সমাজের অগ্রসর অংশ/ অমৃত মাইতি অসম বিকাশের কারণে সমাজে নানান মানসিকতার, নানান ধরনের, নানান রুচির মানুষ আছে। দৃষ্টিভঙ্গি এবং বুদ্ধিবৃত্তি সকলের সমান নয়। কিছু মানুষ আছেন যারা সমাজের বিভিন্ন স্তরকে বিশ্লেষণ করেনা। কিছু মানুষ তাদের দ…
সমাজের অগ্রসর অংশ/ অমৃত মাইতি
অসম বিকাশের কারণে সমাজে নানান মানসিকতার, নানান ধরনের, নানান রুচির মানুষ আছে। দৃষ্টিভঙ্গি এবং বুদ্ধিবৃত্তি সকলের সমান নয়। কিছু মানুষ আছেন যারা সমাজের বিভিন্ন স্তরকে বিশ্লেষণ করেনা। কিছু মানুষ তাদের দূরদর্শিতা, অপেক্ষাকৃত উন্নত চিন্তাধারার এবং চেতনার কারণে সমাজে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে। এই ধরনের মানুষরা সমাজের কিছু কাজ করতে চায় এবং সাহসী পদক্ষেপ নিতে বদ্ধপরিকর। এরা সমাজের অগ্রসর অংশ। সাধারণত সেইসব ব্যক্তিকে অগ্রগণ্য বোঝানো হয় যারা সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখে, যেমন বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, শিল্পী, এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত কর্মীরা। এই অংশটি সমাজের প্রগতি, নতুন ধারণা তৈরি, এবং পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এরা নতুন প্রযুক্তি তৈরি করে, সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশ ঘটায় এবং সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার জন্য কাজ করে যার মাধ্যমে সমগ্র সমাজ এগিয়ে যেতে পারে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে নিম্নবর্গের মানুষের উন্নতির জন্য এরা সদা জাগ্রত। এঁরা মনে করেন নিম্নবর্গীয়দের অবস্থার পরিবর্তন ছাড়া সমাজের অগ্রগতি ঘটতে পারে না। নিচুতলার মানুষ অর্থাৎ নিম্নবর্গীয়রা শিক্ষা-দীক্ষায় চেতনায় যখন এগোবে তখন প্রকৃতপক্ষে সমাজের অগ্রগতি ঘটবে। সমাজের এগিয়ে থাকা মানুষদের এটাই সমাজ চেতনা এবং বিশ্লেষণ। সমাজের অনগ্রসর অংশ হলো আর্থিক দিক থেকে, শিক্ষা-দীক্ষার দিক থেকে, চেতনার দিক থেকে একেবারে পিছিয়ে থাকা মানুষ। অনগ্রসর অংশের উন্নতি ছাড়া সমাজের উন্নতি সম্ভব নয়। একমাত্র সমাজের অগ্রসর অংশ এটাই বিশ্বাস করে। এবং সেই জন্য যে কোন গুরু দায়িত্ব নিতে তারা পিছ পা হয় না। এই অগ্রসর অংশকে আমরা সম্মান করি, আমরা সমর্থন করি।
নব নব উদ্ভাবনী শক্তির মানুষজন এবং বিজ্ঞানীরা নতুন প্রযুক্তি ও ধারণা তৈরি করে সমাজকে আধুনিক করে তুলতে সাহায্য করে।
যুগে যুগে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন সমাজের অগ্রণী অংশ। সামাজিক অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে এঁরা সমাজকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে গেছেন চিরকাল। এঁরা সামাজিক বৈষম্য এবং ন্যায় বিচারের জন্য গণ আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য ও অবিচার দূর করার জন্য কাজ করে, যা একটি উন্নত ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়তা করে। শিল্পী সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা নতুন সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক ধারা তৈরি করে সমাজকে সমৃদ্ধ করে এবং মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটায়। এই অংশকে আমরা বলি সমাজের অগ্রসর অংশ। যুগে যুগে সমাজের এই অগ্রসর অংশ ধনী, বণিক শ্রেণী এবং শাসকগোষ্ঠীর হাতে লাঞ্ছিত হয়েছে। তবু তারা সমাজের বুকে অগ্রণী অংশ হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলেছেন। নিজেদেরকে তৈরি করেছেন নির্ভীকভাবে। নির্ভীকভাবেই পদক্ষেপ নিয়েছে সমাজের বিভিন্ন বাঁক ও মোড়ের সামনে। সমাজের পশ্চাৎপদ অংশ যেদিন অগ্রণী মানুষদের সঙ্গ দিতে পারবে, এক জোট হতে পারবে সেদিন এক নতুন ইতিহাস তৈরি হবে।
__________________________________________
একটি মনস্তাত্ত্বিক দর্শন /অমৃত মাইতি
কপর্দক শূন্য হয়ে বেঁচে থাকা একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। এমন পরিবেশ পরিস্থিতিকে আমি যুদ্ধ মনে করি। এখানে একটা প্রতিকূলতা আছে যা প্রবল বাধাস্বরূপ। অনতিক্রমনীয় এই বাধা। অতিক্রম করা যাবে না এসব জেনেও মনোবল যে হারায় না সেই কিন্তু একমাত্র বেঁচে থাকার অধিকারী। সমস্ত হতাশাকে অগ্রাহ্য করে দুঃসাহসে ভর দিয়ে পাড়ি দেওয়া এক নাবিক। সে জানে ঝড় তুফান আছে । বিপর্যয় অনিবার্য। কিন্তু তার মন মানতে বাধ্য নয়।তার মনের মধ্যে সব সময় রয়েছে রবীন্দ্রনাথ। যে পারে সে আপনি পারে, পারে সে ফুল ফোটাতে। তার হৃদয়ে আছে নেপোলিয়ান যার অভিধানে অসম্ভব বলে কোন শব্দ নেই। জীবনের চলার পথকে সে মনে করেছে যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধ করে এগিয়ে যাওয়াই তার একমাত্র ভূমিকা, স্বপ্ন সফলের অভিযান। তার কাছে এর কোন বিকল্প নেই। জীবন যুদ্ধে জয়লাভ করা অত সহজ নয়। তাই যদি হয় হেরে যাওয়া আর জড় পদার্থের পরিণত হওয়া এক জিনিস। সে গতিময়তার পূজারী। যেখানে পৃথিবী প্রতিমুহূর্তে ঘুরছে নিজে তার কক্ষপথে এবং প্রদক্ষিণ করছে সূর্যকে। সেখানে বস্তু জগতের সব কিছুই গতিশীল।
কপর্দকশূন্য হয়ে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন এবং এর সাথে মানসিক চাপ, হতাশা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা জড়িত থাকে। অর্থের অভাবের কারণে মৌলিক চাহিদা পূরণ করা, যেমন খাদ্য গ্রহণ এবং একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে কাউকে উপহার দেওয়া, বিপন্নের পাশে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে, যা চরম কষ্টদায়ক । যখন টাকা থাকে না, তখন সাধারণ প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে যায়। কপর্দক শূন্য থাকা থেকে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হতাশা বা বিষণ্নতা আসতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু অর্থহীনতা নয়, বরং বেঁচে থাকার জন্যই নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়, যা খুবই যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের অক্ষমতা মানুষকে আরও বেশি হতাশ করে তোলে। নিবিড় সম্পর্কের মানুষজনের সঙ্গে একসঙ্গে থাকা এবং সম্পর্ক রক্ষা করা অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তখন চরম হতাশা তাকে ঘিরে ধরে। তখন সে নিজেকে মনে করে সে একজন হালভাঙ্গা নাবিক। চারিদিকে ঘন কুয়াশা আর অন্ধকার। পথ ভুলে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা। যেতে হবে তাকে এসবের মধ্য দিয়েই, দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেই হবে।
___________________________________________
দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও বিকাশ /অমৃত মাইতি
অলৌকিক শক্তি নয়, পৃথিবীর জন্মও
দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্য দিয়ে হয়েছে। সূর্য নামক এক মহাতারকা ছাড়া পৃথিবীর জন্ম হত না। কারুর ইচ্ছেতে পৃথিবীর জন্ম হয়নি। এটি প্রমাণিত সত্য, পৃথিবীতে জড় বা গতিহীন বলে কিছু নাই। সবকিছুর মধ্যে গতিশীলতা ও সৃজনশীলতা আছে। পৃথিবীতে সব কিছুই পরিবর্তনশীল। পৃথিবী একটি গতিময় গ্রহ। তাই পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে, সবকিছুরই গতি আছে।
দ্বন্দ্ব ও সংঘাত হলো পৃথিবীর অস্তিত্ব। পৃথিবী এবং মহাবিশ্ব দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্যে দিয়ে বিকশিত। কিছু অবুঝ মানুষ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার অভাবে অলৌকিকতা মেনে নেয়। আবার কিছু সমঝদার মানুষ ইচ্ছাকৃত ভাবে দ্বন্দ্ব সংঘাতকে মান্যতা না দিয়ে মনগড়া কিছু উচ্চারণ করে থাকে মানুষকে ঠকানোর জন্য। এদের হাতে কত বিজ্ঞানীকে সত্য
