এক হতভাগা মানুষের গল্প /অমৃত মাইতি ( এক)
আমার জীবনে তিনজন মানুষ আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন। আমার কোন কাজে বাধা না দিয়েও নিরবে নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন। ছাত্র যুব কৃষক আন্দোলন ,ব্যাপক গণ আন্দোলন দিনের পর দিন জেল খাটা, কোন কিছুতে কোন …
এক হতভাগা মানুষের গল্প /অমৃত মাইতি ( এক)
আমার জীবনে তিনজন মানুষ আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন। আমার কোন কাজে বাধা না দিয়েও নিরবে নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন। ছাত্র যুব কৃষক আন্দোলন ,ব্যাপক গণ আন্দোলন দিনের পর দিন জেল খাটা, কোন কিছুতে কোন বাধা তাদের পক্ষ থেকে ছিল না। অনেক সময় অনেক কথা না বললেও বোঝা যায়। ঠিক তেমনি আমাকে কোনদিন তাঁদের কাছ থেকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। আমাকে তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেননি কিন্তু আমি বুঝতাম কোথাও না কোথাও তাদের আমার উপর একটা নিয়ন্ত্রণ আছে। আমার কাজের প্রতি পূর্ণ আস্থা ছিল তাঁদের। তাই বুঝতে হত আমাকেও হাঁটাচলা করতে হবে তাঁদের মানসিক ইচ্ছাকে মূল্য দিয়ে। কোনদিন কেউ সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না করলেও ভেতরে ভেতরে একটা নিয়ন্ত্রণ শক্তি তাদের আমার উপর ছিল আমি বুঝতে পারতাম। আমাদের সম্পর্ককে আমরা সম্মান দিতে পারি বলেই মনের মধ্যে একটা বিশেষ শক্তি কাজ করতো। তাই আমি এমন কোন কাজ করিনি যাতে তাঁরা কষ্ট পান। অথবা মুখ ফুটে বলতে বাধ্য হন আমার সম্পর্কে। এই তিনজন হলেন আমার মা বাবা এবং আমার স্ত্রী। এই তিনজন কেউ আর আমার সঙ্গে নেই। আজ সকাল থেকে খুব মনে পড়ছে তাঁদের কথা। তাই লিখতে বসলাম। আমি আমার মাকে হারিয়েছি ৪৪ বছর আগে। জীবনের কথা বলতে গিয়ে অনেকবার মায়ের কথা আমি বলেছি। তবু বারবার বলতে ইচ্ছে করে"মাগো তোমার শরীরের মধ্যে আমি ছিলাম ২৮০ দিন। আজ তুমি নাই কিন্তু আমি আছি। যে কোন সন্তানের এই অনুভূতিটুকু থাকা দরকার। কতদিন দেখেছি সবাই ঘুমিয়ে গেছে তোমার তখন বিছানায় যাওয়ার সময় হয়নি। আবার সবাই যখন লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে তখন তুমি একমাত্র পরিবারের নির্ভরযোগ্য সদস্যা যাঁর ঘুম ভেঙে যায় সকলের আগে। আবার তোমাকেই দেখেছি দুপুরে গড়িয়ে গেছে ,না ফেরা পর্যন্ত, বাবার জন্য তোমাকেই বসে থাকতে। যে স্মৃতি টুকু আজীবন আমি বয়ে বেড়াতে চাই। যা সব সময় সজীব এবং টাটকা। আমার বাড়ি থেকে বাস রাস্তা পর্যন্ত যেতে হতো হয় হাঁটা পথ না হয় পালকি। মায়ের ক্যান্সার। একজন ক্যান্সার প্রেসেন্টকে নিয়ে যেতে হবে আমাকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে তমলুকে। মাঝে প্রশস্ত নরঘাটের নদী। ভাঁটাতে মাঝে চর পড়ে যায়।
সেই দিনটা ছিল আমার জীবনের সেরা স্মৃতিময় দিন।নদীর মাঝে চর ।দুদিকে দুটো নৌকো মাঝখানে হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। মা ,তোমাকে সেদিন কোলে তুলে নিলাম। আমার এক মূল্যবান সম্পদ তুমি। তারপর চরের পরে আর একটা নৌকাতে বসিয়ে দিলাম। সেদিন তুমি আমাকে দেখছিলে মা। আমিও তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ক্যান্সারের কষ্ট তোমাকে পীড়া দেয়নি। তোমার ঠোঁটে এবং চোখে এক তৃপ্তির হাসি। আমারও একই অবস্থা। সেই দৃষ্টি বিনিময় ,সেই তৃপ্তি আমি আর তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি তো এখন এক সর্বহারা হতভাগা ।কিন্তু তোমার সেদিনের সেই অর্থপূর্ণ দৃষ্টি আর আমার প্রতি তোমার স্নেহের স্পর্শ আমি কোনদিনই বিস্তৃত হতে পারব না। আমি সারা জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছি কিন্তু সেদিনের সেই মুহূর্তটুকু আমাকে সবসময় এক ঝটকায় টাটকা করে দেয়। একজন সন্তানের কাছে সেদিনের সেই ঘটনা পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে ছাড়িয়ে যায়। আমি আমার মাকে কোলে তুলে নিয়ে নদী পেরুতে পেরেছিলাম। এর চাইতে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে।
বাবা আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে ২৫ বছর। একজন বড় মাপের স্বাধীনতা সংগ্রামী জননেতা ছিলেন তিনি। তিনি বলেছিলেন আমি তোকে হাত ধরে রাজনীতি শিখাতে পারিনি। উত্তর দিয়েছিলাম, নিরবে নিভৃতে তুমি আমার মধ্যে যে প্রভাব বিস্তার করেছিলে সারা জীবন। সেটা অনেক অনেক বড় বিষয়। কারুর হাতে সময় থাকে না ।নিজেকেই গড়ে নিতে হয়। যেদিন মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে বেরিয়ে এলাম সেদিন মা এবং বাবা দুজনেই আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। না কোনদিন কোন বাধা পাইনি। আমি আমার মত চলেছি সারা জীবন। মা-বাবা ভেবেছিলেন আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আর একজনকে দরকার। তিনি হলেন আমার স্ত্রী।
