##অমৃত অনুভব##সম্পাদনা/দেশ মানুষ পোটাল সুচিপত্র ১) এতটা সরল তুমি ((অমৃত মাইতি বন্ধুবর) মুহাম্মদ নুরুল হুদা।২) অমৃত মাইতির শব্দে পাথরে খোদিত প্রেম/সুস্নাত জানা।৩) অমৃত মাইতিকে নিয়ে/ড, হরিপদ মাইতি ৪) রাজনীতির অমৃত মন্থনে উঠা সাহি…
##অমৃত অনুভব##
সম্পাদনা/দেশ মানুষ পোটাল
সুচিপত্র
১) এতটা সরল তুমি ((অমৃত মাইতি বন্ধুবর) মুহাম্মদ নুরুল হুদা।
২) অমৃত মাইতির শব্দে পাথরে খোদিত প্রেম/সুস্নাত জানা।
৩) অমৃত মাইতিকে নিয়ে/ড, হরিপদ মাইতি
৪) রাজনীতির অমৃত মন্থনে উঠা সাহিত্য/আরিফ ইকবাল খান
৫) মেদিনীপুরের অমৃতরতন/ভাস্করব্রত পতি
৬) অমৃত মাইতি, এক সাহিত্য জীবন/সুস্নাত জানা
৭) কবি তীর্থঙ্কর অমৃত মাইতি/সুনীল মাজি
৮) কবি অমৃত মাইতি/মতিন বৈরাগী
৯) অমৃত মাইতির কবিতা অসম্পূর্ণ রেখা/মতিন বৈরাগী
১০) অমৃত মাইতি প্রবন্ধ ইতিহাসের আকর/তাপস দেবনাথ
১১)শুভেচ্ছা/পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার।
১২) অমৃত মাইতি - মুক্তির সূর্য উঠবে কবিতায়/মতিন বৈরাগী।
__________________________________________
#আমাকে নিয়ে কবিতাটি নুরুল হুদার লেখা, google থেকে পেলাম আজ।"কালি ও কলম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল#ভালো লাগলো বলেই বন্ধুদের জন্য দিলাম এখানে। ধন্যবাদ।
কালি ও কলম
এতোটা সরল তুমি (অমৃত মাইতি বন্ধুবরেষু)
মুহম্মদ নূরুল হুদা
এতোটা সরল তুমি এতোটা সহজ
এতোটা ভনিতাহীন এতো অভিমানী
ধর্মাধর্মে আস্থাহীন, স্থির কর্মধ্যানী,
তর্কসূত্রে গড়ে নাও অভেদের ঘর :
মানুষ-পতঙ্গ-ঘাস কেউ নয় পর।
মাটিকে আদর করে ডাকো তুমি ‘মা’
আগুন যদিও দাহ্য, বলো অগ্নিদেব,
জলের সান্নিধ্যে তুমি করো গঙ্গাøান :
সর্বভূতে লীন হতে তবে কার ভয়?
: এ মহাবিশ্বের মতো ব্যক্তিও অক্ষয়।
তোমার সারল্য দেখে জমেছে প্রতীতি
মানুষেরা স্বতঃশ্চল, নেই তার যতি।
ব্যক্তি যদি পরিচয়ে নয় অমানুষ,
মানুষ করে না কোনো মানুষের ক্ষতি।
অকারণ যতি দেখে কে থামায় চলা?
পুরুষ লাঙল-ফলা, রমণী সুফলা।
Published :
April
2013
____________________________________________
অমৃত অনুভব।।১
অমৃত মাইতির কাব্যে শব্দের পাথরে খোদিত প্রেম
সুস্নাত জানা
একজন জনগণের সঙ্গে থাকা বামপন্থী রাজনীতির মানুষের হাত থেকে যখন সাহিত্য, শিল্পকলার মতো নন্দনতাত্ত্বিক লেখা বেরিয়ে আসে, তখন আমরা একটু অন্যরকমভাবে তাঁকে ও তাঁর লেখাকে উপলব্ধি করতে চাই। একদিকে মেহনতি মানুষের জন্য সংগ্ৰাম, কৃষক, শ্রমিক, মজদুরের জন্য তাদের সঙ্গে থেকে তাদের মতো করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পর একজন চব্বিশ ঘণ্টার পার্টির সর্বক্ষণের কর্মীর অবসর সময়ে লেখা কবিতায় প্রধানত সেই সংগ্ৰাম, আন্দোলনই ফিরে ফিরে আসে। অমৃত মাইতির কবিতা এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী স্বাক্ষর নিয়ে এল আমার কাছে। তাঁর "সব অক্ষর পাথর হয়ে যায়" কলকাতার পত্রলেখা প্রকাশনা ২০০৭ এর প্রকাশিত কবিতার বইটি বিপ্লব, সংগ্ৰামকে পটভূমিতে রেখে গড়ে ওঠা একটি প্রেমের কবিতা সংকলন। একদম প্রথম কবিতা থেকেই এই স্পষ্ট উচ্চারণ:
“যদি কেনোদিন মনে পড়ে
ঝড়ের রাতে
তুষারপাতের মতো সশব্দে গড়িয়ে যায়
চোখের জল
জেনো, আমি বাস্তবের চাইতেও সত্য
চুম্বনের চাইতেও মধুর অনুগত
শূন্যতার চাইতেও অপরিহার্য।”
"অপরিহার্য "
এ প্রেম উচ্চারণ যদি বাংলাদেশের কবি মজিদ মাহমুদের হতো, যদি নির্মলেন্দু গুণ কিংবা শক্তি- সুনীলের হতো, তবে এরকম ঘোষণায় স্বচ্ছন্দ বোধ করতাম যে একবিতায় প্রেমই মূল চালিকাশক্তি। প্রেম এবং প্রেমই ব্যর্থতার সব দায়ভার বহন করেও টিকে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু এ কবিতা যখন একজন বামপন্থী রাজনীতিকের হাত থেকে বেরিয়ে আসে, তখন অন্য এক নন্দনের আকাশ আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। চুম্বনের মধুর স্বাদ, শূন্যতার বিপ্রতীপে অপরিহার্য হয়ে উঠে। আবার সংগ্ৰাম ও শ্রেণিসংঘাত রাজনীতিতে অপরিহার্য।
প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে অনেক সময় গভীর আবেশ বা deep passion ভাসিয়ে নিয়ে যায় সমস্ত ভাষাশৈলীকে। কবির অবলম্বিত ভাষার মেটাফোর ভেঙে তার ভিতরে ডুব দিয়ে তখন তুলে আনা যায় ভাবনার ভাস্কর্য। সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার ঐতিহ্যে এই deep passion-এর অসংখ্য উদাহরণ আছে, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, মজিদ মাহমুদ, রুদ্র মুহাম্মদ, শম্ভু রক্ষিত প্রমুখে। কিন্তু এই তীব্র আবেগে ভেসে যাওয়ার বিষয়টি অমৃত মাইতির কবিতায় সহজ লভ্য নয়, বরং চূর্ণ শব্দের ভেতরে সংগ্রামশীল জীবনের ব্যস্ততার ভেতর চাপা থেকে যায় তাঁর প্রেমিক হৃদয়ের আবেগী বাসনা। সেরকম "সম্পর্কের বকুল" কবিতায়:
“ঝরে গেলেও সম্পর্কের বকুল শুকোয় না কোনোদিন
সতেজ ঘ্রাণ তোলপাড় করে দুপুরের রোদ
তুমি নারী প্রতিক্রিয়াশীল
যদিও আমার কাগজ কলমের মাঝে তুমি শুধু একা বৃষ্টিস্নাত কদম যমুনায় ছায়া ফেলে
জল ভেঙে ভেঙে চলে দুঃখনদী
সোনালি ফ্রেমে বেঁধে রাখি তোমার বুকের আয়তন
দলছুট হয়ে যাব একদিন
গন্ধহীন পলাশ চুমু খাবে আমায়-”
এ কবিতায় কবি প্রেমিকাকে আশ্বাস দিয়েছেন, একদিন যে নৈকট্য ছিল, আজ ব্যস্ত সময়ের কাছে তা অসম্ভব হয়ে উঠলেও সে সম্পর্ক চিরশাশ্বত। ক্ষণিক বিচ্ছেদের যন্ত্রণা যদিও তোলপাড় করছে প্রেমিক হৃদয়কে, আজ হয়তো আর অবসর নেই কাছে যাওয়ার। কিন্তু তবু সেই পাওয়ার তীব্র আবেশ কবিতার ভাষায় ঝরে পড়ছে। আর সেই 'জল ভেঙে ভেঙে চলা দুঃখনদী-' যেন প্রেমকে তার যোগ্য মর্যাদা দিতে না পারার ব্যর্থ যন্ত্রণায় দুঃখের নদী হয়ে গেছে। তবু প্রেমিকের সঙ্গে একদিন যে গভীর শরীরের সান্নিধ্য ছিল, তার স্মৃতি আজ যখন মনে জাগে, তখন ঘনিষ্ঠ সেই মুহূর্তের অন্তরঙ্গতায়, তার বুকের আয়তন সোনালী ফ্রেমে বাঁধা থাকে। সে যেন গন্ধহীন পলাশের চুম্বনের মত জেগে আছে আজও। আর গোটা কবিতার ভিতর "তুমি নারী প্রতিক্রিয়াশীল" এই লাইনটি একজন সংগ্রামী মানুষের প্রাত্যহিক সমাজ ভাষার মতো। এখানে সম্পর্কের বকুল শুকায় না কোনোদিন; বৃষ্টিস্নাত কদম যমুনায়; জল ভেঙ্গে ভেঙ্গে চলে দুঃখনদী; তোমার বুকের আয়তন; গন্ধহীন পলাশ চুমু খাবে আমায়- প্রভৃতি শব্দগুলি শৈলীবিজ্ঞানের নিরিখে কবিতায় কেবল উল্লেখী (referential ) নেই আর, ক্রমে অনুভবী (emotive) হয়ে উঠেছে। যেরকম:
"নিজেকে পড়াবো বলে
তোমার ব্যাগ্ৰ বাহুতে
ঋতুর আগুন জ্বেলেছি-"
(কোন নক্ষত্রে জন্ম)
“যদি কোনদিন প্রণয়কোরক
আকর্ষণ করে তোমায়
সেদিন দ্বিধাহীন আমি
আন্দোলিত হবো
অপরিহার্য মর্যাদায়।"
(যদি কোনোদিন)
এরকম আরও অনেক কবিতার ভেতরে চূর্ণ স্তম্ভ জোনাকির মতো প্রেম জেগে আছে। এখানে ঋতুর আগুন জ্বেলেছি শব্দটি সরাসরি শরীরী ভাষায় কথা বলে।
অমৃত মাইতি প্রায় পাঁচ দশক ধরে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। রাজনীতি এবং সমাজসেবা তাঁর ধ্যানজ্ঞান হলেও কবিতায় তিনি নিবেদিতপ্রাণ। ব্যক্তিজীবনের বোধ- বিশ্বাসের মতো তাঁর কবিতাও সহজ সরল, প্রাণময়, ঋজু, আন্তরিক ও সত্য উচ্চারণে সমুজ্জ্বল। অনেকগুলি কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা অমৃত মাইতির কবিচরিত্রে কোনো মুখোশ নেই, কবিতায় তিনি কোনো আড়াল রাখেন না, উজ্জ্বল দিনের মতোই আলোকিত তাঁর কবিতাবলি। প্রেম- প্রত্যাঘাত কিংবা বেদনা-বিদ্রোহকে তিনি অত্যন্ত কুশলতায় একাসনে বসিয়েছেন। তাঁর কবিতায় কোনো উচ্চরোল নেই, অনৃতভাষণ নেই। তাঁর কবিতা মার্জিত, পরিশীলিত, স্বল্পভাষের বয়ানে বাঙময়। ২০০৭এ নন্দীগ্রামের এক ঘোরসংকট আরও অনেকের মতো তাঁর জীবনকেও ব্যাহত, বিপর্যস্ত করেছিল। তিনি নন্দীগ্রামেরই বামপন্থী কর্মী ও সংগঠক। কবি অমৃত মাইতি তাঁর ক্ষোভ, কষ্ট, যন্ত্রণা এবং প্রতিবাদকে এই গ্ৰন্থের কবিতার মধ্যে উন্মোচিত করেছেন। এই বিলোড়নের উত্তাপ ও ক্ষয়ের প্রতিসাম্যে দু'মাসে তিনি ৪২২টি কবিতা লিখেছিলেন। তছনছ সময়ের সেই অভিঘাত তাঁর এই বইয়ের অধিকাংশ কবিতায় বিধৃত। নিভৃত প্রাণের দেবতার মতো যাঁর হিতৈষণা এবং নিরন্তর তাড়নায় এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন কবি, সেই সময়ের অভিজ্ঞান 'সব অক্ষর পাথর হয়ে যাবে' শ্রীমতী চায়না ঘোষকে উৎসর্গ করা হয়েছে। বলা যেতে পারে, নেপথ্যচারিণী এই মহীয়সী রমণীই কবিতাগুলির অন্তঃপ্রাণ। কবিতাপ্রিয় পাঠক, আশা করা যায়, এই বই থেকে হয়তো অন্য এক আলো খুঁজে নেবেন। জীবনানন্দ বলেছিলেন, ‘আরো আলো মানুষের তরে এক মানুষির গভীর হৃদয়’।
এই কবিতার অনেকগুলির নামকরণ থেকে এই প্যাশনের ছবি লক্ষ্য করা যায়। যেরকম, আর এক জন্মের জন্য, লোভ হয়, আদিম আগুন, আশ্বাসের দুপুর, মৃদুল চোখ, সম্পর্কের বকুল, আকাক্ষা, তৃষা, বৃষ্টির সংলাপ, হলুদ মাঠ প্রভৃতি।
এই কাব্য রচনার পেছনে একটি কালগত বিপর্যয়ের স্মারকচিহ্ন আছে। প্রসঙ্গত পাঠকদের সে বিষয়ে জানিয়ে রাখি। আলোচনা প্রসঙ্গে অমৃতদা বলছিলেন, 'তখন নন্দীগ্রামে ২০০৭ সালের ঘটনা। সেখানে আন্দোলন চলছে। কবিতা একদম আসছে না। ভীষণ ছটপট করছি আমি, মনে হচ্ছে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মরে যাই, এ এক অসম্ভব যন্ত্রণা।' তাঁর মনে একরাশ হতাশা, কবিতা পালা সাঙ্গ করে ছেড়ে যেতে চাইছে তাঁকে। তখনই তাঁর মনের মধ্যে 'সব অক্ষর পাথর হয়ে যাবে'- র ভাবনা মাথায় এল।
সত্যিই কি অক্ষরেরা পাথর হয়ে যায়? নাকি বাইরেটাকে আবরণে ঢেকে ভেতরে এক অন্তর্গত নদীকে বহন করে নিয়ে চলেছেন কবি যে নদীতে তিনি প্রেম সাঁতারে আরোহী। অনেক কথার পাথর দিয়ে প্রণয়ীর মূর্তিই তিনি নির্মাণ করেছেন এ কাব্যে। এই পাথর চুঁইয়ে বয়ে চলেছে প্রেমের কবিতা। যেখানে নিরন্তর চলে ক্ষরণ প্রক্রিয়া। যে বুক চিরে ছুটিয়ে দেয় ঝর্ণাকে। পরে যা অনেক জলের সমাহারে নদী হয়ে ওঠে।
নদী নারী একাকার হয়ে গেছে এ কাব্যে অনেক বার, "তোমার ঠোঁটে ছিল এক গল্প/ চোখে ছিল এক নদী" (গল্প) কিংবা "নদীর জলে গা ধোয় যুবতী" (ইচ্ছামতী) বা "তুমি চঞ্চলা নদীস্রোতে/ নারীকে দেখেছি ঠিক তোমার মতো/ শষ্যকামনা সারাক্ষণ।" (পাথরে অন্ধকার)
