৩০/৫/২০
বিষয় :- গল্প
শিরোনাম:- দেশবাড়ির গল্প শোনো
কলমে :------ শিবানী গুপ্ত
আমার জন্ম যদিও ত্রিপুরা রাজ্যের ধর্মনগর শহরে , কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি বাবা ও ঠাকুর্দার মুখে দেশবাড়ির ঐতিহ্যের গল্পগাঁথা।
প্রসঙ্গক…
৩০/৫/২০
বিষয় :- গল্প
শিরোনাম:- দেশবাড়ির গল্প শোনো
কলমে :------ শিবানী গুপ্ত
আমার জন্ম যদিও ত্রিপুরা রাজ্যের ধর্মনগর শহরে , কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি বাবা ও ঠাকুর্দার মুখে দেশবাড়ির ঐতিহ্যের গল্পগাঁথা।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি ,আমাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের প্রধান শিষ্য শ্রী মুরারী মোহন গুপ্ত।
আমাদের পৈত্রিক ভিটে শ্রীহট্ট জেলার " দুলালী " গ্রামে।
আমরা দুলালীর গুপ্ত বংশ।তাই পাড়াটির নামই ছিলো গুপ্ত পাড়া।
ঠাকুর্দা ছিলেন নামকরা চিকিৎসক।বাবাও ডাঃ ছিলেন ।
দুলালী ছাড়াও সিলেটের দাড়িয়া পাড়াতেও আমাদের আরেকটি বাড়ি ছিলো,যেখানে ঠাকুর্দা চিকিৎসা করতেন।
ছোটবেলা বাবার মুখেই শোনা,বিশাল বিশাল আমবাগান, কাঁঠাল বাগান,প্রচুর জমিজমার কথা।রাখোয়াল ছিলো। নাম ছিলো,বললাম।ইয়া পেল্লাই দশাসই স্বাস্থ্য।
ছোটবেলায় নাকি বলরামের কাঁধে চেপে বাবা পাঠশালাতে যেতেন।
ঠাকুর্দা কলকাতা থেকে ডাক্তার হয়েও দেশেই প্রাকটিস শুরু করেন।
বনেদীয়ানার পুরোদস্তুর জীবনেই তাঁরা অভ্যস্ত ছিলেন।
পূজা-পার্বনে মহা উৎসবে পুরো গ্রাম উপচে পড়তো।
আমার ঠাকুমা চারুবালা ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন,আর মেঘের মতো কালো একবার চুল ।স্নানের পরে সেই চুল শুকোতে বেশ উঁচু টুলে বসতে হতো।
সেসময়ের গল্পগুলো এতো মজার ছিলো যে তা শোনার লোভে মৌমাছির মতোই কখনো ঠাকুমা তো কখনো ঠাকুর্দাকে ঘিরে থাকতাম।
একবার এক বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রণ।
ঠাকুমা ৬টাকা দিয়ে নববধূর জন্যে উপহারের শাড়ি কিনে বিয়েবাড়িতে গেলেন।
সবাই সেকি খাতির ঠাকুমাকে ।
শুনেছিলাম ,ঠাকুমার দেওয়া শাড়িটা নাকি বিয়ের কাপড় থেকেও দামী ছিলো।
অবিশ্বাস্য চোখে তাকাতে বাবাই বললেন,আরে,তখন তো ৪ আনাতে জোড়া পদ্মার ইলিশ আনলেও বকুনি খেয়েছি ,কেননা,জোড়া ইলিশের দাম দুটাকা ,কি অবাক কান্ড বাপু,যেন রূপকথার গল্পের বলেই মনে হতো।
আসলে ,তখনকার দিনে পাঁচটাকা বেতনের পাত্র ও নাকি বিয়ের বাজারে অতি সুপাত্র।
তখন তো কারো বাড়িতে কোন ছেলে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করলে দুতিন গ্রামের লোক উপচে পড়তো তাকে দেখার জন্যে।
