জাত
ছোটো গল্প
নবনীতা সই
14,5,20
আজ সাতদিন ধরে তোমাকে ফোন করে যাচ্ছি , তুমি ফোন ধরছো না কেন?
আমি ব্যাস্ত ছিলাম ৷ তোমাকে মেসেজ করেছিলাম৷
ব্যস্ত ?? কি আশ্চর্য !! প্রতিদিন আমি ফোন করলে তোমার ঘুম ভাঙতো না আর আজ!!
সবকিছু কি বোঝানো সম্…
জাত
ছোটো গল্প
নবনীতা সই
14,5,20
আজ সাতদিন ধরে তোমাকে ফোন করে যাচ্ছি , তুমি ফোন ধরছো না কেন?
আমি ব্যাস্ত ছিলাম ৷ তোমাকে মেসেজ করেছিলাম৷
ব্যস্ত ?? কি আশ্চর্য !! প্রতিদিন আমি ফোন করলে তোমার ঘুম ভাঙতো না আর আজ!!
সবকিছু কি বোঝানো সম্ভব !! তুমি বাচ্চাদের মতন রিয়্যাক্ট করছো৷
তোমার কি হয়েছে শিবেন? প্লিজ আমাকে বলো৷
কি হবে?কিছু না৷
না না কিছু হয়েছে , দেখি তোমার শরীর ভালো আছে তো?
আহ্ সবার সামনে সিনক্রিয়েট কোরোনা৷
অবাক হয়ে যায় শুভ্রা৷ কেমন যেন অচেনা লাগে শিবেন কে৷ একদিন সকালে ফোন না করলে যে মানুষটার ঘুম ভাঙতো না আজ সে ....
বলোনা কি হয়েছে ?
বললাম তো কিছু হয়নি৷ ব্যস্ত আছি , চাপে আছি৷
চুপ করে শিবেনের পাশে বসে শুভ্রা৷ পাশের মানুষটার হাত দুটো ধরতে খুব মন চায় কিন্তু অভিমান টা দলা পাকিয়ে আছে গলার কাছে৷ আজ সাতটা দিন৷ কিভাবে কেটেছে শুভ্রা জানে৷ শিবেন বলে দিলো ব্যস্ত ছিলাম ৷ ব্যস?? তার কি ভাবে কেটেছে কোনদিন শিবেন জানতে পারবে?
সেই কলেজের প্রথম বছরে শিবেন কে দেখেছিলো শুভ্রা ৷ হাবাগোবা মতন , পড়াতে এসেছিলো কলেজে৷ সবাই হাসাহাসি করতো গাঁয়ের এই শিবেন কে নিয়ে৷ চুপচাপ আর শান্ত৷ কলেজে আস্থায়ী ভাবে পড়াতে এসেছিলো ৷ বিশেষ কিছুই না অতি সাধারণ কিন্তু শুভ্রার ভালো লেগেছিলো৷ ব্যস ওটুকু৷ শুভ্রা ছিলো ছটপটে৷ গান , নাচ আর হই হুল্লোড় করা মেয়ে৷ সবসময় আনন্দ আর হাসিখুসি মুখে সবার মন জয় করা মেয়ে৷ প্রথম আলাপ হলো কলেজ ফাংশানে৷ স্টেজ থেকে নামতেই শিবেন বলেছিলো , খুব সুন্দর নাচ করো তুমি৷ তারপর দুজনে দেখা হয়েছে, হয়েছে সামান্য হাসি বিনিময় ৷ সব ছাত্র ছাত্রীরা যখন শিবেন কে খিল্লি করেছে, শুভ্রার ভালো লাগেনি৷ কেন তা জানেনা শুভ্রা৷
তারপর সেই যেদিন খুব অসময়ের বৃষ্টিতে কলেজে আটকে গিয়েছিলো শুভ্রা৷ লম্বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলো উত্তাল হাওয়ার সাথে মুষুলধারা বৃষ্টি সেদিন শিবেন নিজে থেকে কথা বলেছিলো৷ টুকটাক, ঐ পরিচয় , আলাপ৷
বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাওয়া শুভ্রাকে দেখছিলো শিবেনের অবাক হওয়া দৃষ্টি ৷ কেমন যেন লাগছিলো শুভ্রার৷ মনে হচ্ছিলো বৃষ্টি যেন না থামে , চলতে থাকুক কথার উপর কথার জাল বুনে যাওয়া৷