তাঁর প্রসঙ্গে 'নির্বাচিত' সংকলনের কভারে জনৈক সমালোচক বলেছেন, 'তার ভেতরে যেমন আছে আগুন, সত্যের আগুন, তেমনি আছে প্রেম, নীলাকাশ কিম্বা গভীর সমুদ্রের মতো অফুরন্ত প্রেম। তাই তো তিনি রচনা করতে পেরেছেন জল, মাটি এবং আগুন মিশিয়ে নানা ধরনের গল্প, কবিতা, কাব্য, নাটক, উপন্যাস এবং প্রবন্ধ সম্ভার। তাঁর সব রচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় সমাজের প্রবঞ্চিত, গরীব, দুঃখী, সহায় সম্বলহীন মানুষদের মানুষের মতো করে বাঁচতে শেখানো আর কবি নিজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে 'কেন লিখি' তে বলেছেন, 'অন্তরের রক্তক্ষরণের কথাই কাগজে লিখতে চেষ্টা করি। শ্রেণি বিভক্ত সমাজে বঞ্চনার বিরুদ্ধে দায়বদ্ধতার জন্য সময় সময় লিখতে বসি।' তবে তাঁর বড় বৈশিষ্ট্য হল সহজ সরল গ্রাম্য জীবন, প্রকৃতি, সমাজ, রাষ্ট্র, শিল্প সংস্কৃতি, রাজনীতির কথা বলতে বসে-কখনোই তাঁকে শব্দের কাঠিন্যে ভারাক্রান্ত করেননি। পাঠকের কাছে সহজেই ধরা দেয় তাঁর মনের ভাবালুতা। তাই রূপক গ্রন্থনে তাঁর এ কাব্য শুধু কথা বলে না, চোখের নোনাজলে ভিজতে থাকে শরীর পাথর। এরকম ভাবনার কবি যখন প্রেমকে পাথরের বিপ্রতীপে
স্থান দেন, তখন পাথরের অক্ষর কবিতা হয়ে ওঠে।
'পাখি' কবিতায়- যেন ডানার সশব্দ উড়ান। এ ছন্নছাড়া। ঘর বাঁধে না। পরিযায়ী। মরশুমী বাতাসের গন্ধে ভর করে ঘর ভাঙে গড়ে। আর তাদের এতেই আনন্দ। বুকের কাছে নিবিড় হয় দুঃখঘন ঘাস। সন্ধ্যারাগে অস্তমিত হবে জেনেও বর্ণময় আকাশের সন্ধানে পথ চলা। সূর্যও দিনের সায়াহ্নে রঙ ছড়িয়ে দিয়ে যায়। সেই রঙ ডানায় মেখে পাখিরাও ভেসে বেড়ায় অখণ্ড আকাশে। এ পাখি শুধু পরিযায়ী নয়, নিভৃতে জীবন খাঁচায় বন্দী কোনো পাখি? যে বাতাসে ভাসতে ভালোবাসে। যে আসে আর যায় ছন্নছাড়ার মতো। 'দেনা' কবিতায় ঋণ-এর কথা বলতে গিয়ে বাগানে কুঁড়িদের কথা বলেন। এরা যদি পাখনা মেলতে না পারে, তা কবির কাছে যন্ত্রণার। কবির হৃদয়ে সদ্যোজাত কুঁড়িরা উন্মুখ হবার জন্য বসে থাকে। কবি তাদের ডানা খুলে দিয়ে তাতে ভর করে ভাসতে চান। -তখন খোঁজ করেন বেসামাল বাতাস, যেখানে "শোধ হয়ে নিশ্চয় / অনুরাগে রাঙা হবে তোমার আকাশ।" মানুষের জন্য সংগ্ৰাম, প্রেম মিলেমিশে একাকার।
'নিভৃত অন্ধকারে' কবিতায় খনন কার্যে নামেন। অন্ধকারের প্রতীকে নেমে আসে একরাশ হতাশা। তার মাঝেও রঙীন স্বপ্নগুলোকে নিয়ে ডুব দিতে চান। সেখানেও রঙীন বসনের ছবি মনে দাগ কাটে আকাশময় ছড়িয়ে থাকা অবসাদেরা এখানে ইর্ষাপরায়ণ নয়। কিন্তু তবু 'তুমি' কে আশ্রয় করে কামনার মোহবহ্নি প্রজ্জ্বলিত রাখতে হয় 'আমি' কে আহুতি দেবার জন্য। হতাশার মাঝেও জীবন জড়িয়ে ধরে ভীষণ বাসনা। 'সাক্ষী' কবিতায় আপাত বিক্ষিপ্ত চিত্রের আশ্রয়ে প্রিয় নারীর ছবিই জেগে থাকে। বিচ্ছেদের পরও তার ফিরে আসা প্রেমিক হৃদয়কে এমনই আলোড়িত করে, স্মৃতির কথামালা ছুঁয়ে চোখের তারায় বিপ্লবের 'অনুপ্রবেশকারী' অপরিহার্য হয়ে উঠে। এত পাণ্ডুরতার মাঝেও জেগে থাকে 'অপেক্ষার বটগাছ কুয়াশার গ্রাম'। নিরাশ্রয় হয়ে কারো চোখে আশ্রয় নেবার জন্য অনুপ্রবেশ করতে হয়। হারানোর যন্ত্রণাও প্রাপ্তিকে ফিরে পাবার সম্ভাবনায় বেঁচে থাকে। জীবনের এই বোধ, এরকমই প্রবহমান প্রেমের অন্তর্লীন স্রোত।
'গল্প' কবিতায় "তোমার ঠোঁটে ছিল এ গল্প / চোখে ছিল এক নদী।" -এ নদী বিরহের বা বিলাসের। নির্জনে নেমে আসে চোখের ক্ষরণ। এ নদী একান্ত নিজস্ব। শরীর সর্বস্বতা নয় 'দেহের পাশে শুয়ে থাকা প্রেম আর্তনাদ করে।' শরীর নির্মাণকে নিয়ে ভাঙার খেলায় মাতেন। প্রেম কিন্তু সৌন্দর্যের অতন্দ্র প্রহরী। তাই 'শরীর অপরিহার্য নয় স্বপ্ননীলে'। হৃদয়ের মগ্নতা থেকে উঠে আসা কোলাজ। 'স্পর্শ' কবিতায় ফিরে দেখা। স্মৃতির ভূমিতে পা রেখে মানুষ বড় অসহায়। স্মৃতি হাত ধরে যেন দূরের দেশে নিয়ে যায়। তবু কারো বাল্যস্মৃতি রোমন্থনে দৃশ্য হয় 'ঝুকে থাকা জৈষ্ঠ্যের তৃষ্ণার্ত মেঘ / নাগচম্পার স্বপ্নবীজ পরকীয়া / প্রপাতের সবটুকু জলে/ ধুয়ে নাও মনের শরীর।'—পরকীয়াতত্ত্বের প্রতীপে পুরাণ সত্যের কাছে সমর্পণ। নস্টালজিক প্রেম ঘ্রাণ নেয়। এই পরকীয়া কৌমার্য হরণ করে। আমোদী বসন্তকে দু- বাহুতে আঁকড়ে ধরে মনের মধ্যে নির্ভয় জলতরঙ্গ কোথায় যেন টুং-টাং আওয়াজ তোলে। তবু মনের উপবনে যৌবন খেলা করে। কপালে কলঙ্ক টিপ দেখে নিজের উপর অভিমান হয়। এই অভিমান পরকীয়ার। একালের বিপ্লবী কবি এই পরকীয়ায় ভেসে চলে। আধুনিক কথাসাহিত্যের রোহিনী, কুন্দ, লবঙ্গলতা, বিমলা, কিরণময়ী, অচলা, কুসুম, কলিপা, ভানুমতীদের মতো। 'এই হৃৎপিণ্ড' কবিতায় 'খাবে তো খাও এই হৃৎপিণ্ড / এখনও সময় আছে / পড়ন্ত বিকেলে দীর্ঘ হচ্ছে ছায়া।' জীবনের অস্তরাগে দাঁড়িয়ে সে যেন নদীর মতো খরস্রোতা হয়ে উঠতে চায়। নানা ছন্দ বিভঙ্গে ভাঙতে থাকে গ্রন্থি অবয়ব। এক সমাজ সচেতন মানুষের শানিত চোখ একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। দখলদারির জগতে দরজা বন্ধ রাখতে হয় উৎপাত-এর হাত থেকে বাঁচার জন্য। এখানে 'গ্রীবায় গেঁয়ো গন্ধ ঘাম / প্রতিদিন প্রতিক্ষণে হরিদ্রা বনে / তোমার আঁচল খসে পড়ে।' ঘামগন্ধ, হরিদ্রা, আঁচল শব্দের প্রতীকে মঙ্গলের প্রতিমূর্ত হয়ে ওঠে। দোলাচলতায় দীর্ণ হয় হৃদয়। লুঠেরা সময় ওঁৎ পেতে থাকে। তবুও ঘ্রাণ নিয়ে বলতে হয়- 'এই নাও হৃৎপিণ্ড / জলে ভেজা সারস নয় / ভালোবাসা কিংবা বেদনায় / যেভাবে পারো চেটে নাও।' সমকালের বাংলা কবিতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও একই কথা বলেছেন, 'চোখবাঁধা' কবিতায়।
'ঋণ' কবিতাটি চিত্রকল্পের ব্যবহারে বহু মাত্রিক হয়ে ওঠে। একদিকে সমাজের দগদগে ক্ষত, অন্যদিকে প্রেম নিবিড়তা থেকে সৃষ্টি হয় অক্ষরের কাঠামো। প্রতিমুহূর্তে ঘাপটি মেরে আছে বিষাক্ত ছোবল, এ ছোবল কার? কোনো প্রেমিকার? নাকি সমাজের পালিশ করা কোনো সরিসৃপের। 'নীল বিষে নিঝুম হয় রক্তবহ শিরা/ বড় ঘুম আসে চোখে।'—অব্যক্ত ধ্বনিপুঞ্জের আর্তনাদ। গরল পান করে তাকে উগরে দেবার বদলে আত্ম সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হয়। 'হিসেবের ভুলে যে নক্ষত্রের জন্ম হল / তা আজ বড্ড বেমানান।' -জীবন বোহেমিয়ান হতে গিয়ে যেন হিসেব নিকেশের তুলাদণ্ডে পেন্ডুলামের মতো দোল খায়। এদিক-সেদিক হলেই পানপাত্র ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তখন সেই ভাঙা জলে প্রতিবিম্বরা কুৎসিত মুখ দেখায়। তবুও জীবনের শেষ পুঁজির কড়িকে কোঁচড়ে বেঁধে নিয়ে বার বার নিজের মুখের কাছে বসতে হয়। তীব্র যন্ত্রণা থেকে আত্মউন্মোচনের বিষবাষ্প বেরিয়ে যায়। কিছুটা অভিমান পলায়নমুখী করে তোলে। আবার Es- capist হবার আত্মকেন্দ্রিকতাও বার বার ছোবল মারে। -কিন্তু তার পরেও মানুষের ভেতর থেকে নতুন মানুষটা বেরিয়ে এসে বলে, 'এখনও শরীরের কঙ্কালে কিছু মাংস লেগে আছে।' -ভিক্ষার পাত্র হাতে নয়, হৃদয়ের দরজা হাট করে খুলে দিয়ে 'তোমার কাছে আজ পেতেছি হাত' আত্মমগ্নতা নিয়ে কাঠামোর বিসর্জন। -শুধু হাত পাতা নয়, প্রয়োজনে নীলাক্ষিও উপড়ে ফেলতে হয় প্রয়োজনে একরোখা বর্শার আঘাতে। নতজানু হওয়া ভিখারী করে না, অন্যকে ঋণগ্রহীতা করে তোলে। যেমন করে গিরীশ রামকৃষ্ণকে বেঁধে ছিলেন ঋণের পাশায়। -এ যেন অধরা মাধুরী, বড় অভিমানী, চঞ্চলা, পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়, হাত ছোঁয়ালেই ভেঙে পড়ে। আর্তরব ওঠে, 'ভো! ভো! রাজন আশ্রমো মৃগোহয়ং ন হন্তব্যো ন হন্তব্য!' ঋণ অপরিশোধ্য জেনেও তার দেওয়া-নেওয়া পালা চলে। জটিল আবর্তের ঘূর্ণি তরঙ্গে পানসি ভাসিয়ে প্রেমের পাল ও হালকে আঁকড়ে ধরে হতে হয় উজান স্রোতের মাঝি।
অমৃত মাইতির জন্ম ১৯৪৫- এ। রাজনীতি সমাবেশে বয়স বেড়ে গেছে। প্রেম ও প্রণয়ীকে সময় দেওয়ার অবসর নেই, তবু ভালোবাসার প্যাশনে শেষ বারের মতো ভেসে যাওয়ার বাসনা মনে। অনেকটা রবীন্দ্রনাথের 'পূরবী' কব্যের পথিক অংশের কবিতার মতো সময় শেষ হয়ে আসার গান। জন ডান বা ষোড়শ শতাব্দীর কুটুল্লাসের কবিতায় ব্যবহৃত কার্পেডিয়ম্ তত্ত্বের যোগ আছে 'এই হৃদপিণ্ড' কবিতায়:
“খাবে তো খাও এই হৃৎপিণ্ড-
এখনও সময় আছে
পড়ন্ত বিকেলে দীর্ঘ হচ্ছে ছায়া
খর রৌদ্রের সঙ্গে দুঃখ শোকের অদ্ভুত মিল
শুষে নিতে পার নাকি?
শুধু মানচিত্রের দখলদারি বাড়ায়
এই দেখ দুঃখ-দরজা করেছি বন্ধ
তোমার স্বভাবের নষ্টামি চুল উড়ছে-
গ্রীবায় গেঁয়ো গন্ধ ঘাম
প্রতিদিন প্রতিক্ষণে হরিদ্রাবনে
তোমার আঁচল খসে পড়ে
স্মৃতি ছুঁয়ে জানালার পর্দা লজ্জা ঢেকে রাখে।
এই নাও হৃৎপিণ্ড,
জলে ভেজা সারস নয়
ভালোবাসায় কিংবা বেদনায়
যেভাবে পার চেটে নাও।”
যুদ্ধের শেষে সন্ধিচুক্তি হয়। -পরাজয় থেকে আত্মসমর্পণ বাধ্যবাধকতার সম্পর্কে। কিন্তু যখন নিজেকে নিজের কাছে সন্ধি প্রস্তাব এনে নতুন শুদ্ধ সন্ধির জন্য হাত বাড়াতে হয়, তখন তা রোমাঞ্চকর। যেরকম 'সন্ধি' কবিতায় কবি লেখেন: "যুদ্ধে একজন মরে/ দুইজন মরে প্রেমে/ কোন্ যুদ্ধে রাজি তুমি/ আর জিজ্ঞাসার কোনো অবকাশ নেই -/ এসো সন্ধিচুক্তি করি"
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবি,প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অমৃত মাইতির জন্ম ১৯৪৫-এর ১৩ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থানার শিবরামপুর গ্রামে। বাবা প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপচন্দ্র মাইতি, মা করুণাময়ী। অমৃত মাইতি একজন বামপন্থী আদর্শের সৈনিক, কৃষক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই তিনি অগ্রণী। সাহিত্য সাধনাতেও তিনি সমান সফল। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ থেকে তিনি একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। কানাডার মন্ট্রিওলে কানাডা-বাংলাদেশ সলিডিটারির আমন্ত্রণে 'মহান একুশের বইমেলা'য় একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে 'একুশে পদক' গ্রহণ করেন। কাব্য, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, নাটক, কাব্যনাটক, প্রবন্ধগ্রন্থ মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০০ ছুঁয়ে গেছে। দেশ বিদেশের সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষের কাছে অমৃত মাইতি পৌঁছুতে চান তাঁর সাহিত্যের দ্বারা। সারা জীবনের আন্দোলন, বিপ্লবের ডাক, লালঝাণ্ডার হাতছানির মধ্যে দাঁড়িয়েও তাঁর এই প্রেমের কবিতা মনের লাল উত্তাপের স্বাক্ষর। শেষ কবিতায়ও একদিন সব অক্ষর পাথর হয়ে যাবে, ডানা মেলা পাখি স্তব্ধ হবে, চাঁদ ডুবে যাবে- তখনও প্রেম জেগে রবে- এই স্থির আশাবাদে এ কাব্য আগামীর অভিসারী।
________________________________________
অমৃত অনুভব ......