বলার জন্য হেনস্থা হতে হয়েছে, প্রাণ দিতে হয়েছে। এদের হাতেই জর্দানো ব্রুনো একজন ইতালীয় দার্শনিককে প্রাণ দিতে হয়েছিল। ব্রুনো তার স্মৃতিবর্ধন পদ্ধতির জন্য বিখ্যাত যা সংগঠিত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি মতবাদ প্রচার করেছিলেন যে, মহাবিশ্ব অসীম এবং এর কোন কেন্দ্র নেই। আর এজন্য প্রচলিত ধর্মের বিরোধিতার অপরাধে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়। এই সমস্ত ধর্ম সমাজের সমাজপতিরা অসম্ভব নির্দয় এবং নিষ্ঠুর । নিজেদের তৈরি ভুল সিদ্ধান্তকে জোরপূর্বক বলপূর্বক মানুষের উপর চাপিয়ে দেয় চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখিয়ে। অশিক্ষিত বোধ বুদ্ধিহীন বোকা মানুষরা এদের দাপটে ভয়ে ভয়ে সবটাই মেনে নিত। এরা ভয় দেখাতেন, না মানলে নিজেদের বিপর্যয় হতে পারে, সন্তান-সন্ততিদেরও বিপদ হতে পারে এইসব প্রচার করে সাধারণ মানুষকে বাধ্য করা হত। না মানলে ধর্মীয় প্রচারকদের হাতে নিগৃহীত হতে হতো। আমি নিজে ব্যক্তি জীবনে কার্যকারণ সম্পর্ক বিশ্বাস করি। কোনরকম সংস্কার অলৌকিকতাকে বিন্দুমাত্র স্বীকার করিনা।
পৃথিবীর ও এই মহাবিশ্বের মূল চালিকাশক্তি হল দ্বন্দ্ব সংঘাত এবং বিকাশ। শুধু আমাদের মেধা এবং মগজকে সহজ সরল যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আমি কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে এই পর্বটি আলোচনা করতে চাই। বিভিন্ন সময়ে কিছু যুক্তিপূর্ণ প্রচলিত তথ্য আলোচিত হয়েছে। তবু প্রসঙ্গক্রমে আলোচনা করছি। এমনটা কোনদিনই হতে পারে না যে আপনি ঘুম থেকে উঠেই দেখলেন আপনার বাড়ির সামনের গাছটিতে ফুল ফুটে আছে। কোন ধর্ম সংস্কার অলৌকিকতার ক্ষমতা নেই হঠাৎ করে একটা গাছে বিকশিত ফুলকে আপনি দেখতে পাবেন। এই বিকশিত ফুলের পিছনে একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। একটি বীজ উপযুক্ত উত্তাপে জলবায়ুর প্রভাবে অঙ্কুরিত হয়। একসময় গাছে রূপান্তরিত হয়। গাছটির বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে গাছের শরীরে কিছু সৃষ্টি বিষয়ক প্রাণ বা সজীবতা জন্ম নেয়। গাছের বয়স অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে তার উৎপাদক ক্ষমতা তৈরি হয়। তখনই খুব সূক্ষ্মভাবে ধীরে ধীরে একটি কুঁড়ি দেখা দেয়। এই কুঁড়ির মধ্যে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের একটি শক্তি অন্তর্নিহিত থাকে যা প্রতিনিয়ত কুঁড়িকে বিব্রত করে তাকে কুঁড়ি অবস্থায় থাকতে দেয় না। একটা শক্তি আঘাত হানছে সেই কুঁড়ির উপর। একটি বিরুদ্ধে শক্তি কুঁড়িকে কুঁড়ি অবস্থায় থাকতে দেবে না। কুঁড়িকে বিকশিত না হওয়া পর্যন্ত সে আঘাত হানবে। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার বাইরে অন্য কোন শক্তি নাই হঠাৎ করে এটি গাছে ফুল ফুটে উঠবে। শিশুর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শরীরের মধ্যেও দ্বন্দ্ব সংঘাত এবং শারীরিক বিকাশ ঘটে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের এবং বয়সে শরীরে যৌবন আসে। আদম ঈদের গল্প নয়। হঠাৎ করে মানুষ পৃথিবীতে চলে এলো। সবকিছুই প্রাকৃতিক সামাজিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী হচ্ছে। এভাবেই প্রমাণ করা যায় এই পৃথিবী মহাবিশ্ব পরিবর্তনশীল এবং গতিশীল। এক জায়গায় জড় পদার্থের মত বসে নাই । কারুর নির্দেশে এই বস্তুর জগতকে নাড়াচড়া করা যায় না।
একটি ডিম হঠাৎ করেই পাখির বাচ্চার জন্ম দেয় না। ডিমের মধ্যে ডিম নাশক একটি শক্তি আছে। তার কাজ হল ডিমটিকে নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট উত্তাপের মধ্য দিয়ে বাচ্চার জন্ম দেবে। সব ক্ষেত্রেই প্রাণী জগৎ বলুন, জীবজগত বলুন একটা গতিশীলতা বিদ্যমান। একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিকাশ ঘটছে। দ্বন্দ্ব , সংঘাত ও বিকাশ হল সারা বিশ্বের মূল এবং একমাত্র চালিকাশক্তি।
____________________________________________
ফেলে ফেলে চলেছি/অমৃত মাইতি
জীবনের সমস্ত অংশ থেকে বেশকিছু ফেলে ফেলে এগিয়ে চলেছি। মাঠে চাষার সঙ্গে মাঠের জলে মুড়ি ভিজিয়ে খেয়েছিলাম। তার স্বাদ ছিল অপূর্ব। কী আনন্দ তৃপ্তি সেই স্বাদে, সেখানেই থেকে গেছে। স্কুলের পাশে একটি বটগাছ ছিল। স্কুলের ঘন্টা পড়ার অনেক আগেই পৌঁছে যেতাম। তাই সময় কাটানোর সময় ছিল বটগাছের শিকড়। ওখানে অনেক সময় বসে থাকতাম। সময় অভাবে কোন পড়া বাকি থেকে গেছে, হয়তো তাই বই খুলে দেখতাম। ওই পড়াগুলো ওখানেই আমার থেকে গেছে। ইন্টার স্কুল কম্পিটিশনে ফুটবল খেলতে গিয়েছিলাম। সেদিন জেতার আনন্দ ওখানে রেখে এসেছি। স্কুল ছুটির পরে বটের ঝুরিতে দোল খাওয়ার কিশোরবেলাকে রেখে এসেছি। সঙ্গে নিয়ে আসতে পারিনি কোন কিছুই। ধানের চারা তুলেছি রোপন করেছি আবার ধান কাটার পরে ফসল কেটেছি। এইসব সৃষ্টির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছিলাম, সেখান থেকে যে আনন্দ পেয়েছি, আর তার সবটাই থেকে গেছে। খর রৌদ্রে চাষার নাঙ্গল চষা দেখেছি, আর দেখেছি তার ঘাম ঝরতে। আর কোনদিন দেখতে পাবো না। এইসব সঙ্গে আনতে পারিনি। ফেলে এসেছি। রাত্রিবেলা শালুক ডাঁটা দিয়ে খেজুরের রস খেয়েছি কলসিতে ডুবিয়ে দিয়ে। সেই সব শীতের রাত কী আমোদে না কেটেছে! গভীর রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে যাত্রা শুনতে গিয়েছি, চাঁদ তারা আর খোলা আকাশ সাক্ষী আছে। লুকোচুরি খেলেছি ধানী মাঠে ধান কেশরের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে। সারামাঠ প্রমাণ দিতে পারে আমার জীবনের ওই সময়গুলো কেমন আনন্দে কেটেছে। প্রায় এক মাস কেমন করে কাটিয়েছিলাম মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলের ৩২ নম্বর ডিগ্রি সেল এর ছোট্ট খুপরিতে, সে কথা জানে একমাত্র ওই সেলের গরাদ। রাত্রিগুলো কী ভাবতে ভাবতে কেটে গেছে সেলের গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব ফেলে এসেছি। আন্দামানের মুগ্ধতা নিয়ে আসতে পারিনি। দিনের পর দিন একাকী কানাডায় বরফের মধ্যে নিশ্চিন্তে কাটিয়েছি, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। যা আমার জীবনে অন্য কোথাও সম্ভব হয়নি। সেই সব থেকে গেছে, সঙ্গে নিতে পারিনি। জীবনে আনন্দ আমার সখ্য হয়নি। বেদনাই আমার স্থায়ী হয়েছে। অস্থায়ী জীবনে সবকিছুই অস্থায়ী। এক গোধূলি বেলায় পদ্মা ভ্রমণ।আমি একাত্ম হয়েছিলাম নক্ষত্র, আকাশ আর পদ্মার ঢেউয়ের সঙ্গে সেই রাতের ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আছে বিক্রমপুর। একরাত্রি যা দিতে পেরেছিল ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে বরিশালের পথে আর কোনদিনও কেউ আমাকে তা দিতে পারেনি। মেঘালয়ের অরোয়া গুহা আমার কাছে সাহসিকতার পরীক্ষা নিয়েছিল। গৌহাটির একটি সাহিত্য বাসরে আয়োজক যে মহিলা সংগঠনটি আমাকে পাশে বসিয়ে যত্ন করে খাইয়ে ছিল যা কিশোরবেলার মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমার সুইট হোম ত্রিপুরায় চা বাগান আর বাঁশগ্রাম আমাকে হাতছানি দেয়। যে রাতে চট্টগ্রামের পথে পথে কেন ঘুরেছিলাম, তার রহস্য আমি ছাড়া কেউ জানে না। ৫১বছর আগের সেই বিকেলের হলুদ গন্ধটি যা কোনদিনই ভুলে যাওয়ার নয় সেটিও থেকে গেল এখানে। এই সব কিছু এখন ফেলে ফেলে চলেছি, কোথায় যেন এক ছায়া ঘন নিবিড় শান্তি আছে এই ভেবে। যেখানে চলেছি সেখানে কোন কিছুই নিয়ে যেতে নাই। একাকেই যেতে হয় সেখানে চরম আনন্দের টানে একেবারে হালকা শরীরে কোন বোঝা না নিয়ে যেখানে এ কুল ও কুল কোন কূল নেই । যেখানে নেই কোন আকার। চলেছি নিরাকারের নিরুদ্দেশে।
_____________________________________________
রাজনীতি করা খুব কঠিন কাজ/ অমৃত মাইতি