কোনদিনই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা তিনি ভাবেননি। কিন্তু তার মধ্যেও একটা প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ শক্তি আমার উপর কাজ করেছিল। আমার রাজনৈতিক জীবনে সমস্ত রকমের রসদ যোগান দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল সেই মহিলা। মাঝে মাঝে রাত্রিতে বাড়ি ফিরে এলে বলতেন মিটিং কেমন হলো ,কারা কারা এসেছিল। তুমি তো ভালোই বলো। কিন্তু হাততালি কেউ দিয়েছিল কি? এখন তিনজনই ছেড়ে চলে গেছে আমাকে। আমি এক সর্বহারা অভাগা। সমস্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে অন্য এক জগতের খোঁজে । এই জগতের ভাড়া ফুরিয়ে গেছে। এই চিরকালীন তিন হাত জায়গার অপেক্ষায় আছি।
_____________
এক হতভাগা মানুষের গল্প/অমৃত মাইতি(দুই)
শুরু করেছিলাম তিনজন মানুষকে নিয়ে।আমার জীবনকে যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন ।তাঁরা এখন আমার কাছে নেই। আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে নীতি আদর্শ এবং কর্মসূচি । কোন ব্যক্তি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। সেই অর্থে আমার কোন গুরু নাই। আমার বাবা মা এবং পরবর্তীকালে আমার স্ত্রী যাদের অন্তরের নির্মল জলের ফল্গুধারায় আমি স্নাত হয়েছিলাম। সে কারণেই আমার আর অন্য কোন নিয়ন্ত্রণ শক্তির প্রয়োজন হয়নি। আমি ছিলাম ২৪ ঘন্টার রাজনৈতিক কর্মী। জীবন থেকে নেওয়া বহু অভিজ্ঞতা থেকে আমি বহু মৌলিক সাহিত্য রচনায় প্রবৃত্ত হই। আমি সমাজকে মানুষকে সংগ্রামকে আমার মত করে বিশ্লেষণ করেছি মার্কসীয় দর্শনের আলোকে। একজন রাজনৈতিক কর্মীর ব্যাপক জ্ঞানের প্রয়োজন আছে তাই তাকে লেখাপড়া করতেই হবে। দর্শন এবং প্রয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।পড়াশোনা করতে করতে দেখেছি জীবনানন্দের কবিতায় নিশ্চয়ই রয়ে গেছে বহু বিপ্লবের আবেদন। তাই লিখলাম "জীবনানন্দের কবিতায় বিপ্লবী চেতনা।" গতানুগতিকতার বাইরে চলা অভ্যাস করতে হয় ,না হলে জ্ঞানের বিকাশ ঘটে না।বিবেকানন্দ কে নিয়ে পড়াশোনা করতে করতেই দেখলাম তিনি একজন বিপ্লবী মানুষ এবং তিনি বস্তুবাদী। বিবেকানন্দের বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তাই কোথাও আমি স্বামী বিবেকানন্দ লিখলাম না। বইয়ের নাম দিলাম "বস্তুবাদী বিবেকানন্দ।" এসব আমার মৌলিক রচনা। প্রায় ১০০ টির মতো বই আমি অনেক দুঃখের দিনে কষ্টের দিনে ব্যথা বেদনার দিনে লিখেছি। লেখা আমাকে জীবন দিয়েছে, লেখা আমার প্রাণশক্তি বিকশিত করেছে। এই যে আমি মানুষটি এখন লেখালেখি করছি একজন লেখক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছি দৃপ্ত কন্ঠে বলতে পারি এই লেখাই আমার ব্যবহারিক জীবনের জন্মদাতা। আমার জীবনীশক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে লেখা। চরম দুর্দিনেও বাঁচতে সাহায্য করেছে লেখা।রাজনৈতিক জীবনেও দুই ধরনের লোকের দেখা পেয়েছি। আমার অক্লান্ত পরিশ্রম নিষ্ঠা এবং ত্যাগের পাশে দাঁড়িয়েছেন আন্তরিকভাবে খোলা মনে কিছু মানুষ। তাঁরা আমাকে ভালবেসেছেন। জেলা জেলার বাইরে রাজ্যের বাইরেও আমাকে প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন জানিয়েছেন। তাদের আন্তরিক সমর্থন এবং ভালোবাসায় অর্থ-সামর্থের অভাব থাকলেও আমি কিন্তু সামনের দিকে এগিয়ে গেছি। এই যে এগিয়ে যাওয়া এটাও একটা শিক্ষা। পেছনে দিকে তাকাইনি। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্ম তৎপরতার ক্ষেত্রে যারা পিছিয়ে পড়ার পিছিয়ে থাকার তারা পিছন থেকে টেনে ধরার বহু বহু চেষ্টা করেছেন। না সেই সমস্ত অকৃতজ্ঞ মানুষগুলো যারা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝেনা ,তারা পারেনি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আর যে সমস্ত বন্ধুরা আমার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেছেন তারা তাদের অন্তরের ঠিকানা আমাকে দিয়েছেন। সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলেও প্রচ্ছন্ন ভাবে তারা কিন্তু আমাকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এই সমস্ত বোধ বুদ্ধি সকলের নেই যারা অন্তরের ঠিকানা পান তারা বুঝতে পারেন। আমরা রাজনৈতিক কর্মীরা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার কথা মানি। মেনে চলি এবং মানতে বাধ্য হই। কিন্তু খোলা মনের মানুষ সঠিক বিশ্লেষণ করার মানুষ যদি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার পূজারী না হন তাহলে কিন্তু ভয়ঙ্কর বিপদ। আপনি তাদের সঙ্গে থাকতে পারবেন না। তবু চেষ্টা করতে হয় যতক্ষণ পারা যায় নীতি আদর্শ এবং সাংগঠনিক কর্মসূচিকে নিজের মতো করে মেনে নিয়ে একসঙ্গে পথ চলা। তবে যাদের মধ্যে রাজনৈতিক আচরণ, সভ্যতা ভদ্রতা ব্যবহারিক জ্ঞান একেবারেই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তাদের সঙ্গে আপনি বেশি সময় থাকতে পারবেন না। কিছু অংশের মানুষের মধ্যে ভয়ঙ্কর হিংসা। হিংসার আগুনে তারা আপনাকে পুড়িয়ে মারতে চায়। সেখান থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে আসা খুবই কষ্টকর। শাঁখের করাতের মত আপনার তখন অবস্থা। এগোলে বিপদ পিছলেও বিপদ। ব্যালেন্স করে চলাটাও খুব কঠিন।তাই আমি ওদের সঙ্গে না থেকে লিখেছিলাম "আমি একজন প্রোপাগান্ডিস্ট"। মার্কসবাদে বিশ্বাসী শ্রেণী সংগ্রামে বিশ্বাসী আমি একজন বামপন্থী প্রোপাগাডিস্ট। লড়াই সংগ্রাম থেকে আমি চলে যাচ্ছি না। যতক্ষণ পারবো প্রচার ও গণআন্দোলনের পাশে থাকব। রাজনৈতিক মতাদর্শের পাশাপাশি আমি দেখেছি মানুষের চেতনা শক্তিকে বৃদ্ধি করতে গেলে লেখালেখিরও দরকার। আমার বইয়ের সংখ্যা ১০০ অতিক্রম করেছে।