তারপর থেকে দুজনের বন্ধুত্ব ৷ অসম্ভব মেধাবী শুভ্রা ইংরাজী আর অংকে খুব ভালো ছিলো৷ ক্লাস টপার মেয়েটা শিবেন কে সাহায্য করা শুরু করে তার প্রয়োজনীয় প্রজেক্টে৷ দিনরাত খেঁটে যায়৷ দুজনে মধ্যে চলে সারা দিনরাত আলোচনা , গল্প ৷
তারপর কলেজ শেষ হবার আগেই শিবেন সবার সামনে বলেছিলো , ভালোবাসি ৷ না তখন শুভ্রার মনে হয়নি সিনক্রিয়েট হচ্ছে৷ বরঞ্চ মনে হয়েছিলো যুগ যুগ যেনো এর অপেক্ষায় ছিলো৷
শুভ্রা এম এস সি তে ভরতি হবার আগেই বাবা মা শিবেনের কথা যেনে যায় ৷ শুরু হয় অশান্তি ৷
শুভ্রার বাবা মধ্যবিত্ত পরিবারের পুরুষ হলেও দুই মেয়েকে খুব যত্ন করে মানুষ করেছেন৷ চেয়েছেন মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াক৷ শুভ্রা পরিস্কার বলে দিয়েছিলো সে শিবেন কে বিয়ে করবে৷ তার বাবা সঙ্গে সঙ্গে সমন্ধ দেখা শুরু করেন৷ পাশের গাঁয়ের হাইস্কুলের শিক্ষকের সাথে কথাবার্তা এগোতে থাকে৷ কিন্তু শুভ্রা অটল৷ সবার বোঝানো ব্যর্থ হয়৷ শুভ্রা ভরতি হয়ে যায়৷
শিবেনের জন্য তখন শুভ্রা অনেককিছু করতে পারে৷ আর শিবেন ? তার তো দিনরাত শুধু শুভ্রা৷ দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মন স্বপ্নের ঘর বাঁধে কল্পনায়৷ একমাত্র শুভ্রার মাসি শুভ্রার সাথে ছিলো৷ সে সবসময় শুভ্রাকে বিশ্বাস করতো৷
দিন কেটে যেতে থাকে৷ শুভ্রা নিজের লক্ষ্যে এগোতে থাকে৷ শিবেনের কাজটা স্থায়ী হওয়ার অপেক্ষা ৷
বাবা মা শেষে হাল ছেড়ে দেন৷ মেয়ে বড় হয়েছে সে যা ভালো বোঝে করুক৷ কিন্তু দুজনেই শুভ্রাকে পরিস্কার বলে দেন তারা এ বিয়েতে খুশি নন৷
তারা তাদের ছোটোমেয়ে প্রভা কে নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেন৷ শুভ্রা দাঁতে দাঁত চেপে বাবা মায়ের সব অভিমান সয়ে যায়৷
দেখতে দেখতে দিন কেটে যায়৷ শুভ্রাদের বাড়িতে শিবেন আসলে শুভ্রার বাবা মায়ের নীরব অবহেলা শুভ্রাকে আহত করতো৷ শিবেনের বুকে মাথা রেখে শুভ্রা বলতো বিয়ের পর তুমি আর আসবে না এবাড়ি৷ আমরা মাসির বাড়ি যাবো জামাই ষষ্ঠী তে৷ আর তুমি একদম মন খারাপ কোরোনা৷ আমরা দুজনে চাকরী করে বানাবো স্বপ্নের সংসার৷
শিবেনের লক্ষ্য আরও উচ্চশিক্ষা৷ শুভ্রা সবসময় শিবেন কে উৎসাহ দেয়৷ ভালোবাসা আন্তরিকতায় ভেসে যায় দুটি মন৷ সবার থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতন শুভ্রা শুধু আঁকড়ে ধরে শিবেন কে৷
আজও মনে আছে, পদে পদে মা শুভ্রাকে কথা শোনাতো, কি আছে ঐ ছেলের? অজ গাঁয়ে বাড়ি তাও মাটির৷ বাবা তো পুরুত ৷ ভালো থাকবি?