রাজনীতি করা খুব কঠিন। এটি একজন প্রখর সচেতন মানুষের কাজ। একজন স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন ঠান্ডা মাথা মানুষের কাজ। একজন বিশ্বস্ত সেনাপতির কাজ। একজন দর্শনে বিশ্বাসী মানুষের কাজ। তাই রাজনীতি করা খুব কঠিন কাজ। আমি রাজনীতি বলতে বুঝি বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করা এবং শোষিত মানুষকে মুক্ত করা, যাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বা যারা কোন রকমে বেঁচে আছে, যারা এই সমাজে অবিচারের শিকার, এক কথায় শোষিত বঞ্চিত মানুষ, যারা তাদের জন্য রাজনীতি করেন আমি মনে করি তারাই প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি করার যোগ্য। যারা এই সমাজে প্রতিদিন দিয়ে যাচ্ছে পায় না কিছুই তাদের পাশে দাঁড়ানোই একজন প্রকৃত রাজনীতি করা মানুষের কাজ। যারা নিজের কথা ভাবার সময় পান না, মানুষের কথাই ভাবেন বা তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য জীবনের মূল্যবান সময় অতিবাহিত করেন তারাই প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি করা মানুষ। সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করাকেই যারা আদর্শ মনে করেন এবং এই কাজকে পবিত্র কর্তব্য মনে করেন আমি তাদের কথাই বলছি তারাই একমাত্র রাজনীতি করার যোগ্য। কেউ বলবেন এ তো নীতির কথা। আমি বলি হ্যাঁ রাজনীতিতে তো নীতি থাকবেই। নীতিহীন রাজনীতি আবার আছে নাকি। হ্যাঁ অবশ্যই আছে, আমাদের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং সমাজ কাঠামো নীতিহীন অনেক দলকেই রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করেন। এটা তাদের জ্ঞানের অপরিপকতা। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য রাজনীতির দল আছে। আবার যারা পুঁজির মালিক তাদের পুঁজি বাড়ানোর জন্য একশ্রেণীর শ্রমিক আছে, যারা উদয় অস্ত্র শুধু শ্রম দিয়ে যাচ্ছে পুঁজি বাড়ানোর জন্য সেই সমস্ত বঞ্চিত শ্রমিকের জন্য যারা কাজ করে তারাও রাজনীতি করে। আমি এই শেষোক্ত মানুষের পক্ষে রাজনীতিকদের সম্মান করি। সুতরাং রাজনীতি করি বললেই হবে না। কার জন্য রাজনীতি কর তুমি। তোমার বন্ধু কে, শত্রু কে সেটি পরিষ্কার করে বলতে হবে মানুষের কাছে কারণ সমাজে মানুষের বন্ধু আছে মানুষের শত্রু আছে। মানুষের শ্রেণী বন্ধু আছে আবার মানুষের শ্রেণী শত্রু আছে। যাদের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে বলার সৎ সাহস আছে আমি তাদেরকে জনতার বন্ধু মনে করি। সেই সাহস যাদের আছে, যারা একমাত্র বঞ্চিত মানুষের কথা বলেন তাদের রাজনীতিকেই আমি সম্মান করি। রাজনীতি এখন সবাই করে। যারা ধর্ম ধর্ম করে গলা ফাটাচ্ছে তারা প্রকৃতপক্ষে অধর্ম কাজ করছে।। এদের রাজনীতি করার কোন যৌক্তিকতা নেই। কারণ এরা সমাজের অগ্রগতির চাকাকে পিছনের দিকে টেনে রাখে। এরা সাম্প্রদায়িক। যারা কেবলমাত্র মানুষের বাঁচার লড়াইকেই ধর্ম মনে করে বা অসাম্প্রদায়িক মানুষজন তাদেরকেই আমি রাজনীতিবিদ হিসেবে সম্মান করি। এই পচা গলা সমাজ ব্যবস্থায় যারা প্রতিবাদী তাদেরকেই আমি সম্মান করি রাজনীতিবিদ হিসেবে। যারা পথে নেমেই দিশা দেখাতে পারেন তারাই রাজনীতিবিদ।
_____________________________________________
স্বার্থপরতার জন্ম, বিকাশ ও বিনাশ /অমৃত মাইতি
কোন সমাজবিজ্ঞানী অস্বীকার করে না, প্রতিদিন মালিক শ্রেনী যে শ্রম চুরি করছে তা নিজেদের স্বার্থপরতার জন্য। দেশের বা সমাজের কথা ভেবে এই শ্রম চুরি তারা করে না। নিজেদের পুঁজি ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য এই চুরি। এই চুরি ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য। বিশ্বগ্রাসী এই ক্ষুধা এবং এই চুরি রাষ্ট্র সমর্থন করে। রাষ্ট্রের মদতে এই চুরি। সাধারন মানুষ কিন্তু স্বার্থপর নয়। বাধ্য হয়ে নিজের কথা ভাবে আর পরিবার-পরিজনদেরকথা ভেবে স্বার্থপর হতে বাধ্য হয়। তাই সমাজের কথা সাধারণ মানুষের কথা যতটাই ভাবুক না কেন তার পরিবার-পরিজনদের কথাও ভাবতে হয়, উপায় থাকে না বলে। এই সমাজে এই কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্বার্থপরতা দেখা দেয়। যেহেতু ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা এই সমাজেই রয়েছে তাই বর্তমান এবং ভবিষ্যতের চিন্তা করে যে কাজটা সে করে, তাকে আমরা আপাত দৃষ্টিতে স্বার্থপর মনে করি। কিন্তু সংসার ধর্ম পালন করতে গেলে ব্যক্তিগতভাবে আয় করা ও সঞ্চয় বৃদ্ধি করার প্রয়োজন তো আছেই। সংসারে থেকে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করা যায় না। তাই একটা রাষ্ট্রের চিন্তা ভাবনা তার কাজকর্ম সবকিছুই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। রাষ্ট্রই তো প্রভাব বিস্তার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
দেশের পরিকল্পিত এই অর্থনীতি মানুষকে স্বার্থপর করে তুলছে। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে মানুষ নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হতে পারে। এছাড়াও সম্পদ এবং অনৈতিক আচরণের মধ্যে একটি যোগসূত্র দেখা যায়, যেখানে ধনী ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের স্বার্থের প্রতি বেশি মনোযোগী হন। তবে, স্বার্থপরতার কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বংশগত প্রবণতা এবং শৈশবের পরিবেশের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে মানুষকে প্রায়শই নিজের সুবিধা ও স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হয়, যা স্বার্থপর আচরণের জন্ম দিতে পারে। কেরানী কর্মচারী বা শিক্ষকরা নিজের ভবিষ্যতের জন্য, সন্তান-সন্ততির ভবিষ্যতের জন্য আয়ের একটা অংশ ব্যাংকে জমাতেই পারে। এই প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা, নিজের বংশধরদের বাঁচিয়ে রাখার অধিকার তার তো আছে। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে সম্পদ এবং অনৈতিক আচরণের (যেমন, প্রতারণা) মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। তাই ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেদের স্বার্থের প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
অর্থনৈতিক মন্দা বা অনিশ্চয়তার সময় মানুষ নিজের এবং পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকে, যা সামাজিকভাবে কিছুটা স্বার্থপর হতে উৎসাহিত করে। অন্যান্য কারণও আছে। বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যাগুলো স্বার্থপরতার দিকে চালিত করতে পারে। আচরণগত বৈশিষ্ট্য জিনগতভাবে বা বংশগতভাবে আসতে পারে এবং শৈশবে শেখা আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। কিছু মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ সর্বদা স্বার্থপর এবং নিজেদের স্বার্থপরতা ও লাভের জন্যই কাজ করে, এমনকি পরোপকারের ক্ষেত্রেও। এটি শুধুমাত্র অর্থনীতির উপর নির্ভর করে না, বরং এতে মানসিক, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত কারণও জড়িত।অর্থনৈতিক চাপ অনেককে স্বার্থপর করে তুলতে পারে, তবে একই সাথে মানুষ কঠিন পরিস্থিতিতেও একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং উদার হতে পারে।
এইসব বিশ্লেষণ করে বলা যেতে পারে সমাজের বা রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং সমাজের চরিত্র মানুষের চরিত্রকে গড়ে তুলতে পারে। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি মানুষকে প্রভাবিত করে। তাই প্রতিটি মানুষের অর্থনীতির বিষয়ে এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা হওয়া উচিত। ভগৎ সিং এর কথাটাই সত্যি, মানুষ ধর্ম যত বেশি বুঝে অর্থনীতি তত ভালো বুঝে না। অথচ প্রতিটি মানুষের অর্থনীতি বোঝাটা খুবই জরুরী। কারণ এই অর্থনৈতিক বিষয়টি প্রতিটি মানুষকে এবং সমাজকে পরিচালিত করে। অর্থনীতি যদি গোটা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে হয়ে থাকে তাহলে সেই সমাজে স্বার্থপরতা থাকবে না। সবশেষে এই সিদ্ধান্তই পৌঁছতে হয়। অস্বাভাবিক বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ নিজের জন্য চিন্তা করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