সাধক কবি হাছন রাজার নাম জানেনা এমন মানুষ বিরল।
হাছন রাজা ও উনার ভায়েরা আমার বাবা ও জ্যেঠুর সহপাঠী বন্ধু ছিলেন।
বাংলাদেশের তদানীন্তন রাষ্ট্রদূতের নামটা ঠিক মনে পড়ছেনা ,হয়তো হুমায়ূন রশিদ হবে ,উনার মায়ের স্থায়ী চিকিৎসক ছিলেন ঠাকুর্দা।
রোগীর কপাল দেখেই রোগের উপসর্গ বলে দিতে পারতেন।
এবিষয়ে একটা গল্প বাবার মুখেই শোনা-- সকালবেলা এক রোগীকে দেখে বেশ সুস্থ দেখে গেছেন ঠাকুর্দা।বিকেলে ওই রোগীর বাড়ির সামনে দিয়ে আসতে গিয়ে মরাকান্না শুনে গিয়ে দেখেন,রোগীকে উঠোনে শোয়ানো,বাঁশের মাচাতে,ধূনো জ্বলছে,পাড়া পড়শির ভিড়ে উঁকি দিয়ে রোগীর কাছে গিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলেই ডঃ বিনোদ বন্ধু গুপ্ত রীতিমতো ধমকে উঠলেন সবাইকে,
কি সর্বনাশ করতে যাচ্ছিলে তোমরা? যে মানুষটা বেঁচে আছে তাঁকেই পোড়াতে যাচ্ছো? কি মারাত্মক অঘটন ঘটাতে যাচ্ছিলে তোমরা? ছিঃ ,ধিক্কার! আমি ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলে না?
এতোটুকুই কান্ডজ্ঞান না ছিলো তো কাউকে দিয়ে একটা খবর তো পাঠাতে পারতে,নাও ,সরো,আমাকে দেখতে দাও --জীবিতকে শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছিলে ,জয়মা! জয়মা!
!শিগগিরই ওকে ঘরে নিয়ে শুইয়ে কাঁথা চাপা দাও,আর,ওর পায়ের তলায় সর্ষে তেল গরম করে মালিশ দাও- আমি ওষুধ দিচ্ছি ,চিন্তা করোনা,
,ও ভালো হয়ে যাবে,নাড়ির গতি অতি ক্ষীণ।
হতবাক সবাই ।
আর ,সত্যি সেই রোগীকে ঠাকুর্দাই সুস্থ করে তুলেন।
আরো যে কতো গল্প শুনেছি তা বলে শেষ করা যাবেনা।
শুনলে সবাই অবাক হবে যে,আমার ঠাকুর্দার কখনো বনেদীয়ানার অহমিকা ছিলোনা।
মানুষের উপকারের জন্যেই তার ডাক্তার হওয়া।
ডাক্তারী পড়াকালীন ও বেশ রোমাঞ্চকর ঘটনা,রোজ রাতে এক অপরূপ মাতৃমূর্তি স্বপ্নে দেখেন।
ঘটনাক্রমে একদিন উনার জ্যেঠুর সাথে জয়রামবাটি চলে যান।
আর ,কি আশ্চর্য্য! শ্রীমাকে দেখে,আরে! ইনিই তো স্বপ্নে ডাকতেন তাঁকে!
তখুনি দীক্ষা নেন, কিন্তু মনে একটা কাঁটা খচখচ করে,সবাই বলে,ইনিই সাক্ষাৎ জগদম্বা! ইনি তো অতি সাধারণ,তাহলে!
এদিকে,শ্রীমান ঠাকুর্দাকে ফলমিষ্টি খেতে দিয়েছেন।
ঠাকুর্দা তখনো ভাবছেন।
আচমকাই ঠাকুর্দা মুখ তুলে যেই তাকালেন,দেখেন,শ্রীমা স্বয়ং জগদম্বা রূপে মিটিমিটি হাসছেন। কি অসাধারণ জ্যোতির্ময়ী মা!
ঠাকুর্দার সংজ্ঞা লোপ হলো।
শ্রীমা-ই ঘটের জল ছিটিয়ে দিতে জ্ঞান ফিরে আসে।
শ্রীমায়ের হাতের রান্না যে কতো বার ঠাকুর্দা খেয়েছেন,বলতেন,অমৃতের আস্বাদ!
