#যদিদং_হৃদয়ং_তব
#অরিন্দম_ভট্টাচার্য্য
-- নন্দদা, তোমার সেই মালাইমারকে মার্কা এক কাপ চা দাও দেখি!
আজ ব্যাঙ্কে কাজের প্রচুর চাপ। মাসির পাতলা ফ্যাকফ্যাকে চায়ে ঠিক মন ভরছে না। কম বয়সী সার্ভিস ম্যানেজার পরিতোষ, ব্যাঙ্কের লাগোয়া ন…
#যদিদং_হৃদয়ং_তব
#অরিন্দম_ভট্টাচার্য্য
-- নন্দদা, তোমার সেই মালাইমারকে মার্কা এক কাপ চা দাও দেখি!
আজ ব্যাঙ্কে কাজের প্রচুর চাপ। মাসির পাতলা ফ্যাকফ্যাকে চায়ে ঠিক মন ভরছে না। কম বয়সী সার্ভিস ম্যানেজার পরিতোষ, ব্যাঙ্কের লাগোয়া নন্দ-র চায়ের দোকানে এসে বসলো লাঞ্চের সামান্য কিছু আগেই। কাজের শেষে রোজই সে এখানে এসে চা খায়, দোকানে বসে কিছুক্ষণ আড্ডা দেয়, তারপর বাড়ি যায়।
নন্দ একমনে চা তৈরি করছিল। সসপ্যানের ফুটন্ত দুধ-চা একটা মগ দিয়ে ডেবে চলেছে সমানে। নন্দর চায়ের বিশেষত্বই হলো, ঐ ডাবাডাবিটা। মগটাকে এতো উঁচুতে তুলে ডাবাডাবি করতে আর কাউকে দেখেনি পরিতোষ। ওটা দেখতেই তার বেশী ভালো লাগে। সে প্রশ্ন করে -- আচ্ছা নন্দদা! তুমি এতো উঁচু থেকে চা টা ডাবো কেনো বলোতো?
পরিতোষের দিকে এক কাপ গরমাগরম চা এগিয়ে দিয়ে, কাঁধের গামছাটা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে, এতোক্ষণে মুখ খুললো নন্দ -- আপনি স্যার ডেঙ্গোডাঙ্গসি মানুষ। বিয়ে শাদী তো আর করলেন না, এসবের মর্ম কি করে বুঝবেন বলুন!
চায়ে চুমুক দিতে দিতে পরিতোষ বলল -- তুমি মাঝে মাঝে এমন হেঁয়ালি করে কথা বলো না নন্দদা, আমার মাথায় কিছুই ঢোকে না। চায়ের ডাবাডাবির সঙ্গে বিয়ে করার কি সম্পর্ক বলোতো?
-- কেন? আপনি এতো চা খান, আর এটা কখনো ভাবেননি? চা আর দুধের সম্পর্কটাকে এক মুহুর্তের জন্যও কোনোদিন আপনার স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক বলে মনে হয়নি?
-- এটা আবার নতুন কোথা থেকে আমদানি করলে?
-- নতুন আমদানি নয় স্যার। আমার বাবা বলতেন, একবার এই দু'টো জিনিষের গাঁটছড়া বেঁধে দিলে আর খোলে না। পরস্পর মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এখানে আমাদের কাজটা হলো, এদের এই সম্পর্কটাকে যতটা পারা যায় মধুর করা। এদের গাঁটছড়া বাঁধা জীবন যত সুখের হয়, চায়ের টেস্ট ততো খোলে।
-- সে তো তোমার কাছে বহুবার শুনেছি, যে তোমার বাবার আমল থেকেই নাকি তোমাদের চায়ের দোকান। কিন্তু একটা জায়গায় তো ঠিক মিললো না, নন্দদা। ঐ দু'জনে সবসময়তো একসাথে থাকে না, চা পাতাগুলোকে তো ছাঁকনি করে ছেঁকে ফেলে দেওয়া হয়।
নন্দ তার কালো মুখে সাদা ফটফটে দাঁতগুলো বার করে হাসতে হাসতে বলল -- বললাম যে স্যার, আপনি বিয়ে না করলে বুঝবেন কি করে। "যদিদং হৃদয়ং তব তদিদং হৃদয়ং মম".... শুনেছেন তো?