অমৃত মাইতিকে নিয়ে
___________________
ড: হরিপদ মাইতি
আমি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত হলাম যে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের এক শুভক্ষণে নিমতৌড়ি তমলুক উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে অমৃত গ্রন্থাগারের শুভ উদ্বোধন হচ্ছে। বেশি ভালো লাগছে এ কারণে যে আমাদের জেলার একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও কবি, সেইসঙ্গে যিনি রাজনীতির একান্ত সাধক থেকেছেন সারা জীবন ,সেই শ্রদ্ধেয় অমৃত মাইতির নামে এই গ্রন্থাগারটি উৎসর্গীকৃত হচ্ছে। আমাদের জেলার অগ্রগণ্য সাহিত্যিকদের মধ্যে অমৃতবাবু অন্যতম এবং তার লেখা অজস্র বই (প্রায় একশত) আমাদের দেশের এবং বিদেশের বাঙালি পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্মানেও সম্মানিত। সুতরাং প্রাথমিকভাবে তাঁরই দেওয়া বই দিয়ে যে লাইব্রেরি আমাদের জেলার কেন্দ্রস্থলে উদ্বোধিত হচ্ছে তার একটা সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য এবং আমার স্থির বিশ্বাস , অচিরে গ্রন্থাগারটি সমৃদ্ধ হবে এবং জেলার মননশীল পাঠকদের আকৃষ্ট করবে। আমি সকলের কাছে আবেদন করব, যাঁদের পক্ষে সম্ভব হবে তাঁরা যেন তাঁদের নিজস্ব গ্রন্থভাণ্ডার থেকে কিছু বই গ্রন্থাগারটিকে উপহার হিসেবে দেন। গ্রন্থাগারটি শিক্ষায় সেরা শিরোপা পাওয়া জেলার একটি গর্ব হিসেবে আগামী দিন আরো আরো অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাবে।
অনেকের মনে হতে পারে, যেভাবে বইয়ের পাঠক কমে যাচ্ছে তাতে এ ধরনের গ্রন্থাগার তৈরির উপযোগিতা কোথায়। একটা কথা স্পষ্ট ভাবে আমাদের জেনে নিতে হবে যে, বইয়ের আবেদন শাশ্বত এবং অনাগত আরো সহস্র সহস্র বছর ধরে তার অবদান মানুষের কাছে থাকবে। একটা গ্রন্থাগার সহস্র সহস্র বছরের প্রজ্ঞার সমাহার। বই শুধু আমাদের প্রতারিত -না- করা শ্রেষ্ঠ বন্ধু নয় ,বই আমাদের নান্দনিক তৃপ্তির জগতে পৌঁছে দেয়। তাই শেক্সপিয়ার তাঁর একটা নাটকে বলেছিলেন-"Come,and take choice of all my library,/And so beguile thy sorrow."
অমৃতবাবু ও যোগেশবাবুকে আমার অশেষ কুর্ণিশ।
নমস্কারান্তে,
হরিপদ মাইতি,প্রাক্তন অধ্যাপক,
মহিষাদল রাজ কলেজ। মহিষাদল।
_________________________________________
অমৃত অনুভব
অমৃত মাইতি: এক সাহিত্য জীবন
সুস্নাত জানা ( এক )
অমৃত মাইতি এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। অমৃত মাইতির জন্ম ১৯৪৭-এর ১৩ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থানার শিবরামপুর গ্রামে। বাবা প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপচন্দ্র মাইতি, মাতা করুণাময়ী। নন্দীগ্রামের গ্ৰাম থেকেই লেখাপড়া করে কলেজ জীবন থেকেই তিনি ভূমিহীন কৃষকদের জমির লড়াইয়ে নেমে পড়েন। ভূপাল পণ্ডার মতো তেভাগা আন্দোলনের নেতা তাঁর অনুপ্রেরণা। আবাসবাড়ি হাইস্কুল থেকে পাশ করার পর অমৃত মাইতি প্রথমে মুগবেড়িয়া কলেজ থেকে পার্ট ওয়ান, পরে নন্দীগ্রাম এবং বাজকুল কলেজে পড়তে পড়াতেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি শুরুতে ছিলেন মূলত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি, বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী একজন নেতা, কর্মী ও সংগঠক। ছাত্রাবস্থা থেকেই আজীবন বামপন্থার প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও নিষ্ঠা রেখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কৃষক, মজদুর, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র-শিক্ষক সংগঠন; পার্টির রাজ্য নেতৃত্ব, জাতীয় নেতৃত্ব দিয়েছেন, বামফ্রন্টের সভায় সভাপতিত্ব করেছেন এবং করছেন- এসব বিশিষ্ট সাধারণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আজ অমৃত মাইতি একজন সাহিত্য সেবক। সাহিত্যের সব শাখাতেই তাঁর সমান স্বচ্ছন্দ বিচরণ। আর এই শাখাতেই তিনি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে ছুঁতে পেরেছেন। ২০১৯ এর একুশে ফেব্রুয়ারি তিনি মন্ট্রিঅলে আমন্ত্রিত হয়ে মহান আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে একুশের পদক সম্মাননা গ্রহণ করেছেন। এদেশে ও বাংলাদেশে তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ ও উপন্যাস-গল্পের অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। 'অক্ষরকর্মী' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। জীবনানন্দের জন্মশতবর্ষ থেকে 'আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার' দিয়ে আসছেন শতাধিক দেশী বিদেশী সাহিত্য সেবকদের। তিনি দশবার আমন্ত্রিত হয়েছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক জাতীয় কবিতা উৎসবে। বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, অসম, আন্দামান, ঢাকা, টাঙ্গাইল, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সোনারগাঁও- সর্বত্রই তিনি সাহিত্যের উচ্চ সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। আমি তাঁর সঙ্গে একাধিকবার বাংলাদেশ-ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম গিয়েছি অসংখ্য সাহিত্য সভায় ও আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে। দেখেছি সে সব জায়গায় তাঁকে নিয়ে সব শ্রেণির মানুষের উন্মাদনা। সর্বত্রই তিনি যাঁদের সঙ্গে নিয়ে গেছেন, তাঁদেরও সমান মর্যাদা দিয়েছেন। একাধিক জায়গায় আমি তাঁর সহযাত্রী হওয়ায় সুবাদে দেখেছি বিদেশী সংবাদপত্রে আমাদের সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা কি ত্রিপুরা, কি চট্টগ্রামে- এ কেবল তাঁর ব্যক্তিত্বের মহত্বে। ইতিমধ্যে তাঁর বৃহদায়তনের 'প্রবন্ধ সমগ্র' প্রকাশিত হয়েছে। 'নির্বাচিত অমৃত' ও 'বর্ণময় অমৃত' চিনিয়ে দেয় সাহিত্যসাধক অমৃত মাইতির সাহিত্য সংস্কৃতির বিরাট অবদানকে।
এরকম একজন বহুমাত্রিক মানুষের আত্মজীবনী আমাদের কাছে দীর্ঘদিনের তৃষ্ণার্ত প্রতীক্ষার পর এক পশলা বৃষ্টির মতো, সমস্ত প্রাপ্তির প্রত্যাশাকে ছুঁয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই আত্মকথা প্রকাশিত হতে চলেছে 'মাটি মানুষ ভালোবাসা' নামে।
আবারও নামকরণের মধ্যে দিয়ে মানুষের পাশে থাকা একজন মানুষের, মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসার আশ্চর্য স্বাক্ষর বয়ে নিয়ে চলেছে এই রচনা।
এই স্মৃতিকথা অদ্ভুত স্পর্শময় সহজ সরল ভাষায় লেখা ঝরঝরে মেদহীন গদ্য। ছেলেবেলা থেকে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের বর্ণময় এক যুবকের দেশ ও মানুষের জন্য আত্মোৎসর্গ করা এক রাজনৈতিক কর্মীর আশ্চর্য শ্রম রক্ত স্বেদ ঝরানো দিনলিপির মতো। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে তেভাগা আন্দোলন, ভূমি সংস্কার সংগ্রাম থেকে নন্দীগ্রামের গণ-আন্দোলন, রাজনৈতিক সম্পর্কের আম্রেড়িত উত্থান পতন থেকে ব্যক্তি সম্পর্কের নানা রসায়ন। অকপট সত্য উচ্চারণ যখন প্রায় রূপকথার রাজকন্যার মতো অদৃশ্য, তখন অমৃত মাইতির এই লেখা পড়তে পড়তে চমকে উঠি। সমস্ত শ্রেণির মানুষকে সমান ভালোবাসা- মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন এক সমীকরণ আমাকে তাড়িত করে বার বার, যখন এই সভ্যতায় প্রতিদিন ঘরহীন মানবিকতা আমাদের অভ্যস্ত ব্যসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হয় যেন সত্যি কোন রূপকথার দেশে পৌঁছে গেছি, যেখানে সোনার কাঠির স্পর্শে আশ্চর্য এক রাজপুরীর রাজত্ব আর রাজকন্যা ফিরে পেয়েছি, পেয়েছি ভালোবাসা। একমাত্র ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু জয় করা যায়। বাংলাদেশর আদিগন্ত প্রসারিত গ্রাম আর গ্রামের সোঁদা মাটির গন্ধ, পুকুর খাল বিল নদী নালা পেরিয়ে মহানগরীর আশ্চর্য আলোর গোলকধাঁধা আর সমুদ্র আর বরফের দেশের গল্প। মন্ট্রিঅল থেকে কর্ণফুলী, পদ্মার ইলিশ থেকে আন্দামানের কালাপানি- আর রাতের অন্ধকারে হিজরি টাইটাল ক্যানেলের পাশ দিয়ে হেঁটে চলার মেঠো গল্প, মাছের আঁশটে ঘ্রাণ, পাকা ধানের সুবাস। জেলখানার গরাদ আর কেরলের কুইলন নগরীর অপরূপ নাগরিক সমাবেশ, কক্সবাজার থেকে কন্যাকুমারী, শীতলক্ষ্যা থেকে ধলেশ্বরী- স্রোতের প্রবাহের মতো অমৃত মাইতির জীবনের অসংখ্য উত্থান-পতন ও বহমান জীবনের এক অশ্রুত লিখন এই 'মাটি মানুষ ভালোবাসা'। এ বইয়ের গদ্যলিখনের পাশাপাশি কবিতার আশ্চর্য সমান্তরতা আমাদের মানসিক শান্তির অবগাহন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ধারাবাহিকভাবে এই লেখা প্রকাশিত হওয়ার সময় দেশ ও বিশ্বের অসংখ্য মানুষ ক্ষুধার্তের মতো প্রতীক্ষা করে থাকতেন পরবর্তী লেখার জন্য। অসংখ্য মানুষ প্রতিটি পোস্টিং-এ তাঁদের সুচিন্তিত মতামত, ভালোলাগা-মন্দলাগার আবেগ তাড়িত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে নেতৃত্ব হয়ে ওঠার অকপট সংগ্রামের কাহিনী এই গ্রন্থ। এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহ নানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্য সেবকদের সমরেখ জীবনকথা যেমন লেখা হয়েছে, তেমনই লেখকের নিজস্ব জীবন দর্শনও ফুটে উঠেছে অনায়াস দক্ষতায়। কোথাও কষ্টকৃত কলম চালনা নেই, স্বতস্ফূর্ত গল্পকথনের স্বচ্ছন্দ প্রয়াসটি যে কোনো পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করবে। লেখকের এই গ্রন্থরচনা পরিকল্পনার আঁতুড়ঘর থেকে লেখার জন্য আর্তি, বেড়ে ওঠা এবং পুস্তক আকৃতি দান পর্যন্ত আমি সঙ্গসৌভাগ্য লাভ করেছি বলেই হয়তো এই ভূমিকা লেখার অধিকার পেয়েছি। এখন অসংখ্য দেশ বিদেশের বিপুল বাঙালি পাঠকের আগ্রহের দিকে তাকিয়ে থাকলাম এই আশা নিয়ে, যে তাঁরা একটি অনন্য জীবনচরিত হাতে নেবেন।
২৪ জুলাই ২০২২
ড. সুস্নাত জানা
কবি ও প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক
মেদিনীপুর কলেজ ও মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়
__________________________________________
অমৃত অনুভব.........
রাজনীতির অমৃতমন্থনে ওঠা সাহিত্য
আরিফ ইকবাল খান
মন্ট্রিয়ল থেকে চট্টগ্রাম । অবাধ গতিবিধি তার । বয়স থমকে দাঁড়িয়েছে ।আজীবন বামপন্থী রাজনীতি করা মানুষ । কিন্তু সাহিত্যের কারনে তার স্বতন্ত্র পরিচয় । অক্ষরকরমী পত্রিকা সম্পাদনা করেন । ভুমি সংস্কার , তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে নন্দীগ্রামের গণ আন্দোলন তার লেখার বিষয় । নিজেও সক্রিয় । হলদি থেকে কর্ণফুলি , হিজলি টাইড্যাল ক্যানেল পাড় ধরে রাতের অন্ধকারে হেঁটে যাওয়া এক কবি অমৃত মাইতি । নিজের এলাকায় যা পরিচিতি তার চেয়ে বহুলাংশে জনপ্রিয় অন্য রাজ্যে , অন্য দেশে । অভিমানী এক বিষণ্ণ বালক আশির পেরোনো অমৃত মাইতি ।
প্রশ্ন - কানাডার মন্ট্রিওলে ২০১৯ সালে ( করোনার আগে ) কানাডা-বাংলাদেশ সলিডিটারির আমন্ত্রণে 'মহান একুশের বইমেলা'য় একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে 'একুশে পদক' গ্রহণ করেন আপনি ?
উত্তর - কানাডা ও একুশে ফেব্রুয়ারি১৮ জানুয়ারি ২০১৯ আমার জীবনের একটি অমূল্য স্মৃতি। আমার অভ্যেস ঘুম থেকে উঠে ই-মেল সার্চ করা। অবাক কাণ্ড। কানাডার মন্ট্রিয়েল থেকে মেল এসেছে। একুশের বইমেলায় আমন্ত্রণ। আমন্ত্রণ এসেছে কানাডা বাংলাদেশ সলিডারিটির পক্ষ থেকে। এমন একটা চিঠি পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়। ওঁরা কবি অমৃত মাইতিকে এই সম্মান দিয়েছেন। ভেবে ভালো লাগলো।কিন্তু দূরত্বটা অনেক। আকাশপথে ২২ ঘন্টা সময় লাগে। শুনেছি গোটা দেশটা বরফে ঢাকা। যাওয়ার কথা ভাবলে রোমাঞ্চিত হই, আবার ভয়ে কুঁকড়েও যাই। ঘনিষ্ঠজনেরা সকলেই বারবার বলছে, আপনাকে যেতেই হবে।মেলের পর মেসেঞ্জারে ফোন এল জিয়াউল হক জিয়া-র। আমাকে একুশে পদক দেওয়া হবে । আমি এক বৃদ্ধ মানুষ । ক্যানসার ছাড়া সব রোগ আছে । আমি কি পারব দোহা থেকে একা এত দীর্ঘ বিমান যাত্রা করতে । মনে সংশয় ছিল ।আর একটি কথা মনে পড়ছে , ইনডোরে মেলা হয় । উদ্বোধনে ৭০০-৮০০ বাঙালি
প্রশ্ন – বরফের দেশে কেমন ছিল সেই বইমেলা ?
উত্তর - পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধিরা এসেছেন। এমন একটা আন্তর্জাতিক বইমেলায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে থাকতে পারার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, এর চাইতে বড়ো স্মৃতি আর কী হতে পারে। ভারতের একমাত্র প্রতিনিধি আমি। 'একুশের পদক' দেওয়া হ'ল আমাকে। নিজেকে গর্বিত মনে করলাম। হয়তো অতটা যোগ্য নই। তবুও ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি ভালোলাগাকে অস্বীকার করা যায় না। পরের দিন ভয়ংকর বরফের ঝড় বইছে গোটা কানাডাতে। টরেন্টো থেকে শুধু আমার সাথে দেখা করার জন্য ছ-ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এসেছিল। কিছু বই ও একটা হাতঘড়ি দিলেন আমাকে। ২০০৩ সাল থেকে দুলালের সাথে আমার সখ্যতা। সমাপ্তি অনুষ্ঠানে হলভর্তি পাঠক-পাঠিকা, অনুরাগী, বুকসেলার্স সকলে উপস্থিত। আমি বক্তৃতা দিচ্ছি বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালিয়ানার উপর। মন্ত্রমুগ্ধের মত সকলে বসে শুনছেন। কোনো শব্দ নেই হলের মধ্যে। বক্তৃতা শেষ হলে ছবি তোলার ভিড়। ছোটোরা এসে প্রণাম করল, বড়োরা জড়িয়ে ধরল। একটি অল্প বয়স্ক দম্পতি প্রণাম করে বললে, মামা ভালো আছেন। কোনো কষ্ট হয়নি তো আপনার? আমি অবাক হয়ে তাকালাম তাদের দিকে। তারা বললে, আমাদের বাড়ি ময়মনসিংহ। আমার মায়ের নাম সালমা বেগ। মা আপনার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় থাকো তোমরা? উত্তরে বললে, কুইবেক শহরে। আমি বললাম, এই ঝড়ের মধ্যে এসেছ তোমরা। ভালো লাগল। খুশি হলাম। তোমরা কি ফিরে যাবে? ওরা বলল, আপনার বক্তৃতা শুনছিলাম, খুব ভালো লাগছিল। সেই রাতে ওরা কুইবেক ফিরে গেল। আমি গেলাম শামসাদ রানার আমন্ত্রণে, তার বাড়িতে।যে-কথাটি না বললে নয়, তা হল ঠাণ্ডায় পা কনকন করছে। রানা বুঝতে পেরে পায়ের কাছে হিটারটা বসিয়ে দিয়ে চলে গেল ।
প্রশ্ন - আপনার ছোট বেলা কেটেছে হিজলি টাইড্যাল ক্যানেলের খাল পাড়ে ?
