ক্যালেন্ডারের পাতায় বছর ঘোরে, নিয়ম করে আসে বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচন। ভোটপ্রচারের উত্তাপে সরগরম হয় ময়না ও নন্দকুমার। প্রতিশ্রুতি বর্ষণ করেন প্রার্থীরা। কিন্তু ভোট মিটলেই সেই চেনা ছবি— কাঁসাই নদীর ওপর সেই নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। দু…
ক্যালেন্ডারের পাতায় বছর ঘোরে, নিয়ম করে আসে বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচন। ভোটপ্রচারের উত্তাপে সরগরম হয় ময়না ও নন্দকুমার। প্রতিশ্রুতি বর্ষণ করেন প্রার্থীরা। কিন্তু ভোট মিটলেই সেই চেনা ছবি— কাঁসাই নদীর ওপর সেই নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। দুই বিধানসভা কেন্দ্রের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ ‘পুরষাঘাট ব্রিজ’ আজও রয়ে গিয়েছে কেবল সরকারি ফাইলেই। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কয়েক হাজার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী সেই টলমলে বাঁশ আর দড়ি।
দুর্ভোগের জলছবি
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ময়না ও নন্দকুমার বিধানসভাকে সংযুক্ত করার মূল কারিগর এই পুরষাঘাট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুই জনপদের যোগাযোগের জন্য একটি স্থায়ী কংক্রিট ব্রিজের দাবি দীর্ঘ কয়েক দশকের। কিন্তু প্রশাসনিক উদাসীনতায় আজও কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে ময়না বিধানসভার পূর্ব দক্ষিণ ময়না, সামগঞ্জ ও লালুয়াগেড়া এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াতের একমাত্র পথ এটি। পেশার টানে প্রতিদিন এই সাঁকো দিয়েই মাছ, পান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক সামগ্রী নিয়ে যাতায়াত করেন কয়েক হাজার ব্যবসায়ী। বিপজ্জনক জেনেও স্কুলপড়ুয়াদের যাতায়াত করতে হয় এই পথেই।
এলাকাবাসীর দাবি, সাঁকোর দুই দিক খোলা থাকায় যে কোনো সময় বড়সড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। অতীতে সাইকেল বা মোটরবাইক নিয়ে নদীতে পড়ে যাওয়ার নজিরও কম নেই। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় রাতে এবং বর্ষাকালে। রাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে রোগীকে খাটিয়ায় শুইয়ে ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পার করতে হয়। বর্ষায় কাঁসাইয়ের জল বাড়লে যখন সাঁকো ভেঙে যায়, তখন একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়ায় নৌকা।
দীর্ঘ ২৫ বছরের বঞ্চনার কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন ময়নার বাসিন্দা সুব্রত মণ্ডল। তিনি বলেন, “প্রায় পঁচিশ বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতিই শুনে আসছি। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দুই বিধানসভার বিধায়করাই বিষয়টি জানেন, কিন্তু কেন উদ্যোগ নেওয়া হয় না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।”
একই সুর শোনা গেল পেশায় পান ব্যবসায়ী উত্তম মাইতির গলায়। প্রতিদিন নিমতৌড়িতে পান বিক্রি করতে যান তিনি। উত্তমের কথায়, “গত ১৫ বছর ধরে দেখছি ভোট এলেই নেতারা এসে ব্রিজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। ভোট ফুরোলেই আর কাউকে দেখা যায় না। আমরা আর আশ্বাস চাই না, এবার স্থায়ী সমাধান চাই।”
প্রশ্ন প্রশাসনের দরবারে
দুই বিধানসভার সংযোগকারী এই সেতুটি নির্মিত হলে এলাকার অর্থনৈতিক চেহারা বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, দিনের পর দিন কেন ব্রাত্য থেকে গেল পুরষাঘাট? ক্ষোভ জমছে সাধারণ মানুষের মনে। আসন্ন নির্বাচনের আগেও কি মিলবে স্রেফ গালভরা আশ্বাস, নাকি এবার সত্যিই শুরু হবে কংক্রিট ব্রিজের কাজ— এখন সেদিকেই তাকিয়ে ময়না ও নন্দকুমারের হাজার হাজার বঞ্চিত মানুষ।
কাজল মাইতির রিপোর্ট, দেশ মানুষ