Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ক্যাসিওপিয়া সাহিত্য পত্রিকার দৈনিক সেরা সম্মাননা

#বিনতাদের গভীর অসুখ
#সুস্মিতা
#গল্প

  জীবনের  এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে এই এতদিনে বিনতা টানা মাস  দুয়েক একটু নিশ্চিন্তে, শান্তিতে ঘুমাতে পারছে। মনের মধ্যে এতদিনে তার একটু সুখের,স্বস্তির অনুভূতি। সত্যি কথা বলতে কি সেই জ্ঞান হওয়ার বয়স…


#বিনতাদের গভীর অসুখ
#সুস্মিতা
#গল্প

  জীবনের  এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে এই এতদিনে বিনতা টানা মাস  দুয়েক একটু নিশ্চিন্তে, শান্তিতে ঘুমাতে পারছে। মনের মধ্যে এতদিনে তার একটু সুখের,স্বস্তির অনুভূতি। সত্যি কথা বলতে কি সেই জ্ঞান হওয়ার বয়স থেকেই বিনতার এই সুখটা হারিয়ে গিয়েছিল। একটু শান্তিতে ঘুমানোর সুখ...

  পঁয়তাল্লিশ বছরের বিনতার প্রায় গোটা জীবনটাই বুকের ভেতরটা শুধু পুড়েছে...দাউ দাউ করে জ্বলেছে...
   ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল কিন্তু ওর নিজের মা বাবার হাত ধরেই। একেবারে গোড়ার দিকে বিনতা নিজে অবশ্য কিছুই বুঝত না।  নেহাতই শিশু বয়স তখন।
 পেছন ফিরে স্মৃতি ঘাঁটলে সাড়ে তিন চার বছর বয়সের কিছু কথা আবছা মনে পড়ে। পুরোনো দিনের অ্যালবাম দেখে বাকি ঘটনাগুলো জুড়ে নেওয়া যায়।
  মা বাবার প্রবল উৎসাহে বিনতাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল "বেবি শো কম্পিটিশনে"...সেই শুরু...
  বিনতার একটু একটু মনে আছে... অনুষ্ঠানের কদিন আগে থেকে মা বাবা ওকে নিয়ে কি কান্ডই যে করছিলেন। কত কি শেখানো হচ্ছিল তাকে। সব মুখস্ত করে বলতে হবে একেবারে তোতা পাখির মতো।
কেমন করে নাচ দেখাতে হবে, গাইতে হবে। কত ছড়া যে তখন ও শিখে ফেলেছিল।
   শিশু বিনতাকে দেখতে সত্যি একটা পুতুলের মতোই ছিল। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, ফোলা ফোলা গাল। টানা দীঘল চোখ। দেখলেই যে কোনও লোকের আদর করতে  ইচ্ছে করবে। কিন্তু মিষ্টি বাচ্চা মেয়েটার বড্ড মুড। ইচ্ছে না হলে সে কারুর কোনও কথার উত্তর দেবেইনা। কেউ বেশি বিরক্ত করলে একেবারে ভ্যা করে কেঁদে অস্থির।
 বিনতার বাবা মায়ের টেনশনটা ছিল ঠিক সেখানেই। পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীর ছেলে পাঁচ বছর বয়সেই কথাবার্তায় একেবারে চ্যাম্পিয়ন। গানে গল্পে ছড়ায় সে সকলকে মাতিয়ে রাখে। বেবি শো এবং কম্পিটিশনে সেও যে একজন প্রতিযোগী।
 বলা তো যায়না বিচারকরা কোন জিনিসটির ওপরে বেশি গুরুত্ব দেবেন। শেষে বার্বি ডলের মতো চেহারা নিয়েও রোগাসোগা  বাচ্চাটার কাছে মেয়েকে হেরে যেতে হবে? উফ ভাবা যায়না...এ যেন বিনতার বাবা মায়ের জীবন মরণ সমস্যা।
    লোকে যতই বলুক- "ওমা কি মিষ্টি মেয়ে তোমার"...ওসবে কিছু হয়না। আসল হল প্রতিযোগিতার রেসাল্ট। প্রতিযোগিতায় জিততেই হবে, ফার্স্ট হতেই হবে। তা নাহলে জীবন সম্পূর্ণ মূল্যহীন। অতএব চকোলেট, ক্যাডবেরি, খেলনা, নতুন ফ্রক ...যা চাই সবরকমের ঘুষ দিয়ে শিশুর মুড ভালো রাখতেই হবে, যাতে তার পারফরম্যান্স হয় সকলের সেরা।
      স্কুলে ভর্তির সময়ও প্রায় একইরকম ঘটনা। বিনতার মামার ছেলেমেয়েরা বছর দুয়েক আগে ভর্তি হয়েছে শহরের সেরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। এখন সেই স্কুল বা তার থেকেও নামীদামী স্কুলে বিনতা চান্স না পেলে ওর বাবা মা যে আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া প্রতিবেশীর কাছে মুখ দেখাতে পারবেনা ।