মানুষ উদার হবে কি স্বার্থপর হবে তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের উপর, রাষ্ট্রের পরিচালন পদ্ধতির উপর, রাষ্ট্রের পলিশির উপর। সমাজতান্ত্রিক দেশে যেহেতু সমস্ত ধন-সম্পত্তি রাষ্ট্রের কোন ব্যক্তির নয় তাই সেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা জন্ম নেয় না। সমবন্টন ব্যবস্থা সমাজে থাকলে মানুষ কেন স্বার্থপর হতে যাবে। অসম বন্টন ব্যবস্থার কারণেই তো মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের নিজের চিন্তা করে সমাজের কথা ভাবার সময় পায়না। আমার বিশ্বাস মানুষ মানবিক হতে চায় মানুষ পরোপকারী হতে চায়। মানবিক এবং পরোপকারী মানুষেরা সমাজে সম্মানিত। এই সম্মানের জন মানুষের অন্তর্নিহিত লোভ। অনেক মানুষকে দেখেছি একটু সম্মানের জন্য একটু মাথা উঁচু করে চলার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। ত্যাগী মানুষরা সম্মান অর্জন করেন। মানুষ একদিন বুঝতে পারবে স্বার্থপরতা অসম্মানের।
____________________________________________
সর্বহারা শ্রেণী /অমৃত মাইতি
সর্বহারা বলতে খুব সহজ ভাবে বলতে গেলে সমাজের কোন কিছুতে যাদের অধিকার নাই। অধিকার নাই কোন ধনসম্পদে। তাদের একমাত্র গতর সম্বল। গতর খাটিয়ে তাদেরকে খেতে হয়। জীবনধারণের জন্য এরা সবকিছু হারিয়ে শহরে চলে যায় কাজের সন্ধানে। কলে কারখানায় কাজ নেয়। একটি কারখানার শ্রমিক দু হাত দু পা নিয়ে নির্ধারিত সময়ে কারখানায় প্রবেশ করে। আবার নির্ধারিত সময়ে ছুটি হয়, বেরিয়ে আসতে হয় কারখানা থেকে দু হাত দু পা নিয়ে। কারখানার একটি নাটবল্টুতেও তাদের অধিকার নেই। শ্রম বিক্রি করে পয়সা পায়। কাজের শেষে চলে আসতে হয় গেটের বাইরে। কখনো কাজ চলে গেলে তখন তার আর কোন আয় থাকে না। এদের আমরা সর্বহারা বলি। গ্রামেগঞ্জেও এক ধরনের সর্বহারা আছে। যাদের নিজস্ব জমি নাই, অন্যের খেতে কাজ করে মজুরি পায়। কিন্তু এই সব দিনমজুর বা খেতমজুররা অন্যান্য উপায়েও জীবন ধারণ করে। এরা একেবারে সহায় সম্বলহীন নয়। এদের নিজস্ব বলদ থাকে, হাল নাঙ্গল করে পয়সা উপার্জন করে। নিজস্ব জাল আছে। নিজস্ব পুকুর আছে। খালে বিলে জাল দিয়ে মাছ ধরতে পারে। মাছ বিক্রি করে কিছু আয় হয়। রিক্স ভ্যান চালিয়ে অর্থ উপার্জন করে। লোডিং আনলোডিং ও একশত দিনের কাজ করে আয় করে। অর্থাৎ আয়ের নিজস্ব উপায় আছে। কিন্তু কারখানার শ্রমিকের নিজের বলতে কিছু নেই। তাই শ্রামিক সর্বহারা। কারখানার শ্রমিক একসঙ্গে অনেকে থাকে। তাদের সংগঠিত করা সহজ। গ্রামের খেতমজুর বা চাষী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, সংগঠিত করতে অবশ্যই কষ্ট হয়, সময় লাগে। কিন্তু কারখানার শ্রমিকদের একসঙ্গে পাওয়া যায় সংগঠিত করার জন্য। শ্রমিকরা থাকে কারখানায়। এক ঘন্টার নোটিশে একটা কারখানা শ্রমিকদের নিয়ে কারখানা গেটে মিটিং করা যায় ।শোষণ বঞ্চনা সম্পর্কে সচেতন করা যায়। ধর্মঘট করা যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় দিনমজুরদের একসঙ্গে পাওয়া যায় না বলেই তাদেরকে নিয়ে সংগঠন করা অনেকটাই কষ্টকর। সর্বহারা শ্রেণী বলতে আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকদের বোঝানো হয়, যারা উৎপাদনের মালিক নয় কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য তারা শ্রমশক্তি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। তারা বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণীর দ্বারা শোষিত হয়, যারা উৎপাদনের উপকরণের মালিক। কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বে এই শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা শিল্প শ্রমিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করে। সর্বহারা শ্রেণীর নিজস্ব কোনো উৎপাদনের উপায়, যেমন কলকারখানা, জমি বা যন্ত্রপাতি নেই। বেঁচে থাকার জন্য তাদের শ্রমকে বুর্জোয়াদের কাছে মজুরির বিনিময়ে বিক্রি করতে হয়।
মার্কসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, এটি আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের একটি প্রধান এবং বৃহত্তম শ্রেণী। শ্রমিক শ্রেণী প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারে কিভাবে তাদের ঠকানো হচ্ছে। মালিক শ্রেণীকে কেন শোষক বলা হয়? মালিক শ্রমিক সম্পর্ক যে বৈরিতা চিরন্তনী এ বিষয়ে শ্রমিকের চেতনা পরিষ্কার।মার্কসবাদীদের মতে, এই শ্রেণীর মধ্যে একটি বিপ্লবী চেতনা নিশ্চিতভাবে গড়ে উঠবে যা বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করে শ্রমিকরাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে। বিপ্লবের আতঙ্কে শাসকশ্রেণী কাঁপুক। শৃঙ্খল ছাড়া প্রোলেতরিয়েতের হারাবার কিছুই নেই, জয় করার জন্য আছে সমস্ত দুনিয়া। দুনিয়ার মজদুর এক হও।বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
____________________________________________
রিচ পিপুল/অমৃত মাইতি।
এই রিচ পিপুল বা ধনী ব্যক্তিকে আমি বৃহৎ বুর্জোয়া বলি না। এরা বৃহৎ বুর্জোয়ার একটি অংশ। বৃহৎ বুর্জোয়াদের রাষ্ট্র ক্ষমতার উপর প্রভাব থাকে। যে সমস্ত রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনা করে তাদের উপরও এদের প্রভাব এবং প্রতিপত্তি থাকে। রাষ্ট্রকে নিজের মতো পরিচালনা করার কৌশলও এদের মধ্যে আছে। কিভাবে রাষ্ট্রের নীতি বা আইন প্রণয়ণ করলে বুর্জোয়াদের সুবিধা হবে সেই সমস্ত চিন্তা রাষ্ট্র নায়কদের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয় বৃহৎ বুর্জোয়ারা। নির্বাচন বিধিব্যবস্থা এবং এডমিনিস্ট্রেশন সম্পর্কে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে থাকে বৃহৎ বুর্জোয়ারাই। এরা রাষ্ট্রে খুবই পাওয়ারফুল কারণ এদের পয়সায় দক্ষিণপন্থীরা নির্বাচন চালায়। কিন্তু রিচ পিপুল বা ধনী ব্যক্তিরা রাষ্ট্রকে পরিচালনার বা রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করার মত অবস্থায় থাকে না। কারখানা শ্রমিক শোষণ সবই এদের সিস্টেমের মধ্যে আছে।
"রিচ পিপুল" বা ধনী ব্যক্তিরা মূলত তাদের আর্থিক সম্পদ, ব্যক্তিগত অভ্যাস এবং চিন্তাভাবনার জন্য পরিচিত। তাদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তারা অর্থকে শুধু একটি পণ্য হিসেবে না দেখে আরও অর্থ উপার্জনের একটি 'চুম্বক' হিসেবে দেখে, তারা নিজেদের পছন্দ এবং সিদ্ধান্তের জন্য দায়বদ্ধতা নেন, এবং তারা সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য একটি সঠিক মানসিকতা গড়ে তোলেন। সাধারণত, ধনী ব্যক্তিরা নিজেদের সম্পদ প্রদর্শন না করে বরং আর্থিক স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দেন ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের উপর মনোযোগ দেন। ধনী লোকেরা খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কিছু নিজেদের সম্মান রক্ষা করার জন্য কিছু বিনিয়োগ করে। এরা আদানি আম্বানি টাটা কোম্পানির মত বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণীতে পড়ে না। এদের বৈশিষ্ট্য হলো অর্থকে চুম্বক হিসেবে দেখা। অর্থাৎ আরও বিনিয়োগ আরও অর্থ সংগ্রহ এদের বৈশিষ্ট্য। এরা আরও অর্থ সংগ্রহের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সন্ধান করেন এবং সুযোগগুলোকেই ব্যবসার কাজে লাগায়। তাদের জীবনযাপনের ব্যয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের আয়ের তুলনায় কম থাকে। তারা শুধু ভোগবিলাসের জন্য খরচ না করে, সেই অর্থকে বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেন। তারা প্রায়শই নিজস্ব ব্যবসা বা অন্যান্য বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ তৈরি করেন। তাদের অনেকে বাহ্যিকভাবে চাকচিক্যপূর্ণ জীবনযাপন করেন না; বরং তারা আর্থিক স্বাধীনতা এবং মানসিক শান্তিকে বেশি মূল্য দেন। তাদের বিলাসবহুল গাড়ি বা বড় বাড়ি থাকা মানেই তারা ধনী, এমনটি নয়; অনেক সময় এই ধরনের প্রদর্শনী ঋণের উপর ভিত্তি করে হয়। তাদের জীবনের একটি বড় লক্ষ্য থাকে সময় ও স্বাধীনতার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা।