বহু জায়গায় আমি আমন্ত্রিত হয়েছি। ভালোবেসে আমাকে যারা বই উপহার দিয়েছেন, যতটা পেরেছি নিয়ে এসেছি। সেই বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। বর্তমানে এত বইপত্র রাখার জায়গা আমার নেই। নিজেও কোন রকমে থাকি।
এই বইয়ের সম্ভার নিয়ে আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না এই সংগ্রহের ভবিষ্যৎ কি? আমাদের সমাজের ছোটলোক আছে ভদ্রলোকও আছে।। আমাদের সমাজে একেবারে নিজস্ব স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝেনা এমন লোকও আছে। আবার নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করার লোকের সংখ্যাও রয়েছে। কিছু মানুষ সবসময় টেরা চোখে অন্যকে দেখে এবং তারা নিন্দুক। কিছু মানুষ আছে দুবেলা পেট ভরে খেয়ে ঢেকুর তুলে। তারা মনে করে সমাজের সকলেই খেতে পায়। তারা শুধু নিজেদেরকে দেখে আর কিছু দেখতে পায় না। নিমতৌড়ি তমলুক উন্নয়ন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শ্রী যোগেশ সামন্ত আমার প্রস্তাবে সহমত পোষণ করে একদিন আমার বাড়ি থেকে সমস্ত বই পত্র নিয়ে চলে যায়। সেদিন ভেবেছিলাম আমার আর দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু যোগেশ যে বইপত্র নিয়ে আমার নামেই লাইব্রেরী করবে সেটা আমার জানা ছিল না ।আমার কোনদিন কোন প্রস্তাবও ছিল না তার কাছে। আমি নিজেও কোনদিনও ভেবে উঠতে পারিনি এবং স্বপ্নেও ভাবেনি আমার নামে লাইব্রেরী হতে পারে। এই লাইব্রেরির পিছনে আমার একটা টাকাও খরচ হয়নি। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জননেতা মানিক সরকার বিপ্লব রায় চৌধুরী সুদিন চট্টোপাধ্যায় প্রমূখরা এসেছিলেন। তাঁদের যাওয়া আসার জন্য আমার একটি কপর্দক খরচ হয়নি।
কিছু ব্যক্তিস্বার্থে ডুবে থাকা মানুষ আমারই পরিচিত যাদের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিন আর কোন সম্পর্ক নেই। তারা এমন একটি উল্লেখযোগ্য এবং মানুষের উপকারে লাগবে এই লাইব্রেরির সম্পর্কে নিন্দা মন্দ আড়ালে আবডালে করে যাচ্ছে। তারা সামাজিক মাধ্যমেও দু একজন কটুক্তি করছে। কিন্তু গঠনমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন এমন বহু মানুষ তাঁরা আমাকে এইসব থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বহু বন্ধুবান্ধব প্রতিবাদও করেছেন। তবে এই লাইব্রেরীটি হওয়ার ফলে জীবনে একটি বড় কাজ করতে পেরেছি আমার বিশ্বাস।
একটি পরিচিত গল্প বলেই শেষ করি। হাতি রাস্তায় চলে যায় কুকুর পিছনে দৌড়ায় ।ঘেউ ঘেউ করে। তাতে হাতি কর্ণপাত করে না। আমাকে কোন ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি ।আমাকে পিছন দিকে টেনে আনার চেষ্টা করেও তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আমি মনের জোর নিয়ে সাহস করে নিজেকেই নিজে নিয়ন্ত্রণ করি। সদর্থক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকি।
_____________
এক হতভাগা মনুষের গল্প/ অমৃত মাইতি (তিন)
প্রতিটি মানুষকে রীতি-নীতি মেনে চলতে হয়। কারণ নিয়ম রীতির মধ্যে এক সৌন্দর্য চেতনা থাকে। শৃঙ্খলা বোধ থাকে।সে সামাজিক ক্ষেত্রে হোক, রাজনীতির ক্ষেত্রে হোক কিংবা সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই হোক। প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়ম রীতি মেনে চলাটা খুবই জরুরী। এই নিয়ম রীতি মেনে চলা কেউ কাউকে শিখিয়ে দেয় না। এক্ষেত্রে নিজেই নিজের শিক্ষক। নিয়ম মানা, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এক বিশেষ গুণ, ক্ষমতা এবং দক্ষতা। যিনি পারেন তিনি এগিয়ে যান। তাকে আটকানো যায় না। এ কারণে তিনি নির্ভিক। লেখালেখির ক্ষেত্রে আমি নিজেকে একজন কেউকেটা মনে করি না। লেখালেখিতে আমি এখনো নবিশ মনে করি নিজেকে। কারণ সাগরের তীরে দাঁড়িয়েছি মাত্র। সাগরে নামতে পারিনি এখনো।রাজনীতির ক্ষেত্রে নিষ্ঠা ত্যাগ পরিশ্রম আমাকে কিছুটা এগিয়ে থাকা মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সাহিত্যের সেই স্বীকৃতি পাওয়া খুবই কষ্টকর। কারণ সাহিত্যে অনেক সাগর মহাসাগর রয়েছে। যাদের পান্ডিত্যের কাছে আমি কিছুই নই। তবে আমার যা আছে তা হল নিষ্ঠা আন্তরিকতা এবং বোধ বুদ্ধি বিচক্ষণতা। অনেক গভীরে যাওয়ার ক্ষমতা।সাহিত্যে কোন প্রতিযোগিতা থাকার কথা নয়। কারণ সৃষ্টি যে যার নিজস্ব। তবু প্রতিযোগিতা আছে। গ্রুপবাজি আছে। বহু লেখক বন্ধুদের দেখেছি তারা একটা নিজস্ব ঘরানার মধ্যে থাকেন তার বাইরে কাউকে পছন্দ করেন না। নিজস্ব বন্ধু-বান্ধবের বৃত্তের বাইরে যেতে চান না। আমার কোন গ্রুপ নেই। কোনো গ্রুপের কাছে আমি মাথা বিক্রি করে দিইনি।