সেই ঠাকুর্দার ব়ংশধর বলে গর্ব হয় বৈকি।
কালসায়রের মরণ দোলায় ছিনিয়ে নিলো আপন জনায়,
এখন সবই স্মৃতির কাঁথায় সুখের আলাপন।
দেশের কথা বলতে যাদের আসতো চোখে জল।
শূণ্য চারপাশ তাঁদের হারিয়ে,স্মৃতিই সম্বল!
বিষয় :- গল্প
শিরোনাম:- দেশবাড়ির গল্প শোনো
কলমে :------ শিবানী গুপ্ত
আমার জন্ম যদিও ত্রিপুরা রাজ্যের ধর্মনগর শহরে , কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি বাবা ও ঠাকুর্দার মুখে দেশবাড়ির ঐতিহ্যের গল্পগাঁথা।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি ,আমাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের প্রধান শিষ্য শ্রী মুরারী মোহন গুপ্ত।
আমাদের পৈত্রিক ভিটে শ্রীহট্ট জেলার " দুলালী " গ্রামে।
আমরা দুলালীর গুপ্ত বংশ।তাই পাড়াটির নামই ছিলো গুপ্ত পাড়া।
ঠাকুর্দা ছিলেন নামকরা চিকিৎসক।বাবাও ডাঃ ছিলেন ।
দুলালী ছাড়াও সিলেটের দাড়িয়া পাড়াতেও আমাদের আরেকটি বাড়ি ছিলো,যেখানে ঠাকুর্দা চিকিৎসা করতেন।
ছোটবেলা বাবার মুখেই শোনা,বিশাল বিশাল আমবাগান, কাঁঠাল বাগান,প্রচুর জমিজমার কথা।রাখোয়াল ছিলো। নাম ছিলো,বললাম।ইয়া পেল্লাই দশাসই স্বাস্থ্য।
ছোটবেলায় নাকি বলরামের কাঁধে চেপে বাবা পাঠশালাতে যেতেন।
ঠাকুর্দা কলকাতা থেকে ডাক্তার হয়েও দেশেই প্রাকটিস শুরু করেন।
বনেদীয়ানার পুরোদস্তুর জীবনেই তাঁরা অভ্যস্ত ছিলেন।
পূজা-পার্বনে মহা উৎসবে পুরো গ্রাম উপচে পড়তো।
আমার ঠাকুমা চারুবালা ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন,আর মেঘের মতো কালো একবার চুল ।স্নানের পরে সেই চুল শুকোতে বেশ উঁচু টুলে বসতে হতো।
সেসময়ের গল্পগুলো এতো মজার ছিলো যে তা শোনার লোভে মৌমাছির মতোই কখনো ঠাকুমা তো কখনো ঠাকুর্দাকে ঘিরে থাকতাম।
একবার এক বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রণ।
ঠাকুমা ৬টাকা দিয়ে নববধূর জন্যে উপহারের শাড়ি কিনে বিয়েবাড়িতে গেলেন।
সবাই সেকি খাতির ঠাকুমাকে ।
শুনেছিলাম ,ঠাকুমার দেওয়া শাড়িটা নাকি বিয়ের কাপড় থেকেও দামী ছিলো।
অবিশ্বাস্য চোখে তাকাতে বাবাই বললেন,আরে,তখন তো ৪ আনাতে জোড়া পদ্মার ইলিশ আনলেও বকুনি খেয়েছি ,কেননা,জোড়া ইলিশের দাম দুটাকা ,কি অবাক কান্ড বাপু,যেন রূপকথার গল্পের বলেই মনে হতো।
আসলে ,তখনকার দিনে পাঁচটাকা বেতনের পাত্র ও নাকি বিয়ের বাজারে অতি সুপাত্র।
তখন তো কারো বাড়িতে কোন ছেলে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করলে দুতিন গ্রামের লোক উপচে পড়তো তাকে দেখার জন্যে।
সাধক কবি হাছন রাজার নাম জানেনা এমন মানুষ বিরল।
হাছন রাজা ও উনার ভায়েরা আমার বাবা ও জ্যেঠুর সহপাঠী বন্ধু ছিলেন।
বাংলাদেশের তদানীন্তন রাষ্ট্রদূতের নামটা ঠিক মনে পড়ছেনা ,হয়তো হুমায়ূন রশিদ হবে ,উনার মায়ের স্থায়ী চিকিৎসক ছিলেন ঠাকুর্দা।
রোগীর কপাল দেখেই রোগের উপসর্গ বলে দিতে পারতেন।
এবিষয়ে একটা গল্প বাবার মুখেই শোনা-- সকালবেলা এক রোগীকে দেখে বেশ সুস্থ দেখে গেছেন ঠাকুর্দা।বিকেলে ওই রোগীর বাড়ির সামনে দিয়ে আসতে গিয়ে মরাকান্না শুনে গিয়ে দেখেন,রোগীকে উঠোনে শোয়ানো,বাঁশের মাচাতে,ধূনো জ্বলছে,পাড়া পড়শির ভিড়ে উঁকি দিয়ে রোগীর কাছে গিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলেই ডঃ বিনোদ বন্ধু গুপ্ত রীতিমতো ধমকে উঠলেন সবাইকে,
কি সর্বনাশ করতে যাচ্ছিলে তোমরা? যে মানুষটা বেঁচে আছে তাঁকেই পোড়াতে যাচ্ছো? কি মারাত্মক অঘটন ঘটাতে যাচ্ছিলে তোমরা? ছিঃ ,ধিক্কার! আমি ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারলে না?
