Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

এপার ওপার/অমৃত মাইতি

এপার ওপার/অমৃত মাইতি 
(১)
ক্রমশ অস্পষ্ট হচ্ছি। কোন মানুষ যদি দূর থেকে আরও দূরে চলে যায় তখন তাকে আর চেনা যায় না। অবয়বটা কিছুটা দৃশ্যমান হয়। ক্রমশ আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়। তারপর একসময় বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না…

 




এপার ওপার/অমৃত মাইতি 


(১)


ক্রমশ অস্পষ্ট হচ্ছি। কোন মানুষ যদি দূর থেকে আরও দূরে চলে যায় তখন তাকে আর চেনা যায় না। অবয়বটা কিছুটা দৃশ্যমান হয়। ক্রমশ আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়। তারপর একসময় বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না। হয়তো বা খোঁজার মতো খুঁজলে পৃথিবীর কোন এক কোণে তাকে পাওয়া যেতেও পারে। আমাদের দৃষ্টির অগোচরে এই পৃথিবীতেই সে থেকে যায়। আমার অন্তর্দৃষ্টিতে সেটাই অনুভব করি। আর সকলের অগোচরে থেকে যাওয়াটাই প্রকৃতপক্ষে থেকে যাওয়া। একটি নৌকো যখন অনেক দূরে পাড়ি দেয় ক্রমশ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে কোথায় হারিয়ে যায়। ঢেউ আর রোদের মিশ্রণে এমন এক আলোকবর্তিকার আবির্ভাব ঘটে এবং যে উজ্জ্বল আলোরকুণ্ডলী তৈরি হয় যেখান থেকে আমাদের দৃষ্টি তাকে উদ্ধার করতে পারে না।আমাদের চোখের আড়ালে হারিয়ে গেলেও মনের মধ্যে একটুও অস্পষ্ট হয় না, থেকে যায়। আমরা তাকিয়ে থাকি, আমাদের কোন আত্মীয় ওই নৌকোতে দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আছে। ঠিক তেমনি এখন শুধু দূরের আহবানে কখন যেতে হবে সেই আকাঙ্ক্ষায় বসে থাকি। দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি তার কূল নাই , কিনারা নাই। ঠিক এমন জল আর জলের শূন্যতার মাঝে আকাশের নীলে গান রচিত হয় "অকূল দরিয়ার মাঝে মাঝি বাইয়া যাও রে"। ভয় নাই, ভীতি নাই শুধু আছে রোমাঞ্চ আর যে কোন দিকে চলে যাওয়ার মত মনের জোর। তার মাঝে যদি কোন নৌকো জলের গভীরে আশ্রয় নেয় তাতে আমাদের জানার কোনো সুযোগ থাকবে না। তেমনি এই বিশাল পৃথিবীতে আমরা কে কখন কোথায় হারিয়ে যাব তার খোঁজ পৃথিবীর রাখার কোন দায় থাকে না। অনেক সময় দুর্মূল্য কোন কিছু হারিয়ে গেলে যদি তা খুব প্রয়োজনীয় হয় তাহলে খোঁজ করে দেখার রেওয়াজ  আছে বলেই খোঁজা হয়। না হলে ব্যস্ত এই পৃথিবীতে কে কার খোঁজ রাখে। 


কবিগুরুর বিখ্যাত গানটি বারবার খুব মনে পড়ে।  ---"দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া 

ভূলালো রে ভুলালো মোর প্রাণ।

ওই পারেতে সোনার কূলে আঁধার মূলে কোন মায়া 

দিয়ে গেল কাজ ভাঙানো গান 

নামিয়ে মুখ চুকিয়ে সুখ যাওয়ার বেলায় যায় যারা 

ফেরার পথে ফিরেও নাহি চায় 

তাদের পানে ভাটার টানে যাবে রে আজ ঘর ছাড়া 

সন্ধ্যা আসে দিন যে চলে যায়। 

ওরে আয় 

আমায় নিয়ে যাবি কে রে 

দিন শেষের শেষ খেয়ায়।

দিনের আলো যার ফুরালো ,সাঁঝের আলো জ্বললনা 

সে বসেছে ঘাটের কিনারায় 

আমায় নিয়ে যাবি কে রে দিন শেষের শেষ খেয়ায়--।"


মন চায় সারাক্ষণ এমন একটা হাতছানি। শুধু টেনে নিয়ে যাক দূরে শুধু দূরে। যে দূর কখনো নিকট হয় না। দূরের দিশা শুধু দূর। দূরের পরে আরো দূর থাকে নিকটের সঙ্গে তার আর কোন সম্পর্ক থাকে নাড় ছিঁড়ে যায়।‌ আর কোন বাঁধন থাকে না।


পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত  সম্পর্ক যখন ছিন্ন করতে ইচ্ছে করে, ও আমাকে আর চায় না তেমনি আমারও পৃথিবীর কাছে কিছু চাওয়ার নাই, চলে গেলেই ভালো। আজকাল কবিগুরুর এই গানটি বারবার নিজের মনে গেয়ে উঠি। নিশ্চিন্তে ঘুমোবার সময় পাবো অগাধ। আসলে একটা মুহূর্ত আমার অন্তর থেকেই ওপারের ডাকে চলে যেতে অনন্ত ইচ্ছা জাগে। একটা দায়বদ্ধতা  অস্বীকার করতে পারি না তবুও--।


যা পাওয়ার কথা ছিল না, তাও পেয়েছি। এর বেশি পাওয়ার আর কিছু নাই। একটা মায়া একট লোভ, ঘর সংসার । এখান এক অক্ষম ব্যক্তির মত পড়ে থাকার কোন মানে হয় না। নিজের কোন ক্ষমতা নাই, অন্যের দয়ায় বেঁচে থাকতে কে চায় বলো। আত্মমর্যাদায় বাধে। কিন্তু যাব বললেই যাওয়া হয় না, পথ খুঁজে পাই না। যাব বললেই যাওয়া যাবে এমন কোনো সুন্দর পথ পৃথিবীতে নাই। যে কোন একদিন ভোরে বেরিয়ে পৌছে গেলাম ওপারে। ওপারেতেই সুখের হাতছানি। কতদিন ভেবেছি বাউল হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াই। তবু যেন একটা মায়া, পিছুটান অনুভব করি। সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে দেখেছি বাউল এর জীবনেও একটা পিছুটান আছে। ব্যক্তিগত চাহিদা না থাকলেও পৃথিবীতে থাকার একটা আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে থাকে। সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে মন যেতে নাহি চায়। নিবিড় এক মাটির টান।


এই পারেতে যারা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা বড্ড বিকৃতরুচি এবং কুৎসিত মস্তিষ্কের লোক। শুধু নিজেকেই দেখে তারা। তাদের সঙ্গে থাকা যায় না। তাই কবিগুরুর গান বারবার মনে পড়ে। আমি যে এত কাজ করেছি, কেউ মনে রাখবে না।। রাজনীতি ও সাহিত্য সংস্কৃতির বাইরে প্রচুর সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি মানুষের জন্য। সবসময় মনে হয়েছে, এর মাটি আমার , এ ঘর আমার, এই পরিবেশ আমার। শিরীশের তলায় বাবলার ছায়ার এই পরিবেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে আমাকে। নিজের বসবাসের মতো করে ধারেপাশে ছড়িয়ে থাকে সুখ শান্তি। বারবার ভেবেছি পরিশ্রমের কোন বিকল্প হয় না। তাইতো জাগে কাজের নেশা। একটা সময় হয়তো সত্যিই মানুষের জীবনে চলে আসে ,যখন অজস্র কাজের মধ্যে ডুবে থাকা মানুষটিও একটু মুক্তির বাতাস চায়। জোরে শ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। হাঁপিয়ে ওঠে, আর পারে না।

এমন মানুষও হঠাৎ করে হোঁচট খেয়ে যায় সামান্যতম অন্যমনস্ক হওয়ার ফলে। তখন মনে হয় না এ মাটি এই পরিবেশ আমার নয়, আমাকে প্রত্যাখ্যান করছে। তখনই কবিগুরুর গান আমার মনে হয়। আকুল হয়ে ডাকতে থাকি - "আমায় নিয়ে যাবি কে রে দিন শেষের শেষ খেয়ায়।"

______________________________________


(২)


নদীর এপার ওপার। এপারে আমরা যারা থাকি আমাদের বিশ্বাস ওপারেই সমস্ত রকম সুখ আছে। তাই ওপারেতে যেতে চাই। আমার বড্ড অসুখী। যা আছে, যা পেয়েছি বা যা দেখেছি তার মধ্যেই যাবতীয় সুখ আছে, এটুকু বুঝতে পারিনা আমরা। আমরা বড্ড স্থূলবুদ্ধি সম্পন্ন। যদি সূক্ষ্মবুদ্ধি সম্পন্ন হতে পারতাম তাহলে বুঝতাম এপার ওপার বলে কিছু নেই। সবই মনের ভ্রান্তি। এ শুধু ওপারের এক অদৃশ্য পরিবেশে সুখ খুঁজে নেওয়ার ভ্রান্ত চেতনা। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাকে কী কোন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল! আমি কী তা সম্পন্ন করতে পেরেছি। নাকি অসম্পূর্ণতা থেকে গেল। আমি নিজেই জানিনা আমার কোন দায়িত্ব ছিল কিনা, সম্পূর্ণ করতে পেরেছি কিনা, আমি বুঝতে পারি না। আমার এখানে ভালো না লাগলে আমি জোর করে থাকবো না। আমি চলে যাব অন্য ঘাটে। ওপারেতে আমার হাতছানি। কবিগুরুর মতো করে বলার সাহস