মনে রাখার বিষয় হল, প্রকৃত ধনী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদ প্রদর্শনের জন্য ব্যতিব্যস্ত থাকেন না; তারা এটিকে একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। কারো বাহ্যিক জিনিসপত্র দেখে তার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বিচার করা উচিত নয়, কারণ অনেক সময় এটি ঋণের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে, বাহ্যিক প্রদর্শনের চেয়ে নিজস্ব বিনিয়োগ এবং সঠিক মানসিকতা গড়ে তোলা বেশি জরুরি। বৃহৎ বুর্জোয়ারা আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যবসা-বাণিজ্য করে। রিচ পিপুলদের রেঞ্জ অতটা নয়।
_____________________________________________
শ্রম এবং পুঁজি/অমৃত মাইতি
পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোতে উৎপাদনের অন্যতম শর্ত হলো শ্রমিকের শ্রম, ঘাম এবং রক্ত। শ্রমিকের শ্রম ছাড়া উৎপাদন হবে না। জমি মূলধন এবং সংগঠন থাকলেই উৎপাদন হবে না যদি না শ্রমিকের শ্রম লাগানো যায়। সংগঠকের মূলধনও আকাশ থেকে পড়ে না সেও এই সমাজ কাঠামো থেকে সংগৃহীত হয়। ধরা যাক একটি কাপড়ের কল। সুতা থাকবে যন্ত্রপাতি থাকবে ইলেকট্রিক থাকবে ম্যানেজমেন্ট থাকবে। কিন্তু উৎপাদন হবে না। শ্রমিকের হাত লাগলে পরে উৎপাদন হবে। উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রী বাজারে বিক্রি করে মালিক শ্রেণী মুনাফা লুট করে। উৎপাদন খরচ বাজারদর থেকে বিয়োগ করলে যা থাকে সেটাই মালিকের মুনাফা। এই মুনাফার অংশ কিন্তু শ্রমিক পায় না। এই মুনাফা বাড়তে বাড়তে বৃহৎ পুঁজির আকার ধারণ করে। এই বৃহৎ পুঁজির মালিককে পুঁজিপতি বলা হয়। পুঁজির ক্ষুধা বিশ্বগ্রাসি। পুঁজি বাড়তে বাড়তে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ দখল করে। ভ্লাদিমির লেনিনের মতে, সাম্রাজ্যবাদ হল পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর, যা ১৯১৬ সালে তার লেখা "সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়" বইটিতে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুসারে, পুঁজিবাদ একটি বিশ্বব্যাপী আর্থিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়, যেখানে শিল্পোন্নত দেশগুলি তাদের উপনিবেশে পুঁজি রপ্তানি করে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ও শ্রমকে শোষণ করে। এই পর্যায়ে মুক্ত প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যায় এবং একচেটিয়া বা মনোপলি ব্যবসা প্রাধান্য পায়, যা আর্থিক পুঁজি ও শিল্প পুঁজির সংমিশ্রণের মাধ্যমে এক প্রভাবশালী আর্থিক গোষ্ঠীর জন্ম দেয়। লেনিন উল্লেখ করেছেন যে পুঁজিবাদের স্বাভাবিক বিকাশে প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত একচেটিয়া বা মনোপলি ব্যবস্থার জন্ম দেয়, যেখানে অল্প কিছু বড় সংস্থা পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এই পর্যায়ে শিল্প পুঁজির সাথে ব্যাংকের পুঁজির মিশ্রণ ঘটে, যা 'আর্থিক পুঁজি' তৈরি করে। এই আর্থিক পুঁজিই সাম্রাজ্যবাদের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। উন্নত দেশগুলি তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি অন্য দেশে রপ্তানি করে, যা পণ্য রপ্তানির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।আন্তর্জাতিক মনোপলি গোষ্ঠীগুলো বিশ্বকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে নেয়, যা বিশ্বকে অর্থনৈতিকভাবে বিভক্ত করে। এই অবস্থা বিশ্বজুড়ে শোষণ ও বৈষম্য বাড়ায় এবং এটিই বিপ্লবী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে বলে লেনিন মনে করেন।
শ্রম এবং পুঁজির লড়াই হল শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যা মূলত মজুরি, কাজের পরিবেশ, ও অধিকার নিয়ে ঘটে। এই লড়াইয়ে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি, উন্নত কাজের পরিবেশ এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে, অন্যদিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রায়শই শ্রমের শোষণ এবং মুনাফা বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের শোষণ করে থাকে। এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের শ্রমকে ব্যবহার করে অতিরিক্ত মূল্য তৈরি করা এবং তা নিজেদের কুক্ষিগত করা।
শ্রম ও পুঁজির লড়াইয়ের মূলে রয়েছে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে ক্ষমতার অসমতা, যেখানে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের শোষণ করে তাদের শ্রমের অতিরিক্ত মূল্য নিজেদের জন্য রেখে দেয়। তাই শ্রমিকরা নিজেদের জীবনধারণের জন্য এবং মর্যাদার সাথে বাঁচার জন্য ন্যায্য মজুরি এবং অন্যান্য অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে থাকে, যা প্রায়শই মালিকপক্ষ দ্বারা উপেক্ষিত হয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনেক সময় মুনাফা বাড়ানোর জন্য শ্রম আইন শিথিল করে এবং শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করে, যা শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
মার্কসীয় অর্থনীতি অনুসারে, শ্রমিকরা যে পরিমাণ শ্রমের বিনিময়ে মজুরি পায়, তার চেয়ে বেশি কাজ করে থাকে। এই অতিরিক্ত কাজ থেকে যে অতিরিক্ত মূল্য তৈরি হয়, তা 'উদ্বৃত্ত শ্রম' হিসেবে শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ না দিয়ে মালিকপক্ষ শোষণ করে।শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন সময় আন্দোলন ও ধর্মঘট করে থাকে এবং শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানায়, যা পুুঁজিবাদের শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ।অনেক সময় এই লড়াইকে 'মজুরি দাসত্ব' (wage slavery ) হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেখানে শ্রমিকরা তাদের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয় এবং এর ফলে তারা পুঁজি সম্পর্কের অধীনে থাকে, যা থেকে মুক্তি পেতে হলে পুরো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উৎখাত করা প্রয়োজন। যতদিন না পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ধ্বংস হয় ততদিন সম্পূর্ণ লড়াই চলতে থাকবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে পুঁজিবাদ ধ্বংসের বীজ।
_______________________________________
সাফল্যের চাবিকাঠি/অমৃত মাইতি
আমি সময়কে খুব ভালোবাসি। সময়ের কাজ সময় করে চলে। আমার দায়িত্ব নির্ধারিত সময়ে জীবনের কাছে পৌঁছে যাওয়া। সময় আমার কাছে যেন মূলধন। যারা সময়টাকে মূলধন মনে করে তাদের জীবনে সংকট দেখা দিবে না। যে কোনো কাজের সাফল্যের পিছনে সময় খুবই মূল্যবান একটি সূচক। কেউ যদি সময়কে মূল্যবান মনে করে তাহলে আমি তার সাথে অনেকটা বেশি সময় দিতে পারি। আমার জন্য যে একটু সময় দেয় আমি প্রয়োজনে তাকে ১০গুণ বেশি সময় দিতে পারি। কারণ সময় আমাদেরকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। মনের সঙ্গে সময়ের গতির একটা মিল আছে। যখন আমি কোথাও যাই তখন যদি নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে যাই তখন মনে আনন্দ পাব এই ভেবে, আমি সময়ে শুরু করতে পারছি নিশ্চয়ই সময়ে শেষ করতে পারবো। সময়ের সাথে যাতে মনের মধ্যে একটা গতি তৈরি হয় এবং উৎসাহ পাওয়া যায়। একে বলে সময়ের অনুগামী হওয়া অর্থাৎ সময়ানুবর্তিতা। কারণ আমি লেট কামার নই। আর পাঁচজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি ঠিক সময় পৌঁছানোর জন্য। নির্ধারিত সময় পৌঁছে যাওয়া যুদ্ধ জয়ের অর্ধেকটাই হয়ে যায়। আমি চিরকালই সময় মতো পৌঁছেছি সর্বত্র। মিটিং মিছিলে হোক বা অন্য যেকোনো প্রোগ্রামে হোক আমি সময় মতো পৌঁছাতে না পারলে মনে হয় আমি পিছিয়ে গেলাম। তাই সময়কে মূল্য দিয়ে আমি সব সময় সময়ের সাথে সাথে চলার চেষ্টা করি। সময়ের সাথে সাথে চলতে না পারলে নিজেকে একজন পিছিয়ে পড়ার লোক হিসাবে নিজেকে নিজেই তাচ্ছিল্য করি।। নিজের দাম কমিয়ে দিই। কম নম্বর পাওয়া লোক হয়ে যাই আমি। কে দেবে আমাকে দাম!