লেখকরা সমাজে এগিয়ে থাকা মানুষ। কোনরকম জটিলতা কুটিলতা পছন্দ অপছন্দ লেখক বন্ধুদের মধ্যে থাকা উচিত নয়। এই বিরক্তিকর বৈশিষ্ট্য গুলি লেখক বন্ধুদের মধ্যে থাকা উচিত নয়।।এবং এসব থাকা মানে তিনি সহজ সরল মানুষ নন। লেখকরা সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষ এবং সমাজকে পথ দেখানোর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চলেন। অতি সম্প্রতি জেলা বইমেলা হয়ে গেল। আমি এই প্রথম ডাক পেলাম না। আমার মনে হল আমি হয়তো ওজনদার লেখক বা উঁচু মানের কলমচি নই। জেলা বইমেলা তো কোন গ্রুপের হওয়া উচিত নয়। যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা বিভিন্ন সময় আমাকে তাদের অনুষ্ঠানে ডাকেন। জেলা বই মেলা তো কোন রাজনৈতিক দলের হওয়ার কথা নয়। সেখানে সকলেরই প্রবেশ অধিকার আছে। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত যারা ছিলেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করার অপমান করার অসম্মান করার অধিকারও অর্জন করেছেন তারা। বহু গ্রুপ আছে গোষ্ঠী আছে। তা সে থাকুক। কারণ সবাই সবাইকে ডাকতে পারেনা, সম্ভবও নয়। গোষ্ঠী বা গ্রুপ হলেও ভাষা ও সাহিত্য আন্দোলনে সকলেরই কিন্তু উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। নিশ্চয়ই সবাইকে সম্মান জানাবো আমি। কিন্তু সরকারি বইমেলা তো এমন হওয়ার কথা নয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত আমি কলকাতা স্থিত বাংলা একাডেমিতে সমস্ত প্রোগ্রাম গুলিতে ডাক পেয়েছি। ২০১১ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও ডাক পায়নি। সম্ভবত আমাকে সবাই চেনেন।ডাক না পেলেও আমার কোন অসুবিধা হয় না। কে ডাকবে কে ডাকবে না এসব ভেবে চিন্তে কলম ধরিনি কখনো। আমি লিখি আমার বিবেকের তাড়নায়। সামাজিক অসাম্যের কারণে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমরা অনেকে কলম ধরি। শ্রেণীচেতনাকে জাগ্রত করার জন্য আমরা কলম ধরি। এক্ষেত্রে সাহিত্য সভা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। লেখকদের লেখালেখির এক ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে।
সেই ক্ষেত্রে কে কাকে নিমন্ত্রণ করবে এটা চর্চার বিষয় নয়। আপনি কেমন লিখেন ভালো লিখেন কিনা আপনার লেখা মানুষের উপকারে আসবে কিনা এসবই প্রাধান্য পায় একজন লেখকের কাছে। এখানে পছন্দ অপছন্দ রাগ হিংসাকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজের মনকে নিরপেক্ষ রাখা এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সর্বাঙ্গ সুন্দর। নিজেকে বিতর্কে ঊর্ধ্বে রাখতে পারলে একজন নিরপেক্ষ লেখক হওয়া যায়।বহু লিটল ম্যাগাজিন তারা তাদের সাধ্যমত সাহিত্যের কর্মযজ্ঞে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছেন। আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে সম্মান জানাই। লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলন জোরদার হওয়া দরকার। নিরপেক্ষ লেখকদের কলমের ধার ভার যদি আমাদের মন কাড়তে পারে। এই নিরপেক্ষতার অর্থ এই নয় যে আমি সব দিকে আছি। ডাইনেও আছি বাঁয়েও আছি। কারণ নিরপেক্ষ বলে কিছু হয় না এই শ্রেণী বিভক্ত সমাজে। ঝালে ঝোলে অম্বলে সব জায়গায় থাকবো, একে নিরপেক্ষতা বলে না। আমি নিরপেক্ষ বলতে বোঝাতে চাইছি কোন সাহিত্য সভাতে আমন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা। কারন আমার কাছে সমস্ত লেখক সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত। সমস্ত লেখকরা সম্মানিত।যার যেমন দক্ষতা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তা আমার কাছে বিচার্য বিষয় নয়। যোগ্যতা বলে যদি কিছু থাকে দক্ষতা বলে যদি কিছু থাকে তা বিচার করার দায় আমার নয়। আমার কাছে মঞ্চটা সকলের হোক। লিটল ম্যাগাজিনগুলির সদিচ্ছা এবং ক্ষমতা অনুযায়ী তারা সেভাবেই সভা করবেন। সে ক্ষেত্রে তাদের অধিকার নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু আমার তীব্র প্রতিবাদ হলো সরকারি উৎসব অনুষ্ঠানে নিরপেক্ষতা নিয়ে। সরকারি উৎসব অনুষ্ঠানের, সাহিত্য সভা নিয়ন্ত্রণ করার চূড়ান্ত অধিকার কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে। তাই কর্তৃপক্ষ যদি সাহিত্যের মতো সৃষ্টিশীল কর্মে নিরপেক্ষ না হয়ে নিয়ন্ত্রণ করার শুধু চেষ্টা চালিয়ে যায় তাহলে তা মেনে নেওয়া যায় না। যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের জ্ঞানের এবং যোগ্যতার সীমাবদ্ধতা আছে বলেই আমার বিশ্বাস। তাই তারা ভয় পান সবাইকে ডাকতে। এমন একটা সময় আসবে যখন
