লং মার্চ/ অমৃত মাইতি
জন্মেছি ১৯৪৫ এর ১৩ই মার্চ। শিবরামপুর নন্দীগ্রাম পূর্ব মেদিনীপুর পশ্চিমবঙ্গ ভারত। ১৯৬২ সালে চীন ভারত বর্ডার ডিসপিউট। ১৯৬৪ সালে কমিউনিষ্ট পার্টির বিভাজন। তখন আমি ছাত্র। ১৯৬৬ সালে সিপিআইএমের পার্টি সভ্যপদ লাভ। ১…
লং মার্চ/ অমৃত মাইতি
জন্মেছি ১৯৪৫ এর ১৩ই মার্চ। শিবরামপুর নন্দীগ্রাম পূর্ব মেদিনীপুর পশ্চিমবঙ্গ ভারত। ১৯৬২ সালে চীন ভারত বর্ডার ডিসপিউট। ১৯৬৪ সালে কমিউনিষ্ট পার্টির বিভাজন। তখন আমি ছাত্র। ১৯৬৬ সালে সিপিআইএমের পার্টি সভ্যপদ লাভ। ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট ব্রেক ডাউনের পরে গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে। মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলের একটি সেলের মধ্যে বন্দী থাকতে হয়েছিল প্রায় একমাস। তারপর টি আই প্যারেড। পুলিশ অফিসারটিকে ধন্যবাদ বারবার জানাই, আমাকে চিনতে পারলেও না চেনার ভান করলেন।
তারপরেও একাধিকবার জেল খেটেছি। কৃষক আন্দোলন করতে গিয়ে ২২ বছর মিথ্যা কেসে আসামি। ১৯৬৯ সালে বিপিএসএফের শিলিগুড়িতে রাজ্য সম্মেলন। তখন পরিচয় হয়েছিল বিমান বসুর সঙ্গে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি, বিমানদা হয়েই শ্রদ্ধার আসনে আছেন।
তারপরের বছর বি পিএসএফ এর নাম হলো এস এফ আই, কেরল কনফারেন্সে। ১৯৭৫ সালের জুন মাসের ২৬ তারিখে ইমার্জেন্সী ঘোষণা হলো। তখন অপ্রকাশ্যে দলীয় কাজকর্ম করতে হয়েছিল আমাদেরকে। পত্র পত্রিকা সেন্সর হওয়ার ফলে "বুলেটিন" বের করা হয়। বুলেটিন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্টি কমরেডদের পড়ানোর দায়িত্ব ছিল আমার, কিছু অঞ্চলে।
বিয়ে করলাম ১৯৭৫ সালে। স্ত্রীর নাম মলিনা। সর্বক্ষণের কাজ শুরু করি ১৯৬৬ সাল সাল থেকেই। একটি জুনিয়ার হাই স্কুলের চাকরি নিয়েছিলাম। বিপ্লবের নেশায় চাকরি ছেড়ে দিলাম। মলিনার চাকরি এবং তার তত্ত্বাবধানে শান্তিতে কাটিয়েছিলাম দুই পুত্রসন্তানের জনক হয়ে।
১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো।
১৯৭৮ সালের ৪ঠা জুন সারা রাজ্যে এক দিনে পঞ্চায়েত নির্বাচন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু দলের নির্দেশে
কংগ্রেস এবং জোতদার অধ্যুষিত অঞ্চলে নির্বাচনে দাঁড়াতে হলো। দলের নির্দেশে পঞ্চায়েতের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয় কিন্তু পাঁচ বছর পরে আর ওমুখো হয়নি। অর্থাৎ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিনি সারা জীবনে।
রাজনৈতিক জীবনে একটা নতুন বাঁক ও মোড়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল আমাকে বাধ্য হয়ে।
আরএসপির সভ্যপদ নিলাম এবং প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলন কুইলনে ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। কুইলন কনফারেন্সে গিয়ে কন্যাকুমারিকা ও ঘুরে নিয়েছিলাম। পুরো দক্ষিণ ভারত ঘোরা হয়েছিল। তারপর অবিভক্ত মেদিনীপুরের আরএসপির সম্পাদক পদে আসীন হলাম। স্বেচ্ছায় পদ থেকে অব্যাহতি নিলাম ২০২২ সালে। সম্পাদকের পদে ছিলাম ১৯৮৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত। এত দীর্ঘদিন পদে থেকেছি এবং লেফটফ্রন্ট কর্মসূচিগুলি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছি। ঝুঁকি নিয়েছি । কোনদিন পিছপা হইনি। দল যখন যা দায়িত্ব দিয়েছে, স্বেচ্ছায় এগিয়ে গেছি কখনো দলের দায়িত্বকে বিন্দুমাত্র কম গুরুত্ব দিইনি। এসবের মধ্যেও ওড়িশায় দলের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম ঝান্ডা তুলেছিলাম ।
