নিজস্ব প্রতিবেদক, পশ্চিম মেদিনীপুর .....দেখতে দেখতে ছয়। পাঁচ পেরিয়ে ছয়ে পা দিল 'মেদিনীপুরের তরুণ কবিরা' আয়োজিত মেদিনীপুর লিটেরারি মিট। সম্প্রতি আয়োজিত দু'দিন ব্যাপী এই লিটেরারি মিটমেদিনীপুর ফিল্ম সোসাইটিতে অনুষ্ঠ…
নিজস্ব প্রতিবেদক, পশ্চিম মেদিনীপুর .....দেখতে দেখতে ছয়। পাঁচ পেরিয়ে ছয়ে পা দিল 'মেদিনীপুরের তরুণ কবিরা' আয়োজিত মেদিনীপুর লিটেরারি মিট। সম্প্রতি আয়োজিত দু'দিন ব্যাপী এই লিটেরারি মিট
মেদিনীপুর ফিল্ম সোসাইটিতে অনুষ্ঠিত হয়। সহযোগিতায় ছিল মেদিনীপুর পুরসভা। কবিতা, গদ্য, সংগীত, চলচ্চিত্র ও নাটক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ছিল দক্ষিণবঙ্গের নির্বাচিত ১২ জন কবির কবিতা পাঠ। ছিল বই ও লিটল ম্যাগাজিন স্টল। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ছিলেন শ্রীজাত। প্রারম্ভিক সংগীত পরিবেশন করেন আরাত্রিকা সিনহা।
উদ্বোধনী পর্বে আরাত্রিকার তিনটি গান পরিবেশন করেন। উদ্বোধক শ্রীজাত বলেন, " গান- লেখা- ভালোবাসা দিয়ে আমরা সমস্ত কিছু বদলাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পৃথিবী আরও অন্ধকারের দিকে গিয়েছে। তবু বিশ্বাস করি একদিন সব বদলাবে।" সিদ্ধার্থ সাঁতরার কাব্যগ্রন্থ "লেবুফুল গন্ধরাজ তুমি"- এর মোড়ক উন্মোচন করেন শ্রীজাত।
প্রথম দিন ছিল কবিতা ও গদ্য নিয়ে আলোচনা। কবিতার বিষয় ছিল- 'সমকাল ও কবিতা'। আলোচক ছিলেন শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তা সেন ও প্রফুল্ল পাল। এই বিভাগের সঞ্চালক ছিলেন কিরীটি সেনগুপ্ত। কিরীটির নিখুঁত প্রশ্নের উত্তরে শ্রীজাত-র দাবি, তার অভিমান আসলে "সময়ের প্রতি অভিমান"। যা আগেও অনেক শিল্পী ও সাহিত্যিকদের ছিল। তিনিও ব্যতিক্রম নেন। সমালোচনা গ্রহণ করার ক্ষমতা কবিদের থাকা উচিত বলেও মনে করেন তিনি। মন্দাক্রান্তার আলোচনায় উঠে আসে এই সময়ের কবিদের কবিতায় একাকীত্ব- বিরহ, আধ্যাত্মিক অনুভবের কথা। রাজনৈতিক ভাবে সৎ থাকার কথাও আলোচনা করেন তিনি। প্রফুল্লের কথায়, "কবিতা হল সময় থেকে সময়ে বয়ে চলার হিরণ্ময় মাধ্যম।" তিনি মনে করেন, পাঠকদের 'পাঠ্যাভাস' থাকা উচিৎ।
গদ্যের বিষয় ছিল, 'প্রেম,রাজনীতি ও গল্প'। সঞ্চালক নরেশ জানার তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন সুবর্ণ বসু ও বিতান চক্রবর্তী। সুবর্ণ বলেন, "কোনও গল্পকে কেউ খারাপ বললে নতুন গল্প লেখার জেদ চাপে।" বিতানের কথায় উঠে আসে, বেকারত্ব, প্রেম ও সমাজের বর্তমান পরিস্থিতির কথা। বর্তমান সময়ে গল্প ও উপন্যাসে একপ্রকার 'ঝড়' উঠেছে তন্ত্র ও মন্ত্রের। কিন্তু লেখা কতটা 'সাহিত্য' হয়ে উঠছে সেই প্রসঙ্গেও আলোচনা করেন বিতান।
দ্বিতীয় দিন ছিল