উত্তর – আমার জন্ম জন্ম ১৯৪৭-এর ১৩মার্চ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থানার শিবরামপুর গ্রামে। বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপচন্দ্র মাইতি, মাতা করুণাময়ী।আমাদের বাড়ি ছিল খাল পাড় থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে। চারদিকে গাছ গাছালি । খালে ঝাঁপ দিয়ে চান করা ।এখানে বটের ঝুরিতে দোল খায় ।আমার বাড়ির পাশ দিয়েই ক্যানেল বয়ে গিয়েছে । ছোট বেলায় এই ক্যানেল দিয়ে স্টিমার যেতে দেখেছি । এই ক্যানেল দিয়েই রবীন্দ্রনাথ , গান্ধীজী ও ডি এল রায় গিয়েছিলেন ।
প্রশ্ন - আপনার পারিবারিক পরিমণ্ডল কেমন ছিল ?
উত্তর - আমার বাবা ৪২ আন্দোলনের সাথে ও তেভাগা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন । জেল খেটেছেন । ইংরেজরা বাড়ি রেইড করেছিল ।
প্রশ্ন – আপনার এখন বয়স কত ?
উত্তর - ৮৫ পেরিয়ে গেছে ।এই বয়সেও আমি সচল । জেলাতো বটেই অসম , ত্রিপুরা , মণিপুর সহ বিভিন্ন রাজ্যে সাহিত্যের জন্য ঘুরে বেড়াই ।
প্রশ্ন – আপনার বইয়ের সংখ্যা কত ?
উত্তর –কাব্য, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, নাটক, কাব্যনাটক, প্রবন্ধগ্রন্থ মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৮৬ হয়ে গেছে।। আর চারটি বইয়ের কাজ চলছে । প্রথম কবিতার বই ‘দায়বদ্ধ’ । ৪০টি কবিতার বই বেরিয়েছে । সৃষ্টির প্রচ্ছদ , চেতনার পাণ্ডুলিপি , গোলাপবাগে চৈত্র বাতাস , প্রবাসী পাখির গান , পাড় ভাঙে প্রতিদিন , অন্য মেঘ ভিন্ন রঙ এইসব নাম ।
প্রশ্ন – আপনার লেখা লেখিতে মায়ের অবদান ছিল ?
উত্তর – আমার বাবা প্রবাসী পত্রিকা নিতেন । আমি প্রবাসী পত্রিকা পড়তাম মায়ের গ্রামফোন ছিল । মায়ের নাম করুণাময়ী মাইতি । মুকুন্দরাম দাসের গান শুনতাম । মা বাপের বাড়ি থেকে হিজ মাস্টার ভয়েস এর গ্রামাফোন পেয়েছিলেন। সেখানে গান শুনতাম । সেই গান আমার লেখার একটা পরিবেশ তৈরি করে দেয় । আমার স্কুল জীবন শুরু হয়েছিল গ্রামের পাঠশালায় । পরে আবাস বাড়ি হাইস্কুল , মুগবেড়িয়া কলেজ , বাজকুল কলেজ।
প্রশ্ন – আপনার লেখালেখির সাথেও রাজনীতি আছে ?
উত্তর - ৬৭ থেকে রাজনীতি করতাম । জেলে গিয়েছিলাম । পুলিস পিটিয়ে জেলে যাওয়ার ইতিহাস আছে । টি আই প্যারেড হল । আমাকে সেই পুলিস অফিসার সনাক্ত করলেন না । আমার বয়স কম ছিল । সেটাও একটা অভিজ্ঞতা । মনে হয়েছিল সব পুলিস খারাপ না ।বাবা তেভাগা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। আমিও একজন বামপন্থী আদর্শের সৈনিক, কৃষক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই ময়দানে থেকেছি । সাধারণ গ্রামের মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি । ঝাড়গ্রাম , জঙ্গল মহলের মানুষের সাথে খুব নিবিড় সম্পর্ক । আমার লেখায় বারবার ফিরে আসে ওদের জীবন , সারল্য , ঘামের গন্ধ । মাঠময় ফসল , ক্ষুধা তৃষ্ণার কথা ।আমার বাবাকে উদ্দেশ্যে কর মা বলতেন , ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছে । আমি খুব মজা পেতাম । আমার রাজনৈতিক পরিচয় আমি অস্বীকার করিনি । আমার লেখায় প্রভাব পড়েছে । তবে আমার বন্ধুরা আমাকে আমার লেখক সত্তার জন্য কাছে টেনে নিয়েছিলেন । রাজনীতি আর লেখা দুটি স্বতন্ত্র ধারা কিন্তু অবিচ্ছিন্ন ।
প্রশ্ন – আপনাকে বাংলদেশে বলা হয় ‘মিছিলে হাঁটা কবি’ । কেমন লাগে ?
উত্তর – আমার বাংলাদেশের কবি ও সাহিত্যিকদের সাথে খুব বন্ধুত্ব । ওঁরা আমাকে বলেন , মিছিলে হাঁটা কবি । ওঁরা আমাকে মিছিলে হাঁটতে দেখেছেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার জন্মদিন পালন করেছেন বন্ধুরা । প্রাপ্তি বলতে সেদিন আসাদ চৌধুরী , নির্মলেন্দু , সমুদ্র গুপ্ত , রবীন্দ্র গোপ সহ নানা সাহিত্য্যের মানুষজন উপস্থিত । ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য । বন্ধুদের ভালোবাসা পেয়েছি লিখেই ।
প্রশ্ন – আপনার নাকি বাংলাদেশ দ্বিতীয় বাড়ি ?
উত্তর –বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি সামসুর রহমান , নির্মলেন্দু গুণ , সমুদ্র গুপ্ত , আসলাম সানি , সালেম সুলেরি , আল মাহমুদ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বৃত্তের মানুষ । এর মধ্যে অনেকেই চলে গিয়েছেন । বাংলাদেশে আমি ৩২ বার গিয়েছি । চট্টগ্রাম চারবার যাই । কক্সবাজার থেকে ময়মনসিংহ হাতের তালুর মত চেনা । শুধু বাংলাদেশ পৌঁছে গেলেই হত । ঠিকানা বন্ধুদের বাড়ি । সাহিত্যের কি আর বেড়া হয় কিছু ? হয়না । এখানে মন খারাপ হলে বাংলাদেশ যাই । বয়স হয়েছে তাই কবি – সাহিত্যিকদের বাড়ি যাই ।
প্রশ্ন – বদলে যাওয়া বাংলাদেশে গিয়েছেন ?
উত্তর – যাইনি । একটি সংগঠন ফেলোশিপ দেবেন । তাই যেতে পারি । আমন্ত্রণ এসেছে।
প্রশ্ন – আপনার কবিতা ছাড়া গল্পের বিষয় কী ?
উত্তর –জনমানস , পিছিয়ে পড়া মানুষ , তাদের প্রেম , ভালবাসা , লড়াই নিয়ে গল্প ।
প্রশ্ন – আপনি নিজে কী প্রেমে পড়েছেন ?
উত্তর – প্রেম করেছি । যৌবনে । মনে পড়ে । কিন্তু লেখায় লিখিনি তার কথা । আমাদের প্রেম আসলে অন্য জিনিস ছিল । সেই সময় আন্দোলনে যুক্ত । আজ এই জেলে , কাল সেই জেলে , প্রেয়সী ছেড়ে গেলেন । ঝুঁকি নিতে পারলেন না । পরে দেখা হলে অবশ্য আফসোস করেছিলেন । সে এক অন্য ভিন্ন স্বাদের প্রেমের গল্প । থাক আজ ।
প্রশ্ন – মনে পড়ে সেই প্রেম ?
উত্তর – এখন মনে পড়েনা । এখন মনে পড়ে আমার স্ত্রীর কথা। আমার জীবনের ছায়া সঙ্গী । বাড়িতে থাকতাম না । সংসার ধরে রেখেছিল সে । চলে গেল । স্ত্রীর অভাব অনুভব করি । আমি স্কুলে চাকরি করতাম । ছেড়ে দিয়েছিলাম সর্বক্ষণের রাজনীতি করব বলে । বাধা দেয়নি সে।আমার চার পুরুষ ধরেই রাজনীতি করি । আমার পরবর্তী জেনারেশনও রাজনীতির সাথে যুক্ত।বাবা পোস্ট মাস্টার ছিলেন । পেনশন পেতেন । স্ত্রী চাকরি করতেন ।
প্রশ্ন – নন্দীগ্রাম কাণ্ডের সময় বই বেরিয়েছে ?
উত্তর – নানা পত্র পত্রিকায় লেখা বেরিয়েছে । বামফ্রন্টের পতনের কারন নিয়ে আলোচোনা করেছিলাম । খুব হইচই হয়েছিল । আসলে সত্যটা লিখতে চেয়েছি ।
প্রশ্ন – অসম , ত্রিপুরায় আপনার যোগাযোগ নিবিড় ?
উত্তর - বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে , সেখানকার মানুষের সাথে গভীর যোগাযোগ । ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার আমার ভাল বন্ধু । উনি উৎসাহ দেন লেখা লেখার জন্য ।মানিক সরকার খুব ভালো পাঠক । উনি আমার প্রবন্ধের বই উদ্বোধন করেন । যেমন উৎসাহ দিতেন কবি বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় । তিনিও রাজনীতির মানুষ ছিলেন।
প্রশ্ন – একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন ?
উত্তর- স্বরবর্ণ সাহিত্য পুরস্কার , মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরস্কার সহ একাধিক পুরস্কার পেয়েছি ।জীবনানন্দের জন্ম শতবর্ষ থেকে আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরষ্কার পেয়েছি । তবে আর এই বয়সে পুরস্কার কি কোন অর্থ থাকে ?
প্রশ্ন – আড্ডা দিতে ভালবাসেন ?
উত্তর – আমি আড্ডা দিতে ভালোবাসি । খুব ভাল লাগে সবার সাথে মিশতে । বিশেষ করে তরুণদের সাথে । আমার বাড়িতে আসে এক ঝাঁক উজ্জ্বল পায়রার মত । পুকুরের মাছ ধরে । গ্রামের রান্না খেয়ে যায় । কবিতা পড়ে গান করে । এখন নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছি । আমার দশ হাজার বই আছে । কোন ভালো লাইব্রেরীকে দিয়ে যেতে চাই । বন্ধু গৌতম দাস আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু । অর সাথেই নানা বিষয় আলোচানা করি ।
প্রশ্ন – জীবনানন্দ ও বিবেকানন্দকে নিয়ে বই লিখেছেন ?
উত্তর – এই দুটি আমার উল্লেলখ যোগ্য কাজ । মৌলিক ভাবনা । 'জীবননানন্দের কবিতায় বিপ্লবী চেতনা ' আমার লেখা বই । উদ্বোধন হয় বাংলাদেশে। উদ্বোধন করেন ফিরদঊস আরা – নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক । জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কবিতা আমার বিছানায় থাকে সব সময় প্রশ্ন - ঝাড়গ্রাম আপনার খুব প্রিয় জায়গা?উত্তর - আমার বাড়ি থেকে বাস ধরে নানা জায়গায় যেতে হত। রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ঝাড়গ্রাম আমাকে যেতে হত। তপ্ত দুপুরে লু পড়া দিনে হেঁটে বেরিয়েছি। বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। লাল জলের পুকুরে( ভেতরে স্বচ্ছ) স্নান করে শাক , আলু মাখা ভাত খেয়েছি। রাতে মাটির উঠোনে ঘুমিয়েছি। ধ্যাঙ্গা হাঁসদার বাড়ির নিকোনো উঠোন আজও ভুলিন।
প্রশ্ন – আপনি খেলাধুলো খুব ভালবাসতেন ?
উত্তর - আমি ছোটোবেলা থেকেই হাডুডু এবং ফুটবল খেলায় ভীষণ আগ্রহী ছিলাম। পড়ার চেয়ে খেলায় সময় দিতাম বেশি। আমার কাছে পড়াটা খুব কঠিন কাজ, খেলাটা খুব সহজ। আমি তখন স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি। আন্তঃজেলা ফুটবল প্রতিযোগিতা। খেলতে গেলাম ধান্যশ্রী হাইস্কুলের মাঠে। ২-০ গোলে আমরা জিতলাম। অনুশীলন করতাম স্কুল ছুটির পরে। ফুটবল খেলা আমাকে কোনোদিন ছেড়ে যায়নি, এমনকী এই বৃদ্ধ বয়সেও। আমি খেলেছি দিঘার মাঠে দু-বার, মেচেদার শান্তি সংঘের মাঠে একবার, তমলুক কলেজ গ্রাউন্ডে একবার, কাঁথি অরবিন্দ স্টেডিয়ামে একবার। এখানে আমি হয়েছিলাম ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ। এছাড়াও সুতাহাটার মাঠে একবার। দুর্গাচক স্টেডিয়ামে রাত্রিতে একবার। প্রত্যেকটি ছিল কম্পিটিশন।
প্রশ্ন – সাহিত্যের অঙ্গনে আপনার বন্ধু কারা ?
উত্তর - বন্ধু শ্যামলকান্তি দাশের সাথে কবিতা নিয়ে চর্চা হয় । আশিস সান্যাল সহ নানা বর্ষীয়ান কবির সাথেই কথা হয় । সামসুর রহমানকে দেখেছি দেশ ও মাটির প্রতি নিবিড় ভালোবাসা ছিল । আল মাহমুদ ছিলেন মজার মানুষ । বহু জায়গায় ছড়া পড়েছি এক সাথে । এই বাংলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , নীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় আমার বন্ধু ছিলেন ।
প্রশ্ন – এত বই লেখেন কখন ?