সময়ের মূল্য বলতে বোঝায় সময়ের গুরুত্ব এবং সেই সময়ের সঠিক ব্যবহার। সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে করতে আমাদের আই কিউ বাড়িয়ে দেয়। জীবনের একটি মূল্যবান অভ্যাস সময়কে ব্যবহার করা। আমাদের জীবনে সফলতা, অর্থ ও উদ্দেশ্য পূরণের জন্য অপরিহার্য। এটি একটি অমূল্য এবং অপরিবর্তনীয় সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। সময়ের মূল্য উপলব্ধি করা এবং একে সঠিকভাবে ব্যবহার করা একটি সুস্থ ও পরিপূর্ণ জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সময় একটি অমূল্য সম্পদ, যার তুলনায় অর্থ বা বস্তুগত সম্পদ কম গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থ এবং বস্তুগত সম্পদ অর্জন করা গেলেও, সময় একবার চলে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না।সময়ের সঠিক মূল্যায়ন এবং ব্যবহার জীবনের সফলতা অর্জনে সাহায্য করে। সময় সাফল্যের চাবিকাঠি। সময়ের গুরুত্ব বোঝা সুস্থ, সফল এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য।অর্থনীতিতে, সময়ের মূল্যকে প্রায়শই অর্থের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। যেমন, সময়ের অপচয় বা সাশ্রয়ের জন্য মানুষ কতটা অর্থ দিতে বা নিতে ইচ্ছুক, তা এর মাধ্যমে বোঝা যায়। আপনার বার্ষিক আয়কে আপনার কাজের মোট ঘণ্টায় ভাগ করে আপনার প্রতি ঘণ্টার একটি আর্থিক মূল্য বের করা যেতে পারে।
সময় শিক্ষার্থীদের সাফল্যকে চালিত করে। সময়ের ঘড়ি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সর্বত্র ঘড়ি ব্যবহার করা হয়। সময় দেখে চলতে হয়। হাত ঘড়ি তার প্রমাণ। রেল স্টেশনে ঘড়ি থাকে। এয়ারপোর্টে ঘড়ি থাকে। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতে ঘড়ি থাকে। সময়ের মূল্যের কারণেই আপনাকে সবসময় ঘড়ি দেখতে হয়। সময়ের প্রতি মায়া থাকে বলেই জীবনের প্রতি মায়া বাড়ে। সময় দেখে আমরা ঘুম থেকে উঠি। তারপর কাজে যাই। আবার সময় দেখে ঘুমোতে যাই। অপরিসীম এই সময়ের মূল্য। সময়মত খাওয়া এবং বিশ্রাম নিয়ে যারা এই অভ্যাসটিকে জীবনের শুরু থেকে করতে পারেন তারা সময়ের শিক্ষক।
একজন ভ্রমণকারীর কাছে সময়ের দাম অপরিসীম। আমি একবার বাবাকে নিয়ে সাউথ ইন্ডিয়া গিয়েছিলাম। পয়সা এবং সময় বাঁচানোর জন্য কোথাও রাত্রি বাস করিনি। হিসেব করে যে সমস্ত পরিবহনগুলো নাইট সার্ভিস দিয়ে থাকে , টাইম টেবিল হিসেব করে সেভাবেই টিকিট কেটেছিলাম। আমাদের হোটেল খরচটা বেঁচে গিয়েছিল। বাবার সঙ্গে যাওয়ার সুবিধা ছিল দুটো টিকিট ফাস্ট ক্লাসে বিনা পয়সায় পাওয়া। ২৪ ঘন্টাকে আমরা তিন দিয়ে ভাগ করি। সকাল থেকে ঘুমোনো পর্যন্ত কি কাজ করব এই হিসাবটাই আমি আমার জীবনে মেনে চলেছি।
_____________________________________________
হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রনা/অমৃত মাইতি
"যন্ত্রণা হলো যা হারিয়ে গেছে, সেই কারণ। মনে হয় যেন সব চলে গেছে। একেবারে নিঃস্ব করে দিয়ে হয় চলে গেছে নাহয় হারিয়ে গেছে। কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আমাকে অসহায় করে দিয়ে গেছে, অমূল্য সম্পদ যা কোনদিন আর ফিরে আসবেনা। শুধু একবারই এসেছিল, ধরে রাখতে পারিনি। এই ব্যর্থতার কারণেই ভয়ংকর যন্ত্রণা অনুভব করি। বুকে মোচড় দিয়ে যন্ত্রণা হয়। যন্ত্রণা কাউকে বোঝানো যায় না। প্রকাশ করাও যায় না। বুকের মধ্যে চেপে রেখে সেই যন্ত্রণা অনুভব করতে হয়। হারানো প্রাপ্তি হবে না ঠিকই কিন্তু শ্রদ্ধা বোধ তৈরি হয়।
যন্ত্রণা আসলে হারানো জিনিসের বেদনা এবং সেই শূন্যতার অনুভূতিকে প্রকাশ করে। এটি একটি গভীর দার্শনিক ধারণা, যার অর্থ হলো যা কিছু মূল্যবান জিনিস (বস্তু বা সম্পর্ক) আমরা হারিয়ে ফেলি, তার অভাবজনিত কষ্টই হলো আসল যন্ত্রণা। যেমন যে মানুষ বা সম্পর্ক জীবনের অংশ ছিল, তা হারিয়ে গেলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। যা কিছু আমরা চেয়েছিলাম কিন্তু পাইনি, বা যা কিছু আমরা হারিয়েছি, তার জন্য যে হাহাকার, সেটাও যন্ত্রণার উৎস। যাকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকা, যাকে মনের সর্বস্ব দিয়ে বেঁচে থাকা হয়, তার কাছ থেকে সামান্য প্রত্যাঘাত যে যন্ত্রনা দেয় তা মৃত্যুর সমান। অমূল্য জীবন মূল্যহীন হয়ে যায়। যে যন্ত্রণার পরে মনে হয় বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না।
জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে স্মরণ করি। যা কিছু মরে গেছে বা হারিয়ে গেছে তার জন্য শোক এবং বর্তমানের শূন্যতা উভয়ই যন্ত্রণার কারণ হতে পারে।
এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে, অনেক সময় আমরা চেষ্টা করি হারানো জিনিস ফিরে পেতে। কারণ, যে জিনিস হারিয়ে গেছে, তার শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা করাটাই এক ধরনের যন্ত্রণার মুক্তি।
জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতায়-- "যে-নক্ষত্র ম'রে যায়, তাহার বুকের শীত লাগিতেছে আমার শরীরে— যেই তারা জেগে আছে, তার দিকে ফিরে তুমি আছো জেগে— যে-আকাশ জ্বলিতেছে, তার মতো মনের আবেগে জেগে " -- প্রয়োজন হয় যন্ত্রকে লালন করার, যন্ত্রণাকে হারালে সময়কেও হারাতে হয়।
যা হারালে জীবনে আর কোনদিন মৃত্যু পর্যন্ত ফিরে পাওয়া যায় না তা হল মানুষ। সেই হারানোর যন্ত্রণা আজীবন দুষ্ট ক্ষতের মত বুকে জেগে থাকে। দিনের আলোর মধ্যে যেমন নক্ষত্র ডুবে থাকে ঠিক তেমনি সারাদিনের কাজের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া মানুষটির অস্তিত্ব মনে পড়েনা। দিনের শেষে গোধুলি আসে সেও ধীরপায়ে উপস্থিত হয়। তাকে হারানো যেন পাপ। তাকে হারানো যেন অপরাধ। তাই সে জেগে থাকে যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য। প্রতি মুহূর্তে তাকেই উপলব্ধি করতে হয়। এর নাম যন্ত্রনা। যাকে নিয়ে যন্ত্রণা তাকে শেয়ার করা যায় না। সে এক অব্যক্ত বিষয়, কাউকে বোঝানো যায় না বলা যায় না। শুধু নিজেকেই কুরে কুরে খায় সে যন্ত্রণা। যন্ত্রণার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে যন্ত্রণার অনুভূতি। তখন বোঝা যায় এই যন্ত্রণার সুখ কত।
____________________________________________
পবিত্র পিপাসা /অমৃত মাইতি
দিঘির পাড়ে বসে থাকে পথিক, মনে তার পবিত্র পিপাসা। তৃষ্ণার্ত পথিকের একমাত্র চাহিদা পিপাসা নিবারণের জল। তৃষ্ণার মধ্যে পথিকের পবিত্রতা আছে। পৃথিবীতে কয়েকশো কোটি মানুষ আছে। অনেকেই চাহিদার মধ্যে থাকে পবিত্রতা। প্রতিটি মানুষের চাহিদা কিন্তু এক নয়। সবচাইতে সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের চাহিদা একেবারেই সামান্য ডাল ভাত। এই চাহিদা পূরণ তার সাধ্যের মধ্যে। এর চাইতে বেশি কিছু চাহিদা তার মনে আসে না তার কারণ তার চাহিদা সীমিত, তার বেশি সম্ভব নয় বলে। এটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের একমাত্র পবিত্র চাহিদা।
" পবিত্র পিপাসা" একটি আলঙ্কারিক বা কাব্যিক উক্তি, যার দুটি অর্থ হতে পারে: প্রথমত, মানুষের মৌলিক চাহিদা, যেমন জল বা খাদ্য, যা শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে, তা একটি "পবিত্র" বা অপরিহার্য বিষয়। দ্বিতীয় বিষয়, আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা। এ বিষয়টি আমার বিশ্বাস নাই তাই আমি আলোচনা করব না। আমি অকপটে স্বীকার করলাম।
আমাদের মধ্যে একটি মৌলিক চাহিদা আছে। যেমন জল পান করা বা খাবার খাওয়া, যা জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য, এই অর্থে "পবিত্র পিপাসা" জীবনের এক মৌলিক প্রয়োজনকে বোঝায়। বস্তুজগতের বাস্তবতায় পাড়ি দেওয়া মানুষের এক পবিত্র পিপাসা যেখানে তিনি এক নির্মল পরিবেশে বেঁচে থাকতে চান, জীবন যাপন করতে চান। এটি তার কাছে এক নির্মল পিপাসা। এই চাহিদার কাছে তিনি নিজে বাধা পড়তে চান। একেবারে কলুষমুক্ত চাহিদা। অনন্ত আকাশের নিচে দুটি ডানায় ভর দিয়ে পাখির বিচরণের মতোই।