শুভ্রা কানে নিতো না৷ শিবেনের শুভ্রাদের বাড়িতে আসাটা গাঁয়ের লোকের চোখে লাগতে শুরু করলো৷ শুভ্রা সব মেনে নিলো৷
কিন্তু যেদিন শুভ্রার প্রিয় মাসি বললো , শুভ্রা তোদের এবার অন্তত রেজিস্ট্রি করা উচিত ৷ তখন শুভ্রা সেই প্রিয় মাসি কে বললো সে শিবেন কে চাপ দেবেনা৷ বেচারার সামনে অনেক পথ৷ ওকে পি এইচ ডি করতে হবে৷ প্রফেসর হতে হবে৷
মাসি বুঝিয়ে বুঝিয়ে হার মেনে গেলো৷ কিন্তু শুভ্রা অটল৷
সেই দিনগুলো শুভ্রার কাছে একদিকে কষ্টের বাবা মা দিনদিন দুরে সরে যাচ্ছেন আবার অন্যদিকে ভালোবাসায় ভরপুর৷ দিন শুরু হতো শিবেন কে দিয়ে শেষ হতো শিবেন কে নিয়ে৷
তারপর শিবেন পেলো তার স্বপ্নের চাকরী৷ শুভ্রার মনকামনা পূর্ণ হলো৷
মাত্র দশদিন আগের কথা৷ খুশিতে পাগোল হয়ে গিয়েছিলো শুভ্রা৷ মাসিকে জানাতেই মাসি ও খুব খুশি ৷
মাসি কিছু বলার আগেই শুভ্রা বলেছিলো তোমার কিছু বলা লাগবে না সামনের শীতেই ডেট ঠিক করো৷ আর হ্যাঁ সাতদিন আগে না আসলে বিয়ে করবো না৷
কিন্তু তোর পড়া?
বিয়ের পর শেষ করবো৷
শুভ্রা আমি বলি কি তুই রেজিস্ট্রি করে রাখ৷ খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট তুই ৷ চাকরী করে না হয় সামাজিক বিয়ে করিস৷
না মাসি৷ বাড়িতে জানো তো কি অবস্থা ? বাবা মা কেউ শিবেন কে পছন্দ করেন না৷ আচ্ছা বলো সংসার আমি করবো তো মানুষ টা আমার পছন্দের তো হতে হবে? তাদের কাছে শিবেন দেখতে ভালো না৷ শিবেন বোকা বোকা৷
ওরকম বলতে নেই শুভ্রা৷ মা বাবা কি খারাপ চান? সবঠিক হয়ে যাবে৷ দুজনে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবি৷ তখন সব ঠিক হয়ে যাবে৷ তোর বয়স তো বেশী না আপাতত রেজিস্ট্রি কর ৷
না বাবা বলেছেন বিয়ে করে বিদায় হও ৷ আমাকে জানো সহ্য করতে পারেনা৷
ধুর বোকা৷ বাবা মা অনেককিছু বলেন সব কথা ধরতে নেই ৷
না মাসি আমি বিয়ের দিন রেজিস্ট্রি করে নেবো৷ শিবেনের মা সেদিন ফোন করে বললো , তুমি কবে আসছো আমার আর একা ভালো লাগেনা৷ নিজের সংসার নিজে সামলাও৷
বাবা এতদুর??
হ্যাঁ হ্যাঁ দুর৷ তুমি এখন ঠিক করো আমার বিয়েতে কি পড়বে৷ কি কি আনন্দ করবে৷
আচ্ছা বাবা তোর মেসো আসুক বলছি৷ তোর ভাই তো শুনেই খুশি হয়ে যাবে৷ দেখিস বাবা ওর কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক ডেট দেখে নিস৷
কোনো চিন্তা কোরোনা৷ শিবেনের তো একটাই শালা৷ সে না আসলে হবে?