চলচ্চিত্র ও নাটক এবং সংগীত প্যানেল। চলচ্চিত্র ও নাটক বিভাগের বিষয় ছিল- "সিনেমা ও থিয়েটার এবং দর্শকের প্রত্যাশা"। চন্দন সেন, সুজন নীল মুখোপাধ্যায় ও ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়ের কাছে একের পর এক প্রশ্ন রেখেছিলেন সিদ্ধার্থ সাঁতরা। আলোচনার সময় চন্দন বলেন, "সিনেমা ও থিয়েটারের 'মধ্যবিত্ত' দর্শক একই রকম। তবে 'হার্ডকোর' বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের দর্শক সে ভাবে থিয়েটার দেখতে আসেন না।" তাঁর দাবি, দর্শকের প্রত্যাশা অনুযায়ী অভিনয় করতে হয় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে। তিনি আরও বলেন, "ইনস্টাগ্রাম- এ ফলোয়ার দেখে কাউকে দিয়ে অভিনয় করানোর চল পুঁজিবাদের বর্তমান কঙ্কালসার চেহারা।" চন্দন মনে করেন, "বিক্রি হওয়া দরকার কিন্তু 'কেবল বিক্রি' হাওয়াই কাম্য নয়।" সুজন নীল মনে করেন, থিয়েটারের ক্ষেত্রে গ্রাম ও মফস্বলের দর্শক অনেক বেশি আন্তরিক। শহর ছেয়ে গিয়েছে 'ভুয়ো দেখেনদারি'-তে। ঋতব্রত-র কথায়, পাপারাৎজ়ি প্রভাব ইতিবাচক দিকে অন্যভাবে থাকলে তাতে শিল্পের সুবিধা হয়। ব্যক্তি জীবন যেমন তুলে ধরা হয় তেমন যদি থিয়েটারের তথ্য প্রকাশ করা হয় তাহলে অনেক বেশি সুবিধে হয় থিয়েটার শিল্পী ও দর্শকদের।
সংগীত প্যানেলে সঞ্চালক সুপান্থ বসুর প্রশ্নের উল্টোদিকে ছিলেন রূপঙ্কর বাগচী ও শুভেন্দু মাইতি। আলোচনার বিষয় ছিল, "বাংলা গানের স্থায়িত্ব: কথায় না সুরে?" রূপঙ্কর জানান, আগে সুর ঠিক করে তার পরে কথা আবার আগে কথা ঠিক করে তার পরে সুর দু'টোই হয়েছে তাঁর শিল্পে। তাই স্থায়িত্বের দাড়িপাল্লায় কথা ও সুর দুই সমান। তিনি বলেন, "গানের কারিগরের থেকে আমি অনেক বেশি শ্রোতা। আমি 'জানি' গান শুনতে। কারণ শোনাটাও শিল্প।" পাশাপাশি গানের লেখক ও গায়কদের প্রতি তাঁর পরামর্শ ধৈর্য ও নিজের- নিজের কাজের প্রতি ভরসা না হারানোর। শুভেন্দু'র আলোচনায় উঠে আসে, গ্রহণযোগ্য বিষয়, কাব্যমূল্য ও বর্তমান প্রজন্মের আর্তনাদের কথা। তিনি বলেন, "গান গাইতে যেমন শিখতে হয় তেমন শ্রোতারাও দায় থাকে কিভাবে শুনতে হয় তা শেখার।" 'শ্রোতা'-র মতো 'শ্রোতা' কমছে বলেই মনে করছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, "গানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকেই উৎসারিত আধুনিক গান।"
আয়োজকদের তরফে সম্পাদক অভিনন্দন মুখোপাধ্যায় ও সভাপতি সিদ্ধার্থ জানান, পরের বছর লিটেরারি মিটের আলোচনার বিষয় হবে নতুন। সেই সঙ্গে থাকবে নতুন চমক। আপাতত এক বছরের অপেক্ষা। দু'দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের সামগ্রিক সঞ্চালনা করেন মোম চক্রবর্তী ও কুমারেশ দে।
আগামনী কর মিশ্র, কীর্তিময় দাস, রাজেশ্বরী ষড়ংগী, শায়েরী চক্রবর্তী, আকাশ রায়, সুরজিৎ দাস, আমির হামজা, সন্তু মুখোপাধ্যায়, মৌপর্ণা মুখোপাধ্যায়, প্রসাদ মল্লিক, বাবর আলি-সহ মেদিনীপুরের তরুণ কবিরা সংগঠনের সকল সদস্য ক্লান্তি ভুলে ফের প্রস্তুত পরের বছরের জন্য ঢেউ তুলতে। আয়োজকেরা অনুষ্ঠানের সাফল্যের কৃতিত্ব উৎসর্গ করেছেন দর্শক ও শ্রোতাদের উদ্দেশে।