উত্তর – হাসি । আগে স্মার্ট ফোন নিয়ে কাজ করতে ভয় পেতাম । এখন মোবাইলে লিখি ।
____________________________________________
আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত
: অমৃত অনুভব ( একটা বই)
মেদিনীপুরের মানুষ রতন, অমৃত মাইতি
( কবি, প্রবন্ধকার, বামপন্থী নেতা )
ভাস্করব্রত পতি
"জীবনের চেয়ে দামী কিছু আছে ভেবে / ঘাম রক্তে পিচ্ছিল করেছি মাটি / বিবর্ণ অন্ধকারে অনেক ইচ্ছে / তাই ঘাম রক্তে পিচ্ছিল করেছি মাটি"।
জীবনকে এভাবে দেখতে পছন্দ করেন যিনি, তিনি তাঁর যে হাতের আঙুল ছুঁইয়ে অক্ষরের জাল বোনেন, ঠিক সেই হাতের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে ঘাম রক্তে জবজবে দেহে মিছিলে স্লোগানে হাঁটতে হাঁটতে অন্যায়ের জাল ছিন্ন করতে মুখর হয়ে ওঠেন। তিনি একাধারে কবি। অন্যদিকে রাজনৈতিক সমাজসেবী। অবলীলায় বলা যায় "মিছিলে হাঁটা কবি"। তিনি বাংলা সাহিত্যের অমৃতকুম্ভের সন্ধানে থাকা অমৃতসুধা মাখা 'কবি অমৃত মাইতি'।
এই কবিই তাঁর "জীবন এক অভিজ্ঞতা" তে নিজের সম্পর্কে এক মূল্যায়ন করতে গিয়ে অকপটে এবং অনায়াসেই লিখতে পারেন, "ভুল করলে ভুলের মাশুল দিতে হয়। ক্রমাগত ভুল করলে তাকে বলা হয় অবাস্তব, অর্বাচীন। ভুলের মধ্যে থাকে শিক্ষা আর অভিজ্ঞতা। আমি তেমন একজন মানুষ। বাস্তববাদী, পাশাপাশি অতিমাত্রায় আবেগপ্রবণ। আমার আবেগ আমাকে অনেক ভালো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহায্য করে। আমার আবেগ অতিমাত্রায় বিশ্বাসী। মানুষকে বিশ্বাস করা আবেগের একটি অন্যতম ধর্ম। বারবার মনে হয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জরুরি কাজ। ভুল হয়ে যায় ভুল করে ফেলি বিশ্বাসকে জড়িয়ে ধরি। অমানবিক বন্ধু ভয়ংকর শত্রু। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে, আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে। মানুষ চিনতে ভুল হয় বার বার। যার যা প্রাপ্য তাকে বেশি দেওয়া হয়ে যায় অনেক সময়। তার প্রয়োজনে সে আসে কাছে। তার চাহিদা পূরণ হয়ে গেলে, সে তো চলে যাবে ঠিক। কারণ সে তো থাকতে আসেনি। কিন্তু যাওয়ার সময় সে রক্ত ঝরিয়ে দিয়ে যায়। এই সমস্ত অকৃতজ্ঞ অমানবিক অনেক মানুষের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। মানুষ নাকি ঠকে শিখে। আমার কোনো শিক্ষাই হয়নি আজও। এ যেন আমার বিপন্নের পাশে না বুঝে সুঝে বিশ্বাস করে দাঁড়ানোর বদ অভ্যাস।"
১৯৪৭ সালের ১৩ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের শিবরামপুরে অমৃত মাইতির জন্ম। ২০২২ এ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ৭৫ বছর পূর্তি। কবি অমৃত মাইতিরও জন্মের প্লাটিনাম জুবিলি। পিতা প্রতাপচন্দ্র মাইতি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। পেয়েছিলেন তাম্রপত্র। তাই জন্মলগ্ন থেকেই পিতার কাছে শুনেছেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের বহু কাহিনী। যা তাঁর লড়াই আন্দোলনের মুকুটের পালক। এর ফলে তিনি নিজেকে একজন খাঁটি সমাজসেবী হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছেন। একসময় তাঁর বাবার মাথার দাম ইংরেজ শাসকরা ধার্য করেছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা। স্বাভাবিকভাবে অনুমেয় তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঠিক কতখানি মাথাব্যাথার কারণ ছিলেন। আদ্যন্ত বামপন্থী রাজনৈতিক ভাবনায় দীক্ষিত। সেইসাথে শিল্প সংস্কৃতি নিবিষ্ট এক অনন্য 'মানুষ রতন'।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করা এই লড়াকু নেতাটি একাধারে সাধারণ মানুষের জন্য সম্মুখ সমরে ঝাঁপিয়ে পড়া বামপন্থী নেতা। রক্তে ধ্বনিত হয় 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ'! আর অন্যদিকে কলমঠেলা কবি। প্রেমের কবি, জীবনের কবি, যৌবনের কবি, হৃদয়ের কবি, রসের কবি, আগুনের কবি, অন্তরের কবি, প্রতিবাদের কবি, বিক্ষোভের কবি। সর্বোপরী মানুষের কবি। তাঁর কলমের আঁচড়ে উৎসারিত হয় -- "আমার কোনো হাত নেই / যা দুমুঠো খাদ্য দেবে // আমার কোনো খেলনা নেই / যা সন্ত্বানহারাকে সান্ত্বনা দেবে // আমার কোনো হৃদয় নেই / যা মানুষকে আশ্রয় দেবে // আমার কোনো জীবন নেই / যা মৃত্যুকে ঠেকাবে // আমার কোনো চোখ নেই / যে শ্মশানে দুফোঁটা জল ফেলবে।"
লড়াই আন্দোলনের মধ্যে উৎসারিত আলো তাঁর জীবন থেকে বার্ধক্য। তেভাগা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ভূপাল পাণ্ডার কোলে উঠে তাঁর বেড়ে ওঠা। সেখানেই যেন সংগ্রামের জন্য মন্ত্রপূত সমিধ হয়ে উঠেছিলেন। জীবনে অসংখ্য কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৬৭ এর শেষ দিকে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভাঙার চক্রান্তের প্রতিবাদে মুখর হয়ে কারাবরণ করেছেন। সাধারণ মানুষের পেটের, মনের, বেঁচে থাকার এবং অতৃপ্তির ক্ষুধা তিনি হৃদয়ঙ্গম করেছেন অন্তরাত্মা দিয়ে। আর সেই ক্ষুধা পাঠককূলকে উপলব্ধি করিয়েছেন কবিতায় -- "এত ক্ষুধা, কাকে বলি সে কথা / সুখের পর পুনরায় কাঙালিপনা / একটি কবিতার পর / পুনরায় ব্যস্ত হয়ে ওঠা / সবসময় কি অতৃপ্তির ক্ষুধা / কাকে বলি এ কথা / সামাজিক ছায়াচিত্র / আচ্ছন্ন করে হৃৎপিণ্ড / চোখের সীমানা বাড়তে থাকে / মনের আকাশে অবাধ অগাধ / যাযাবর জীবনের নিরাময়হীন রোগ / এত ক্ষুধা, কাকে বলি সে কথা"।
বামপন্থী আন্দোলনের জন্যে শাসকদলের চক্রান্তের সম্মুখীন হয়েছেন। বাম আন্দোলনে থেকেও কখনো কখনো বামপন্থী কিছু নীতির বিরুদ্ধেও হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদে মুখর। নন্দীগ্রামের রোমহর্ষক ঘটনা তিনি সমর্থন করতে পারেননি। তবে শিল্পায়নের বিরোধীতা না করেও তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, "নন্দীগ্রামের মাটিতে শিল্প গড়ে উঠুক এ আকাঙ্ক্ষা মানুষের নেই একথা ঠিক নয়"। তেমনি তিনি চোখে চোখ রেখে বলতে পেরেছেন, "নন্দীগ্রামের বেশিরভাগ মানুষই প্রান্তিক চাষি ও গরিব। এখন যা চলছে তা কি শ্রেণিসংগ্রাম? এসব কথা অনেকের অপছন্দ। সাতাত্তর সাল থেকে একই ভাঁড়ার ঘর থেকে চাল নিয়ে এক ই হাঁড়িতে ফুটিয়ে একান্নবর্তী পরিবার হয়ে আছি। ভাগ করতে হলে পুরো হাঁড়িটাই ভাঙতে হয়। জেনে রাখা ভালো, সাত পয়সার সঙ্গে তিন পয়সা যোগ করলে দশ পয়সা হয়। তিন পয়সা না দিলে সাত পয়সাও মূল্যহীন হয়ে যায়"। নিজের জন্মস্থান নন্দীগ্রামের মানুষজনকে নিয়ে রাজনীতি করে ফায়দা তোলাকে সমর্থন করতে পারেননি তিনি। আজও তাঁর বুক কাঁদে যখন তাঁর মনে হয়, "ছুটছে সেই কিশোর / মনের সমস্ত দরজা তার খোলা / বুকের শ্বাস প্রশ্বাসে ঝড়ের পূর্বাভাস / আকাঙ্ক্ষার খেদ ও ক্রন্দন সহচর তার / কতবার শ্মশান সম্রাটের সঙ্গে দেখা হয়েছে -- / সব অবসাদ পিপাসা হারায়"। কবি দীপ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, "কাজের মানুষ মাটির মানুষ প্রাণ ভরা উচ্ছ্বাস / নন্দীগ্রামে বাঁচিয়ে রাখেন জীবনানন্দ দাশ"।
অমৃত মাইতির রচনায় বারবার এসেছে জীবনানন্দ দাশের প্রতিচ্ছবি। সখের চালতাফুল, ভিজে শিশিরের জল, হালভাঙা নাবিক, কিশোরীর লাল পা, ধানসিঁড়ি নদী হয়ে উঠেছে নন্দীগ্রামের এই ভূমিপুত্রের লেখনীর আকর। যা তাঁকে মেদিনীপুর থেকে বিদেশ বিভুঁইয়তে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিয়েছে। বাংলা ভাষায় তাঁর সপাট লেখনিতে উবে গিয়েছে দুই দেশের সীমানা। ভারত এবং বাংলাদেশের বোদ্ধা সমাজে তিনি হয়ে উঠেছেন জীবনানন্দ চর্চার আধুনিক সাহিত্যিক। 'জীবনানন্দের বিপ্লবী চেতনা' মূর্ত হয়েছে তাঁর কলমের আগায়। ঠিক যেভাবে জীবনানন্দ অন্ধকারে আত্মমগ্ন থেকে ধূষর রোমান্টিসিজমের জগতে ডুবে থাকতেন বেদনা ভোলার সহজ পদ্ধতি হিসেবে, ঠিক তেমনই অমৃত মাইতি মাঝে মাঝে এই পঙ্কিল অন্তঃসারশূন্য চেতনাহীন জগতের মোহ ভুলতে আশ্রয় নিয়েছিলেন খোদ জীবনানন্দকে। আর অকপটভাবে লিখে ফেলেন, "ভালোবাসার জন্য চোদ্দ হাজার মাইল হেঁটেছি / পায়ে পায়ে ফসলের মাঠ পেরিয়ে / বনানীর বিভ্রান্তির পথ বেয়ে / পাথরের নুড়িতে আছাড় খেয়ে -- আবার উঠেছি / ভালোবাসার জন্য চোদ্দ হাজার মাইল পথ হেঁটেছি।" আসলে বনলতা সেন তাঁর কবিতা লেখার জারক রস। অক্ষরকর্মীর আবাসভূমি। যে ভূমিতে জন্ম নেয় স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের সংমিশ্রণে -- "হাত বাড়াই -- সে হাত ধরে / ভালোবাসার কারুকাজ। / কুর্নিশ করে অশ্রু ফোঁটা / কুসুম জানে ফোটার প্রয়াস"। জন্ম নেয় অজস্র হাহাকার, আনন্দ, ভালোবাসার যৌথ গদ্য। আর বনলতা সেনকে চোখের তারায় ও মনের কোনায় রেখে যে কবিতা উত্তোলিত হয় মনন থেকে, চিন্তন থেকে, সেই কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে ফুটে ওঠে অপরূপ এক রূপসী বাংলার প্রতিচ্ছবি। "প্রেম ও নির্জনতা" কবিতায় বনলতা সেনের স্রষ্টাকে সম্মান জানিয়ে অমৃত লাভের আশায় কবি লেখেন, "হাতে নাই বা থাকলো একতারা / কন্ঠে প্রবাসীর গান / যদি থাকে / যে কোনো ভোরে / চলে যাওয়া ভালো"।
অমৃত মাইতির গ্রন্থতালিকায় রয়েছে -- বর্ণময় অমৃত, কবিতায় বানভাসি, জলের আক্রোশ ও আহ্লাদের সাথে, পাড় ভাঙে প্রতিদিন, নৌকো আটকে রাখো কেন, প্রজ্ঞার আকাশে সহজ সমীকরণ, ভালোবাসি পদ্মার পানি, প্রবাসী পাখির গান, বাদাম বালিকা প্রেম ও চেতনার কবিতা, প্রেম ও চেতনার কবিতা, কাঁচঘর, সব অক্ষর পাথর হয়ে যাবে, কবিতার জন্য তুমি, একলা চলাই পথ, জেগে ভেতরের মানুষ, ধানসিঁড়ি কি নদী, অনুগত মধ্যরাত, মানুষ কি ইনস্ট্রুমেন্ট?, প্রবন্ধ সংগ্রহ, কলসপাতা, কামিনি কেন ফুটলো ও অন্যান্য গল্প, অন্ধকারে একা, ভোরের গদ্য, Facebook থেকে পেজবুক, আমি নদী পাখি, একলা চলাই পথ, জীবনধারা, নীলধূসর, কখনো আকাশ কখনো মেঘ, প্রসঙ্গ মার্কসবাদ ও আর. এস. পি., নির্বাচিত অমৃত মাইতি ইত্যাদি। ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের মুখেও ঝরে পড়ে মেদিনীপুরের এই অজপাড়াগাঁয়ের কবিকে নিয়ে শ্রদ্ধা। সুদূর কানাডার মন্ট্রিয়লের একুশে বইমেলাতে ২০১৯ এ সংবর্দ্ধিত হন একমাত্র তিনিই। আর বাংলাদেশের বুকে তো তিনি 'ঘরের কবি'! অমৃত মাইতির কাছে পৃথিবীতে দুটি তীর্থক্ষেত্র সমাদৃত। একটি আন্দামানের সেলুলার জেল, আর দ্বিতীয়টি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম!
তিনিই একমাত্র কবি যাঁর ভাণ্ডারে রয়েছে ১৫ টি দীর্ঘ কবিতা লেখার বিরল কৃতিত্ব। সবচেয়ে ছোট দীর্ঘ কবিতা ২৩০ লাইনের। আর সবচেয়ে বড় দীর্ঘ কবিতা ১১১১ লাইনের! বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব জাহিদুল ইসলামের চোখে তিনি হয়ে উঠেছেন "মিছিলে হাঁটা কবি"। মিছিলের মতো দীর্ঘ হয় তাঁর কবিতার ভাব। আর এই মিছিলেই মেলে লড়াই আন্দোলনের যাবতীয় শক্তি। যে শক্তি জন্ম দেয় অক্ষরের। আর সিক্ত করে মিছিলে হাঁটা কবির কল্পনাকে। আর তাতেই লিখে ফেলেন -- "দেহ বেচে যে মেয়েগুলো / ভোর রাতে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে / আমি তাঁদের নোনা জল / জিভ দিয়ে চাটি"।
এই করোনা পরিস্থিতিতেও কবির কাব্যসাধনা থমকে যায়নি। বরং বারবার মূক মুখে মুখর হয়েছে কবিতার স্কেলিটন। কবিতার হাড্ডি মজ্জা সহ শোনিত ধারায় রঞ্জিত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। সেই ২০২০ সালের ৭ ই আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত নিয়ম করে কবিতার উপঢৌকন নিয়ে "ফেসবুক লাইভ"! কখনও সেখানে উচ্চারিত হয় বস্তুবাদী বিবেকানন্দ, গণচেতনায় রবীন্দ্রনাথ, মুজিবুর রহমান, আবার কখনও 'কবিতা পিরামিড নির্মান নয় - অভিজ্ঞান'। সপ্তাহে দুদিন বা তিনদিন নিয়ম করে লাইভে নিয়ে আসেন কবিতার অ্যানাটমিক্যাল কাটাছেঁড়া। নন্দীগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রামের মেঠো ল্যাবরেটরিতে বসে মুঠোফোন জুড়ে মুঠো মুঠো অক্ষরের শাব্দিক উচ্চারণ -- "একটি কুঁড়ি যদি বিকশিত হতে না পারে / তার কি দোষ? / একটি কুঁড়ি যদি কোনো ঘাসফড়িং কেটে দেয় / তার কি দোষ? / একটি কুঁড়ি যদি কোনো অর্বাচীন ছিঁড়ে দেয় / কুঁড়ির কি দোষ? / একটি বিকশিত ফুল / যদি মালা হতে না পারে / তখন তো ফুলেরই আফশোষ!"