এতোটুকুই কান্ডজ্ঞান না ছিলো তো কাউকে দিয়ে একটা খবর তো পাঠাতে পারতে,নাও ,সরো,আমাকে দেখতে দাও --জীবিতকে শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছিলে ,জয়মা! জয়মা!
!শিগগিরই ওকে ঘরে নিয়ে শুইয়ে কাঁথা চাপা দাও,আর,ওর পায়ের তলায় সর্ষে তেল গরম করে মালিশ দাও- আমি ওষুধ দিচ্ছি ,চিন্তা করোনা,
,ও ভালো হয়ে যাবে,নাড়ির গতি অতি ক্ষীণ।
হতবাক সবাই ।
আর ,সত্যি সেই রোগীকে ঠাকুর্দাই সুস্থ করে তুলেন।
আরো যে কতো গল্প শুনেছি তা বলে শেষ করা যাবেনা।
শুনলে সবাই অবাক হবে যে,আমার ঠাকুর্দার কখনো বনেদীয়ানার অহমিকা ছিলোনা।
মানুষের উপকারের জন্যেই তার ডাক্তার হওয়া।
ডাক্তারী পড়াকালীন ও বেশ রোমাঞ্চকর ঘটনা,রোজ রাতে এক অপরূপ মাতৃমূর্তি স্বপ্নে দেখেন।
ঘটনাক্রমে একদিন উনার জ্যেঠুর সাথে জয়রামবাটি চলে যান।
আর ,কি আশ্চর্য্য! শ্রীমাকে দেখে,আরে! ইনিই তো স্বপ্নে ডাকতেন তাঁকে!
তখুনি দীক্ষা নেন, কিন্তু মনে একটা কাঁটা খচখচ করে,সবাই বলে,ইনিই সাক্ষাৎ জগদম্বা! ইনি তো অতি সাধারণ,তাহলে!
এদিকে,শ্রীমান ঠাকুর্দাকে ফলমিষ্টি খেতে দিয়েছেন।
ঠাকুর্দা তখনো ভাবছেন।
আচমকাই ঠাকুর্দা মুখ তুলে যেই তাকালেন,দেখেন,শ্রীমা স্বয়ং জগদম্বা রূপে মিটিমিটি হাসছেন। কি অসাধারণ জ্যোতির্ময়ী মা!
ঠাকুর্দার সংজ্ঞা লোপ হলো।
শ্রীমা-ই ঘটের জল ছিটিয়ে দিতে জ্ঞান ফিরে আসে।
শ্রীমায়ের হাতের রান্না যে কতো বার ঠাকুর্দা খেয়েছেন,বলতেন,অমৃতের আস্বাদ!
সেই ঠাকুর্দার ব়ংশধর বলে গর্ব হয় বৈকি।
কালসায়রের মরণ দোলায় ছিনিয়ে নিলো আপন জনায়,
এখন সবই স্মৃতির কাঁথায় সুখের আলাপন।
দেশের কথা বলতে যাদের আসতো চোখে জল।
শূণ্য চারপাশ তাঁদের হারিয়ে,স্মৃতিই সম্বল!
