Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ক্যাসিওপিয়া সাহিত্য পত্রিকা দৈনিক সেরা সম্মাননা

পুরনো কলকাতার দ্য ভিঞ্চি

অমৃতা মুখার্জী

শ্রীসদনের কলাভবন ব্লকের ডানদিকের শেষ ঘরটায় প্রায় আলো  ঢোকেনা। ঘরটা বাথরুমের পাশে, পিছনে বেসিনে ছড়ছড় করে জল পড়ে দিবারাত্র। দেওয়ালের রং চটা আর শেওলার আল্পনা দেওয়া। তারা দুজনেই যেহেতু সামারের…


পুরনো কলকাতার দ্য ভিঞ্চি

অমৃতা মুখার্জী

শ্রীসদনের কলাভবন ব্লকের ডানদিকের শেষ ঘরটায় প্রায় আলো  ঢোকেনা। ঘরটা বাথরুমের পাশে, পিছনে বেসিনে ছড়ছড় করে জল পড়ে দিবারাত্র। দেওয়ালের রং চটা আর শেওলার আল্পনা দেওয়া। তারা দুজনেই যেহেতু সামারের ছুটি থেকে ফিরতে দেরী  করেছে এই অপুর্ব ঘরটি তাদের দেওয়া হল। যদিও তারা দুজনেই শিক্ষাভবনের ছাত্রী। 

লাজু চোখ বড় বড় করে খুব ডাঁটল ইমন কে " কিতনী বার বোলীথি, জলদি আয়া কর, হুয়া না ফুরসৎ তেরি?
আব কুঁয়ে মে মেডক বনকে রহা যায়ে হাম দোনো"

"এই ম্যালা ফ্যাচ ফ্যাচ করিস না তো!  তুই তো বললি রাঁচী গেছিস বেড়াতে। সেজন্য আমি দেরী করে এলাম, থাকিস হাজারীবাগে এমন ভাব দিলি যেন রাঁচী না প্যারিস যাচ্ছিস। মর এখন এই পচা ঘরে। তোর তো এমনি মাথা খারাপ। কষ্ট করে রাঁচী যাবার কি দরকার ?"

লাজু এমন তাকাল যেন ভস্ম করে দেবে ইমন কে। গজগজ করতে করতে হনুমান জীর ক্যালেন্ডার লাগাচ্ছিল দেওয়ালে।

ইমন হাঁ হাঁ করে উঠল। "এই এদিকের দেওয়ালে নো হনুমান জী, তোর দিকে লাগা!"

"কিঁঊ? তেরা প্রব্লেম কেয়া হ্যায়? তু ভি লগা না, কালী মাইয়া কি পোস্টার, মেরা কোই এতরাজ নেহী"

" অবশ্যই লাগাব। তবে কালী মাইয়ার নয়। ডিম্পল কাপাডিয়ার, ক্রাউনিং গ্লোরি, আহা কি চুল, কি চোখ, কি শোল্ডার, পারিনা"

" তেরা দীমাগ খ্অরাব হো গ্যয়া। কালী মাঈয়ার বদলে মে ডিম্পল ? ইয়ে ভি কোই বাত হুয়ী? এক্সাম হবে তো কাকে প্রে করবি? ডিম্পল কে?"

" যানে দে মেরি রুমমেট, তুই বুঝবি না। অত গদগদ  ভক্তিনেই আমার, অতি ভক্তি চোরের সিম্পটম"

হ্ঠাৎ দরজাটা একটু ফাঁক হল। পানের মত মুখ আর একজোড়া  হরিণের মত কাজল মাখা চোখ। দিব্যি হাসি হাসি।

"মাই নেম ইস রীণা! তোমরা কি নতুন ? ওয়েল্কাম টু আওয়ার ব্লক। ক্যান আই বরো সাম শুগার।"

লে! হালুয়া। যা: বাবা। কি ইন্ট্রো !

মেয়েটি আরো মিষ্টি করে হাসলো আর একটু ভিতরে ঢুকে এল। তার গায়ে একটা সবুজ চুন্নি। দুহাতে ভর্তি ঝলমলে কাঁচের চুড়ি।
খুব আদুরে গলায় সে জানাল, তার বাবা কলকাতা থেকে হ্ঠাৎ এসেছেন দেখা করতে। বাইরে গেস্ট রুমে বসে আছেন। খুব মাথা ধরেছে। এক কাপ চা পেলে ভাল হয়। চা বানাতে এসে রীণা দেখে চিনি নেই। অগত্যা।

ইমন এক কাপ চিনি দিতেই থ্যনক ইয়ু  বলে বাহারি কোলাপুরি চপ্পলের ঝংকার তুলে মেয়েটি হরিণীর মত চলে গেল।

লাজু তখনো গোঁজ হয়ে বসে। ইমন তাড়া দিল।  "আরে তাড়াতাড়ি চল, সাড়ে আটটা বাজে, জাহাঙ্গীর দার কিচেন ব্যানকোয়েট বন্ধ হয়ে যাবে তখন খিদেয় পেটে চুহা দৌড়বে সারারাত।"

ঝটপট দুজনে রেডী হয়ে ঘরে তালা লাগিয়ে দৌড় লাগাল।

গেটের কাছে পেরোবার সময় দেখল গেস্ট রুমে বসে আছেন এক জন খুব লম্বা সৌম্যকান্তি পুরুষ। অল্প সাদা দাড়ি। চোখের দিকে তাকালে মন শান্ত হয়ে যায়। মাথায় খুব স্টাইলিশ স্ট্র হ্যাট। খাকী প্যান্ট আর জংলা সবুজ জামা। রীণা হাত নেড়ে ডাকল। পরিচয় করিয়ে দিল
"বাবা এরা আমার বন্ধু, এক ই ব্লকে থাকি, এরা চিনি দিল বলে তুমি চা খেতে পারলে। "