তিনি আর. এস. পি. র পূর্ব মেদিনীপুর জেলার প্রাক্তন সম্পাদক। সেই সাথে পার্টির রাজ্য সম্পাদকমন্ডলী এবং কেন্দ্রীয় কমিটির প্রাক্তন সদস্য। এটাই শুধু তাঁর পরিচয় নয়। তিনি যে পায়ে মিছিলে হাঁটেন, সেই পায়ে নড়বড়ে সত্তরেও সবুজ খেলার মাঠে ফুটবল নিয়ে ড্রিবল করতে পারেন। আদ্যন্ত মিশুকে এই বামপন্থী মানুষটি গতানুগতিক চরিত্রের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। যাঁর সাথে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়, মন খুলে ঠাট্টা করা যায় আর হৃদয় নিংড়ে সাহিত্য চর্চা করা যায়! 'নিরস তরুবর' সুলভ জননেতা নন। 'শুষ্কং কাষ্ঠং' সুলভ রাজনৈতিক নেতাও নন। তিনি আসলে "তেমন ডাক যদি আসে ঝাঁপিয়ে পড়ব ঠিক / হয়তো কখনো এমন প্রতিজ্ঞা / করেছিলাম নিজের কাছেই / সাহস আর পুরুষকারের সাথে / কপটতা করবোনা নিশ্চয়ই / কথার কাছে কথা রাখবোই"।
তাঁর প্রকাশিত "মানুষ কি ইনস্ট্রুমেন্ট" বইতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন "উচ্চবিত্তদের চাহিদা আর আনন্দের খোরাক মেটাতে সমগ্র জনসমাজ আর কতদিন ব্যবহৃত হবে ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে?" আর কবির ভাবনায় এই ভুলভুলাইয়া সমাজ পরিবর্তনে দরকার স্পার্টাকাসের মতো কোনো চরিত্রের উত্থান। যে পারে মানুষকে ইনস্ট্রুমেন্টে পরিণত হওয়া থেকে উদ্ধার করতে। তাই তিনি সাদা কাগজে কালি ছিটিয়ে হুংকার দেন, "মানুষ এখন উন্নত ধরনের পালিশ করা ঝকঝকে ক্রীতদাস। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে কিছু অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু সে অধিকার পুঁজিপতিরা বা সরকার চাইলে ক্ষুন্ন করা হবে। আপনার ভোটাধিকার আছে কিন্তু আপনি প্রয়োগ করতে পারবে না। সময় হলে স্পার্টাকাস ঠিক আসে সমাজের বুকে। এক সময় মানুষকে কেনা হতো। এখন মানুষের মগজকে কিনে নেওয়া হচ্ছে। একদিন যাঁদেরকে যন্ত্র হিসেবে ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে তাঁরা সবাই স্পার্টাকাসের চরিত্র খুঁজে পাবে। মানুষ নিজেই শক্তিশালী। প্রত্যেকের মধ্যে স্পার্টাকাসের চরিত্র আছে। নিজেকে বিকশিত করার জন্য সংস্কারমুক্ত হতে হবে। না হলে যুগ যুগ ধরে আমরা ইনস্ট্রুমেন্টে পরিণত হয়ে থাকবো।"
শেষ পাতে একটাই কথা -- যাঁহার মূর্তি অমৃততুল্য অর্থাৎ স্নিগ্ধ, তিনিই তো ‘অমৃতমূর্তি'। তাঁর বিচরণভূমিই আজ তাঁকে চিহ্নিত করেছে ‘অমৃতফেণী' কিংবা ‘অমৃতমণ্ডা’-র জগতে। তাঁর যাবতীয় কীর্তি যেন সেই সমুদ্র হইতে সুধামন্থন তথা ‘অমৃতমন্থন' থেকে উঠে আসা ‘অমৃতাহ্ব’। আজ তাই ‘অমৃতভাষী’ অমৃত মাইতিকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতে হবে অমৃতকরণের মাধ্যমে। কাশীবিলাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশিত (১৩০৮) ‘দুর্গাপঞ্চরাত্রি’ অনুসারে বলা যেতেই পারে -- “শঙ্খপাত্রে দধি দুৰ্ব্বা পুষ্প দিয়া তথি / ধেনুমুদ্রা দিয়া তথি করিলা অমৃতি”।
( জলদর্চি পত্রিকায় প্রকাশিত)
____________________________________________
অমৃত অনুভব
: অমৃত মাইতি: এক সাহিত্য জীবন
সুস্নাত জানা ( এক )
অমৃত মাইতি এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। অমৃত মাইতির জন্ম ১৯৪৭-এর ১৩ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থানার শিবরামপুর গ্রামে। বাবা প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপচন্দ্র মাইতি, মাতা করুণাময়ী। নন্দীগ্রামের গ্ৰাম থেকেই লেখাপড়া করে কলেজ জীবন থেকেই তিনি ভূমিহীন কৃষকদের জমির লড়াইয়ে নেমে পড়েন। ভূপাল পণ্ডার মতো তেভাগা আন্দোলনের নেতা তাঁর অনুপ্রেরণা। আবাসবাড়ি হাইস্কুল থেকে পাশ করার পর অমৃত মাইতি প্রথমে মুগবেড়িয়া কলেজ থেকে পার্ট ওয়ান, পরে নন্দীগ্রাম এবং বাজকুল কলেজে পড়তে পড়াতেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি শুরুতে ছিলেন মূলত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি, বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী একজন নেতা, কর্মী ও সংগঠক। ছাত্রাবস্থা থেকেই আজীবন বামপন্থার প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও নিষ্ঠা রেখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কৃষক, মজদুর, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র-শিক্ষক সংগঠন; পার্টির রাজ্য নেতৃত্ব, জাতীয় নেতৃত্ব দিয়েছেন, বামফ্রন্টের সভায় সভাপতিত্ব করেছেন এবং করছেন- এসব বিশিষ্ট সাধারণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আজ অমৃত মাইতি একজন সাহিত্য সেবক। সাহিত্যের সব শাখাতেই তাঁর সমান স্বচ্ছন্দ বিচরণ। আর এই শাখাতেই তিনি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে ছুঁতে পেরেছেন। ২০১৯ এর একুশে ফেব্রুয়ারি তিনি মন্ট্রিঅলে আমন্ত্রিত হয়ে মহান আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে একুশের পদক সম্মাননা গ্রহণ করেছেন। এদেশে ও বাংলাদেশে তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ ও উপন্যাস-গল্পের অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়েছে। 'অক্ষরকর্মী' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। জীবনানন্দের জন্মশতবর্ষ থেকে 'আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার' দিয়ে আসছেন শতাধিক দেশী বিদেশী সাহিত্য সেবকদের। তিনি দশবার আমন্ত্রিত হয়েছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক জাতীয় কবিতা উৎসবে। বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, অসম, আন্দামান, ঢাকা, টাঙ্গাইল, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সোনারগাঁও- সর্বত্রই তিনি সাহিত্যের উচ্চ সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। আমি তাঁর সঙ্গে একাধিকবার বাংলাদেশ-ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম গিয়েছি অসংখ্য সাহিত্য সভায় ও আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে। দেখেছি সে সব জায়গায় তাঁকে নিয়ে সব শ্রেণির মানুষের উন্মাদনা। সর্বত্রই তিনি যাঁদের সঙ্গে নিয়ে গেছেন, তাঁদেরও সমান মর্যাদা দিয়েছেন। একাধিক জায়গায় আমি তাঁর সহযাত্রী হওয়ায় সুবাদে দেখেছি বিদেশী সংবাদপত্রে আমাদের সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা কি ত্রিপুরা, কি চট্টগ্রামে- এ কেবল তাঁর ব্যক্তিত্বের মহত্বে। ইতিমধ্যে তাঁর বৃহদায়তনের 'প্রবন্ধ সমগ্র' প্রকাশিত হয়েছে। 'নির্বাচিত অমৃত' ও 'বর্ণময় অমৃত' চিনিয়ে দেয় সাহিত্যসাধক অমৃত মাইতির সাহিত্য সংস্কৃতির বিরাট অবদানকে।
এরকম একজন বহুমাত্রিক মানুষের আত্মজীবনী আমাদের কাছে দীর্ঘদিনের তৃষ্ণার্ত প্রতীক্ষার পর এক পশলা বৃষ্টির মতো, সমস্ত প্রাপ্তির প্রত্যাশাকে ছুঁয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই আত্মকথা প্রকাশিত হতে চলেছে 'মাটি মানুষ ভালোবাসা' নামে।
আবারও নামকরণের মধ্যে দিয়ে মানুষের পাশে থাকা একজন মানুষের, মানুষের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসার আশ্চর্য স্বাক্ষর বয়ে নিয়ে চলেছে এই রচনা।
এই স্মৃতিকথা অদ্ভুত স্পর্শময় সহজ সরল ভাষায় লেখা ঝরঝরে মেদহীন গদ্য। ছেলেবেলা থেকে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের বর্ণময় এক যুবকের দেশ ও মানুষের জন্য আত্মোৎসর্গ করা এক রাজনৈতিক কর্মীর আশ্চর্য শ্রম রক্ত স্বেদ ঝরানো দিনলিপির মতো। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে তেভাগা আন্দোলন, ভূমি সংস্কার সংগ্রাম থেকে নন্দীগ্রামের গণ-আন্দোলন, রাজনৈতিক সম্পর্কের আম্রেড়িত উত্থান পতন থেকে ব্যক্তি সম্পর্কের নানা রসায়ন। অকপট সত্য উচ্চারণ যখন প্রায় রূপকথার রাজকন্যার মতো অদৃশ্য, তখন অমৃত মাইতির এই লেখা পড়তে পড়তে চমকে উঠি। সমস্ত শ্রেণির মানুষকে সমান ভালোবাসা- মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন এক সমীকরণ আমাকে তাড়িত করে বার বার, যখন এই সভ্যতায় প্রতিদিন ঘরহীন মানবিকতা আমাদের অভ্যস্ত ব্যসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হয় যেন সত্যি কোন রূপকথার দেশে পৌঁছে গেছি, যেখানে সোনার কাঠির স্পর্শে আশ্চর্য এক রাজপুরীর রাজত্ব আর রাজকন্যা ফিরে পেয়েছি, পেয়েছি ভালোবাসা। একমাত্র ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু জয় করা যায়। বাংলাদেশর আদিগন্ত প্রসারিত গ্রাম আর গ্রামের সোঁদা মাটির গন্ধ, পুকুর খাল বিল নদী নালা পেরিয়ে মহানগরীর আশ্চর্য আলোর গোলকধাঁধা আর সমুদ্র আর বরফের দেশের গল্প। মন্ট্রিঅল থেকে কর্ণফুলী, পদ্মার ইলিশ থেকে আন্দামানের কালাপানি- আর রাতের অন্ধকারে হিজরি টাইটাল ক্যানেলের পাশ দিয়ে হেঁটে চলার মেঠো গল্প, মাছের আঁশটে ঘ্রাণ, পাকা ধানের সুবাস। জেলখানার গরাদ আর কেরলের কুইলন নগরীর অপরূপ নাগরিক সমাবেশ, কক্সবাজার থেকে কন্যাকুমারী, শীতলক্ষ্যা থেকে ধলেশ্বরী- স্রোতের প্রবাহের মতো অমৃত মাইতির জীবনের অসংখ্য উত্থান-পতন ও বহমান জীবনের এক অশ্রুত লিখন এই 'মাটি মানুষ ভালোবাসা'। এ বইয়ের গদ্যলিখনের পাশাপাশি কবিতার আশ্চর্য সমান্তরতা আমাদের মানসিক শান্তির অবগাহন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ধারাবাহিকভাবে এই লেখা প্রকাশিত হওয়ার সময় দেশ ও বিশ্বের অসংখ্য মানুষ ক্ষুধার্তের মতো প্রতীক্ষা করে থাকতেন পরবর্তী লেখার জন্য। অসংখ্য মানুষ প্রতিটি পোস্টিং-এ তাঁদের সুচিন্তিত মতামত, ভালোলাগা-মন্দলাগার আবেগ তাড়িত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে নেতৃত্ব হয়ে ওঠার অকপট সংগ্রামের কাহিনী এই গ্রন্থ। এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহ নানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্য সেবকদের সমরেখ জীবনকথা যেমন লেখা হয়েছে, তেমনই লেখকের নিজস্ব জীবন দর্শনও ফুটে উঠেছে অনায়াস দক্ষতায়। কোথাও কষ্টকৃত কলম চালনা নেই, স্বতস্ফূর্ত গল্পকথনের স্বচ্ছন্দ প্রয়াসটি যে কোনো পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করবে। লেখকের এই গ্রন্থরচনা পরিকল্পনার আঁতুড়ঘর থেকে লেখার জন্য আর্তি, বেড়ে ওঠা এবং পুস্তক আকৃতি দান পর্যন্ত আমি সঙ্গসৌভাগ্য লাভ করেছি বলেই হয়তো এই ভূমিকা লেখার অধিকার পেয়েছি। এখন অসংখ্য দেশ বিদেশের বিপুল বাঙালি পাঠকের আগ্রহের দিকে তাকিয়ে থাকলাম এই আশা নিয়ে, যে তাঁরা একটি অনন্য জীবনচরিত হাতে নেবেন।
_____________________
অমৃত অনুভব
' শরীরে একান্ন তীর্থপীঠ মননে হাজার নক্ষত্র'
কবিতীর্থঙ্কর * : শ্রীঅমৃত মাইতি
সুনীল মাজি
সে যেন বসন্তের এক টুকরো ভোর। টকটকে। গৌরী রঙ। অথচ সে যেন বিস্ময়ে শিবশিব। কালো আলো তুমি যাও। সাদা আলো এসো। সে যেন লাল পান কণ্ঠের উৎসব---সে যেন লাল গান প্রতিষ্ঠা করার দিন। সে যেন আশ্চর্য এক-টুকরো স্বপ্ন। টকটকে। গৌরী রঙ। কথার ভেতর সে কি গৌরব ! সে যেন চণ্ডীপুর থেকে নন্দীগ্রাম । বাবা দক্ষিণ রায়। পাহারায় আছে এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল। কাদা মাটিতে হাঁটাহাটির স্ট্যাম্প আছে। তাঁর সারা জীবনের সংগ্রহের নাম : কমরেড কবিতা লেখো।
নেতারা লম্ফ জ্বালিয়ে সাক্ষরতার অভিযান করে। তিনি শুকতারা আলোয় কবিতা লেখাতে চান। তিনি ব্যতিক্রমী প্রয়াস। তিনি অক্ষর দিয়ে মুখ ধোয়াতে চান। পা ধোয়াতে চান। লোকসঙ্গীত দিয়ে স্নান করাতে চান। মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো সুন্দর যেন আর কিছু নেই। কে তুমি পড়িছ বসি রোদ। টকটকে। গৌরী রঙ। তিনি যেন বাবা দক্ষিণ রায়ের উপর বসে থাকা এক রোদ। কমরেড। কবি অমৃত মাইতি।
তাঁকে শেষের কবিতার অমিত রায় থেকে রে বানানোর ইচ্ছে নেই আমার । তাঁকে অতিরঞ্জিত করে বলার দরকার নেই। যে যত বড়ই শিল্পী হোক না কেন, তার এত বড় লম্বা তুলির হাত হয় না, যে, আকাশের গায়ে হাত দিয়ে রাঙাতে পারে। কমরেড পারে না। কবি পারে। কমরেড ব্যর্থ। কবি সফল। ইস্তাহার ব্যর্থ। কবিতা সার্থক। তিনি কবিতার লেখক অমৃত মাইতি। তিনি কবি হতে চাননি। তিনি কবিতা হতে চেয়েছেন। মানুষ চলে যায় মানব থেকে যায়। এই তাঁর জীবনানন্দ। কবি চলে গেছেন । কবিতা ফিরে এসেছে। ট্রাম ধাক্কা দিতেই অন্য সকল প্রথিতযশা কবিদের শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। কবিতা জীবনানন্দ বেঁচে উঠলেন। বাংলা কবিতায় সেই এক ভোরের শুরু। এই অমৃতকথা বলতে বলতে রূপনারায়ণ পার। বলতে বলতে ভাগীরথী গঙ্গা। বলতে বলতে মেঘনা যমুনা। একশ কিলোমিটার জমি পেরুতে যে কষ্ট হয়, এক কিলোমিটার নদী পেরুলে সেই ক্লান্তি ধুয়ে যায়। তখন তিনি কমরেড নন। তখন তিনি কবি অমৃত মাইতি। পথ পেরুতে তিনি ইস্তাহার পড়েন। নদী পেরুতে কেবলই কবিতা।
সুনীল, তোমাকে একটা কথা বলি শোনো, এই কবিতার পড়া লেখা করি বলে বুঝতে পারলাম, লেনিন একজন কমরেড। মাও সে তুঙ একজন কমরেড। কিন্তু কার্ল মার্ক্স কমরেড নন। প্রথমে তিনি কবি । দ্বিতীয়ত তিনি দার্শনিক।
অমৃত মাইতি কত বড়ো নক্ষত্র না গ্রহ আমি জানি না । তবে তিনি, শুকতারা চলে গেলে যা থাকে, একটুকরো। টকটকে। গৌরী রঙ। প্রাণের গৌরব। তিনি বিশ্বাস করেন একজন মানুষ যদি কবি ও দার্শনিক হন তাহলে আকাশ-মাটি তাঁর দখলে। কমরেড যদি কবি না হন ? তবে বাবা দক্ষিণ রায় তাঁকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে। বস্তুবাদ ভালো। হৃদয়বাদ আরও ভালো। ঝড়ের পর জল এলে তবে বিপ্লব সার্থক। তাই হৃদয়ের অশ্রু চাই।
সুনীল, চলো, তোমাকে একটা কবিতা শোনাই।
' আমি একটা কৃষ্ণ তৈরি করব
রাধার সঙ্গে ওর ছবিটা রাখব না
অসংখ্য মানুষের মিছিলে কৃষ্ণ থাকবে
ষোড়শ গোপিনী রাখব না।
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে
পণপ্রথার বিরুদ্ধে
নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে
একটি ক্রান্তিকারী মহিলা সংগঠন রাখব ।
আমরা একটা কৃষ্ণ তৈরি করব
মৌলবাদীদের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কালোবাজারিদের
দু-হাতে তুলে আছাড় মারবে।
আমরা একটা কৃষ্ণ তৈরি করব
যার ঘর নেই বাড়ি নেই
তার পিছু টান নেই
সে কৃষ্ণ সর্বহারা
সে আমাদের নেতা ।
আমরা একটা কৃষ্ণ তৈরি করব
যে কাটমানি খেয়ে আপোষ করবে না।
আমরা কৃষ্ণের একটা কাট-আউট তৈরি করব
যে কৃষ্ণের হাতে বাঁশি থাকবে না
একটা বড় ঝাণ্ডা ধরিয়ে দেব।'
কবিতার নাম কৃষ্ণ। কাব্য গ্রন্থের নাম দায়বদ্ধ । এও একধরণের নির্মাণ । দেশ নির্মাণের মতো কবিতা নির্মাণ । মানুষ গড়ার মতো কবিতা গড়া। কেবল কবিতা নয়, গল্প প্রবন্ধ উপন্যাস ভ্রমণকথা ইত্যাদি মিলে গ্রন্থ সংখ্যা পঞ্চাশ।
কেবল লেখা নয় তিনি সম্পাদনা করেন অক্ষর-কর্মী।
কেবল সম্পাদনা নয়, তিনি ২০০০ সালে জন্মশতবর্ষে জীবনানন্দ উৎসব কমিটি গঠন করেন। শিবরামপুর নন্দীগ্রামে তিনি বছর তিনেক জীবনানন্দ উৎসব ও মেলা সংগঠিত করেছিলেন। তারপর ২০০৭ সাল থেকে অদ্যাবধি আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার প্রদান করে চলেছেন। তিন বছর বাংলাদেশে এবং এক বছর ত্রিপুরায় এই পুরস্কার পর্ব অনুষ্ঠিত করে করে সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। 'জীবনানন্দের কবিতায় বিপ্লবী চেতনা' এই রকম প্রবন্ধ যিনি লিখতে পারেন সেই কবি ও কমরেডকে এখন জীবন ও সাহিত্য নিয়ে কিছু প্রশ্ন করা যাক।
এক।। প্রশ্ন : খুব অহংকার করার মতো একটি পরিবারে আপনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন । প্রথমত সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী পিতা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি কিভাবে আপনার সৃষ্টিশীল মনকে প্রভাবিত করেছিলেন ?
