কিতা করতাছ চাচা। আমি তোমরার কাজের লোক, ভিন দেশের ভিন ধর্মের মানুষ। মুখ্যুসুখ্যু। আমারে সালাম কইরনা।  বললাম, তা কী করে হয়গো, কাকা। তুমি আমার বাবার বয়েসি, গুরুজন। তোমারে প্রণাম করবো না? ঐ জাতপাত ধর্ম ধুয়ে কি জল খাবো? তুমি আমায় আশীর্বাদ দাও। সেদিন নিজের গামছা দিয়ে চোখ মুছেছিলেন আমজাদকাকা। তার অর্থ সেদিন বুঝতে পারিনি, কিন্তু আজ বুঝি। তিনি সেদিন ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার কথা বলে উপদেশ দিয়েছিলেন আমি যেন ঐ তিন নম্বর বাচ্চার মত না বুঝে বুঝেছি বুঝেছি বলে নিজের ক্ষতি না করি। ছাত্রজীবনে তাঁর ঐ একটি উপদেশ আমার অনেক উপকার করেছিল। আজ শিক্ষকতার জীবনে ঐ উপদেশ আমি আমার  ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে থাকি। আমার ছাত্রছাত্রীরা যে আমাকে এত্ত ভালোবাসে তার মূলে আমজাদকাকার ঐ উপদেশ। স্কুলের পথে মুগের ক্ষেতে বানরের দলের উপস্থিতি ছিল। কাকা ঐ পথটা পার করে দিতেন। স্কুলের পথে সরু গাঙটা কখনো পাঁজাকোলে কখনো কাঁধে চাপিয়ে পার করিয়ে দিতেন।
দুপুরে খাওয়ার পর কোণার ঘরে বাঁশের মাচায় কাকা ঘুমাতেন। আমি গিয়ে বায়না ধরতাম গল্প শোনার। কত গল্প বলতেন। দেশভাগ, স্বাধীনতা আমি দেখিনি। চার বছর পর জন্মেছি আমি। উনি দেশভাগ, ধর্মে ধর্মে বিরোধ, হানাহানির নিন্দে করতেন। বড়ো হয়ে যখন কলেজে গেছি, শিক্ষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছি, অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষায় শিক্ষক সম্পর্কে পড়েছি, জেনেছি, ভেবেছি,  আমজাদকাকার মুখটা ভেসে উঠতো মনের দর্পণে।
   ক'মাস কাজ করে দেশে চলে যেতেন কাকা। ফি-বছর আবার আসতেন। ঊনিশশ ষাটে আমাদের বাড়ি ঘেঁষা স্কুল স্থাপিত হলে আমি আগের প্রাইমারি স্কুল থেকে উচ্চ বুনিয়াদি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। পঁয়ষট্টিতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাঁধে। আমজাদকাকা সেই যে দেশে গেলেন, আর ফিরলেন না। আজ হয়তো উনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু এখনো তাঁকে ভুলতে পারিনি। এক হিসেবে তিনিও আমার শিক্ষক। একজন শিক্ষক হয়ে আমি আমার শিক্ষককে ভুলি কীকরে?

আগরতলা, ২৭/০৫/২০