                    (২)
        এইভাবেই শুরু হয়...
 শুরু হয় এক গভীর অসুখের। মা বাবার মনের এই অসুখ ধীরে ধীরে সংক্রামিত হয় সন্তানের মধ্যে। গোটা ছাত্রী জীবন ভালোবেসে পড়াশোনা করার  বদলে বিনতা শুধু ভেবেছে -"আমাকে ফার্স্ট হতেই হবে, হতে হবে সকলের সেরা। নিজের ভালো হওয়াটাই বড় কথা নয়,শেষ কথা নয়, আসল কথা হল "অন্যদের হারাতেই হবে"। আমি যেন অন্য সকলের থেকে এগিয়ে থাকি। জয়ীর মুকুট থাকবে শুধু আমার মাথায়...সব বিষয়ে, জীবনের সব ক্ষেত্রে।"
  পড়াশোনায় বিনতা বরাবরই মেধাবী ছিল। কিন্তু কখনও কোনও কারণে একটি বিষয়ে নম্বর কম হলে, বাড়িতে নেমে আসত শোকের ছায়া। মা বাবার খাওয়াদাওয়া বন্ধ। বিনতারও।
 তারপরে ক্ষুধার্ত পশুকে লোভনীয় খাবারের লোভ দেখিয়ে চাবুকের ভয় দেখিয়ে যেমন প্রশিক্ষণ দিয়ে সার্কাসের খেলা দেখানোর জন্য তৈরি করা হয়, বিনতাকেও ঠিক তেমনি তৈরি করে দেওয়া হল।
         বিনতা নিজেও একসময় হয়ে গেল এই সার্কাসের সদস্য। সেই সঙ্গে শুরু হয়ে গেল ওর বুকের ভেতরটা পুড়তে থাকার রোগ। জীবনের কোন ক্ষেত্রে ওর থেকে ভালো কেউ থাকতেই পারেনা। সেরা জিনিসটি শুধু হবে ওর...

                     (৩)
           বাবা মা দেখেশুনে অতি  সুপাত্র এক ডাক্তারের সঙ্গে বিয়ে দিলেন বিনতার। সে অত্যন্ত  মেধাবী ছাত্র ছিল, বর্তমানে সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। নম্র,ভদ্র স্বভাব। বিনতা বেশ খুশি।
 প্রায় একইসঙ্গে বিনতার কলেজের সহপাঠী এবং অন্যতম প্রতিযোগী সুজাতার বিয়ে হল এক ইঞ্জিনিয়ারের  সঙ্গে, সে বিদেশে কর্মরত। ব্যস, খুশি টুশি কোথায় উধাও হয়ে গেল, বুকের ভেতরটা জ্বলতে শুরু করল বিনতার। নিজের বিবাহিত জীবনের সুখ আনন্দ উপভোগ করার বদলে ও সারাক্ষণ হিসেব নিকেশ করতে শুরু করল এই বিয়েটার ব্যাপারে জয়ী হল কে? যেন দুই বান্ধবীর জীবনকে দাঁড়িপাল্লায় রেখে মাপামাপি।
     বিনতা তখন শুধু বান্ধবীর জীবনের খবর রাখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
 বিয়ের পরে বিনতার স্বামী রক্তিম ওকে হানিমুনে নিয়ে গিয়েছিল কুলু মানালিতে। রক্তিমের স্বভাব মাধুর্যে, প্রেমে ভালোবাসায় মধুচন্দ্রিমার দিনগুলো স্বপ্নের মতোই কাটার কথা ছিল। বহিরঙ্গে দিনগুলো সেরকমই ছিল।
 কিন্তু ওই যে বিনতার বুকের ভেতরটা... সেটা যে তখন পুড়ছে। কারণ ও খবর পেয়েছে কলেজের সেই বান্ধবী সুজাতা বরের সঙ্গে হানিমুনে গিয়েছে বিদেশে... প্যারিসে। নিজের হানিমুনের আনন্দ আর একটুও উপভোগ করতে পারলনা বিনতা।

