অরুণ কুমার সাউ,তমলুক : বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠ, ভোর রাতের শীতল বাতাস আর একটি পুরোনো রেডিও—মহালয়ার এই চিরন্তন ছবি এখন ফিকে হয়ে আসছে। একসময় যে ছবি ছিল বাঙালি পরিবারের সকালের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ডিজিটাল যুগে তা ক্রমশ জায়গা করে…
অরুণ কুমার সাউ,তমলুক : বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠ, ভোর রাতের শীতল বাতাস আর একটি পুরোনো রেডিও—মহালয়ার এই চিরন্তন ছবি এখন ফিকে হয়ে আসছে। একসময় যে ছবি ছিল বাঙালি পরিবারের সকালের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ডিজিটাল যুগে তা ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে স্মার্টফোন আর টেলিভিশনে। মহালয়ার আগে পুরোনো রেডিও সারানোর জন্য তমলুকের ইলেকট্রনিক্সের দোকানগুলোতে যে ভিড় জমত, তা এখন আর চোখে পড়ে না। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘ মহিষাসুরমর্দিনী ’ শোনার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন বহু মানুষ। এই দিনটিতেই যেন পুরোনো রেডিওগুলোর কদর হঠাৎ বেড়ে যেত। ফলে, মহালয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই তমলুকের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্সের দোকানে পুরনো রেডিও সারাইয়ের জন্য উপচে পড়ত ভিড়। সারাবছর তেমন ক্রেতা না পেলেও, এই সময়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন রেডিও মেরামতকারীরা। তবে, তাদের আক্ষেপ—যত দিন যাচ্ছে, রেডিও সারাই করাতে আসা মানুষের সংখ্যা কমছে। তমলুকের রাধাবল্লভপুরের বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি অমলেশ ডগরা জানান, - আগে মহালয়ার ১০ দিন আগে থেকেই এলাকার মানুষ বাড়ির পুরোনো রেডিও সারানোর জন্য নিয়ে আসতেন। আগের তুলনায় এখন কাজের চাপ অনেকটাই কমেছে। প্রতি বছর এই সময় প্রায় ৩০-৪০টি পুরোনো রেডিও মেরামত করতাম। কিন্তু এবছর মাত্র ১০টি রেডিও সারাই করেছি।
অমলেশ ডগরা আরও বলেন, মোবাইলের যুগে রেডিওর শ্রোতা কমেছে। তাই রেডিওর চাহিদাও আর নেই। এখন ইন্টারনেট আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে গোটা দুনিয়া। বর্তমান প্রজন্ম ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুঠোফোনে মহালয়ার স্বাদ উপভোগ করে। একই কথা শোনা গেল তমলুকের এক প্রবীণ ব্যবসায়ী তথা রেডিও মেরামতকারীর মুখে। তিনি বলেন, - ৩৫ বছর ধরে আমি বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ব্যবসা করছি। একসময় দোকানে নতুন রেডিও বিক্রির পাশাপাশি পুরোনো রেডিও মেরামত করা হতো। ১৫ বছর আগেও মহালয়ার সময় নতুন রেডিও কিনতে ক্রেতারা ভিড় করতেন, আর পুরোনো রেডিও সারাই করাতে আসতেন অনেকেই। কিন্তু এখন সেই দিনগুলো অতীত। এবছর মহালয়ার আগে আমার দোকানে মাত্র একটি রেডিও সারানো হয়েছে। এই পরিবর্তন নিয়ে তমলুক পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী সরস্বতী মণ্ডল তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে আমরা বেতারে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুনে আসছি। আমাদের ছেলেবেলায় হয়তো গ্রামে মাত্র হাতে গুনা রেডিও ছিল, আর মহালয়ার ভোরে দেবীবন্দনা শোনার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। এখন টিভি, মোবাইল অনেক কিছু এসেছে। তবুও, মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহালয়া শোনার যে অনন্য অনুভূতি, তা অন্য কিছুতে পাওয়া যায় না।
তবে, নতুন প্রজন্মের ভাবনাটা ভিন্ন। দশম শ্রেণির ছাত্রী রিমি রায় জানান, - টিভিতে মহালয়া অনেক বেশি মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে। ছোটদের জন্য কার্টুনের মাধ্যমেও মহালয়া পরিবেশন করা হয়। তাই রেডিওর চেয়ে টিভিতেই মহালয়া দেখতে আমাদের বেশি ভালো লাগে।ডিজিটাল যুগে রেডিওর ঐতিহ্য সত্যিই তার আবেদন হারাচ্ছে।