সাহিত্যের মতো সৃষ্টিশীল কর্মকে নিজেদের করায়ত্ব রেখে অন্যদেরকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং সমাজের অপরাপর অংশের উপর মাতব্বরি করবে। যুগ যুগ ধরে সরকারি ব্যবস্থাপনা নিজেদের পক্ষে প্রচার যন্ত্রেকে এবং কিছু মানুষকে তৈরি করার চেষ্টা করে আসছে। সেই সমস্ত লোককে উঁচু আসনে বসিয়ে সুযোগ সুবিধা আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে সাধারণ লেখকদের মোটিভেটেড করার চেষ্টা করে। আমি এই ধরনের ব্যবস্থার তীব্র প্রতিবাদ করি। রাষ্ট্রযন্ত্র শোষণের হাতিয়ার। সেই রাষ্ট্রযন্ত্র যখন সাহিত্য সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে তখন কি ভয়ংকর বিপদ হতে পারে অনুমান করতে পারি। তাদের পরিচালিত শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি মেহনতী মানুষের পক্ষে ভীষণ বিপদ। এরা ইতিহাসও পাল্টে দিচ্ছে। তাই বলবো সাধু সাবধান।
___________________________________
এক হতভাগা মানুষের গল্প/অমৃত মাইতি (চার )
বাংলাদেশের জাতীয় কবিতা পরিষদ সবচেয়ে পুরনো সাহিত্যের প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর দু দিনের উৎসব। সেখানে বিন্দুমাত্র সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই, সরকার মাথা গলায় না। তিন বছর অন্তর নতুন কমিটি হয়। ধর্ম বর্ণ রাজনীতি নির্বিশেষে কবি নির্বাচন হয়। কবি, সরকারের পক্ষে বিপক্ষে থাকতেই পারে। আমি ২০০৫ সাল থেকে টানা ১১ বছর আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। দেখছি, মন্ত্রী বা সাংসদ মঞ্চের নিচে দর্শকাসনে বসে, মঞ্চে কেবলমাত্র কবি সাহিত্যিকরা। সংগঠনের নেতারা নিজস্ব সংবিধান মেনে চলেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রণের কথা বলতে গিয়ে এইসব আলোচনা করলাম।
সাম্প্রতিককালে সেখানে কী হচ্ছে, এসব নিয়ে আমার এই লেখা নয়। শেখ হাসিনা সরকারের আগে এবং তাঁর আমলে দুই সরকারের সময়কার সাহিত্যিকদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং তাদের কার্যকলাপ নিয়ে আমি বললাম। ভেতরে যাই থাক অন্তত বাইরে সাহিত্যিকদের উন্নত মনের পরিচয় আমি পেয়েছি।
গ্রুপবাজি দলবাজি এবং কে সরকারের পক্ষে বা কে বিপক্ষে, ভিতরে ভিতরে প্রতিযোগিতার ঠেলাঠেলি থাকতে পারে।।আমার নজরে আসে নি। প্রতিযোগিতা ছিল, আছে, থাকবে।যিনি যত বড় হন না কেন লিটল ম্যাগাজিন থেকেই তাঁকে উঠে আসতে হয়েছে। সিঁড়ির উপরে উঠে গেলে আর মনে পড়ে না নিচের ধাপটা তাকে পেরিয়ে আসতে হয়েছে। সময়ের প্রেক্ষিতে কোন কোন লেখা বারবার লেখা হচ্ছে, মনে হতে পারে। অস্বীকার করিনা, পুনর্লিখন হতে পারে। ঘটনাবহুল দীর্ঘ জীবনে যখন কোন ঘটনা মস্তিষ্ককে বিব্রত করে তখন কিছু লিখে নিজেকে হালকা করি। দীর্ঘদিন ধরে যারা আমাকে বিব্রত করছে তারা জেদ নিয়ে বসে আছে আমি না মরলে তারা নৃশংসতা ছাড়বে না। তবে তাদেরকে ধন্যবাদ আমার লেখাকে প্ররোচিত করার জন্য।
আমি একবার হঠাৎই একটি দীর্ঘ কবিতা লিখে ফেললাম। কবিতাটি ১১১১ লাইনের। তিনজন নামি মানুষকে দিয়েছিলাম পান্ডুলিপি। তিনজনের মধ্যে একজন ছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। নীরেন দা বললেন, তুমি ঠিক আট দিন পরে আমাকে ফোন করবে। এমন মানুষ আমি দেখিনি এত ব্যস্ততার মধ্যেও ঠিক তিনি দীর্ঘ কবিতাটি পড়ে ফেলেছিলেন এবং কবিতাটি নিয়ে তিনি সদর্থক মন্তব্য করেছিলেন। আমাকে নিয়ে কিছু কথা লিখতে গিয়ে ওই কবিতার দিনে উল্লেখ করেছিলেন।"হৃদয় যেন এক পথিক"। ঠিক সেই সময় আমি একটা আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম বাংলাদেশে একটি ইংরেজি সংবাদপত্রের বার্ষিক অধিবেশনে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রথম সারির ২৮ জন কবি। দীর্ঘ কবিতাটির পান্ডুলিপি ছিল আমার কাছে। আমার কাছ থেকে চেয়ে নিলেন নুরুল হুদা। 24 ঘন্টার মধ্যে কবিতাটি একটি বই হিসেবে প্রকাশ করে আমার হাতে দিয়েছিলেন। ভাষার প্রতি কতটা যত্নবান হলে এই কাজ করা যায়। আমি ভালো করে বলতে পারি ২৪ ঘন্টার মধ্যে এমনটা দীর্ঘ কবিতার বই নিশ্চয়ই আমাদের এখানে কেউ করে দিতেন না। এখানে প্রকাশক আছে, ওখানেও প্রকাশক আছে। সবাই ব্যবসায়িক প্রকাশক এমনটা কিন্তু নয়। কিছু প্রকাশক আছেন তাদের মধ্যে সাহিত্য চেতনা আছে, শুধুমাত্র ব্যবসা তাদের কাছে এক নম্বর নয়।
ছোটবেলা থেকে রাজনৈতিক কারণে মাঠে ময়দানে কাজ করেছি বেশি। মগজের তাড়নায় বিবেকের তাড়নায় আবেগের বসে লিখে ফেলেছি অনেক কিন্তু পড়েছি কম। তাই আমার লেখাগুলি মৌলিক। না পড়লে জ্ঞানের ভান্ডার বাড়ে না। কম পড়েছি তাই দাবি করি না আমি জ্ঞানী মানুষ।
একবার এক রাত্রিতে প্রয়াত সাহিত্যিক অসীম সাহার সহযোগিতায় অংকন মাইতি, সুস্নাত জানা, অরিন্দম প্রধান ও আমার চারটি বই প্রকাশ করেছিলেন ঢাকায় বসে। এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা ও আনন্দ। আমার সঙ্গে অনেক সাহিত্যিক বন্ধু বাংলাদেশ গিয়েছেন। প্রয়াত মানস চিনিও গিয়েছিলেন। মানুষ বহুদিন থেকে চেষ্টা করছিল বাংলাদেশে যাবে। অনেককে ধরাধরিও করেছিল। আমাকে বলায় আমি এক কথায় রাজি হয়ে যাই এবং তাকে নিয়ে যাই। আমার প্রতি তার কৃতজ্ঞতা, আনন্দ ও চিঠি দেখে বড্ড ভালো লেগেছিল। কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়াটা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় কিন্তু তার এই কৃতজ্ঞতাবোধ আমাকে মুগ্ধ করে। আরেকজন তার নাম আমি বলছি না আমার খুব ঘনিষ্ট হয়ে থাকার চেষ্টা করতো মাঝেমধ্যে।