সেই মনে হয় শেষ হেসেছিলো শুভ্রা৷ তারপর সাতদিন শিবেনের ফোন বন্ধ নয় ফোন তোলেনি ৷ চিন্তায় আধামরা হয়ে আজ বাধ্য হয়ে কলেজে এসেছে শুভ্রা৷
আমি আসছি৷
কোথায় যাচ্ছো?
কাজ আছে৷
আচ্ছা ৷ রাতে ফোন কোরো৷
আমি কদিন ব্যস্ত শুভ্রা৷
শুভ্রা!! শু বলে ডাকাটা কি ছেড়ে দিলে?
কতকিছু তো ছাড়তে হয়৷
তারপর..
আজ একমাস না শিবেন ফোন করেছে না মেসেজ ৷ প্রথম প্রথম শুভ্রা খুব রাগ করেছে ৷ ভেবেছে ফোন করলেও তুলবে না৷ পরে মনে মনে চেয়েছে ফোন করুক৷তারপর নিজের ফোন করেই গেছে৷ ফোন ধরেনি শিবেন ৷ শিবেনের মা কে ফোন করেছে তিনিও ধরেন নি৷
অজানা অাশংকা মনে এসেছে কিন্তু শুভ্রা নিজের ভালোবাসায় বিশ্বাস হারায় নি৷ বাবা মায়ের চোখে মুখে প্রশ্ন কে নিজের হাসি মুখ দিয়ে এড়িয়ে গেছে৷
আজ একটা অন্য নাম্বার দিয়ে ফোন করাতে, শিবেন ধরেছে৷
হ্যালো কেমন আছো?
আমি খুব ব্যাস্ত ৷
জানি৷ কিন্তু বাবা তোমাদের বাড়িতে যেতে চান৷
তোমার বাবা ? কেন?
কেন জানোনা? বিয়ের কথা বলতে৷
কেন তিনি তো রাজি ছিলেন না৷
হয়েছেন আমার চাপে পড়ে৷
দ্যাখো শুভ্রা৷ বাবা মা কে চাপে ফেলা যায়না৷ আমার বাবা এ বিয়েতে রাজি না৷
মানে?
মানে খুব সহজ৷ তোমার বাবা রাজি ছিলেন না যেমন তেমন আমার বাবা রাজি হচ্ছেন না৷
তার আপত্তির কারন?
তোমাদের জাত৷
সেটা কি তিনি জানতেন না?
বাবার মুখে মুখে তর্ক করবো?
তাহলে উপায়?
তুমি চাকরী পেলে না হয় বাবা কে রাজি করানো যেতো৷
আর না পেলে?
কিছু করার নেই ৷
তাহলে চলো রেজিস্ট্রি করে নি৷
তোমার মাথা খারাপ ?
কেন? আমার বাবা যখন রাজি ছিলোনা তখন ও তো আমি বলেছিলাম আমি এক কাপড়ে চলে আসবো৷
তোমার বাবা আজ রাজি হচ্ছে আমার চাকরী দেখে৷
মানে? তুমি বাবাকে লোভী বলছো?
তা নয়তো কি?
আমার বাবা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে..
থাক থাক , সব বোঝা আছে ৷ শোনো শুভ্রা বাবা রাজি না হলে আমার কিছু করার নেই ৷ আমি সে শিক্ষা পাইনি যে বাবার সাথে তর্ক করবো৷
আর ভালোবাসা ? কথা না রাখার শিক্ষা?
আমি জানিনা কিছু , অপেক্ষা করো৷ বাবাকে চেষ্টা করছি রাজি করানোর৷ তার মধ্যে তুমি চাকরী পেয়ে গেলে....
কোথায় একটা অপমানের কাঁটা ফুটেছিলো আমার বুকে৷ তারপর হয়েছিলো রাগ, অভিমান, নিজের আত্ম সম্মান কে পিছনে ফেলে তবুও আবার গিয়েছিলাম কিন্তু আর দেখা পাইনি শিবেনের৷ সে তখন আমাকে না বলে দিল্লী তে৷ কলেজ থেকে পি এইচ ডি করতে পাঠানো হয়েছে৷ যে মানুষ টা ঘুম থেকে উঠতো আমার ফোনের রিংটোনে, মেসেজে ভরিয়ে রাখতো আমার ইনবক্স দুদিনে সব ভুলে গেলো?
