নিজস্ব প্রতিবেদক, মেদিনীপুর : সমকালীন দক্ষিণ এশীয় সাহিত্য জুড়ে যে বিপন্নতা ও সংকটের চোরাস্রোত, তারই মানচিত্র খুঁজে বের করার লক্ষ্যে গত তেইশে সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর কলেজের ইংরেজি বিভাগের উদ্যোগে কলেজের আঙিনায় বসল বিদ্বজ্জনদের চাঁদের…
নিজস্ব প্রতিবেদক, মেদিনীপুর : সমকালীন দক্ষিণ এশীয় সাহিত্য জুড়ে যে বিপন্নতা ও সংকটের চোরাস্রোত, তারই মানচিত্র খুঁজে বের করার লক্ষ্যে গত তেইশে সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর কলেজের ইংরেজি বিভাগের উদ্যোগে কলেজের আঙিনায় বসল বিদ্বজ্জনদের চাঁদের হাট। 'Vulnerabilty in South Asian Literature: Understanding the Crisis and Comminity' শীর্ষক দিনভর এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জ্ঞানচর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। রাজ্য তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শতাধিক গবেষক ও অধ্যাপক শুধু যোগই দেননি, তাঁদের মননশীল বিতর্কে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে গোটা অধিবেশন। ঘটনাচক্রে তেইশে সেপ্টেম্বরেই রাজ্যজুড়ে হওয়া অতিবর্ষণে কলকাতা তথা আপামর রাজ্যবাসীর বিপন্নতার ছবি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল যে বিপন্নতা শুধু তাত্ত্বিকই নয়, তা ভয়াবহভাবে বাস্তবও বটে।
সম্মেলনের মূল আকর্ষণ ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তাত্ত্বিক ও হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রমোদ কে. নায়ার। 'উত্তর-ঔপনিবেশিক কবিতায় বিপন্নতা ও সংকট' শীর্ষক তাঁর সূচক ভাষণটি যেন গোটা আলোচনার সুর বেঁধে দেয়। অধ্যাপক নায়ার তাঁর ভাষণে দ্ব্যর্থহীন ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন, এই বিপন্নতা ব্যক্তিগত দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং এক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে নির্মিত সম্মিলিত সংকট। তাঁর মতে, দক্ষিণ এশীয় কবিতা এই কাঠামোগত হিংসা ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে একাধারে সাক্ষী এবং প্রতিরোধের দলিল।
আলোচনার অভিমুখকে আরও প্রসারিত করেন দুই আমন্ত্রিত বক্তা-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটেসে অবস্থিত ব্র্যান্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা উল্কা আজারিয়া এবং কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনিন্দ্য এস, পুরকায়স্থ। তাঁদের অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ ভাষণে উঠে আসে ক্ষমতা, রাষ্ট্র ও লিঙ্গের জটিল আবর্তে ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বের সংকট কীভাবে সাহিত্যে ছায়া ফেলে, সেই প্রসঙ্গ।
দিনভর একাধিক অধিবেশনে শতাধিক গবেষক তাঁদের গবেষণাপত্র পাঠ করেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গবেষকরা পারস্পরিক মতামত আদানপ্রদানের সাথেসাথে কলেজের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গেও আলোচনায় অংশ নেন। অধিবেশনে পাঠ হওয়া প্রতিটি গবেষণাপত্রেই ছিল নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিপ্লনতা ও সংকট-কে দেখার ও বোঝার চেষ্টা।
এই অভিনব উদ্যোগ প্রসঙ্গে মেদিনীপুর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক শ্রী সত্যরঞ্জন ঘোষ বলেন, "সাহিত্যের কাজ শুধু সৌন্দর্য সৃষ্টি নয়, সময়ের ক্ষতগুলিকে চিহ্নিত করাও। আমাদের লক্ষ্য ছিল সাহিত্যের আয়নায় সমকালীন বিশ্বের এই জটিল সঙ্কটটিকে কাটাছেঁড়া করা। অংশগ্রহণকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান আমাদের সেই প্রয়াসকে সার্থক করেছে।" এই সম্মেলন যে দক্ষিণ এশীয় সাহিত্য গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।
বৃষ্টির প্রকোপকে উপেক্ষা করে স্বনামধন্য অধ্যাপক, গবেষক ও ছাত্রছাত্রীদের চিন্তার আদানপ্রদান আরো একবার স্পষ্ট করে দিল যে বিপন্নতা বইয়ের পাতা থেকে বাস্তবের জমিতে উঠে এলেও সঠিক ভাবনাচিন্তা ও উদ্যোগ তার মোকাবিলা করতে সক্ষম।