সবাই জানে বাংলাদেশে আমার থাকা আওয়ার পয়সা লাগে না। এমনকি গাড়ি ঘোড়ায় ভ্রমণের জন্যও লাগে না।
আমার সঙ্গে যারা দীর্ঘদিন খারাপ ব্যবহার করে আসছে আমার ধারে পাশে চলে এলে আমি ভুলে যাই পুরনো শত্রুতা এবং দুর্ব্যবহারের কথা। আমি তাকে নিয়ে গেলাম বাংলাদেশ। তারও থাকাখাওয়ার খরচ লাগেনি। সে খুব অবাক হয়ে গেল। ফিরে এসে বলল যে, অমৃতবাবুর বাংলাদেশের ব্যাংকে টাকা আছে, হোটেল আছে। তাই নাকি তার পকেটের টাকা খরচ হয়নি। এমন ইতর মানসিকতার সঙ্গে আমার জীবনে বহুবার দেখা হয়েছে, পাশে এসেছে আবার বিপন্ন করে দিয়ে চলে গেছে। এখনো অব্যাহত আছে আমাকে বিব্রত করার অভ্যাস। একটা কুকুরকে আপনি যদি একদিন খাওয়ান তাহলে কিন্তু সে সারা জীবন মনে রাখবে। একটা মানুষকে সারাজীবন খাওয়ানোর পরে যদি একদিন খেতে না দেন তাহলে সে আপনার চরম শত্রু। এই চরম সত্যতা আমি অর্জন করেছি।
ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি। এখানে ভাগ্য বলে কিছু নেই। চলার পথে যেমন কতিপয় মানুষের বিষাক্ত ছোবল খেয়েছি ঠিক তেমনি অসংখ্য ভদ্র নিরহংকারী ভালোমানুষের ভালবাসা পেয়েছি। তাদের পরামর্শ সহযোগিতা আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আমি কৃতজ্ঞ তাঁদের কাছে। আবেগ এবং সরলতা মানুষের বড় গুণ। কিন্তু বাস্তবতা এবং বুঝে চলাটা জরুরি দরকার। পাশাপাশি বুঝেছি যে সেই পথচলা যদি ঠিক মতো আয়ত্ত করতে না পারেন তাহলে আপনার জীবন বিষময় হয়ে যেতে পারে। আমার এই জীবনে সমস্ত অভিজ্ঞতার সমাহার।
রাজনৈতিক জীবনে ভয়ংকর হিংসা বিদ্বেষ দেখেছি এবং সর্বনাশ করার প্রয়াসও দেখেছি। সাহিত্যের জীবনে অতটা কেউ কারোর ক্ষতি করে না। যদিও প্রতিযোগিতা আছে। গঠনমূলক প্রতিযোগিতা চলতে থাকুক। কবি এবং কর্মী, দুটোই দেখেছি আমি। যিনি কবিতা লিখেন আবার তাকে সাহিত্যের ক্ষেত্রে সাহিত্যসভা, কবিসম্মেলন ইত্যাদি সমস্ত কাজের ক্ষেত্রে কর্মী হিসেবে কাজ করতে দেখেছি। অনেক কিছু লিখেন কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে কোন কাজ করেন না। আবার অনেকে লেখালেখি করেন। কবি সাহিত্যিকদেরকে নিয়ে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তারা সাহিত্যের সেবক। একজন লেখক যখন সংগঠনের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে তখন সেও সাহিত্যের প্রচারক। এই প্রচারের কাজে যারা থাকেন তাদেরকে যেন আমরা কোনদিন ছোট করে না দেখি।
_______________________________
এক হতভাগা মানুষের গল্প /অমৃত মাইতি (৫)
আমি লেখকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। লেখকদের বয়স অভিজ্ঞতা নিয়ে বলছি না। বলছি যে কোন লেখকের সৃষ্টির প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। আমার জীবনে আগে রাজনীতি এবং পরে সাহিত্যচর্চা ও লেখালিখি। আমার আবেগ ছিল কিন্তু লেখালেখি করতে পারতাম না ভালো।। লিখতে লিখতে লেখক হয়েছি । সাহিত্যের, কবিতার ব্যাকরণ নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। লেখকদের ভালবাসি, কত লেখককে আমি বই করে দিয়েছি। জীবনে প্রথম বই হয়েছে আমার হাত দিয়ে এমন লেখক রয়েছেন অন্তত বেশ কয়েকজন। অথচ তাদের কৃতজ্ঞতা বোধ নেই, দাবীও করিনা। সামনে দাঁড়িয়ে চিনতে পারেন বলেও মনে হয় না। কিন্তু আমি মনে করি আমার সঙ্গে বেশ কিছু লেখকের নিবিড় সম্পর্ক আছে। যে যার সময় বাঁচিয়ে নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
আমি এমন কিছু হয়ে যাইনি বা আমার কাছে এমন কোন দায় নাই যে সবাইকে আমার সঙ্গে কথা বলতে হবে। আবার আমি অতটা অনভিজ্ঞ লোক নই বা অবিবেচক নই, লেখক বন্ধুদের কাছে অন্যায় দাবি করব। কোন কোন সাহিত্য সভায় আমাকে যখনই ডাকা হয়, আমি চলে যাই। কিন্তু আমি ডাকলে তারা আসতে চান না। আবার আসেনও অনেক বন্ধু। ঘর ভরিয়ে দেন। আমি খুব আশা করেছিলাম আমার নামাঙ্কিত লাইব্রেরীটিতে, যাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ আলোচনা করে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, উদ্বোধনের দিন তাদের অনেকেই কথা দিয়ে কথা রাখেননি। অনুপস্থিত ছিলেন। আমার নিজের যা বই ছিল সেই সংখ্যাটা কম না। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠিত লেখকের মূল্যবান বই এবং সহযোগিতা আমি প্রত্যাশা করেছিলাম। প্রত্যাশা পূরণ না হলেও, চাহিদা প্রাপ্তির তুলনায় কম নয়। যাদের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, উৎসব অনুষ্ঠানে একসাথে জড়িয়ে থেকেছি, তাদের বইপত্র এই লাইব্রেরীতে থাকুক আমি চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম আন্তরিকভাবে। তাই তাদের কাছে আমার আহ্বান ছিল। আমি অন্তরের অন্তস্থল থেকে বলছি তারা এলে এবং তাদের বইপত্র নিয়ে এলে আমি যে কী পরিমাণ খুশি হতাম তা আমি তাদের বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমি খুব পীড়িত হয়েছি এবং কষ্ট পেয়েছি ।
