Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ক্যাসিওপিয়া সাহিত্য পত্রিকা দৈনিক সেরা সম্মাননা

#শিল্পী
#অরিন্দম_ভট্টাচার্য্য

বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। কোনো একটা বিশেষ প্রয়োজনে লোকাল ট্রেনে চড়ে চাকুরীস্থল হলদিয়া থেকে গ্রামের বাড়ীর উদ্দেশ্যে র‌ওনা দিয়েছি। গ্রীষ্মকাল। ট্রেনে প্রায় সকলের‌ই গলদঘর্ম অবস্থা। অসম্ভব ভীড়, বস…


#শিল্পী
#অরিন্দম_ভট্টাচার্য্য

বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। কোনো একটা বিশেষ প্রয়োজনে লোকাল ট্রেনে চড়ে চাকুরীস্থল হলদিয়া থেকে গ্রামের বাড়ীর উদ্দেশ্যে র‌ওনা দিয়েছি। গ্রীষ্মকাল। ট্রেনে প্রায় সকলের‌ই গলদঘর্ম অবস্থা। অসম্ভব ভীড়, বসার কোনো জায়গা পাইনি, একটা সিটের দেওয়ালে কোনোরকমে একটু ঠেস দিয়ে কামরার ভেতরে চেন ধরে ঝুলে আছি। বাইরে কোন স্টেশন এলো, কোন স্টেশন গেলো, ভিড়ে কিছুই বোঝার উপায় নেই। অবশ্য আমার গন্তব্য বহুদূর, তাই আমার বোঝার প্রয়োজন‌ও নেই। ট্রেনে ওঠার সময় রুমালটা ভিজিয়ে নিয়েছিলাম, ওটা দিয়েই সম্পূর্ণ মুখটা ঢেকে নিয়েছি। একটু হলেও গরমটা কম লাগছে। বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন রকমের স্থুল কথাবার্তার কচকচানিতে এক সময় ভেতরটা অস্বস্তিতে ভরে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পাশের কামরা থেকে একটা অদ্ভুত সুন্দর সুর ভেসে এলো কানে। কোনো চেনা পরিচিত গান নয়, সুর‌ও নয়। তবু অসম্ভব একটা টান অনুভব করছিলাম। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম পাশের কামরার দিকে। তারজালির ফাঁক দিয়ে দেখলাম, এক সুদর্শন যুবক, হাতে একটা মাইক্রোফোন নিয়ে চোখ বন্ধ করে গেয়ে চলেছে সেই গান। বেশ কয়েকটা গান শুনে মন্ত্র মুগ্ধের মতো চেয়ে র‌ইলাম তার দিকে। মনেমনে ভাবলাম -- হায় রে কপাল! এতো সুন্দর কন্ঠ, মোহিত করা সুরের যাদু, তেমন সুন্দর গানের কথা, এরপরও ঐ ছেলেটিকে এইভাবে রোজগার করতে হচ্ছে!

পরের স্টেশন আসতেই যুবকটি তার যন্ত্রপাতি নিয়ে নেমে গেল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়! কেউ কোনো অর্থ দিয়ে তাকে সাহায্য করলো না। আমার‌ই মতো আরো একজন এদিক থেকে খুব মনযোগ সহকারে যুবকের গান শুনছিলেন, তাকে বললাম -- আজকাল সত্যিই মানুষ গুণীর যোগ্য সম্মানটুকু দিতে ভুলে গেছে। তা নাহলে বলুন!একটা টাকাও কেউ ওর পকেটে দেয় না!

পাশের ভদ্রলোক হেসে বললেন -- আপনি মনে হয়, এই লাইনে নতুন যাতায়াত করছেন। ঐ ছেলেটি কারো কাছ থেকে কোনোদিন কোনো টাকা নেয় না। মনে হয় অন্য কোথাও সার্ভিস করে। প্রত্যেক রবিবার এই ট্রেনটিতে পাবেন ওকে। এটাতেই গান শোনাতে শোনাতে যায়, আবার এটাতেই গান শোনাতে শোনাতে ফেরে।

অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম -- এমন‌ও হয়!

ভদ্রলোক বললেন -- শুনেছি, ওর বাবা নাকি অন্ধ। এইরকম ট্রেনে ট্রেনে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেই ছেলেকে মানুষ করেছেন। এখন আর ওনাকে দেখা যায় না। ছোটোবেলায় মাঝে মাঝে ছেলেটিও নাকি বাবার ঝোলা পাঞ্জাবী ধরে ধরে ঘুরতো।

আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরলো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে র‌ইলাম। ছেলেটির প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেল।
হাওড়া স্টেশনে নেমে হন্তদন্ত হয়ে ওকে ধরলাম -- তোমার গান শুনে ভাই আমি অভিভূত। তোমার সম্পর্কে অনেক কথাও শুনলাম‌। তোমার বাবা এখনো বেঁচে আছেন তো?