বা স্পর্ধা আমার নেই।

"যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই-

যা দেখেছি ,যা পেয়েছি ,তুলনা তার নাই। 

এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম হয়ে রাজে 

তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই 

যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেতে চাই।। 


বিশ্বরূপের খেলা ঘরে কতই গেলেম খেলে 

অপরূপকে দেখে গেলেম দুটি নয়ন মেলে।

পরশ যারে যায় না করা সকল দেহে দিলেন ধরা 

এইখানে শেষ করেন যদি শেষ করে দিন তাই-

যাবার বেলা এই কথাটি জানিয়ে জানা যাই -


একটি জীবনে , যা দেওয়ার মানুষকে, সমাজকে, তিনি নিঃস্বার্থভাবে তা দিয়ে আমাদের মনোজগতে আনন্দের তরী ভাসিয়ে দিয়েছেন। তিনিই বলতেই পারেন যা পেয়েছি তার তুলনা নাই। এই বোধ আমাদেরকে কেমন যেন আনমনা করে দেয়। 

এই মনুষ্যজন্ম সত্যি কত মহান হতে পারে সমস্ত রকম লোভ মোহ ত্যাগ যিনি করতে পারেন তিনি প্রকৃত একজন মানুষ । তিনি প্রান্ত জনের সখা।

আমাদের এই জাগতিক যাপনে আমরা যা কিছু করি, পাপ পূণ্য ভালো-মন্দ সবকিছুই কিন্তু এখানেই  চুকিয়ে যেতে হয়। এই গৃহজগতের ওপারে কিছু নেই। এ শুধু আমরা কল্পলোকে বিচরণ করি মাত্র।


এটাই মনোজগতের খেলা। প্রকৃতপক্ষে আমরা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়িড় এই জীবন এবং জগৎ সম্পর্কে আমাদের ধারণা যখন খুব খারাপ হয়ে যায় তখন আমরা অন্য জগত খুঁজে নেওয়ার কথা বলে থাকি। বলি, চলে গেলেই ভালো হয়। কিন্তু মানুষের মৃত্যুর পরে জীবন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তার অন্য কোনো জগতের সন্ধান পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। এই বিজ্ঞান এবং এই চেতনাকে আমি অস্বীকার করি না তবুও আমরা কথায় কথায় বলে থাকি এপার ওপার।


 এই জীবনের পরে আর একটা জগৎ আছে। এটা গল্প লোকের কল্পকাহিনী। তবুও আমরা বলি, এই জগতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং বিশ্বাস রেখেই বলি। কবিগুরু আমাদের চেতনার ঘরকে আলোকিত করে গেছেন। তিনি জীবনে যত পূজা করে গেছেন এই ধরণিতে তা কিন্তু কখনো হারিয়ে যাবে না। 

 

"অসমাপ্ত"কবিতায় সে কথাই তিনি বলে গেছেন, চলমান জীবনে নদী যদি হারিয়ে যায় মরুপথে , নদীর কিন্তু বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায় না। একজন মানুষ জীবনভর তার ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে পথ চলতে চলতে যদি বা অন্যের কাছে ব্যর্থ বিবেচিত হয় । তিনি কিন্তু নিজের কাছে ব্যর্থ নন । তার আত্মবিশ্বাস সে কথা বলে না। তিনি সাধারনের কাছে সবুজ এক দুরন্ত যৌবন। 


প্রমথ চৌধুরী বলেছেন-"সৃষ্টির জন্য মনের যৌবন চাই। পুরাতনকে আঁকড়ে থাকাই বার্ধক্য অর্থাৎ জড়তা। একজন সচেতন মানুষ কিন্তু তার জ্ঞান তার বোধ তার তীক্ষ্ণতা থেকে মনে করেন যে তিনি একা। তার বিচক্ষণতার কাছে তার বিবেচনার কাছে তার জ্ঞানের কাছে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি থাকতে পারে বা নাও থাকতে পারে। সেজন্যই তাকে ভাবতে হবে কবিগুরুর নির্দেশ, - যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে। তাই সৃষ্টিশীল মানুষকে কখনো একা মনে করতে নেই।


মানুষ অসীম ক্ষমতার অধিকারী। বিকারগ্রস্ত মানুষ আমরা, তাই অনেকেই ভুলে যাই "তোমার কীর্তি চেয়ে তুমি মহৎ"। তোমাকে কেউ পিছনে ফেলে দিতে পারে না।


শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখে তার শিল্প। আবার শিল্পের সৃষ্টিকর্তা শিল্পী। তাই সৃষ্টিকর্তাই মহান। শিল্প হল শিল্পীর মস্তিষ্কের সন্তান। আমাদের সমস্ত চিন্তাভাবনার প্রক্রিয়া বা চিন্তার জগত এই দৃশ্যমান পৃথিবীর মধ্যে । এখান থেকে চলে যাব আমরা। এপার ওপার যতই বলি না কেন ওপার কিন্তু কাল্পনিক জগত। তবু ওপারের গল্প, কাল্পনিক জগতকে নিয়ে আমরা একটা সান্ত্বনার রাজত্ব তৈরি করি, একটা স্বপ্নের রাজ্য তৈরি করি। সেখানে থাকতে ভালবাসি। মনোজগতকে নানান রঙে মনের মত করে তৈরি করা যায়। যেমন খুশি তেমন সাজানো যেতে পারে মন জগতে। এখানে বোধহয় সমস্ত সুখের খনি। আর আমরা যারা এই বস্তুজগতে বাস করি যা আমাদের ইচ্ছে খুশি সাজানো যায় না।


তাই এই জগতের বাইরে আমি আমার নিজের মনোজগতকে কল্পনার রঙে রাঙিয়ে একটি স্বপ্নের জগত তৈরি করতে পারি। প্রকৃতপক্ষে কল্পজগতের অর্থাৎ ওপারে আমরা যেতে পারি না। এপার ওপার থেকেই যায়। আমার পাশে একজন পরিচিত মানুষ বসে থাকে যার সাথে আমাদের মনের মিল নেই।দুজনের মাঝখান দিয়ে মনে হয় এক খরস্রোতা নদী বয়ে গেছে। একজন এপারে একজন ওপারে। আমরা মানসিকভাবে এপারে থাকি আর একজন ওপারে থাকে। অনেক সময় আমাদের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও তাই হয় মাঝখানে বয়ে যায় এক অদৃশ্য নদী। তখন একসময় নিবিড় ঘনিষ্ঠতার ফাটল বাড়তে বাড়তে এক বৃহৎ নদীর আকার ধারণ করে। তখন এই পারে আমি আর ওই পারে তুমি মাঝে শুধু জোয়ার ভাটা বয়ে যায়।

___________________________________


 (৩)


"এই কূলে আমি 

আর ওই কূলে তুমি 

মাঝখানে নদী ওই বয়ে চলে যায় 

তবুও তোমার আমি পাই ওগো সাড়া 

মাঝখানে নদী ওই বয়ে চলে যায় 

এই কুলে আমি আর ওই কূলে তুমি

দুটি পাখি দুটি কূলে গান যেন গায়

যুগে যুগে তুমি মোরে বেঁধেছিলে ফুলডোরে 

তাই আজ বসে থাকি আশায় আশায় 

মাঝখানে নদী ওই বয়ে চলে যায়।"


এই কুলে কোন একটি বিরহী পাখি একটি বর্ণহীন গাছের ডালে তাকিয়ে বসে আছে ঐ পারের দিকে। বুকে তার অজস্র জ্বালা। জানি নিরাময় হওয়ার মত নয়। তবু সে বসে আছে এই পারে প্রাণহীন এক গাছের ডালে। কী কথা এতো তার ওপারের অদৃশ্য কোন এক প্রণয়ীর সঙ্গে। কেউ জানে না । সে পাখি নিজেও জানে না। তবু তাদের মন কথা বলে। মনে মনে সাড়া দেয়। নদীর ঢেউয়ের মতো তাদের বুকেও ঢেউ খেলে। একজনের বুকে বিরহ জ্বালা আর একজনের বুকে সন্তানের স্বাদ। তাদের মনের সমস্ত কথা নিয়ে নদী বয়ে যায় মোহনার দিকে। আশায় আশায় বসে থাকে দুই পাখি। প্রণয়ী ফিরবে কখন তার পাশে। আশায় বসে থাকে বিরহিনি। একদিন মুছে যাবে সমস্ত ব্যবধান। কোথাও উবে যাবে ব্যবধান আর নদীর স্রোত।


মনের মিল থাকলে তো ব্যবধান অদৃশ্য হয়ে যায়। আর যদি এই ধোঁয়াশা বাড়তে থাকে তাহলে মাঝে সমুদ্র প্রমাণ দূরত্ব তৈরি হয়। বিভেদের প্রাচীর ভেঙে ফেলতে হয় কাজের প্রয়োজনে।। আমাদের সমাজে দুই শ্রেণীর মানুষ আছে, আছে ব্যবধান। কবিগুরু এই ব্যবধান সরাতে চেয়েছেন। "ঐকতান" কবিতায় তাঁর সেই ব্যথার কথা, অভিমানের কথা সবিনয়ে উল্লেখ করেছেন। তাঁর আবেগ আর মর্মবেদনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। নিম্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে অন্তরের সম্পর্ক গড়ে তুলতে তিনি পারেননি এটাই তাঁর মনোবেদনা।