এমন কয়েকজনের আন্তরিকতা অনুভব করতাম, তারা কিন্তু আসেননি। আমি খুব প্রত্যাশা করে তাদের অপেক্ষায় ছিলাম, তাদের উপস্থিতির অভাব অনুভব করেছিলাম। যদিও একটি সুন্দর সফল কর্মসূচি করতে পেরেছিলাম আমরা। এই অনুষ্ঠানে কত দূর থেকে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এলেন ভালোবাসার টানে। প্রায় ৮৫ বছরের বেশি বয়সের সুদিন চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে এলেন লাইব্রেরী উদ্বোধনের নাম শুনে। খুব আনন্দ পেয়েছি তাঁর আগমনে। ৮০ বছর বয়সের প্রবীণ মানুষ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী বিপ্লব রায় চৌধুরী সারাক্ষণ বসেছিলেন। উল্লেখযোগ্য মুহূর্তগুলি উপভোগ করার জন্য যদি আমার নিকট বন্ধুরা আসতেন, ভীষণ আনন্দ পেতাম। এভাবে পীড়িত হতাম না। যারা আসেননি তাদেরকে আমি খুব খুব ভালোবাসি। আমি এখনো প্রত্যাশা করি তাদেরকে।
লাইব্রেরীটি রক্ষা করা দরকার। যাদের অভিজ্ঞতা আছে তাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ, পরামর্শ দিয়ে যাবেন। আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব। কত সাহিত্যিক বন্ধুদের আমি বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়িয়েছি, আশ্রয় দিয়েছি প্রশ্রয় দিয়েছি। তারা কী করে ভুলে গেলেন আমাকে, বুঝতে পারছি না। রাজনীতিতে ঠেলাঠেলি থাকে সুকৌশলে বিরোধিতা করে অনেকে। পিছন থেকে ছুরি মারতে দেখেছি রাজনীতিতে। কিন্তু সাহিত্যের মতো সৃষ্টির সঙ্গে যারা যুক্ত তারা সমস্ত লেখকের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন, সুসম্পর্ক রাখবেন এটাই আমার প্রত্যাশা। গঠনমূলক কাজের সঙ্গে আসুন একসঙ্গে কাজ করি একসাথে থাকি । আমরা কেউই চিরকাল থাকবো না। একদিন চলে যাব পৃথিবী থেকে। আমরা কেউ সমালোচনার উর্ধ্বে নই। হয়তো একজন বামপন্থী মানুষ হিসেবে আমাকে আপনার পছন্দ নয়। কিন্তু লাইব্রেরীর তো বাম ডান বলে কিছু হয় না।কাজ করতে গেলে ভুল ত্রুটি থাকে। হয়তো আমিও ঠিক ঠিক ভাবে, আন্তরিকভাবে বন্ধুদের ডাকতে পারিনি, এমনও হতে পারে। আমার ভুল থাকলে সেই ভুলটুকু আপনি শুধরে দেবেন, প্রত্যাশা করি । ভুল করলে ভুল স্বীকার করে নেওয়া আমার চিরকালের অভ্যেস। বয়স হয়েছে। ভুল হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। আমি অপরিসীম আনন্দ পেয়েছি যারা এখনো বইপত্র পাঠাচ্ছেন ডাকের মাধ্যমে। গৌহাটি শিলচর ত্রিপুরা নিউ দিল্লি বালুরঘাটসহ বহু জায়গা থেকে ক্রমাগত বইপত্র এবং শুভেচ্ছা বার্তা আসছে। শুভেচ্ছা বার্তাগুলি নিয়ে আমরা একটি বুকলেট তৈরি করেছি। শুভেচ্ছাবার্তা এসেছে অস্ট্রেলিয়া কানাডা ইংল্যান্ড নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশ থেকে। হয়তো আরো সহযোগিতা পেলে আরো ভালো হতো। কিন্তু সদর্থক সহযোগিতা ও সাফল্যের দিক উল্লেখযোগ্য।
বহু দিনের পুরনো একটি কবিতার কথা মনে পড়লো আমার। নিজেকে উন্মুক্ত করার জন্য কবিতাটি দিলাম।
"হরিশচন্দ্র"
------------
এলে খালি হাতে এসো দু-হাত ভরে যাবে
এলে খালি চোখে এসো জল ভরে যাবে
এলে খোলা মনে এসো জ্বালা নিয়ে যাবে
এলে ভালোবাসা নিয়ে এসো প্রেম নিয়ে যাবে
এলে গোপনে এসো স্মৃতি নিয়ে যাবে
এলে সোজা পথে এসো নদী পথে যাবে
এলে কাশফুল হয়ে এসো কালি নিয়ে যাবে
এলে খালি পায়ে এসো নুপুর পরে যাবে
এলে গরল নিয়ে এসো অমৃত নিয়ে যাবে।
__________________________________________
এক হতভাগা মানুষের গল্প/ অমৃত মাইতি (৬)
আত্মসমালোচনা ছাড়া জীবন পূর্ণাঙ্গ হয় না। আমি আমার প্রিয় পাঠক বন্ধুদের বলি, আমারও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আমি সাজিয়ে গুজিয়ে লিখি না। আগে থেকে কোন পরিকল্পনাও আমার করা থাকে না। বোধ বুদ্ধি আবেগ ও নিষ্ঠা আমাকে লিখিয়ে নেয় সমাজ সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে। চলতে চলতে আমার পায়ের উপর নির্ভরতা বাড়ে। বলতে বলতে বক্তা হয়ে উঠি। আমাকে কেউ হাত ধরে শেখায় নি। আমি ভুল করি, শুধরে নিই। আমার অহংবোধ নেই, গোঁড়ামি নাই, গোঁয়ার্তুমিও নেই। মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে পড়ি, বিব্রত হই। কিন্তু আমার অস্থিরতার চেয়ে স্থির বুদ্ধি এতটাই বেশি যেখানে অস্থিরতা হার মানে। আমি বিব্রত হই অনেক সময়।কিন্তু আমার ধৈর্য এত বেশি যে বিব্রত হার মানে।
আমাকে জীবনে কেউ দায়িত্ব দেয় নি। সব সময় আমি দায়িত্ব নেব বলে যেন ঘাড় পেতে আছি। এই যে লোকটা মাথায় বোঝা নিয়ে চলছে তার কষ্টটা কেউ বুঝলো না। অথচ তার মাথাতেই আবার এমন অনেকে আছে আর একটু বোঝা চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে হালকা করে। এভাবে অন্যের বোঝা বইতে বইতে আমি চলেছি। পারব না, এই কথা কাউকে বলতে পারিনি। পারছি না, পা টলছে, আর বোঝা বাড়িও না আমার মাথায়। সত্যি বলছি পারছি না। কিন্তু তবু কাউকে বলতে পারছি না, আমার মাথায় আর বোঝা দিও না গো। কেমন একটা অভ্যাস হয়ে গেছে ,বোঝা নিয়ে চলতে চলতে হয়তো একদিন মুখ থুবড়ে পড়ে যাব। মরেও যাবো একদিন। তবু বলতে পারব না আমার মাথায় আর বোঝা চাপিও না।