দিন দিন আমি পাগোলের মতন হয়ে যাচ্ছিলাম৷ একটা মানুষ কি করে সব মুহুর্তে ভুলে যায়৷ আবসাদে নিজেকে ভুলে যাচ্ছিলাম৷ শেষে আর কিছু মনে থাকতো না, খেতে ভালো লাগতো না৷ আর শেষ পেরেক টা আমার জীবনে ঠুকে ছিলো শিবেনের বিয়ের খবর টা৷
প্রভা হাসলে মনে হতো আমাকে দেখে হাসছে৷ বান্ধবীরা বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে আসলে মনে হতো ব্যঙ্গ করছে৷ বাবা মায়ের চোখের দিকে তাকাতে পারতাম না৷
অপমান নয় অবসাদে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম৷ শেষে ঠাঁই হলো এ্যাসাইলামে৷
সেখানে আমার ডাক্তার শান্তনুর আপ্রাণ চেষ্টায় আমি সুস্থ হই ৷ শান্তনু মূখার্জী ৷ আমার দেবতা৷ তিল তিল করে ক্ষয়ে যাওয়া মন কে যিনি বাঁচতে শেখান৷ পরম যত্নে আমার চিকিৎসা করেন৷ আজ বুঝতে পারি কত ধৈর্যশীল হলে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়া যায়৷ তার একান্ত চেষ্টায় আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হই ৷
আবার পড়াশুনা শুরু করতে বলে সবাই ৷ কিন্তু পারিনি, শিক্ষিত মানুষের রূপ দেখে ঘৃণা হয়ে গিয়েছিলো ৷ আর কলেজে যেতে চাইনি৷
দীর্ঘদিন বই য়ের মাঝে ডুবে গিয়েছিলাম ৷ কোলকাতায় মাসির বাড়ির ছোট্ট লাইব্রেরী টা হয়ে যায় আমার ঠিকানা৷ মাসির ছেলে বিদেশে চলে গিয়েছিলো চাকরী পেয়ে৷ মাসি আর মেসো কে নিয়ে আমার জগত৷
মাঝে মাঝে ডাক্তার শান্তনু নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতেন৷ তার মা আর ছোট্ট বুবুন কে নিয়ে তার সংসার ৷ স্ত্রী গত হয়েছেন বুবুন কে জন্ম দিয়ে৷ সময় সুন্দর কেটে যেতো৷ ছোট্ট বাচ্চাটা আমার কাছে গল্প শোনার কি বায়না করতো ৷ জীবন কে আবার একটু একটু করে ভালোবাসতে শিখলাম৷
গাঁয়ে আর ফিরিনি৷ বোনটার চাকরী , বিয়ে সব খুশির খবর গুলো ফোনেই শুনেছি৷ তারপর শুরু করি মাসির আগ্রহে লেখালিখি ৷ সময় থেমে তো থাকেনা বয়ে নিয়ে চলে যায় মানুষ কে৷
আজ দশ বছর পর৷
আজ আমার বই বেস্ট সেলার৷ সরকারী বেসরকারী প্রচুর পুরস্কার আমার ঝুলিতে৷ জীবনের খাতা আমি সাদা রাখলেও লিখে গেছি জীবনের কথা৷ সম্মান , অর্থ আর ভালোবাসা পেয়েছি দুহাত ভরে৷
তুই রেডি হোসনি? কখন থেকে কি লিখে যাচ্ছিস?
শান্তনু অপেক্ষা করে থাকবে তো৷
চলো বাবা চলো৷ আমার থেকে তুমি বেশী এ্যাকসাইটেড৷
হবোনা ? আজ তুই এতবড় সম্মান পাবি৷ তোর বাবা মা সব আসবেন৷ উফ তুই আমার মুখ রেখেছিস৷ শুধু..
শুধু কি?
তোর জীবনটা একা ...
কেন তুমি আছো, মেসো আছে, ভাই , প্রভা..
আর জীবনসাথী?
আমার স্মৃতি আর লেখা৷
এভাবে..