 
                        (৪)
       
  এই অসুখ বড় গভীর অসুখ, এই অসুখ দিনে দিনে বাড়তেই থাকে।
     কয়েক বছরের মধ্যে বিনতার ছেলে হল। খবর পেল- বান্ধবীর মেয়ে হয়েছে। নিজেকে যতই আধুনিকমনস্ক মনে করুক,  ছেলের মা বিনতার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল জয়ীর হাসি। একটু শান্তি হল ওর।

      কিন্তু তারপরে ? অসুখ বিনতার পিছু ছাড়লনা। এ অসুখ পিছু ছাড়েনা। ছেলে রোহিতের গোটা ছাত্রজীবন ও শুধু বুকের ভেতরের জ্বলুনিতেই  জ্বলল। ঠিক ওর নিজের স্কুলের দিনগুলোর মতোই রোহিতকেও সব সাবজেক্টে, আঁকায়, ক্যারাটেতে, আবৃত্তিতে ফার্স্ট হতেই হবে।
 সেখানেই শেষ নয়, গরমের ছুটিতে রোহিতের কোনো বন্ধু কিম্বা নিজেদের কোনও আত্মীয় বা চেনাশোনা কেউ ব্যাংকক গেলে, বিনতাদের হাজারো অসুবিধা হলেও সিঙ্গাপুরে যেতেই হবে।
    ছেলের ক্লাস টেন ও টুয়েলভের বোর্ড পরীক্ষার সময় বিনতার অসুখ একবারে তুঙ্গে। রোহিতের ক্লাসের সব ছেলেদের আদ্যপান্ত খবর রাখে বিনতা। কে কোন বিষয়ে কোথায় ক'টা  টুইশনে যায় সারাদিন তার হিসেব কষে।
  রেসাল্ট বেরোনোর সময় অবস্থা সব থেকে খারাপ। সন্তানের সব প্রতিযোগীদের এক দুই নম্বরের ফারাক বিনতার বুকের মধ্যে দাবানল সৃষ্টি করে।
 তার ওপরে বারো ক্লাসের পরে কে আই.আই.টিতে চান্স পেল, কে পেলনা? কে গেল ডাক্তারি পড়তে, কেই বা গেল অন্য কোনও রাজ্যের বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে? বিনতা তখন জ্বলে পুড়ে কাঠ।
     
 শেষপর্যন্ত রোহিত ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করেছে এবং বেশ নামকরা ভালো কোম্পানিতেই  চাকরি করছে। কিন্তু বিনতার শান্তি নেই। কদিন আগেই খবর পেয়েছে সমবয়সী মাসতুতো বোনের ছেলে নামী আরেক আই.টি. কোম্পানি থেকে ভালো "অন-সাইটের" সুযোগ পেয়ে বছর দুয়েকের জন্য আমেরিকা যাচ্ছে। "রোহিতের আগেই বোনের ছেলে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল"...খবরটা শোনা পর্যন্ত বিনতার বুকের ভেতরটা দাউ দাউ করে জ্বলছে।

                     (৫)