এইসব জীবনের কথা লিখে গেছি। কিছু মানুষ আছেন কিছুটা পড়ে রেখে দিয়েছেন, সম্পূর্ণ করতে পারেননি।
আবার কিছু মানুষ আছেন যারা অন্যের কষ্ট দেখে কষ্ট পান, পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। অন্যের দুঃখের অংশীদার হওয়ার চেষ্টা করেন। পলায়নী মনোবৃত্তি তাদের নেই। তারা অনেকেই আমার লেখা ধৈর্য ধরে পড়েন এবং শেষ অবধি পড়েন। অনেকের মধ্যে দু একজনের নাম উল্লেখ করতে পারি অন্যান্য পাঠকদের একটুও ছোট না করে। প্রতিটি লেখা সুযোগ পেলেই পড়েন আমার এমন পাঠকের সংখ্যাও কম নয়। ফেসবুকে আমার প্রতিটি লেখা পড়েন প্রিয় কিন্নর রায় তুষার কান্তি সাহা রাতুল দেব বর্মন তাপস দেবনাথ মৃণাল চক্রবর্ত মৃণাল কান্তি দাস প্রবীর ব্রহ্মচারী টনি লাল পান্ডে দেবব্রত সেন স্বপন প্রামানিক চায়না ঘোষ অঙ্কন মাইতি প্রমূখ। আমার প্রিয় কয়েক শত পাঠক আছেন যারা আমার লেখা পড়েন, মন্তব্য করেন, পরামর্শ দেন। আমি সবচাইতে বেশি উল্লেখ করতে পারি যার নাম তিনি কিন্তু লেখক নন, একজন মনোযোগী সচেতন পাঠক শ্রী মানিক সরকার। আমার একটি বই "জীবন এক অভিজ্ঞতা"। উল্লেখ না করে পারছি না, একদিন মানিক সরকার মহাশয় আমাকে ফোন করে বললেন, এইমাত্র আপনার এই বইটি পড়ে শেষ করলাম। খুব ভালো লিখেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি মন্তব্য করলেন তিনি। এরকমই একদিন দুপুর বারোটার সময় ফোন করলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শিল্পী ও নাট্যকর্মী রজত বন্দ্যোপাধ্যায়। বইটি নিয়ে সকাল থেকে বসেছিলাম এইমাত্র শেষ করলাম। এমন ধরনের লেখা খুব একটা বেশি দেখি নি আমি । প্রয়াত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও এমন মন্তব্য করেছিলেন একদিন আমাকে। এক একটা পোস্ট মন্তব্যে ভরে গেছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। অঙ্কন, সুস্নাত জানা এবং তাপস বৈদ্য আমার একেবারে নিয়মিত পাঠক। বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দিয়েছেন তারা। সাংবাদিক তাপস দেবনাথ অশ্বিনী জানা বিকাশ চন্দ মঞ্জির বাগ আমার প্রতিটি লেখা পড়েন। আমার লেখা পড়েন কমলেশ দাশগুপ্ত। নিয়মিত অনিয়মিত পাঠকের সংখ্যা অন্তত ১০০০। সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এবং তারা প্রায় সকলেই লেখক। কিন্তু একজন মগ্ন পাঠক মানিক সরকার। তিনি লেখেন না কিন্তু একজন ভালো পাঠক। তিনি আমাকে বারবার উৎসাহিত করেছেন। ভালো লেখা দেখলেই তিনি বলতেন, চলে আসুন আগরতলাতেই উদ্বোধন হবে আপনার বই। আমি কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে।
আমার স্বীকার করতে আপত্তি নাই আমি কিন্তু ভালো পাঠক নই। একটা কথা চালু আছে লেখা পড়া। কিন্তু আমি মনে করি আগে পড়া তারপরে লেখা। না পড়লে লিখবো কী করে। রাজনৈতিক কারণে সময়ের অভাবে আমি অন্যের বই পড়ার সময় পাইনি। সময় পেয়েছি খুবই কম। জীবনে অভিজ্ঞতাটাই আমার কাছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বইয়ের পাতা। আমি যদি ধরে নিই জীবনটা একটা বই তাহলে সারা জীবনের শিক্ষার সুযোগ অনেক। শিখেছিও তাই জীবন থেকে। একটা ভালো কর্মী জীবনটাইতো পড়ার বই। তাই আমি পড়েছি কম লিখেছি বেশি। আমাকে যদি কেউ কম পড়া লোক মনে করেন ,আন্ডার এস্টিমেট করেন আমার তাতে কোন আপত্তি নেই। আমি অখুশি নই খুশিও নই। আমার একটি অভ্যাস বলে রাখা ভালো কোন বইয়ের মধ্যে, কোন লেখার মধ্যে যদি শ্রেণীদৃষ্টিভঙ্গি থাকে তাহলে আমার মন পড়ে থাকবে নিশ্চয়ই সেখানে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজের উল্লেখ থাকলেই আমি একটু মন দিয়ে পড়ি। তার মানে এই নয় যে অন্যান্য লেখার প্রতি আগ্রহী কম। নিম্নবর্গের মানুষের কথা লিখতে গেলে উচ্চ বর্গের মানুষের জীবন যাপন শোষণ বঞ্চনা এবং কারণ জানতেই হবে।। আমি যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালিত হই সে কথাই এখানে উল্লেখ করলাম।। আমার দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা আপনি করতেই পারেন, আমার কোন আপত্তি নেই। বিরক্ত হব না, স্বাগত জানাবো। আমার মধ্যে কোন সংকীর্ণতা নেই। সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমি অন্যকে দেখি না।
আমি মনে করি লেখকরা সমস্ত রকম সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ মানুষ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করবেন। সবকিছুর মূলে রয়েছে মানুষ, মানুষের ভালো-মন্দ, মানুষের বেঁচে থাকা মানুষের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য। একজন লেখক হিসেবে আমার এই দৃষ্টিভঙ্গির কথাই বলছি। রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে পাশাপাশি অনেক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু সাহিত্য আমার কাছে এক সুগন্ধি ধূপকাঠি। ভালো-মন্দ যাই থাক, সাহিত্যে আমি সেই সুগন্ধ অনুভব করি।
____________________________________________
সমাপ্ত-----