"অন্তর মিশালে তবে তার অন্তরের পরিচয় 

পাইনে সর্বত্র তার প্রবেশের দ্বার,

বাধা হয়ে আছে, মোর বেড়াগুলি জীবনযাত্রার। 

জীবনে জীবন যোগ করা 

না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।

তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা।--

আমার সুরের অপূর্ণতা। 

আমার কবিতা জানি আমি 

গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী"


প্রচলিত সমাজ কাঠামোতে এক অদৃশ্য ব্যবধান তৈরি করা হয়ে থাকে দুই শ্রেণীর মধ্যে। এই অদৃশ্য ব্যবধানটি শোষণ বঞ্চনার। কবিগুরু এই ব্যবধান তুলে দিতে চান। কিন্তু নিম্নবর্গীয় মানুষের কাছে তিনি যেতে পারেননি, তাদের অন্তরঙ্গ হতে পারেননি। এটা তার বড় অভিমান। বড় বেদনার । তাই তিনি দুপারের মানুষের কবি হয়ে উঠতে চেয়েছেন।


"আমি পৃথিবীর কবি, যেথা তার যত উঠে ধ্বনি 

আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখন-

এইসব সাধনায় পৌঁছিল না বহুদূর ডাক,

রয়ে গেছে ফাঁক।"


তার মনের কথা তিনি গোপন করেননি। আজকের সমাজে মানুষের মানুষের যে বিভাজন, শ্রেণীবৈষম্য হানাহানি খুনোখুনি দেখে মনে পড়ে কবিগুরুর কথা। বঞ্চিতদের জন্য তার যেন অনেক কিছু করার কথা। তিনি পারেননি। যদিও তার অজস্র কবিতায় বঞ্চিত মানুষের জন্য মর্মবেদনা দেখেছি। তিনি প্রকৃতই সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার মানুষ। তাই এপার ওপার নয় মাঝের বেড়া তিনি তুলে দিতে চান। না, এই কুলে আমি আর ওই কুলে তুমি, কোন ব্যবধান তাঁর কাম্য নয়।

_________________________________________


(৪)


সাধারণত আমরা নদীর এপারে থাকি। তার কারণ এপারে লোকালিটি বেশি। পথঘাট ঘরবাড়ি মানুষের কোলাহল, গণসমাগম যানজট জটিল মানুষ সহ এসবের ভিড়ে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠি। একই গতানুগতির দৈনন্দিন জীবন। কার আর কাঁহাতক কত ভালো লাগে? একই দেখার একই ধরণের কথার মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। চতুর বুদ্ধিমান লোকের মত গুছিয়ে কথা বলার মধ্যে কোন নতুনত্ব নাই। তাই ওপারের জনবসতিহীন ক্বচিৎ দুটি একটি ঘর অসংখ্য পাখির বাসা, পাখির কুজন মন কেড়ে নেয়। ঝোপঝাড় জঙ্গল সবুজের সমারোহের মধ্যে ভাবুক মন, আবেগের মানুষ মনে করে ওটা তার নির্জন বনভূমি, নিজস্ব মনভূমি। মানুষ জীবন পাল্টাতে চায়। অর্থনৈতিক কারণে নয়। একটু শান্তি একটু নির্জনতা একটু বিশ্রামের প্রয়োজন আছে মানুষের। শান্তি প্রিয় মানুষের কাছে প্রকৃতি পরিবেশ অনেক বেশি মূল্যবান, অর্থের চাইতে। তাই চিরকাল এই প্রচলনটি অর্থবহ হয়ে আছে। নদীর ওপার তাই জীবন যাপনের ক্ষেত্রে সেরা। 


এপারের পাখিগুলো সব উড়ে  গেছে ওপারে নিশ্চিত আশ্রযের আশায় যেখানে ভদ্রবেশি বদমাশ লোক গুলো থাকে না। ব্টফল খেয়ে ফেলে দেয় পাখি। পথিক আমি চলে যাই এইসব মাড়িয়ে। আমাদের এপারে খরা। উত্তপ্ত রোদ্দুরে সারা দুপুরটা খাঁ খাঁ করছে। ওপারের নির্জনতা এপারের কোকিলকে লোভ দেখিয়ে কিনে নিয়েছে।"বউ কথা কও" পাখি ওপারের বটের ছায়ায় নিজেকে লুকিয়ে রেখে অনর্গল ডেকে যায়। আমি যখন প্রাতঃভ্রমণ করি, আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ডেকে ওঠে। আমি পাখিটাকে দেখার চেষ্টা করি। গাছের আড়াল থেকে সে আমার সঙ্গে তামাশা করে। আমিও উঁকি ঝুঁকি মারি। আমি কিন্তু জানি পূরুষ কোকিল দেখতে সুন্দর, কুহু সুরে নারী কোকিলকে ডাকে ।"বউ কথা কও"পুরুষ পাখিটি ডেকে যায় তার বউকে।