পৃথিবীর খাদ্য ভান্ডারে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার আছে। তাই খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্পূর্ণ পবিত্রতা আছে। এই চাহিদা ডাল ভাত হতে পারে মাছ ভাত হতে পারে মাংস ভাত হতে পারে যে কোন খাবার হতে পারে। কারণ খাদ্য ভান্ডার কোন ব্যক্তির নয়, সমষ্টির। একজন পিপাসার্ত ব্যক্তির যতটুকু জলের প্রয়োজন হয় ততটুকুই সে পান করে তার বেশি নয়। এই জন্য পিপাসা সবসময় পবিত্র। একজন ব্যক্তির জীবনধারণের জন্য শরীরের পুষ্টির জন্য যেটুকু খাদ্য গ্রহণের প্রয়োজন হয় সেটুকুই তার কাছে যথেষ্ট, তার বেশি তার চাহিদা নেই।। এ কারণে খাদ্য গ্রহণের মধ্যে একটা পবিত্রতা আছে। তার বাইরে কোন প্রয়োজন থাকে না। অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের জন্য যদি কিছু থাকে তা লোভ। মানুষের জীবনে পবিত্র পিপাসা তাই একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা আবশ্যক। একটি মানুষের মাথার উপর একটি ছাদ থাকার দরকার। বিশ্রামের জন্য একটি বিছানা থাকা দরকার। তার বেশি চাহিদা হলো লোভ। কিন্তু মাথা উঁচু করে চলা বা শিক্ষা গ্রহণ কখনোই লোভের মধ্যে পড়ে না। এইসব পূরণ হয়ে গেলে কোন মানুষের আর অতৃপ্তি থাকে না।
এমন একটি অনুভূতি প্রকাশ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে যেখানে কোনো কিছু এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাওয়া যায় না। দু'রকম হতে পারে। একই প্রয়োজনীয় চাহিদার মধ্যে আকাঙ্ক্ষা থাকে যা না পূরণ হওয়া পর্যন্ত অশান্তির মধ্যে থাকতে হয়। আবার অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ না হলেও অশান্তির মধ্যে থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় চাহিদাটুকু হল লোভ। যা না হলেও চলে। এর মধ্যে পবিত্রতা নেই। একটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। খাদ্যে আমাদের লবন দরকার হয়। না হলে রুচি হয় না। তাই বলে আমরা কেউ অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করি না।
_____________________________________________
এক নব্য শ্রেণীর উদ্ভব/অমৃত মাইতি
যুগে যুগে শাসক ও শোষিতের কিংবা ধনী-দরিদ্রের মাঝে একটা শ্রেণী বা সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। এরা শাসকগোষ্ঠীর পাশে থেকে প্রভুত ক্ষমতা ভোগ করে। বর্তমান সময়ে এমএলএ, এমপি পৌরসভা পঞ্চায়েত দপ্তরগুলিতে যারা কাজ করে এবং প্রতিনিধিত্ব করে তারা শাসকগোষ্ঠীর অধীনে থেকে প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হয়ে ওঠে। এদের ব্যাংক ব্যালেন্স আর সাইড বিজনেস বাড়তে থাকে। নির্বাচিত হওয়ার আগে এদের যা টাকা থাকে তারপর দ্রুতগতিতে কীভাবে সে টাকা বাড়তে থাকে ব্যাংকে। এইসব খবরাখবর সমাজ মাধ্যমে আমরা পেয়ে থাকি। এদেরকে আমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নব্য শ্রেনীর উদ্ভব মনে করি। এক সময় আভিজাত্য শ্রেণী বা এলিট সম্প্রদায় যে ধরনের ক্ষমতা ভোগ করতো, জনগণের উপর প্রভাব বিস্তার করতো এই নব্য উঠতি শ্রেণীও তদনরূপ স্ট্যাটাস ভোগ করে। এই নব্য উঠতি শ্রেণীর সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখা দেয়। এইসব দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সমীহ সবরকম তৈরি হয়। এই উঠতি নব্য শ্রেণীর সঙ্গে ছোট বড় ঠিকাদাররাও যুক্ত হয়ে পড়ে। এরাই ভোট ব্যাংক শাসকগোষ্ঠীর। কেবলমাত্র এই রাজ্যে এই চিত্র দেখা যায় তা নয়। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে এই চিত্র দেখা যায়। এরা উৎসব অনুষ্ঠান গুলিতে দুহাত ভরে অর্থ সাহায্য করে। উৎসব অনুষ্ঠানে কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করে। অর্থাৎ এই উঠতি শ্রেণী সাধারণ মানুষের উপর এমন ভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে কোন কাজকর্মে খেলাধুলা উৎসব অনুষ্ঠানের সর্বত্রই তারা বিচরণ করে।
এরা মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এদের হাতে থাকে সাম্প্রদায়িকতার বীজ। মানুষের ঐক্যকে ধ্বংস করে। জাতপাতের লড়াইয়ের দিকে মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। খাদ্যের লড়াই কে গুরুত্বহীন করে দেয়।
ধর্মীয় চর্চা আলোচনা প্রকটরুপে দেখা দেয়। সমাজ মাধ্যমগুলিও সহযোগিতা করে। কুসংস্কার অন্ধ বিশ্বাস সমাজ জীবনকে গ্রাস করে। এই কাজে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে নব্য উঠতি শ্রেণী।
আমরা যারা শ্রেণী সংগ্রামে বিশ্বাস করি, আমরা যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, আমাদেরকেই এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে। এবং বিকল্প কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
____________________________________________
অভিজাত সম্প্রদায় /অমৃত মাইতি
সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসে অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। আর্থিক বিচারেও শ্রেণীবিভাজন লক্ষ্য করা যায়। সামন্ততন্ত্রেও বিভিন্ন ধরনের সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করা গেছে। আবার পুঁজিতন্ত্রেও দেখা গেছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্ভব। আর্থিক বিচারে উচ্চশ্রেণী মধ্য শ্রেণি নিম্ন শ্রেণী ও সর্বহারা শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছে। জীবন ধারণের ক্ষেত্রে, জীবন যাপনের ক্ষেত্রেও চিন্তাধারার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। অভিজাত শ্রেণীর শ্রমের সঙ্গে সম্পর্ক নাই। এরা চিরকালই ভোগী। ত্যাগী নয়। এরা এদের মত করে যান্ত্রিকভাবে সংস্কৃতি তৈরি করে এবং মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। বিনোদনমূলক সংস্কৃতির দ্বারা মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে। মোহগ্রস্ত করে রাখে। এদের সংস্কৃতিতে চমক থাকে তাই আকৃষ্ট হয় সাধারণ মানুষ এবং যুব সমাজ । অভিজাত বলতে সমাজের উচ্চবিত্ত একটি বিশেষ সুবিধাভোগী অংশকে বোঝায়, যারা সাধারণত উত্তরাধিকার সূত্রে পদমর্যাদা, সম্পদ বা বিশেষ সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হয়। এই শ্রেণীটি বংশানুক্রমিকভাবে নির্ধারিত হতে পারে, যেমন রাজকীয় বংশ বা উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, অথবা সম্পদ, শিক্ষা বা সামাজিক সংযোগের মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে।তারা প্রায়শই সমাজে প্রভাবশালীর ভূমিকা পালন করে এবং একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বা জীবনধারার প্রতিনিধিত্ব করে।
শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাসে এই অভিজাত সম্প্রদায় ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে। অন্তত পশ্চিমবাংলায় এদের প্রভাব দেখা যায় না। পশ্চিমবাংলায় সংগ্রাম তীব্র আকার ধারণ করেছে যার ফলশ্রুতি হিসেবে অভিজাত শ্রেণীর ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে। এদের অস্তিত্ব নিয়ে কেউ তেমন করে ভাবেনি। দেশের যে সমস্ত অংশে শ্রেণী সংগ্রাম জোরদার নয় সেইসব জায়গায় অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রভাব এখনো আছে। অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পদ এবং সামাজিক প্রভাব ধরে রাখার জন্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন রয়েছে। এদের যেমন সম্পদ আছে ঠিক তেমনি সমাজের বুকে নিজের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সাংস্কৃতিক বিকাশকেও গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে, অভিজাত শ্রেণী উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত উপাধি এবং পদমর্যাদার অধিকারী হয়, যেমন পূর্বের যুগে রাজকীয় পরিবার বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্যরা। এরা উত্তরাধিকার সূত্রে সাধারণ মানুষের কাছে সমীহের পাত্র হয়ে থাকে। কোন উৎসব অনুষ্ঠানে এদেরকে সম্মাননীয় ব্যক্তি হিসেবে ডাকা হয়। তাদের উচ্চ সামাজিক মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো সম্পদ। তারা প্রায়শই বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়। নিজেদের অস্তিত্বকে রক্ষা করার জন্য বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য দান করে সাধারণ মানুষের কাছে সমীহের পাত্র হয়ে দাঁড়ায়। অভিজাত শ্রেণী সমাজে তাদের প্রভাব এবং ক্ষমতা ধরে রাখে।তারা প্রায়শই সমাজের উচ্চ স্তরে থাকে, শুধুমাত্র রাজা বা রাষ্ট্রপ্রধানের নিচে। কিছু ক্ষেত্রে, অভিজাত শ্রেণীকে শিক্ষাগত যোগ্যতা বা বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতেও সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা "বুদ্ধিজীবী অভিজাত" হিসেবে পরিচিত।
অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভব প্রাচীনকালে শুরু হয়েছিল, যেমন প্রাচীন গ্রীসে প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের সময় থেকে, যেখানে এটিকে 'শ্রেষ্ঠদের দ্বারা শাসন' হিসেবে দেখা হতো। তবে, আধুনিক অর্থে একটি নির্দিষ্ট ভূমি-ভিত্তিক অভিজাত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছিল ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে যখন লর্ড কর্নওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার মাধ্যমে একটি ভূমি অভিজাত শ্রেণী সৃষ্টি করেছিলেন। প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের ধারণায় অভিজাততন্ত্রের প্রাথমিক রূপ দেখা যায়, যেখানে শাসক শ্রেণীকে নৈতিক ও বৌদ্ধিকভাবে উন্নত হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগে বিভিন্ন সমাজে, বিশেষত ইউরোপে, অভিজাত শ্রেণী একটি সামাজিক কাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠে, যেখানে জন্ম এবং উত্তরাধিকারের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা ও ক্ষমতা লাভ হতো। গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার মাধ্যমে একটি নতুন ভূমি-ভিত্তিক অভিজাত শ্রেণী সৃষ্টি করেন, যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত ছিল। বর্তমানে অভিজিতদের সেই ক্ষমতা নেই যা পূর্বে তারা ভোগ করতো। যদিও মানসিকভাবে বংশানুক্রমিকভাবে তারা নিজেদেরকে অভিজাত মনে করে। এদের পোশাক-আশাক চালচলন সাধারণ মানুষের চাইতে একটু অন্যরকম। নজরে পড়ার মতো। কিন্তু সমাজের অগ্রগতির সাথে সাথে এই অভিজাত সম্প্রদায় ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। বুর্জোয়ারা এখন সমস্ত কিছু নিজেদের কুক্ষিগত করে রাখে। তাই অভিজাত শ্রেণীর সমস্ত রকমের ক্ষমতাকে খর্ব করে দিয়ে সমকক্ষ কোন শ্রেণীকে রাখতে চায় না। অভিজাত সম্প্রদায়ের বিলুপ্তির এটি একটি অন্যতম কারণ।
_____________________________________________
লেখক নিজের প্রচারের জন্য লিখেন না/অমৃত মাইতি
আমি প্রতিদিন লিখি। আমার লেখা আসলে প্রতিদিন যা কিছু ঘটছে সমাজে, যা কিছু দেখছি তার প্রতিক্রিয়া। যা কিছু আমার মগজকে আলোড়িত করে, আমি তাই লিখি। এবং এই লেখাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারিত হয়। একটি লেখাও নিজের প্রচারের জন্য লিখি না। এই প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডা সমাজের মানুষের জন্য। আমি যখন লিখি তখন আমার সামনে কেউ থাকে না। কাউকে দেখেও লিখি না। কারুর ভালো লাগবে কিংবা কারুর মন্দ লাগবে, এসব ভেবেও একজন লেখক নিশ্চয়ই লিখেন না। মন যা চায় তাই লিখি। তাই লেখা যেন বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে। নিজের লেখার উপর ভরসা বিশ্বাস থাকলে, নিজের বোধশক্তি সঠিক থাকলে কখনো অন্যের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। যেহেতু আমি যুক্তিবাদী চিন্তায় অভ্যস্ত তাই লেখাতেও যুক্তিসঙ্গত লেখা প্রতিফলিত হয়। এই লেখা যদি পাঠকের মনের মত হয় অথব গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে সেই লেখাটি গুরুত্ব পায় এবং মানুষের প্রয়োজনে লাগে। আমার লেখা সে কারণে মানুষের চেতনা বিস্তারে জন্য। মানুষের চেতনার স্তরটিকে আরো উন্নত করার ক্ষেত্রে একজন লেখক অবশ্যই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে কলম ধরেন। একজন লেখক পাবলিক সাইকোলজি অবশ্যই লেখার সময় মনে রাখেন। লেখার সময় দায়িত্ববোধ এবং এবং পাবলিক সাইকোলজি যেন মাথায় থাকে।
লেখাটি কখন শেষ করতে হবে সে সম্পর্কে পরিষ্কার জ্ঞান থাকা উচিত। লেখার সময় কোথায় থামতে হবে সে সম্পর্কে জ্ঞান থাকা খুবই আবশ্যক। যে বিষয়বস্তু নিয়ে আমরা লিখি সেই লেখা ঠিক ঠিক মতো বোধগম্য হলেই শেষ করে দেওয়া উচিত। পরিস্থিতি এবং প্রতিবাদী মন লেখককে লিখিয়ে নেয়। যে বিষয়ে লিখছি তা বোধগম্য হলেই আর লেখা বাড়িয়ে লাভ নাই। তখন অতিশযোক্তি দোষে দুষ্ট হবে লেখা। লেখার বিষয়বস্তু এবং দৃষ্টিভঙ্গি যদি সঠিক হয় তাহলে সেই বিষয়ে পাঠক কী বলবে, কী বলবে না পাঠক কতটা গ্রহণ করবে কী করবে না তা নিয়ে বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই। সাধারণ পাঠকের চেতনা আরো মজবুত করা আরও নিবিড় করার দায়
তাই লেখকের। কোন কারণে লেখক তার কলম বন্ধ করবেন না। যত লিখবেন তত মনের আর কলমের জোর বাড়তে থাকবে, বাড়তে থাকবে আত্মবিশ্বাস।
_____________________________________________
আমি খুব রাগী মানুষ/অমৃত মাইতি (আলোচনা ১০)
আমি খুব শান্ত মানুষ। কিন্তু খুব রাগী মানুষও বটে।
সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত জীবনে স্বভাবসিদ্ধভাবে আমি শান্ত প্রকৃতির এবং একেবারেই শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমার ভেতরে একটি বদ গুণ আছে। তা হলো রাগী স্বভাব। আমি নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপনে অভ্যস্ত। অতি সাধারণ জীবন যাপন করতে আমি খুব ভালোবাসি। কিন্তু হঠাৎ করে কেউ আমাকে আক্রমণ করে বসলে অথবা কটু কথা বললে আমি কিন্তু ভীষণভাবে রেগে যাই যদিও কিছুতেই তা প্রকাশ করতে পারি নাআমার প্রতি কোন কটুক্তি কেউ করলে আমি ঘাবড়ে যাই ভীরমি খেয়ে যাই। কিছুতেই সহ্য করতে পারি না। আমার মাথা গরম হয়ে যায়। খুব চাপ অনুভব করি এবং অস্বস্তি বোধ করি। কিন্তু কিছুতেই প্রকাশ করতে পারি না। তাৎক্ষণিক কোন বিরোধিতায় জড়িয়ে পড়তে আমার মন চায় না। তাই পরিস্থিতি অনুযায়ী কথা বলি এবং যেটুকু প্রতিবাদ করার প্রয়োজন তাই করি। ভেতরে ভেতরে ভীষণ রাগ অনুভব করি। কিন্তু নিজেকে সংযত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি।
আমার সহ্য করার ক্ষমতা খুব বেশি। আমি ভাবি অন্যের কটুক্তি সহ্য করতে যাব কেন! এই সহ্য শক্তি আমার অন্তর্নিহিত। এই সহ্য শক্তি থাকার ফলে অনেক সময় বড় কোন সংঘর্ষ বা বিপর্যয় হয় না। আমার সম্পর্কে কেউ মিথ্যা কথা বানিয়ে বললে আমি যে কি পরিমাণ রেগে যাই মনে হয় লংকাকান্ড বাঁধিয়ে দিই। কিন্তু পারি না। কারণ সব সময় মাথায় থাকে যে সয় সে রয়। যে না সয় তার নাশ হয়। শুধু এইটুকু মাথায় থাকার জন্য হাজারটা বিপদ হাজারটা প্ররোচনা থাকা সত্ত্বেও আমি মাথা ঠান্ডা রেখে দাঁড়িয়ে আছি। প্রচুর হিংসুটি অশিক্ষিত লোকের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। কিছু স্বভাব চতুর মানুষ যারা নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত নয়, তারা কিন্তু অন্যকে আক্রমণ করে হিংসা করে আনন্দ পায়। উপায় থাকেনা তাই এদের সঙ্গেও থাকি। আবার নিজের মেজাজটাও ঠিক রাখি।
আপনি নিছক ভদ্রলোক সবসময় পাবেন না বন্ধু হিসেবে। আবার শুধুই যে ধূর্ত লোকদের সঙ্গে আপনাকে থাকতে হবে, এমন নয়। কিছু ভদ্রলোক আছেন তারা আপনাকে আক্রমণ না করলেও চতুর লোকেরা তাদের স্বভাব ছাড়বে না। অনেক সময় মনে হয়েছে যেন সাপ নিয়ে শুয়ে আছি। যেদিকে পাশ ফিরবেন সেদিকেই ছোবল খেতে হবে। আমার অভ্যাস হয়ে গেছে এই সমস্ত বিষাক্ত লোকদের সঙ্গে থাকার। এদের সঙ্গে থেকে যতটা পেরেছি শান্ত থেকেছি। আবার এদের সঙ্গে থেকে শিক্ষা পেরেছি বিরক্তি কম প্রকাশ করার। রাগ কম দেখানোর। এক কথায় ব্যালেন্স করে চলা সারা জীবন রপ্ত করেছি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি আজকে যার উপর ভয়ংকর রাগ তৈরি হয়েছিল নিজেকে প্রশমিত করার ফলে একসময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পেরেছি এবং জয় করতে পেরেছি। এমন অভিজ্ঞতা ও আমার আছে। এ যেন ঠিক এক ঘরে পাশাপাশি মাটির কলসি ও পিতল কলসির ঝগড়া বিবাদ। ঠোকাঠুকি লাগলে ভেঙে যাবে। না আমরা তো কেউ ভাঙতে আসিনি। আমরা গড়তে এসেছি। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি যতই সঠিক হোক না কেন ভাঙতে তো বেশি সময় লাগে না। কিন্তু যুগ যুগ ধরে গড়তে সময় লাগে। ভেঙ্গে গেলে আর গড়া যায় না।
মাথায় রাখতে হবে আমি জিততে এসেছি। হেরে যেতে আসিনি। আমি দাঁড়াতে চাই। আপনার সঙ্গী সাথীরা সকলেই আপনার মত হবে তা কি করে সম্ভব। কতজনকে বাদ দিয়ে আপনি চলবেন। কম্বলের চুল বাছতে গিয়ে পুরো কম্বলটাই উধাও হয়ে যাবে। তাই একজন সংগঠক খুবই সতর্কভাবে নিজেকে পরিচালন করবেন। আক্রমণটা ভুলে যাবেন কিন্তু মনে রাখবেন। কেমন করে আক্রমণকারীর সঙ্গে ব্যবহার করবেন তা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত মুন্সিয়ানা। আপনি বারবার আক্রান্ত হবেন, বারবার উঠে দাঁড়িয়ে জয়লাভের চেষ্টা করবেন। এভাবেই নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে উঠুন, অপরকেও শিক্ষা দান করুন। আবার বলবো যে সয় সে রয়। যে না সয় তার নাশ হয়।
____________________________________________