এক।। উত্তর : আমার বাবা প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপ চন্দ্র মাইতি । গ্রাম শিবরামপুর থানা নন্দীগ্রাম। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে কাজ করতেন। তেভাগা আন্দোলনের নেতা ভূপাল পাণ্ডার সহকর্মী ছিলেন। সুশীল ধাড়ার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি ইংরেজের মোস্ট ওয়ান্টেড পার্সন ছিলেন। ইংরেজরা তাঁর মাথার দাম ধার্য করেছিলেন পঞ্চাশ হাজার টাকা। কারণ তিনি অ্যাবস্কণ্ডার ছিলেন। ইংরেজরা আমাদের ঘর ভাঙচুর করে । ৪২ এর অগাস্ট আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষ সংগ্রাম করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত সরকার তাঁকে তাম্রপত্র প্রদান করেন। তিনি মেদিনীপুর সেসন কোর্টের জুরি ছিলেন।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলি, পিতা পুত্রের মধ্যে একটা প্রভাব তো থাকেই। একটি রক্তের, জিনগত। অপরটি পরিবেশগত। যাই হোক, আমি শৈশবে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড দেখেছি। রাজনৈতিক ভাবে আমি বাবার দ্বারা অবশ্যই প্রভাবিত । সমাজ চেতনার বীজ তিনি প্রোথিত করেছিলেন আমার মনে। সারাজীবন যে কাজকর্ম করেছি ; মনে হয়েছে যে, এগুলো আমার বাবার-ই কাজ। তাঁর নির্দেশ আমি পালন করে চলেছি মাত্র। সেই জন্য বাবার রাজনৈতিক সততা আমি কাজের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করি। তাই কখনো রাজনীতি করতে গিয়ে আদর্শ থেকে বিচ্যুত হইনি। একটা আদর্শ তথা ভ্যালু ওরিয়েন্টেড পলিটিক্স করে চলেছি আজও।
অপরদিকে আমার মা করুণাময়ী ছিলেন সংস্কৃতি সচেতন নারী। কালচার্ড লেডি। তাঁর 'হিজ মাস্টার্স ভয়েস' এর গ্রামোফোন আমাকে সংস্কৃতি প্রেমী করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রসঙ্গত বলি, নন্দীগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রামে আমার বাড়ি। গ্রামগুলো ছিল যোগাযোগহীন। আমার বাড়ি থেকে আট কিমি দূরে পাকা রাস্তা। কিন্তু প্রবাসী পত্রিকা বা দৈনিক পত্রিকা প্রতিদিন আসত। সকালে না এসে হয়তো বিকালে আসত। তো, প্রবাসী পত্রিকা আমাকে সাহিত্য জগত দেখিয়েছে। অর্থাৎ আমার মা বাবাই আমার মনে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির বীজ প্রোথিত করেছেন। তাই আমি এখনও এসবের মধ্যেই সব সময় আচ্ছন্ন থাকি। আমার ধমনীতে নতুন নতুন ভাবনার স্রোত সদা প্রবাহমান।
দুই ।। প্রশ্ন : কোনটা অনিবার্য ছিল--- কে আপনার নিয়তি কবিতা না রাজনীতি ? আপনি কি পরজন্মে বিশ্বাসী ? যদি হ্যাঁ সূচক হয় তাহলে কি পরের জন্মে কবিতা লিখবেন ? যদি না সূচক উত্তর হয়, তবে পঞ্চাশ বছর যদি আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় কিভাবে শুরু করতেন ?
দুই ।। উত্তর : খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। যেটা বাস্তব ঘেঁষা সেটার উত্তর দেব। আর যেটা কল্পনা বা পরাবাস্তব ওটার উত্তর না দিলে কোনও ক্ষতি হবে না।
মাঝে মাঝে আমিও ভাবি, কোনটা না করলে আমি বাঁচব না ? আসলে আমার দুটোই চাই। কবিতাজীবন আমার অনুভূতিকে সদা জাগ্রত রাখে। এখানে আমি সাঁতার দিই। জীবন তখন নদীর মতো। তার উজান আমাকে ভাসিয়ে রাখে।
অপরদিকে রাজনীতি তো ছোটবেলা থেকে করছি। ১৯৬৬ থেকে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করি। প্রথমে ছাত্র আন্দোলন । যুব ও কৃষক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। ১৯৬৭ সালে যুক্ত ফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন করি। অ্যারেস্ট হই। তারপর মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে। এক পুলিশ অফিসারকে ইঁট ছুঁড়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছিলাম। তাই সকল আন্দোলনকারীকে ছাড়লেও আমাকে ছাড়ল না। এমন কি আমাকে 'অ্যাটেম্পট টু মার্ডার কেসে' আটকে দিল। আমার 'টি প্যারেড' হলো । সৌভাগ্যবশত, সেই সৎ পুলিশ অফিসারটি আমাকে না চেনার ভান করে চলে গেলেন । ছাড়া পেলাম একমাস পরে সেই সেন্ট্রাল জেল থেকে। এভাবেই বাম রাজনীতির পথে আমার দীর্ঘ পরিক্রমা। সাত দশক হেঁটে চলেছি, কোনোও বিরাম নেই। রাজনীতিতে কবেই পেরিয়ে গেছি পঞ্চাশ। সাহিত্যেও তাই।
পঞ্চাশ বছর ফিরিয়ে দিলে যেভাবে মানুষদের নিয়ে সংগ্রাম করেছি। এভাবেই করব। মানুষ ছাড়া সাহিত্যের কথা আমি ভাবতেই পারি না। সংগ্রামের ইতিহাস তো সাহিত্যের এক মূল ধারা। আমি তো সেই মূল ধারার সাহিত্য করে এসেছি। ছাত্রজীবন থেকে---সেই নিষ্পাপ বয়স থেকে মানুষের ভেতরের সৌন্দর্য ও শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখাই আমার সাহিত্যের কাজ।
তিন।। প্রশ্ন : আপনি সমাজবাদী সাম্যবাদী ভাবনার মানুষ অথচ কোনও সাম্যবাদী কবির চেয়ে জীবনানন্দ আপনার হৃদয় জুড়ে আছে। কারণটা কি ? সচেতনভাবে কি আপনি কবিতাকে রাজনীতি থেকে দূরে রেখেছেন ?
তিন ।। উত্তর : একজন সৃষ্টিশীল মানুষকে খুব সংবেদনশীল হতে হয়। একজন মানবতাবাদী হতে পারেন সাম্যবাদী। সকলের জন্য সমান অধিকার এই ভাবনা তিনিই ভাবতে পারেন যিনি সব মানুষকে সমান ভাবতে পারেন। এমনকি তিনি নিজেকে অপরের মতো একজন ভাবতে পারেন। এই ভাবনা এই বোধ একজনকে খুব উচ্চ জায়গায় নিয়ে যায় । তুমি কত উচ্চতার মানুষ আমি অনুভব করতে পারি তোমার হৃদয়ের উচ্চারণ দেখে। তাই বলি, যদি জীবনানন্দের বোধ কবিতাটি পড়া থাকে তাহলে বুঝতে পারবে তিনি কত বড়ো মানবতাবাদী কবি।মানুষের মঙ্গল কামনা । মানুষকে কালো শকুন চিনিয়ে দেওয়া। মানুষকে প্রতিবাদী করা একজন সাম্যবাদী কবিতার চরিত্র। তাই সুকান্তর সাম্যবাদ আর জীবনানন্দের সাম্যবাদ চিনতে গেলে তোমাকে সিপিএম এর সাম্যবাদী ভাবনা এবং আর এস পির দেশকল্যাণের ভাবনার তফাৎ বুঝতে হবে। সাম্যবাদী স্বর কি এক হতে হবে ? যাই হোক, আমি যদি কেবল রাজনীতির লোক হতাম, তাহলে হয়তো জীবনানন্দকে নিয়ে কাজ করতাম না। যেহেতু জীবনানন্দ হৃদয়ের মানুষ। তাঁর ভাষার গন্ধ আমাকে উদ্বেলিত করে, আমি লেখার ভেতর মাটির গন্ধ পাই। এতো কাঁচা মাটি পলিমাটির গন্ধ আমি অন্য কোথাও পাইনি । তাঁকে নিয়ে আমার বই আছে। আমার অনুভূতির কথা বিস্তৃতভাবে জানিয়েছি। জীবনানন্দের মতো মানব প্রকৃতির কবি ক'জন আর আছে ? আমি লেখার ভেতর এই মানবিকমুখ খুঁজে চলেছি নিরন্তর।
কবিতা চেতনার জিনিস। রাজনীতি সচেতনভাবে মানব কল্যাণ করার একটা পন্থা। রাজনীতিতে মানুষ আসে সক্রিয়ভাবে। প্রত্যক্ষ যোগ। উন্নয়ন করার সুযোগ থাকে সরাসরি। সাহিত্যের মানব কল্যাণ অপ্রত্যক্ষভাবে। একটু প্যাসিভ। তবে গভীর। মানব কল্যাণে সাহিত্য ও রাজনীতি গভীর ও বিস্তৃতভাবে এই উন্নয়ন করতে পারে। এখানে রাজনীতির সংকীর্ণভাবনা তথা দল কেন্দ্রিক রাজনীতির র কথা বলছি না। রাজনীতি আমার কাছে চিরকাল মুক্ত চেতনার জিনিস। তার সঙ্গে কবিতাশিল্পের মিল বেশি। আমার রাজনীতি গণতন্ত্র আমার কবিতাও গণতন্ত্র।
চার।। প্রশ্ন : কবিতার মাধ্যমে আপনি কি জনমানসে কোনও মেসেজ দিতে চান নাকি কবিতা আপনার সখের বাগান ? কবিতা দিয়ে কি সমাজ রাষ্ট্রের পরিবর্তন সম্ভব? রাষ্ট্র কি সত্যি সত্যিই পাত্তা দেয় কবি ও কবিতাকে ?
চার।। উত্তর : সাহিত্য আমার কাছে সখের বাগান নয় । তবে শিল্প বাগান। জীবনশিল্প। যাদের কাছে জীবন ও শিল্প সমান তাদের কাছে জীবন অনন্ত। আমি সেই সুদূর অনন্তের পিয়াসী। মেসেজ একটা আছেই । তবে কবিতার ভেতর দিয়ে আমি জ্ঞান দিই না। জীবন বোধের কথা বলি, প্রতিটি মানুষের জীবন দর্শন থাকবে, নইলে সে কিসের মানুষ ? জীবনকে চিনতে সাহায্য করে কবিতা ।
বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস তো কবিতা-শক্তির ইতিহাস। কবিতা কি পারে না ? কবিতা অর্জুনকে যুদ্ধের অস্ত্র তুলে নিতে সাহায্য করে চার হাজার বছর আগে। এই কবিতাই বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রকে সাম্যবাদে দীক্ষিত করেছিল । কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো তো কবিতা ! প্রলেতারিয়েত আহা কী শব্দ ! সর্বহারা র শিকল ছাড়া হারাবার কিছু নেই । পৃথিবীর কোন্ কবি এমন একটা লাইন লিখে যেতে পেরেছেন ? তো, কবিতা যেহেতু মানসজাত তাই মানবজাতির কল্যাণে সব কিছু সম্ভব।
একটা নির্বোধ রাষ্ট্র কবি ও কবিতাকে পাত্তা দেয় না। কেননা তার বোধ শক্তি নেই। তাতে সেই রাষ্ট্রের নির্বুদ্ধিতা প্রকটিত হয়। যে রাষ্ট্র কবিতা বোঝে না সে বিজ্ঞান বোঝে না। সে অপসংস্কৃতির আধার। সে সৃষ্টিশীল নয় । সে রাষ্ট্র অভদ্র। শিল্প বোঝার জন্য মেধা দরকার ।
তবে কিছু সরকার কবি ও কবিতাকে ভয় পায়। তাই পাত্তা না দেওয়ার ভান করে। এটা তাদের দূর্বলতা। এটা তাদের অক্ষমতা। তারা নিরেট। গবেট। গর্দভ কি কখনও কবিতা বুঝতে পারে ? তবু তারা পৃথিবীতে রয়ে গেছে ।
পাঁচ ।। প্রশ্ন : আপনার প্রিয় একটি লেখা দিন---যে লেখাটি আপনার সিগনেচার।
পাঁচ ।। উত্তর : "একটা জাতি সমাজ এবং রাষ্ট্র কতটা সমৃদ্ধ তা বোঝা যায় তার সাহিত্য সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের উপর l একটি রাষ্ট্র যখন পিছিয়ে থাকে ,তখন বুঝতে হবে সে দেশের মধ্যে অশিক্ষা-কুশিক্ষা গোঁড়ামি প্রবল। এই ধরনের রাষ্ট্রে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসামাজিক কাজকর্ম ছেয়ে যায় । তখন আমরা বলি ঘূণধরা সমাজ।বিদেশে টাকাপাচার নারীপাচার ধর্ষণ ব্যাংক ডাকাতি লুটপাট খুনোখুনি নৈরাজ্যের পরিবেশ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা বাড়তে থাকে। এসবের পিছনে সরকারি ইন্ধন থাকে বলে প্রশাসনও ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে। অসম বন্টনব্যবস্থা, ধনবৈষম্যের কারণে হাভাতেদের, দরিদ্রের ও বেকার মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। যুবমনের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিপথে ভুলপথে জীবন যাপন করা ছাড়া তাদের পথ থাকে না। জুয়া মদ সাট্টা র আসরে ভীড় বাড়তে থাকে। এই সমাজে মানুষের আয় বাড়ে না ব্যয় বাড়ে। হতাশা আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়তে থাকে। মানুষের সামনে রাষ্ট্র কোন দিশা দেখাতে পারেনা । রাষ্ট্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। তখন অসামাজিক ব্যক্তিদের পোয়াবারো। অর্থনৈতিক দিক থেকেও দেশ এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে, সাধারণ নাগরিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোন পথ খুঁজে পাওয়া না।
রাষ্ট্রনেতারা বা রাজনৈতিক নেতারা এই সমস্ত অসামাজিক লোকদের সহযোগিতায় ভোট সংগ্রহ করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে।অর্থের বিনিময়ে ভোট লুঠ হয়।
দেশটা জাহান্নামে গেলে কার কি যায় আসে। ক্ষমতায় থাকার লোভ বেশী। পাশাপাশি দেখুন সারা বিশ্বের ইতিহাসে ভারতবর্ষের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। এই দেশটা ছিল ইংরেজের অধীন। এই দেশ স্বাধীন হয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবনের বিনিময়। আজ কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে দেশটাকে। শাসকগোষ্ঠী কোন পথের নিশানা দিতে পারেনা বলেই মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে ভোটে জিততে চায় , ক্ষমতায় থাকতে চায়। ঠিক এমন অবস্থাতে শাসকগোষ্ঠী বল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে চায় । আর অপরপক্ষে শোষিত বর্গ শাসকশ্রেণীকে আর মেনে নিতে পারে না। ঠিক এমন পরিবেশ পরিস্থিতিতে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া মানুষের বাঁচার পথ থাকে না। মানুষ বুঝতে পারে বেঁচে থাকার জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থার উচ্ছেদ চাই।
রাষ্ট্রীয় বাধার পাহাড় ডিঙানোর জন্য মানুষকে বৈপ্লবিক নীতি-আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে হয়। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে কিছু সংবাদমাধ্যম বঞ্চিত মানুষের নীতির প্রতি সহমত পোষণ তো করেই না বরং এই পচা গলা সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা কলম ধরেন।
দু'ধরনের কলমচি আমরা দেখতে পাই।