নারী কোকিলকে কাছে পাওয়ার জন্য নিজেকে সুন্দর হতে হয়।কোকিলা কোনদিনই সুন্দর হয় না।খুব ভোরে হাঁটতে  যাই আমি।এইসব অভিজ্ঞ্যতা আমার নিজস্ব সঞ্চয়। লোকে যে যেমন ব্যাখ্যা করুক, আমার ভালো লাগা এইসব নান্দনিকতা থেকে। প্রবল খরায় বটের ছায়ায় পথিকের কাছে, পাখির সুরের কাছে, নরম ছায়া আমার প্রিয়। যখন পায়ে হেঁটে ছোটবেলায় কোত্থাও যেতাম তখন গাছের ছায়া আমার একমাত্র বিশ্রামের আশ্রয়। অজস্র কারন আছে এই আকর্ষণের। এপারে হাঁটার সময় গাড়ি ঘোড়ার শব্দে চিন্তার বিভ্রম ঘটে।  চিন্তার জাল ছিঁড়ে যায়। আমার কল্পনার রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আমি তাই এত আপন মনে করি ওপারের নির্জনতা। যেদিন আমি থাকবো না সেদিন এইরূপ মাধুরীলতা কে বুক দিয়ে আগলাবে?

এই প্রেম এই ভালোবাসা ভালোলাগা এর দাম কখনো কেউ দিতে পারবে না, আমি ছাড়া। আমি জানি ওপারের তোমাদের ওই সংসার আমাকে না পেয়ে কষ্ট পাবে। প্রতিদিন আমার পায়ের শব্দ ধুলো মাখা মুথা ঘাস, ঝরা পাতা আর শুনতে পাবে না । অন্যের ভালোলাগা আর আমার ভালো লাগার মধ্যে পার্থক্য আছে অনেক। এসব ভাবতে গেলে কিছুটা সময় অন্যমনস্ক হতে হবে। অর্থাৎ এপারের ভালোবাসা থেকে মনটাকে নিয়ে যেতে হবে ওপারের নির্জনতায়। ভোরের উল্লাসে আমার ভোর।

"চোখ আর চায় না ঘুমাতে/জানালার থেকে ঐ নক্ষত্রের আলো ভেসে আসে"(জীবনানন্দ দাশ)।

একটি স্মৃতি না বলে পারছিনা। আমাকে পাগল করে দেয় যে স্মৃতি। প্রাসঙ্গিক হবে বলেই মনে করি। সেদিন রাতে যাব বরিশাল। ঢাকা শহর থেকে যাচ্ছি সদরঘাট। বুড়িগঙ্গায় ভাসবো বিরাট এক জলযানে। তারপর এপার ওপারের  হাতছানি রাতের অন্ধকারে। চোখে ভেসে উঠছে, 

"গোধূলির মেঘ সীমানায়/ধুম্র মৌন সাঁঝে"(পিরামিড কবিতা)। এবার বুড়িগঙ্গায় ভাসবো । আমাদের নিয়ে যাবে,"সাঁঝের নিহারনীল সমুদ্র মাথিয়া।"কেবিনের বাইরে আকাশের দিকে আমি তাকিয়ে। অন্ধকারের মোহিনী মায়ায় নক্ষত্র তাকিয়ে আছে,"নিষ্পলক যুগ্ম ভুরু তুলে/চেয়ে আছে অনাগত উদিচির কূলে/মেঘ রক্ত, ময়ুখের পানে/জ্বলিয়া যেতেছে নিত্য নিশি অবসানে/নতুন ভাস্কর/"জলযানটি ছুটে চলেছে বরিশাল অভিমুখে। বিপরীত দিক থেকে এভাবেই বৃহদাকার জলযানগুলি ছুটে আসছে সদরঘাটের দিকে। দূরে তাকিয়ে আছি নিষ্পলক দুই চোখে। ঘন অন্ধকারে ঢাকা দূরে নদী তীরবর্তী সবুজ গাছগাছালি। মিটমিট করে তার ভিতর জোনাকির মালার মত জ্বলছে নিয়নের আলো।  আহা ওই অপরূপ নির্জনতায় যদি আমি থেকে যেতে পারতাম!"আলো- অন্ধকারে যাই --মাথার ভিতরে/ স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে/  স্বপ্ন নয় -শান্তি নয়- ভালোবাসা নয়/ হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়। /আমি তারে পারিনা এড়াতে/ সে আমার হাত ধরে হাতে/ সব কাজ তুচ্ছ মনে হয়"। জীবনানন্দের হাতে হাত রেখে তার বিচরণ পথে এগিয়ে চলেছি আমি এক অভিযাত্রী শরীরে জলের গন্ধ মেখে।