বিধানসভার নির্বাচনে দুবার লড়াই করা হয়েছে ওড়িশায়। ওড়িশায় দলের লিটারেচার না থাকায় লিখলাম "প্রসঙ্গ মার্কসবাদ ও আরএসপি"। ওড়িয়া ভাষাতে বইটি ট্রান্সলেট হয়। ওড়িয়া ভাষায় আমারই বই প্রথম প্রকাশিত হয় আমাদের দলের পক্ষ থেকে। বিরামমহীনভাবে নন্দীগ্রাম থেকে ঝাড়খণ্ডের বর্ডার অর্থাৎ বেলপাহাড়ি ব্লক পর্যন্ত দলীয় কাজে সময় দিয়েছি । আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতি জেনেছি। আদিবাসীদের জীবন নিয়ে গল্প কবিতা লিখেছি।একদিনও অসুস্থতার কারণ দেখাইনি। পাশাপাশি সাহিত্য সংস্কৃতি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের টানে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করেছি। সুদূর কানাডা পর্যন্ত ছুটে গিয়েছি একুশের ফেব্রুয়ারিতে অংশগ্রহণ করতে। বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। কেমন করে অত দূরে হাজার হাজার বাঙালিরা জীবন যাপন করছেন। কিন্তু তারা প্রতিনিয়ত বাংলা ভাষাকে শ্রদ্ধা সম্মান দেখিয়ে বাংলা সংস্কৃতিকে রক্ষা করছে। এ আমার এক নতুন অভিজ্ঞতা। আমার কোন কাজে কোন দিন কোন প্রশ্ন তুলেনি বা বাধা দেয়নি আমার বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপ চন্দ্র মাইতি এবং আমার সহধর্মিনী মলিনা মাইতি। এঁরা দুজন আমার জীবনের প্রেরণা ছিলেন। দুজন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমি খুবই অসহায়। খুব গভীরভাবে চিন্তা করলে যা মনে হয় তা হল সাথীহারা আমি।
কবিতা গল্প প্রবন্ধ উপন্যাস সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই আমার বিচরণ।ছোট বড় প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০, মোট বইয়ের সংখ্যা ১০৭। আমার কর্মজীবন ১৯৬৬ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত। নিজেকে একজন বামপন্থী প্রোপাগান্ডিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসি। এজন্যই একটি বই লিখেছি তার নাম"আমি একজন প্রোপাগান্ডিস্ট"। এই বইটি জেলা বামফ্রন্টকে উৎসর্গ করেছি। জীবনে পেয়েছি অগাধ। রাজনীতিতে এবং সাহিত্যে একজন পরিচিত মানুষ আমি। বাংলা ভাষার একজন লেখক ও বাংলাপ্রেমী হিসেবে আমি দেশে বিদেশে পরিচিত মানুষ এবং আমার অজস্র বন্ধুবান্ধব আছে । গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ হলো আন্দামানের সেলুলার জেল। ত্রিপুরা আসাম মেঘালয়। কানাডা। আমার অন্যতম তীর্থক্ষেত্র চট্টগ্রাম ভ্রমণ আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনিয়মিত হলেও "অক্ষরকর্মী" পত্রিকার সম্পাদনা আমি করেছি। ২০০০ সালে জীবনানন্দ উৎসব কমিটি গঠন করেছি এবং পরপর ৩ বছর মেলা ও সংস্কৃতিক কর্মসূচি গ্রহণ আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য। এই মেলাতে দেশ-বিদেশের বহু গুণী মানুষ লেখক বন্ধুরা উপস্থিত হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার প্রদান ২০০৭ সাল থেকে শুরু করেছি। আমার জীবনে একরকম শ্রেষ্ঠ পাওয়া আমার নামাঙ্কিত একটি লাইব্রেরী নিমতৌড়িতে (তমলুক) আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
এটাই আমার ৬১ বছরের লং মার্চ।
