বিভাগ—গল্প
চ্যাটার্জ্জী বাড়ির মাসীমা
মালা চ্যাটার্জ্জী
19,5,2020
অবশেষে সেই ব্যাপারটাই হল। এতদিন ধরে যা
কানাঘুষো চলছিল। সেলিমপুরের নিঃসন্তান
চ্যাটার্জ্জী মাসীমাদের বসত বাড়িটা ভারত সেবাশ্রমই পেল। মেসোমশাই জীবিত অবস্থাতে…
বিভাগ—গল্প
চ্যাটার্জ্জী বাড়ির মাসীমা
মালা চ্যাটার্জ্জী
19,5,2020
অবশেষে সেই ব্যাপারটাই হল। এতদিন ধরে যা
কানাঘুষো চলছিল। সেলিমপুরের নিঃসন্তান
চ্যাটার্জ্জী মাসীমাদের বসত বাড়িটা ভারত সেবাশ্রমই পেল। মেসোমশাই জীবিত অবস্থাতেই উইল করে
গিয়েছিলেন বাড়িটা তাদের মৃত্যুর পর ভারত
সেবাশ্রম পাবে। স্বাভাবিকভাবেই নিকট আত্মীয়-
স্বজন এতে দারুণভাবে মনঃক্ষুণ্ণ । তারা এতদিন
ধরে আসা-যাওয়া করে এই দম্পতির প্রিয়জন হয়ে
আখের গুছাতে চেয়েছিল। সে গুড়ে বালি করে যদি
কেউ এমন করে তবে এতদিনের এটাওটা দিয়ে
কাছে আসার চেষ্টা ভস্মে ঘি ঢালার মতনই অবস্থা।
হিসেব মতো আমি চ্যাটার্জ্জী মাসীমাদের কেউ নই,
দৃশ্যত পরিচয় হচ্ছে—আমি মাসীমাদের পাড়ার মেয়ে। মা-মরা আমাকে ছোটবেলা থেকেই মাসীমা
খুব ভালোবাসতেন। আমিও সেই ভালোবাসার
টানেই মাঝেমাঝে মাসীমাদের বাড়ি যেতাম। কাজ
থাকলে বলতেন ‘ এখন যা । ’ কাজ না থাকলে
বসিয়ে আদরকরে আমটা, বিস্কুটটা, আচার, এটা-ওটা খেতে দিতেন। এহেন মাসীমা যখন মারা
যান তখন খুবই মর্মাহত হয়ে পড়ি। পুরোনো
কথাগুলি খুব মনে পড়তে থাকে।
পাড়ার সবাই ওনাকে “বিড়াল মাসীমা” বলে ডাকতো
কারণ অনেক বিড়াল ওনার পোষ্য ছিল। বিড়ালদের খাবার সময় দেখতাম একটা থালা মোটা একটা
লোহা দিয়ে বাজাতেন। আর বিড়ালগুলিও ঠিক
পড়িমড়ি করে যেখানে থাকতো এসে উপস্থিত হত।
ওদের জন্য মাছ, ভাত, দুধের নিত্য ব্যবস্থা ছিল।
তাই দেখে মনে আছে, বোস বাড়ির ঠাকুমা চাঁচাছোলা মাজাঘষা ভাষায় বলতেন,‘ আদিখেত্যা ,
বেড়েলের জন্য থালা পেটানো। ’
মিত্র বাড়ির কাকীমা, গুহ বাড়ির জেঠীমাও তো
হেসে খুন হতেন। কখনো যদি ওনারা চোখাচোখি
হতেন তাহলে ব্যঙ্গ করে বলতেন, “থালা পেটানো
হচ্ছে এবার ছানাপোনা আসবে। ”
জানি চ্যাটার্জ্জী মাসীমার চাপা স্বভাবের জন্য এরা
কেউ ওনাকে পছন্দ করতেন না।
মনে আছে, মেসোমশাই যেহেতু আর্মিতে কাজ
করতেন তাই ওনার হার্ট অ্যাটাক করলে মোমিনপুরে
আর্মি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। যখন ঐ খবর
আমার কানে এসে পৌঁছায়, আমি মাসীমার কাছে
মেসোমশাই কেমন আছেন জানতে গিয়েছিলাম।