জল আর নদীর পাড় আমার আজও বিচরণ ক্ষেত্র। জলযানটি ছুটে চলে আমিও ছুটে চলি। চোখে তখন এক ঘোর লেগেছে।"ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকব/ধীরে ধীরে পৌষের রাতে/কোনদিন জাগবো না আর/কোনদিন জাগবো না আমি কোনদিন আর"।

_________________________________________


(৫)


এপারে বাংলা ওপারেও বাংলা। কখনো পশ্চিমবঙ্গ কখনো বা পূর্ববঙ্গ। দুদিকের মানুষ আমরা বাংলায় কথা বলি, বাংলায় গান করি, বাংলায় কবিতা লিখি, স্বপ্নটাও দেখি বাংলাতে। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা।এক মৌলাবাদী ঝটকা ঝড়ে বিধ্বস্ত হল আমাদের সংস্কৃতি। রক্তাক্ত হলো মনের ঐকতান। তবুও আমরা এপার বাংলা, ওপার বাংলা কথা বলি বাংলা ভাষাতে।  যদিও আমরা কষ্ট পেয়েছি খুব তবু এখনো ভালবাসাবাসি আছে আমাদের। এখনো ডাক পাই আন্তরিকভাবে। আসুন এখানে,কোন অসুবিধা নেই। দীর্ঘদিনের অভ্যেস তো তাই ওইটুকু ডাক পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। বন্ধুরা খুব ভালবাসেন আমরাও ভালোবাসি বন্ধুদের। আমি বিশ্বাস করি আমাদের সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐক্য ধ্বংস করতে পারবে না কেউ। এখনো আমাদের লেখা ছাপা হয় ওপারে। আমাদের এখানকার ম্যাগাজিনেও ওদের লেখা ছাপা হয়।

     

৪০৯৬ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া আমাদেরকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। এটি বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্ত। একটি হৃদয় ছিল আমাদের। এখনো আমরা মনে করি, আমাদের মন দ্বিখণ্ডিত হয়নি এখনও। এখনো আমরা মনে করি আমাদের সংস্কৃতিকে দ্বিখন্ডিত করতে পারেনি কোন শক্তি। এখনো মনে করি আমরা বাংলাকেই ভালবাসি।

আমরা উভয়ই ডাল ভাত  চচ্চড়ি পিঠে পুলিতে ভালো আছি। গঙ্গা পদ্মার পানি সব ভাগ হোক। কিন্তু বাতাস ভাগ করতে পারবে না কেউ। এপার থেকে ওপারে ঝোড়ো বাতাস বয়ে যায়। ওপার থেকেও বয়ে আসে স্নিগ্ধ বাতাস। আমাদের মন জড়িয়ে গেছে। আমরা জড়িয়ে আছি। ওই দেখো সীমান্তে কেমন সম্প্রীতির গাছ ও লতাপাতারা। এপারের লাউগাছের ডগা পরম প্রীতিতে ওপারে গিয়ে দোল খায় বাতাসে। লাউ ঝুলে থাকে। ওপারে আমাদের প্রতিবেশীরা লাউ ও লাউয়ের ডাঁটা খেতে খুব পছন্দ করে। ওরা তুলে নিলে আমরা খুব খুশি হই। এভাবেই আত্মীয়তা বাড়ে। আবার ওপরের নারকেল গাছ কাঁটাতার ডিঙিয়ে ঝুঁকে পড়ে আমাদের মাটিতে। বাতাসে দোল খেতে খেতে পাকা ঝুনো নারকেল পড়ে যায় আমাদের মাটিতে। এ যেন ওদের আত্মীয়তা বাড়ানোর চেষ্টা। ঠিক দেখুন আম কাঁঠাল এপারে ওপারে ঝুলে আছে এক অদ্ভুত আত্মীয়তার আবেশে। অদ্ভুত এক প্রাকৃতিক বন্ধন আছে যা সামান্য কাঁটাতারে আমাদেরকে বিভাজিত করতে পারে না।

 

