Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

প্রাচীন ঐতিহ্য আর লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধন: তমলুকের ধর্মঠাকুরের মেলা

অরুণ কুমার সাউ,তমলুক : পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী শহর তমলুকের ধর্মতলায় শুরু হলো শতাব্দী প্রাচীন পুরোনো লোকধর্মকেন্দ্রিক ধর্মঠাকুরের মেলা। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে তাম্রলিপ্ত পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রাধাবল্লভপু…


অরুণ কুমার সাউ,তমলুক : পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী শহর তমলুকের ধর্মতলায় শুরু হলো শতাব্দী প্রাচীন পুরোনো লোকধর্মকেন্দ্রিক ধর্মঠাকুরের মেলা। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে তাম্রলিপ্ত পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রাধাবল্লভপুর গ্রামে এই মেলা বসে। বুধবার এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মেলার শুভ উদ্বোধন করেন তাম্রলিপ্ত পৌরসভার পৌর প্রধান ড. দীপেন্দ্র নারায়ণ রায়। এছাড়াও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপ-পৌর প্রধান লীনা মাভৈঃ রায়, কাউন্সিলর দেবশ্রী দাস মাইতি, আনোয়ার বেগম, তৃপ্তি ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিবর্গ এবং মেলা কমিটির সদস্যরা।

এই মেলার সঠিক সূচনাকাল নিয়ে কোনো লিখিত নথি না থাকলেও, স্থানীয়দের ধারণা এর বয়স শতাব্দী প্রাচীন। মেলাটির কেন্দ্রবিন্দু হলো কিয়াখালী গ্রামের দেবনাথ পরিবারের ধর্মঠাকুরের বিগ্রহ। প্রাচীনকাল থেকে এই পরিবারের সদস্যরাই বংশপরম্পরায় দেবতার পুজো করে আসছেন। একসময় একটি পুরোনো অশ্বত্থ গাছের নিচে এই পুজো অনুষ্ঠিত হতো। বর্তমানে গ্রামের মানুষের চাঁদায় একটি মন্দির নির্মিত হয়েছে, যেখানে বিগ্রহ এনে ধর্ম ঠাকুর পুজো করা হয়।

মেলা কমিটির এক সদস্য জানান, কয়েক বছর আগেও এই মেলা মাত্র একদিনের জন্য বসত। তবে বর্তমানে মানুষের উৎসাহ এবং লোকসমাগমের কথা মাথায় রেখে এটি আট দিনের মেলায় রূপান্তরিত হয়েছে।


লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ধর্মমঙ্গল কাব্যের নায়ক লাউসেনের আরাধিত দেবতা এই ধর্মঠাকুর বন্ধ্যাত্ব মোচনের দেবতা হিসেবে সুপরিচিত। আজও দূর-দূরান্ত থেকে বহু নিঃসন্তান দম্পতি সন্তানের জন্য মানত করতে আসেন। এছাড়াও মৃত-বৎসনার সন্তাননাশ রোধ, রোগ নিরাময় এবং সন্তানদের দীর্ঘ সুস্থতার কামনায় এখানে পুজো দেওয়া হয়। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, ভক্তরা বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে পুজো দেন— এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঝাঁটা, পাট, মাটির হাঁড়ি, প্রদীপ, গোটা পান-সুপারি, এবং চর্মরোগ নিরাময়ের জন্য ওল, ডাল, চাল, চুন ও মাটির ছোট ভাঁড়। দেবনাথ পরিবারের সদস্য বিশ্বনাথ দেবনাথ বলেন,- আমাদের এই ধর্মঠাকুর অনেক প্রাচীন। তবে ঠিক কবে থেকে আমাদের পরিবারে এই বিগ্রহের পুজো হচ্ছে, তা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। এটি আমাদের বংশের বহু পুরনো ঐতিহ্য।

ধর্মঠাকুরের পুজোর পাশাপাশি, একই স্থানে বিশ্বকর্মা পুজোকে কেন্দ্র করে সাত দিন ধরে বড় মেলা বসে। এই মেলায় স্থানীয় কারিগরদের তৈরি জিনিসপত্র এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকানপাট বসে, যা প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে ওঠে।স্থানীয় বাসিন্দা রাজকুমার মান্না জানান, -এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রক্তদান শিবির, যাত্রা ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং লোকসংস্কৃতি আর গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের এক অসাধারণ মিলনক্ষেত্র।এই মেলা প্রমাণ করে, আধুনিকতার ভিড়েও তমলুকের মতো প্রাচীন জনপদে লোকবিশ্বাস এবং ঐতিহ্য কীভাবে আজও জীবন্ত।