------------------------------------------------
এরই নাম জীবন
***************
মীনা মুখার্জী
••••••••••••••••
"শোন, তোমার ঐ ল্যাংবোটের কোন দায়িত্ব আমি নিতে পারব না বলে দিলাম। আপনি শুতে ঠাঁই নেই তো শঙ্করাকে ডাক।"…
------------------------------------------------
এরই নাম জীবন
***************
মীনা মুখার্জী
••••••••••••••••
"শোন, তোমার ঐ ল্যাংবোটের কোন দায়িত্ব আমি নিতে পারব না বলে দিলাম। আপনি শুতে ঠাঁই নেই তো শঙ্করাকে ডাক।"
"এই দুধের শিশুরে কার কাছে রেখে যাব তাইলে" বলে শিউলি মানিকের কাছে অনেক কাকুতি মিনতি করল, কিন্তু মানিক তার সিদ্ধান্তে অটল।
"তাহলে ঐ কথাই রইল, সামনের রবিবার আমি ঠিক সন্ধ্যে সাতটার সময় দরজায় টোকা দেব, তুমি রেডি থাকবে"। ভট্ ভট্ করে মটর সাইকেলের আওয়াজ তুলে চলে গেল মানিক।
হাতে মাত্র দুটো দিন সময়। এর মধ্যে কি ব্যবস্থা করবে তার পাঁচ বছরের ছেলেটার? জুটমিলটা লক আউট হবার পর থেকে তো তার বুড়ো স্বামীটার মাথার ঠিক নেই, রোজ সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরে রাতে একপেট চোলাই গিলে টলতে টলতে এসে শোয় আর মড়ার মতো ঘুমায়। খেতেও চায় না সব দিন। তার থেকে প্রায় কুড়ি বছরের বড়, তাই 'বুড়ো' বলেই ডাকে । কোন কোন দিন জোগাড়ের কাজ করে কিছু টাকা এনে দেয় শিউলির হাতে। শিউলিও দুটো বাড়িতে ঠিকে কাজে লেগেছে। তাতেও কি এই মাগ্গির বাজারে তিনটে পেট চলে?
বাবুদের বাড়ি কাজ করতে গিয়েই মানিকের চোখে পড়ে যায় শিউলি। সে আজ মাস ছয়েক আগের ঘটনা। বোসবাবুর ছেলের বন্ধু, প্রোমোটারি করে, অনেক টাকা। এখন শিউলির খাওয়া-পরার অভাব নেই। মাঝে মাঝে সিনেমা দেখাতেও নিয়ে যায়। নেবে নাই বা কেন? দেখতে শুনতে তো কোনদিনই খারাপ নয় শিউলি। আর তার বুড়ো স্বামী? কোনদিনের জন্য জানতেও চাইলো না কোথা থেকে আসছে এতো টাকা। কাপুরুষ একটা, বৌ-ছেলের মুখে ভাত জোটাবার ক্ষমতা নেই তো বলবে কোন মুখে? আর সতীপনা? ও সবে বিশ্বাস নেই শিউলির। পেটে ক্ষিধে থাকলে ওসব সতীপনা ধুয়ে জল খেলে চলে না।
অনেক ভেবেও যখন কূল-কিনারা পেল না শিউলি তখন চরম সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল।বিকেলে পাড়ার বাচ্চাগুলোর সাথে খেলা করে ফেরার পর ছেলেটাকে ভরপেট খাইয়ে বিছানায় শুইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। শীতের বেলা, ছটার সময়েই যেন কতো রাত। নিজেও একটু খেয়ে, কি মনে হ'লো বুড়ো স্বামীটার জন্য থালায় ভাত আর বাটিতে বাটিতে তরকারি বেড়ে, আসন পেতে, গ্লাসে জল ভরে, সব ঢাকা দিয়ে রাখলো। আহা, বুড়ো মানুষটার পেটে সারাদিন কিছু পড়ে কিনা কে জানে? কতদিন যে মানুষটার সাথে ভাল করে কথাও বলে নি শিউলি।
ঘড়ির দিকে তাকাল শিউলি। প্রায় সাতটা বাজে। এক্ষণি মানিক এসে পড়বে। ধীরে ধীরে বিছানায় বসে পরম মমতায় ঘুমন্ত ছেলেটার মাথায় হাত বুলালো কয়েকবার। তারপর বুকে পাথর চাপিয়ে একটা বালিশ নিয়ে চেপে ধরলো ছেলের মুখে। কিছুক্ষণ ছটফট করে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে গেল দেহটা। এক ফোঁটা জল কি এসেছিল শিউলির চোখে? না, সময় কোথায়? বাইরের দরজায় মানিকের টোকা শুনতে পাচ্ছে সে। তাড়াতাড়ি স্যুটকেশটা নিয়ে বেরিয়ে এল সে। দরজায় বাইরে থেকে শিকল তুলে দিল। আজ মানিক চারচাকার গাড়ি এনেছে, শিউলি উঠতেই গাড়ি ছেড়ে দিল। গলির রাস্তা শুনশান্, শীতে সবাই বাড়ির ভিতরে।
আজ শিউলির বুড়ো স্বামী তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে গরম সিঙ্গারা, ছেলের জন্য একটা ছবি আঁকার খাতা আর রং-পেন্সিলের বাক্স নিয়ে। ছেলেটা অনেকদিন বায়না করেছিল। আজ তার মন খুব খুশি, একটা কাজ জোগাড় করতে পেরেছে সে। আজ সে নেশাও করে নি হতাশা ভোলার জন্য।
কিন্তু বাড়িটা এতো নিস্তব্ধ কেন? এতো তাড়াতাড়ি মা-ছেলে ঘুমিয়ে পড়লো? ঘরে শিকল তোলা, নির্ঘাত শিউলি টিভি দেখতে গেছে পাড়ায় কারো বাড়ি। ঐ তো ছেলেটা লেপের তলায় ঘুমোচ্ছে। মেঝেতে ভাত বাড়া মানে শিউলির ফিরতে রাত হবে। কি আর করা যাবে, অন্তত ছেলের হাসিমুখটা তো দেখা যাক। "খোকা, খোকা, উঠে দেখ, কি এনেছি তোর জন্য।"
নাঃ, খোকার ঘুম আর ভাঙে নি, শিউলিও ফেরে নি কোন দিন।
☆