উঠে এসে দু জন কে জড়িয়ে ধরলেন।
" অনেক ধন্যবাদ। ভীষণ  মাথা ধরেছিল, খুব উপকার করলে তোমরা। আমার নাম রথীন মিত্র। খবর্দার কাকু, জেঠু বলবে না। রথীন দা চলতে পারে। "

গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল ইমনের। কি সব্বনাশ! রীণা মিত্র র বাবা যে বিখ্যাত চিত্রকর রথীন মিত্র সেটা তো তারা জানত না। উফ, ভাগ্যিস লাজু কে পাত্তা না দিয়ে চিনি টা দিয়েছিল। ঢিপঢিপ করে প্রণাম করল দু জনে।

উনি দরাজ গলায় হেসে উঠে বললেন
"আই মাস্ট পে ইউ ব্যাক রিটার্ন। আজ রাতে বরং জাহাঙ্গীরের নেমন্তন্ন নাই বা খেলে। চল আমি তোমাদের আজ খাওয়াবো। ভালমন্দ ধাবায় গিয়ে বেশ ভালমন্দ খাওয়া যাক।"

রীণা হই হই করে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। " থ্যানক ইয়ু বাবা"

ওরা তিনজন  বসেছিল উনার উল্টোদিকে। আলু কুলচা, চানা আর পনীর পকোড়া অর্ডার দেওয়া হয়েছে। চিত্রকর মৃদু হাসলেন আর ঝুলি থেকে দুটো চ্যাপ্টা আয়তাকার বই বার করলেন। ভারি সুন্দর হালকা হলুদ মলাট। উপরে অসাধারণ একটা স্কেচ। বইএর নাম Calcutta then and now. নিজে হাতে সাইন করে দিলেন।  R এর মাথায় একটা গোল টুপি।

সন্ধেটা স্বপ্নের ঘোরে কেটে গেল। কারুকার্য করা নেপালী বাদাম কাঠের পাইপ খাচ্ছিলেন। তামাকের অদ্ভুত সুগন্ধ। বলছিলেন। ইমন রা হাঁ করে শুনছিল। হাওড়া ব্রিজের ইতিহাস। প্রথমে ছিল পন্টুন ব্রীজ। রানী  ভিক্টোরিয়ার আমলে 1866। লেসলি ব্রাডফোর্ড ছিলেন থার্ড ইঞ্জীনীয়ার। 1528 ফুট লম্বা, বানাতে লেগেছিল তখন কার দিনে 22 লাখ টাকা। কিন্তু পরবর্তী তে ভীড় বেড়ে গেল। দু পাশে জুট মিল খুলে গেল। 1920 তে নতুন বড় ব্রিজের নকশা কাটা হল। এবারকার ইঞ্জীনীয়ার স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জী। টাটা রা দিলেন স্টীল। 1943 তে এসে গেল আজকের হাওড়া ব্রীজ। 1500 ফুট লম্বা, পৃথিবীতে পঞ্চম উচ্চতায়। খুব ধুমধাম করে ওপেনিং হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ  চলছিল। বলা যায় না কে বোমা মারে।

লাজু অবাক হয়ে উনার আঁকা স্কেচ টা দেখছিল।

নিউমার্কেট যার নামে সেই হগ সায়েব ছিলেন চেয়ারম্যান অফ জাস্টিস অফ পীস। পুলিশ কমিশনার ও ছিলেন। 1866 থেকে 76। ইউরোপিয়ান রা যাতে বেশ টুকটাক বাজার করে খুশি মনে বাস্কেট নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে তার জন্য এই আয়োজন। লাল ইঁটের গথিক স্থাপত্য আর সুন্দর স্লেট রঙ্গা ছাদ। টাওয়ার টা এসেছিল খোদ লন্ডনের Huddersfield থেকে। প্রত্যেকটা ইঁট স্পেশালি বানানো। রুডিয়ার্ড কিপলিং ও তার লেখায় এই বাজার কে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ খোঁজার আদর্শ জায়গা বলেছেন সিটি অফ ড্রেডফুল নাইটের পাতায় পাতায়। 1985 সালে পুড়ে গিয়েও আবার নতুন করে জেগে উঠেছে এই বাজার লিন্ডসে স্ট্রীটের মোড়ে।

ইমন মুগ্ধ হচ্ছিল স্কেচ টা দেখে। কি শাণিত লম্বা পেন্সিলের টান।

মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি যেখানে হয়েছিল, সেই খিদিরপুর ব্রীজ এর স্কেচ টা দেখে ইমন  উদাস হয়ে গেল। তার দেশের বাড়ি ভদ্রপুরের কাছে যেখানে মহারাজা নন্দ কুমারের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আজো আছে। আছে তার প্রতিষ্ঠিত কালীর মন্দির। খিদিরপুর ব্রীজের উল্টোদিকে ছিল মেজর কার্কপ্যাট্রিকের বিখ্যাত বলরুম। সেখানে কত মনের দেওয়া নেওয়া হত নাচের তালে কে জানে।

খাবার এসে গেল। রীণা সবাই কে ছুরি তে কেটে সুন্দর করে কাঁটা চামচ দিয়ে সার্ভ করল। ইমন মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। কি