-- এটা আবার কে শোনে নি! এটাতো বিয়ের সময়ের শপথ।
-- তবে! এখানে শরীরের কথা কি কোথাও আছে? আসল বন্ধনটাতো দুটো হৃদয়ের স্যার, শরীরের তো নয়! হ্যাঁ, হৃদয়ের বন্ধনটাকে মজবুত করতে শরীরটা প্রথম প্রথম লাগে, এইটা ঠিক। কিন্তু বন্ধনটা যখন পারফেক্ট হয়ে যায়--
-- ভালবাসার গভীরতা ম্যাক্সিমাম হয়ে যায়।
-- এটা একদম ঠিক বলেছেন। তখন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই শরীরটার আর খুব একটা মানে থাকে না। তা না হলে, চায়ের পাতাকে সম্পূর্ণ ছেঁকে ফেলে দেওয়ার পরেও ওটাকে 'চা'-ই বলবে কেন? কাপের চায়ের দিকে ইঙ্গিত করে নন্দ।
-- এটা তুমি হাইট দিয়েছো নন্দ দা। আমার তো বোলতি বন্ধ্। এতো জানো, কিন্তু সত্যি তোমার কোনো গর্ব নেই।
-- জানবো না স্যার, যাকে নিয়ে করে খাই, তার নাড়ি নক্ষত্র না জানলে হয়! আপনাদেরকেও তো টাকার নাড়ি নক্ষত্র জানতে হয় নাকি?
-- তা ঠিক বলেছ। তবে ঐ এতো উঁচু থেকে ডাবাডাবির রহস্যটা কিন্তু এখনো উন্মোচন হলো না। চা শেষ করে একটা সিগারেট ধরায় পরিতোষ।
-- আরে বাবা, শুধু ঘরে বসে বসে গরমে ফুটলেই কি সম্পর্ক গভীর হয়! সেই সমান গরম নিয়ে দু'জনকে একসাথে খোলা হাওয়ায় ঘুরতেও বেরোতে হয়। হৃদয়ের বন্ধনের মজবুতির জন্য বাইরের ঐ পরিবেশটাও যে সমান জরুরী। যাতে একটু বেশী সময় ধরে খোলা হাওয়ায় দু'জনে হাত ধরাধরি করে ঘুরে ঘুরে প্রেম করতে পারে, সেজন্যই আমি ওদেরকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যাই। এরপর শুধু লাফিয়ে পড়ার অপেক্ষা। তাপে চাপে ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়ে কণায় কণায় মিশে যায় ওরা। এরপর ওদের ভালবাসার বাষ্প যখন চারদিকে গন্ধ ছড়ায়, তখন আমার কাজ শেষ হয়।
-- ওরে বাপরে! তুমি যে কবি মানুষ, এটাতো জানা ছিল না! পরিতোষ হেসে ওঠে।
একটা সাত পুরোনো খাতা বার করে খুব দুঃখের সঙ্গে দেখায় নন্দ -- সে একসময় লিখতাম স্যার। তবে এখন আর সময় পাই না। বাবাও মরে গেল, পড়াশোনাও বন্ধ হলো, সঙ্গে কবিতা লেখাও।
একজন কমবয়সী সুন্দরী মহিলা হেসে হেসে এসে পরিতোষকে জিজ্ঞেস করলো -- স্যার! আপনি এই সময় আসতে বলেছিলেন, আমার ডিডি টা রেডি হয়ে গেছে?
সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে ইচ্ছা করলো পরিতোষের -- ও... আপনি! চলুন চলুন, আমি রেডি করেই রেখেছি।
কিন্তু পারলো না। কোথায় যেন বাধলো। সে বেশ একটু গম্ভীর ভাবেই বলল -- কোন ডিডিটা বলুনতো? ও...ঐ ইউনিভার্সিটির অ্যাডমিশনের জন্য বলেছিলেন না? এখনো তো হয়নি ওটা। আপনি বরং লাঞ্চের পরে এসে ওটা নিয়ে যাবেন।
-- ওকে স্যার। ঠিক ক'টা নাগাদ এলে পাবো? একটা মিষ্টি হাসি।
-- না থাক, আপনাকে আবার আসতে হবে! চলুন দেখি এখনি করে দিতে পারি কিনা। পরিতোষ উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত একটা ভাব, ঠিক যেন নন্দ-র চা।