আবার শুরু কোরোনা৷ সবার কপালে সিঁদুর থাকেনা৷ চলো চলো আজ মন খারাপ নয়৷
হ্যাঁ যাবার সময় শান্তনু আর বুবুন কে নিয়ে নেবো৷
হ্যাঁ চলো৷
বুবুন শান্তনুর ছেলে৷ মা মরা ছেলেটা শুভ্রার খুব ন্যাওটা৷ শান্তনুর বাড়ির সামনে গাড়িটা রেখে শুভ্রা নেমে আসে৷ হলুদ একটা কাঁথাস্টিচের শাড়িতে ঝলমল করছিলো শুভ্রা বাসন্তী রোদের মতন৷ বাড়ির সামনে চেম্বার শান্তনুর৷ শুভ্রা সোজা অন্দর মহলে চলে যায়৷ এ বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত ৷ মাসি নেমে আসার আগেই বুবুন কে নিয়ে আসার সময় থমকে যায় শুভ্রা৷ আধা কাঁচা পাকা চুলের বয়েসের থেকে বুড়িয়ে যাওয়া লোকটাকে দেখে চেনা যাচ্ছেনা৷ ভিতরের করিডোর দিয়ে যেতে চেম্বারের যে অংশটা দেখা যায় সেটা দিয়ে লোকটা শুভ্রা কে না দেখতে পেলেও লোকটা যে শিবেন সেটা দেখে পা যেন আঁটকে গেছে ৷ শান্তনু রিপোর্ট দেখে বলছে,
দেখুন মিস্টার শিবেন চ্যাটার্জী আপনার ডিপ্রেশান তো দিন দিন বাড়ছে৷ ওষুধে কাজ করছে না৷ পরিবার নিয়ে কোথাও ঘুরে আসুন৷ এভাবে চললে তো হবেনা৷
পরিবার ? আমার আর পরিবার ৷ সন্তান তো হয়নি৷ স্ত্রী আজ তিন বছর চলে গেছে৷ আমি আর মা এই পরিবার ৷
তাহলে মা কে নিয়ে কাশী ঘুরে আসুন৷ দিন দিন ঘরে বন্দি হয়ে থাকলে চলবে?
ভালো লাগেনা জানেন, মনে হয় পাগোল হয়ে যাবো৷
এভাবে চললে তো হবেনা৷ আচ্ছা আজ আপনি আসুন৷ চেঞ্জে না গেলে কিন্তু আবার এ্যাসাইলামে ভরতি হতে হবে৷
দেখি৷ আসি৷
কিছুক্ষণ নিজেকে সামলে শুভ্রা ঘরে ঢোকে৷
চলো তো মায়ের কাছে৷ ঐ তো মাসি চলে এসেছে৷
শুভ্রা যে লোকটা গেলো সে কি...
আমি চিনি না মাসি৷
চলো না মাসি কাজ আছে৷ আসো না শান্তনু৷
তোমার দেরী হয়ে যাচ্ছে না?
না দেরী হয়ে গেছে আর দেরী করতে চাইনা৷
ঠাকুর ঘরে শান্তনুর মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ে শুভ্রা৷
মা আমি অন্য জাতের৷ কিন্তু তোমার পাগোলের ডাক্তার না নিজে পাগোল ছেলেটার যে মিষ্টি ছেলেটা বুবুন , তার মা হতে চাই ৷আমাকে দেবে মা সেই অধিকার ???
চোখের জলে ভরে ওঠে শান্তনুর মুখখানি৷
পাগলী মেয়ে৷ কবে থেকে তো বসে আছি তোর পথ চেয়ে৷ আর শুভ্রা মায়ের কোনো জাত হয়না৷ তুই বুবুনের সত্যকারের মা৷
শান্তনু হাসিমুখে বেরিয়ে যায়৷
বুবুন শুভ্রার গলা জরিয়ে বলে ওঠে আজ তুমি আর আন্টি না?
না বাবু আমি তোর মা৷
ঠাকুরঘরে রাখা শাঁখটা মাসি জোরে শঙ্খধ্বণি দিয়ে ওঠে৷
সমাপ্ত