গিয়ে দেখেছিলাম পাড়ার বিলুর মা‘ও সেখানে উপস্থিত। মনে আছে, মাসীমা বিলুর মা‘কে
বলেছিলেন, ‘ও বৌ, আজ বিলুকে আমার সঙ্গে
দিও, দরকার আছে। কাল ঝড়বৃষ্টি ছিল কাল
বুড়োকর্তা মরেনি, আজ মরবে। আমি বিলুর
হাতে দাহ ও ওদের চা মিষ্টি খাবার জন্যে টাকা
দিয়ে দেবো। তোমার মেসোমশাই আমাকে বলেছে
কেউ যেন একপয়সা ওনার কাজে খরচা না করে।
আর শোন, তোমার ছোট ছেলেকেও সঙ্গে নেবো
কারণ উনি মরলে পড়ে আমি যদি অস্থির হয়ে পড়ি।
সঙ্গে বল্টুও থাকা ভালো। একটা ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি
চলে আসবো ওনার কথামতো।'
আমি আর বিলুর‘মা হতবাক শ্রোতার মতো
মাসীমা‘র দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর, আমাদের
হঠাৎ তাগাদা দিয়ে মাসীমা বলে বসেছিলেন,
‘এবার যাও তোমরা, তাড়াতাড়ি কাজসারি
হাসপাতালে যেতে হবে। ’
মাসীমা‘র তাগাদায় উঠে রাস্তায় এসে সেদিন
কোনকথাই বলতে পারিনি আমরা শুধু নির্মম সত্যি
কথাগুলি বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটাচ্ছিল।
ঐদিন রাতেই মেসোমশাইয়ে‘র মৃত্যু‘র খবর কানে
এসে পৌঁছেছিলো। গিয়েছিলাম চ্যাটার্জ্জী মাসীমা‘র
বাড়ি। বোস ঠাকুরমা ‘হায় হায় গো, ও চাটুজ্যে
গিন্নি’ বলে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে ঘরের মধ্যে
প্রবেশ করেছিলেন। তারপর কাঁদো কাঁদো গলায়
বলেছিলেন,‘ছাঁইপাশ শাখা পলা ভাঙার ব্যবস্থা
আমি করে দিচ্ছি, তুমি স্নান করার সময় মাথার
সিঁদুর‘টা ঘষে ঘষে তুলে ফেলো। ’
হঠাৎ ঘরের মধ্যে বোধহয় বাজ পড়েছিল।
চ্যাটার্জ্জী মাসীমা ধীর গলায় বলেছিলেন, ‘ওটা
আমিই করে নেবো মাসীমা, সে শক্তি আমার আছে। ’
বৈধব্যসাজে বোস ঠাকুমাকে সঙ্গী করেননি বলে
বোধহয় ঠাকুমা রেগে গিয়েছিলেন। তাই কালক্ষেপ
না করে‘ যাই বাড়িতে অনেক কাজ পড়ে আছে'
বলে উঠে গিয়েছিলেন।
এমন কী হবিষ্যি দিতে গেলেও মাসীমা গ্রহণ করেন
নি। শান্ত গলায় বলেছিলেন, ‘আমি হবিষ্যি করছি
না তো। যে কদিন অশুচ নিরামিষ খাবো, তারপর
যেমন আগে খেতাম সেরকমই খাবো। তোর
মেসোমশাইয়ের নির্দেশ। ওনাকেই আমি গুরু বলে
মানি। প্রয়াগে আমাদের দু‘জনের শ্রাদ্ধশান্তিও
উনি করে গেছেন। বাড়িটারও একটা ব্যবস্থা হয়েছে'
বলে চুপ করে গিয়েছিলেন।
কোনকথা সেদিন বলতে পারিনি আমি শুধু
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে ছিলাম। সম্বিত আসলে
দেখেছিলাম চোখের জলে সব ঝাপসা লাগছিল।
স্বত্বসংরক্ষিত@ মালা চ্যাটার্জ্জী