সীমান্ত দিয়ে কু ঝিকঝিক রেল গাড়ি চলে যাচ্ছে। এপারের মানুষ আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। যাত্রীরা হাত নাড়ে আমরাও হাত নাড়ি। সীমান্তে কোথাও কোথাও কিছু কিছু সময় পাওয়া যায় এপার ওপারে হাট বাজারে সাক্ষাতের আর মাছ সবজি কেনার সুযোগ হয়ে যায়। কিন্তু তবুও তো এপার ওপার কাঁটাতারের বেড়া। এপার ওপার দুটি দেশ। দেশভাগ হল দু'দেশের মানুষ জানলো এই কাঁটাতারের বেড়া আন্তর্জাতিক সীমানা। দুদেশের কত টাকা খরচ। সে হিসেব পাওয়া যাবে না এক বিশাল পরিমাণ অংক। কত বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স রাতদিন পাহারা দিচ্ছে। চোর ডাকাতের জন্যও এত কড়া পাহারা নেই।


আমাদের হৃদপিণ্ডকে রক্ষা করে রক্ত সঞ্চালন করে রক্ত বহ শিরা উপশিরা। ঠিক তেমনি অসংখ্য শিরা উপশিরার মত নদী আছে যার উৎপত্তি দুই পাশে।। নদীগুলি দুই দেশকে পানি দিচ্ছে। এমন ৫৪ টি  আন্তর্জাতিক নদী যা উভয় দেশের শরীরের শিরা উপশিরার মত। নদীগুলির নাম আমাদের জীবন ধারার সঙ্গে মিশে গেছে। আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। এইসব নদী নিয়ে কত কথা কত গল্প কত লেখক বন্ধুরা লিখে ফেলেন মনের আনন্দে। অসামান্য এক তৃপ্তি ও অনুভূতি পেয়ে বসে কলম ধরলে। নামগুলো কলমে চলে আসে, সাহিত্য সৃষ্টিকে আরো উল্লেখযোগ্য করে তুলে। এপারে উৎপত্তি ওপারে চলে যাচ্ছে আবার ঘুরে ফিরে চলে আসছে এপারে যেমন ইছামতি। দুই দেশের সুন্দরবন এলাকা জুড়ে রয়েছে এমন অনেক নদী।

বাংলা ভাষার জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রক্ত দেওয়া মানুষগুলি আজও কোন ভেদাভেদ করেনি। সকলেই সাহিত্য সংস্কৃতিকে, বাংলা ভাষাকে উজ্জীবিত করে চলছে। ওরা যে ভাষাকে ভালোবাসে আমি তার প্রমাণ দেখেছি। অনেক সংগতি সম্পন্ন পরিবার শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে ,পিছিয়ে পড়া মানুষকে নিয়ে গল্প কবিতা লেখেন। যদিও ব্যক্তিগত জীবনে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য তাদের এমন কিছু দুঃখ বেদনা নেই। কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টিতে তারা উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেন পিছিয়ে পড়া মানুষদের জীবন জীবিকাকে কেন্দ্র করে।


সাঁঝের বেলা শঙ্খ বাজে। কাঁটাতারের দুই দিকে চলে যায় সেই আওয়াজ। আমি সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে কত কিছু অনুভব করার চেষ্টা করেছি। উল্লেখ করার মতো নদী যেগুলো বাংলাদেশে উৎপত্তি হয়েছে ভারতে প্রবেশ করে আবার ফিরে গেছে। বেতনা - কোদালিয়া আত্রেই পুনর্ভবা নদীগুলি বাংলাদেশ উৎপত্তি হয়ে ভারতের মধ্যে দিয়ে আবার ফিরে গেছে বাংলাদেশে। যতই এপার ওপার বলি না কেন জড়িয়ে আছি জড়িয়ে গেছি এভাবেই জড়িয়ে থাকবো আলোতে অন্ধকারে কিংবা জ্যোৎস্না রাতে। জ্যোৎস্না রাতে একাকী নির্জন নদী পাড়ে বাঁশের বাঁশি বাজে ভাটিয়ালি বাউলের সুরে। সেই সুর ভেসে আসে আমাদের কানে। সেই বাশির সুর বাজে,

"শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয় ফিরে আয়।

তোরে না হেরিয়া সকালের ফুল অকালে ঝরিয়া 

যায় " (নজরুল)।


ওপারের মেঘগুলি ঝড়ের মত ধেয়ে আসে আমাদের এপারে, ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরিয়ে দেয়। দরজা জানলা বন্ধ করতে সময় পর্যন্ত দেয় না। কাঁটাতারের এপারের মানুষগুলো আবেগে আপ্লুত হয়ে আহ্বান জানায়। প্রয়োজনে একটু ভিজে নেয়। এপারে ওপারে কাঁটাতারের দুই পারে এমন দৃশ্য হামেশাই দেখা যায়। মিলেমিশে থাকা, একই মেঘের বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা। যতই ভালবাসাবাসির কথা বলি না কেন ; যতই সম্প্রীতির কথা বলি না কেন কাঁটাতার কিন্তু আমাদের এপার ওপার করে দিয়েছে।

____________________________________________