ছেলেটি আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকালো। কে জানে! আগে হয়তো আমার মতো অদ্ভুত লোক তার চোখে পড়েনি। সে মিষ্টি করে বলল -- না, উনি আর নেই। তিন বছর হলো পরলোকগমন করেছেন উনি।

-- আর তুমি যে এভাবে লোককে গান শোনাও, তার কি কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে?

-- অবশ্য‌ই আছে। কারণ ছাড়া কি কিছু হয়? তবে সে অনেক কথা। এখন খুব খিদে পেয়েছে। পরে কোনো একদিন কথা হবে।

আমিও নাছোড়বান্দা। বললাম -- খিদে আমার‌ও পেয়েছে। চলো না, একসাথেই খেতে খেতে গল্প করা যাবে।

ছেলেটা হেসে ফেললো -- আপনি ছাড়বেন না দেখছি। চলুন তাহলে।

গঙ্গার পাড়ের একটা হোটেলে খাবার নিয়ে জানলার ধারে বসলাম দু'জনে। গঙ্গার ঢেউ, জলের ওপর দিয়ে লঞ্চের এপার ওপার করা, ছুটে ছুটে লোকের লঞ্চে ওঠা নামা, এসব দেখতে দেখতে গল্প জুড়লাম দু'জনে। সে অনেক গল্প। সে না হয় অন্যদিন হবে। তার মধ্যেই কয়েকটা কথা না বলতে পারলে আমার ভাত হজম হবে না। তাই সেটুকুই বলছি --

ছেলেটি বলল -- বাবা ছিলেন একজন প্রকৃত শিল্পী। কোনোদিন চেনা ছকে গান গাইতেন না। অদ্ভুত অদ্ভুত সুন্দর সুর আবিষ্কার করতেন নিজেই। বলতেন, প্রকৃতিতেই সব কিছু আছে। প্রকৃত শিল্পী সে-ই, যে সেখান থেকেই সমস্ত কিছু আহরণ করতে পারে। সে গায়ক হোক, লেখক হোক বা চিত্রশিল্পী হোক, প্রকৃতির ভাষা যতক্ষণ না সে পড়তে পারছে, ততক্ষণ সে শিল্পীই নয়। মারা যাবার দু'দিন আগে উনি আমাকে ডেকে বলেছিলেন -- 
                         বাবা, শুনেছি যোগীদের অসীম ক্ষমতা। তারা ভূমির উপর বায়ু সমূদ্রেও ভেসে থাকতে পারেন, সামান্যতম জল পান না করেও তৃষ্ণা মেটাতে পারেন, কণা মাত্র খাদ্য গ্রহণ না করেও ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে পারেন, আবার শ্বাসক্রিয়া বন্ধ রেখেও দেহে জীবন ধরে রাখতে পারেন।
জানি, তুমি পারো না এসব। কিন্তু তুমি যা পারো,
সেটাই বা কম কিসের!
তুমি হয়তো অন্ধকারকেও দেখতে পাও, হয়তো নিরবতাকেও শুনতে পাও, কিংবা গন্ধহীনেরও গন্ধ পাও, নয়তো বিস্বাদের‌ও স্বাদ পাও, কিংবা অপদার্থ শক্তির‌ও স্পর্শ পাও!
তুমি যে শিল্পী! তোমার ক্ষমতাও অপার।
মনে রেখো, তুমি কোনো যোগীর থেকে কোনো অংশে কম ন‌ও।
তুমি সদা ধ্যানমগ্ন নিজের শিল্প রচনায়। কল্পনা মন্ত্রে বশ করেছ দূরন্ত সময়কে, সযত্নে বেঁধে রেখেছো তার‌ই খোটায় তাকে। সৃষ্টি তোমার নিত্য খেলার অঙ্গ, সেদিক থেকে তুমি স্রষ্টাও।
নির্ভিক তুমি, জীবন্মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করতে তুমিই পারো। সৃষ্টির নেশায় দুর্গম পথে হেঁটে যেতে পারো কয়েক আলোকবর্ষ।
তোমার হাতের শাণিত অস্ত্রে নিমেষে টুকরো করে ফেলতে পারো যত অবাঞ্ছিত অমুলক চিন্তাধারাকে। তোমাকেই ভয় পায় যত প্রচলিত প্রথা।
তাই, তুমি আমাকে কথা দাও, আমার মৃত্যুর পর‌ও তোমার শিল্পী সত্তাকে তুমি বাঁচিয়ে রাখবে। আর আমার অগনিত শ্রোতাদের মুগ্ধ করবে তোমার সেই শিল্প দিয়ে।

সেদিন ওনাকে আমি কথা দিয়েছিলাম।
আমি একটা বেসরকারী কোম্পানিতে চাকরী করি। তাই প্রত্যেক সপ্তাহে একমাত্র এই রবিবারটাই সময় পাই আমার শ্রোতাদের গান শোনাতে। তাদের কাছে টাকা কি জন্য নেবো বলুন? আমার সংসারতো এমনিতেই চলে যাচ্ছে। বরং ওরা আমার গান শুনে আমাকে ধন্য করছে -- আমার শিল্পী সত্তাটাকে বাঁচিয়ে রাখছে।