     শুধু কি এই...বিনতার জীবনে কিছুতেই শান্তি নেই। আত্মীয়স্বজনের নানা খবর ওকে সুস্থ থাকতে দেয়না।
     স্বামী রক্তিম সরকারি ডাক্তার।  বুদ্ধিমান, কর্তব্যপরায়ণ গোছানো ছেলে। ছেলের পড়াশোনা, বৃদ্ধ বাবামায়ের দেখাশোনা সামলে এই বছর তিনেক হল ওরা বাইপাসের ধারে হাজার স্কোয়ার ফুটের একটি ছিমছাম ফ্ল্যাট কিনেছে।
     কিন্তু গত সপ্তাহেই মামাতো ননদ তার বাড়ির গৃহপ্রবেশের অনুষ্ঠানে নেমন্তন্ন করেছিল। কথা প্রসঙ্গে কতবার যে শোনাল ওদের ফ্ল্যাটটির আয়তন বারো শো স্কোয়ার ফুটেরও সামান্য বেশি।  বুকের জ্বলুনিতে সেদিন এবং তার পরেও কদিন বিনতা আর ঘুমাতে পারলনা।
           বিনতার শুধু মনে হয় অন্য মানুষের জীবনে সুখের ঘটনা ঘটার যেন আর কোনো শেষই নেই। সব সময় অন্য লোকেদের জীবনে ভালো ভালো ঘটনা ঘটেই চলেছে। এই তো সেদিন রক্তিমের এক কলিগ ওদের পুরোনো ছোট গাড়িটা পাল্টে একটা হন্ডা সিটি গাড়ি কিনে ফেলল। বিনতা আর সহ্য করতে পারেনা। ওর নিজের জীবনেও যে কত ভালো কিছু ঘটে, সেসব আর ওর চোখে পড়ে না।  অপরের জীবনের আনন্দের ঘটনা ঘটতে দেখে ওর পাগল পাগল লাগে।

                      (৬)
        তারপরে আচমকা এল এই করোনা ভাইরাস। শুধু দেশজুড়ে নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে লকডাউন। পৃথিবীটা যেন হঠাৎ থমকে গেল... একেবারে থেমে গেল।
   কোথাও কিছু ঘটছে না, কেউ কিছু করতে পারছেনা, কেউ কোথাও যেতে পারছেনা।
  দেখতে দেখতে অনেকগুলো দিন পেরিয়ে যাচ্ছে... অনেক অনেকগুলো দিন। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে পড়ছে।  একটু দিশেহারা। রোগের সঙ্গে লড়াই করার জন্য এই লক ডাউন জরুরি তো বটেই, কিন্তু রুজি রোজগারের কি হবে? আগামী দিনগুলোতে কি অপেক্ষা করছে? কবে শেষ হবে এই বন্দিদশা? কবে মানুষ ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবন? কবে আবার ভয় মুক্ত হয়ে মানুষ বাঁচার মতো বাঁচবে?
 
       শুধু বিনতা এই লক ডাউনে ভীষণ খুশি। ও মনেমনে চায় এইরকম লকডাউন অনন্তকাল চলুক। ওর খুব শান্তি- "পৃথিবীর কোথাও কিছু ঘটছে না, কারুর ভালো কিছু হচ্ছে না, অন্তত বিনতাকে হারিয়ে দিয়ে অন্য কেউ বিনতার থেকে ভালো থাকতে পারছেনা।"
সারা বিশ্বের লোক যখন  পৃথিবীর সুস্থতার প্রার্থনায়, বিনতা তখন করোনা ভাইরাসের প্রতি খুব কৃতজ্ঞ বোধ করে।
 সারা দিনরাত ও প্রার্থনা করে- "পৃথিবীর এই অসুখ যেন না সারে, লকডাউন হোক চিরস্থায়ী, কারুর জীবনে যেন ভালো কিছু না ঘটে।" তাহলেই বিনতার শান্তি। এর ফলে বিনতাদের নিজেদের জীবনেও যে ভালো কিছু ঘটার সুযোগ তৈরি হচ্ছেনা, সেই বোধ ওর কাজ করেনা। এ যেন নিজের নাক কেটেও অন্যের যাত্রাভঙ্গের আনন্দ।
  জ্ঞান হওয়ার বয়সের পরে এই প্রথম বিনতা একটু নিশ্চিন্তে শান্তিতে ঘুমোতে পারছে। উফ... সত্যি লকডাউনের ফলে এই মুহূর্তে অন্তত ওর বন্ধুবান্ধব,আত্মীয়স্বজন কেউ ওর থেকে বেশি ভালো নেই...কি যে শান্তি...
 
"সত্যি বিনতাদের বড় গভীর অসুখ।"

***********