(এক) শাসন ক্ষমতার ধারেপাশে থেকে উপঢৌকন পাওয়ার লোভে, পুরস্কার পাওয়ার লোভে, নানান সুখ-স্বাচ্ছন্দ পাওয়ার জন্য একশ্রেণীর লেখক তারা মাথা নামিয়ে ক্ষমতার পাশে থাকে। শাসক গোষ্ঠীর পক্ষে ওকালতি করে কলম ধরে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা। এদেরকে আমি বলি অর্ধশিক্ষিত।
(দুই) আর এক শ্রেণীর কবি-সাহিত্যিক শিল্পী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আছেন যারা এই রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ এর পক্ষে সমাজ পরিবর্তনের জন্য চেতনাকে শাণিত করার চেষ্টা করে। এদের সামনে শাসকগোষ্ঠীর আনুকূল্য পাওয়া যে সমস্ত তাঁবেদার কলমচি আছে , তারা ভয়ঙ্কর বাধা। এই বাধার পাহাড় ডিঙানো কঠিন কাজ।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, লিটিল ম্যাগাজিন গুলো গ্রামগঞ্জে শহরতলীতে ছড়িয়ে থেকে অসংখ্য লেখক লেখিকাদের পাশে দাঁড়ায়। বড় বড় শহরে একটু বিকশিত হওয়ার সুযোগ যারা পেয়েছে তাদের মধ্যে উন্নাসিকতা কাজ করে, তারা পরস্পর পরস্পরের পিঠ চাপড়ায়। অথচ লিটল ম্যাগাজিন গুলোতে অনেক মেধার বিকাশ ঘটে , অনেক ভালো লেখনীর সন্ধান পাওয়া যায়। এদেরও উন্মেষের ক্ষেত্রে প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
তাই বলি , রাষ্ট্রে সাহিত্য সংস্কৃতি শিল্পচেতনা সর্বক্ষেত্রে কিন্তু একটা লড়াই আছে। বাধা আছে। এই বাধা অতিক্রম করতে না পারলে যুগে যুগে পৃথিবীর বড় বড় বিপ্লবের ক্ষেত্রে কবিলেখকশিল্পিরা যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে সেই দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার মতো মানসিক জেদ আমাদের তৈরি করতে হবে। একদিন আমাদের লেখনী হবেই কালজয়ী। আমাদের সৃষ্টি চেতনা বিকাশে ক্ষুরধার হবে, নিপীড়িত মানুষের, ভুখা মানুষের জন্য লেখা চিরকালই সমাদৃত হয়েছে। আসুন কাঁটার পাহাড় অতিক্রম করার শপথ গ্রহণ করি।"
(ফুল ও কাঁটা থেকে উদ্ধৃত )
_____________________________________________:
অমৃত অনুভব
কবি অমৃত মাইতি
মতিন বৈরাগী। ঢাকা বাংলাদেশ
‘ব্যর্থতা তো দেখিনি কখনো /পিছন ফিরে তাকাইনি কোনদিন /এসবই কি শুধু প্রক্রিয়া । এগিয়ে যাওয়ার !/সাফল্যের সিঁড়ি আছে /কিন্তু সাফল্য কোথায় ?/সাফল্যটুকু বাকি থেকে গেল আমার জানার’ কিংবা ‘মুক্তির সূর্য উঠবে’কবিতায় তিনি বলেন ‘ দিগন্তে বিস্তৃত লাল রং ছেয়ে যাবে/পুরো আকাশটা লাল রঙে ছেয়ে যাবে/আমি জানি একদিন হবে /আমি জানি নিশ্চিত হবে/সূর্য লাল রক্ত লাল ঝান্ডা লাল’।
ভাষা ও সাহিত্য আলোচনার ক্ষেত্রে মূলত ফার্দিনান্দ দ্য সসুরের ভাষাতাত্ত্বিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে কাঠামোবাদ, যেখানে বলা হয়, প্রতিটি সাহিত্যকর্ম একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কাজ করে এবং তার অর্থ নির্ধারণ হয় ভাষা, চিহ্ন ও সাংগঠনিক উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতাদ্বয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, উভয় কবিতায় একটি পূর্বনির্ধারিত কাঠামো রয়েছে যা ‘প্রগতি ও মুক্তি’ সংক্রান্ত সাধারণ বয়ানকে অনুসরণ করে।
মুক্তির প্রত্যাশা এবং বিপ্লবের চেতনার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কবিতাটি নির্মিত। এখানে “সূর্য”, “রক্ত লাল”, “ঝান্ডা”, “মুক্তির পায়রা” ইত্যাদি শব্দ চিহ্ন সংগ্রামের প্রতীক। এই প্রতীকগুলোর অর্থ কেবল কবিতার অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মাধ্যমেই বৃহত্তর রাজনৈতিক/সমাজিক বয়ান। “সূর্য লাল রক্ত লাল ঝান্ডা লাল” ‘লাল’ সংগ্রামের প্রতীক। বার বার বলা হচ্ছে “আমি জানি একদিন হবে / আমি জানি নিশ্চিত হবে” নিশ্চয়তা ও প্রত্যাশার দ্বান্দ্বিক বিন্যাস রয়েছে এই কবিতায়। রোলাঁ বার্ত বলেন, ভাষা যখন পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে শব্দের সচারতাকে অতিক্রম করে তখন ভিন্ন অর্থদ্যোতনা পাঠকের মস্তি®েক নির্ধারিত ধাঁচ তৈরি করে । ‘সাফল্যের সিঁড়ি’ পর্যায়ক্রমে অগ্রসরমান ক্রিয়াকে সহগামী করে। “সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে / প্রতিটি ধাপ যত্ন করে পেরিয়েছি”। এই বক্তব্য একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সংহত। কবিতা দুটিতে বিপরীত মুখী প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেমন প্রক্রিয়া বনাম চূড়ান্ত সাফল্য -> ব্যক্তির প্রচেষ্টা বনাম সামাজিক স্বীকৃতি। “সাফল্যের সিঁড়ি আছে / কিন্তু সাফল্য কোথায়?” দৃষ্টযোগ্য, কবিতাটি সাফল্যের একটি প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সেই সাফল্য আসলে অধরা থাকে। লেভি-স্ট্রস বলেন সমাজ ও সংস্কৃতির সকল অর্থ বৈপরীত্যের মধ্যে গড়ে ওঠে। মাইতির কবিতার ভাষ্য এবং উপভাষ্য একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সংগঠিন , যেখানে প্রতীক, দ্বান্দ্বিকতা ও পুনরাবৃত্তি কখনও খণ্ডিত কখনও পূর্ণাঙ্গতা দেয়। ‘মুক্তির সূর্য উঠবে’ কবিতায় বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান, যেখানে মুক্তির প্রতিশ্রুতি ও সংগ্রামে এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে।অন্যদিকে, ‘সাফল্যের সিঁড়ি’ কবিতায় জীবন ও সাফল্যের মধ্যকার কাঠামোগত সম্পর্ক তুলে ধরে। নেরুদা, নাজিম হিকমত ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, তাদের কাব্যচিন্তা ও কাব্যরীতি একদিকে সমাজ-রাজনীতি ও মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যদিকে কাঠামোগতভাবে নির্দিষ্ট শৈলীর মধ্যে কাজ করে। নেরুদার কবিতা মূলত বাস্তব অভিজ্ঞতার ভাষায় নির্মিত, যেখানে প্রেম, বিপ্লব, প্রকৃতি ও ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ কাঠামো গড়ে ওঠে। নেরুদার কবিতায় লাতিন আমেরিকার সংগ্রামকে উজ্জ্বভাবে ধরে রেখেছে। বর্ণিত হয়েছে ইতিহাসের অনুষঙ্গ । এখানে ভাষা ও প্রতীকের কাঠামো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। “তোমার রক্ত দিয়ে আমি পথের মানচিত্র আঁকব,/তোমার দেহের শিরা দিয়ে আমি নদীর ধারা টানব।”নেরুদার কবিতায় আমরা প্রাকৃতিক বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিপ্লব বনাম শোষণ, প্রেম বনাম নির্জনতা এই ধরনের দ্বান্দ্বিক কাঠামো দেখতে পাই, যা ক্লদ লেভি-স্ট্রসের কাঠামোবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। “আমি স্বপ্ন দেখি,/একদিন আমার দেশের আকাশ নীল হবে/আর শিশুদের মুখে থাকবে হাসি।” ন ‘আকাশ নীল হওয়া’ এবং ‘শিশুর হাসি’ আসলে সাম্য ও শান্তির প্রতীক, যা কাঠামোবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিরোধী বাস্তবতার বিপরীতে সম্ভাবনার ভাষা তৈরি করে। হিকমতের কবিতায় পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে দৃঢ় চেতনার গঠন লক্ষ করা যায়। “এখনও নয়, কিন্তু হবে/এখনও নয়, কিন্তু হবে” মাইতির কবিতায় তেমন পুনরাবৃত্তি দ্বারা চেতনাকে শানিত করা হয়েছে। অমৃত মাইতির "মুক্তির সূর্য উঠবে" এবং "সাফল্যের সিঁড়ি" কবিতায় প্রতীক, পুনরাবৃত্তি, দ্বান্দ্বিক কাঠামো ও প্রক্রিয়াবাদী বাস্তবতা রয়েছে যা কাঠামোবাদী তত্ত্বের সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কবি অমৃত মাইতির "সাফল্যের সিঁড়ি" কবিতা লক্ষণীয় -- ‘ সাফল্যের ধারে পাশে আসতেই পারিনি’ এখানে সাফল্য একটি চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং একটি অন্তহীন পথ। এটি রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির দার্শনিক কাঠামোর সাথে অংশীদারিত্ব প্রকাশ করে। ‘যেমন তোমার পথের ধুলা হয়ে ছড়িয়ে যাবো’ অমৃত মাইতি একজন সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিশ্বাসের মানুষ, আজীবন তিনি সেই আদর্শকে লালন করে আসছেন।
__________________________________________
ইতিহাসে আকর গ্রন্থের মর্যাদা পেতে পারে।
______________
অমৃত অনুভব
অমৃত মাইতির কবিতা : অসম্পূর্ণ রেখা
‘খুবই সূক্ষ্ম ভাবে চেষ্টা করেছি
চেষ্টা করেছি একেবারে নিজেকে সমর্পণ করে
খুব চেষ্টা করেছি খোঁজার
মন উজাড় করে লিখেছি
যা পেয়েছি সবটাই লিখেছি।
না পারিনি, খোঁজার বিরাম নাই
ক্লান্ত হয়েছি, তবু পারিনি।
বারবার মনে হয়েছে
হয়তো কোথাও হারিয়ে গেছে কিছু
আমি আর কোনদিন খুঁজে পাবো না।
যেমন কত শব্দ ঘুমের ঘোরে জেগে উঠে
মুহূর্তের মধ্যে সে আবার হারিয়ে যায়
সারা জীবন চেষ্টা করেও তাকে পাই না।
আমি তো চেয়েছিলাম
যা কিছু ভেতরে আছে উজাড় করে দিয়েছি ।
"মানুষ একবার নগ্ন হয় জন্মের সময়
আর একবার নগ্ন হয় আগুনের পোশাক পরে
বাকি সময়টা সে নগ্ন নগ্ন খেলে
গাছেদের মত ছাল বাকল পরে কিনা জানি না
আসলে মানুষ প্রকৃত নগ্ন হতে ভয় পায়।"
মনের ভিতরে উঁকি ঝুকি মেরেছি
যা পেয়েছি সবটাই লিখেছি
তবু মনে হয়
নিশ্চয়ই কিছু থেকে গেল বাকি।
মূল্যবান কিছু কথা হারিয়ে
ক্লান্ত এক প্রাণ পড়ে আছি।
তাই,লেখার অপূর্ণতা নিয়ে
জাগতিক নিয়মে
পূর্ণচ্ছেদ টানতে হবে এখন।’
কাঠামোবাদ হলো ভাষা ও সাহিত্য বিশ্লেষণের একটি তত্ত্ব যেখানে লেখার অন্তর্নিহিত কাঠামোতে বিপরীত ধারণা, বাইওনারী অপজিশন, পুনরাবৃত্তি, ভাষা চিহ্ন এবং ভাষার গঠন বিশ্লেষণ করে অর্থ উন্মোচন করা হয়। এই তত্ত্ব অনুসারে, কোনো সাহিত্যকর্মকে এককভাবে বিশ্লেষণ না করে বৃহত্তর ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে বিশ্লেষণ যোগ্য। অমৃত মাইতির এই কবিতায় বাইওনারী অপজিশন বা দ্বিবিধ বিপরীত ধারণায় পূর্ণতা বনাম অপূর্ণতা কবিতার কিন্দ্রবিন্দুতেই আছে। এক গভীর আত্মেপলব্ধির মধ্যে তার উচ্চারণ ‘অসম্পূর্ণ যেমন “সবটাই লিখেছি” বলছেন, তেমনই “তবু মনে হয় ... কিছু থেকে গেল বাকি” । এই দ্বৈততার মধ্যে একটি কাঠামোগত টানাপোড়েন তৈরি হয়। উজাড় হওয়া বনাম হারিয়ে যাওয়া: “উজাড় করে দিয়েছি” এই আত্মসমর্পণের বিপরীতে আছে “মুহূর্তের মধ্যে সে আবার হারিয়ে যায়”। “চেষ্টা করেছি”, “লিখেছি”, “পারিনি” এই ধরণের পুনরাবৃত্তি একদিকে মানসিক ক্লান্তি ও সংবেদনশীলতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে কবিতার কাঠামোকে একটি বৃত্তাকার তৈরি করে, যেখানে ফিরে আসে চেষ্টা ও ব্যর্থতার ছায়া।
কবিতাটিতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সমগ্রীক হয়ে উঠবার প্রবণতা রয়েছে। “আমি তো চেয়েছিলাম...”, একটি দার্শনিক সার্বজনীন উপলব্ধি “মানুষ প্রকৃত নগ্ন হতে ভয় পায়।” এটি একটি চিহ্ন, হিসেবে কাজ করে যা মানুষ ও সমাজের দ্বিচারিতাকে বুঝতে সাহায্য করে। কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতায় কবিতাটি কোনো নির্দিষ্ট ধারণায় স্থির নয়, বরং ভাবনার প্রবহমান গতিকে অনুসরণ করেছে।, “যা পেয়েছি সবটাই লিখেছি”, আবার বলেন “তবু মনে হয় ... কিছু থেকে গেল বাকি” এই দ্বৈত উচ্চারণ দেরিদার তত্ত্বের বিনির্মাণের সুত্রকে অনুসরণ করে।“লিখেছি” আর “লিখতে পারিনি” এই দুই ঘোষণার মধ্যেই অর্থের নির্ভরতা ভেঙে যাচ্ছে। ’আনডিসাইবিলিটি’ মূলত ‘জাগতিক নিয়মে পূর্ণচ্ছেদ টানতে হবে এখন’।’দার্শনিক ‘ভাঙন’ আমাদেরকে বিনির্মাণ তত্ত্বের সংগে যুক্ত করে।
‘বারবার মনে হয়েছে/হয়তো কোথাও হারিয়ে গেছে কিছু/আমি আর কোনদিন খুঁজে পাবো না।’এক ধরনের অবচেতন বা হারানোর ভয়। এই ভয় বা অতৃপ্তি ফ্রয়েডের ভাষায় অবদমিত আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত। এর মানে অসম্পূর্ণতা কবিতার পূর্ণতাÑÑ লেখক নয় । ‘হয়তো কোথাও হারিয়ে গেছে কিছু/আমি আর কোনদিন খুঁজে পাবো না।” আবার কত শব্দ ঘুমের ঘোরে জেগে উঠে... সারা জীবন চেষ্টা করেও তাকে পাই না” এটি স্পষ্টভাবে স্বপ্ন-অবচেতন সংক্রান্ত ফ্রয়েডীয় ধারণার প্রতিফলন। কবি এক অর্থে তার “স্বপ্নস্বরূপ আত্মচিত্র” নির্মাণ করছেন। কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের কিছু আধ্যাত্মিক ও আত্মজিজ্ঞাসামূলক কবিতা ‘জীবনস্মৃতি’, ‘অবশেষের,ভাবগত মিল আমরা লক্ষ করতে পারি, যেমন ‘যা কিছু হারায় তাই পাওয়া যায় এই অনুভব এখানে প্রাধান্যপায়। অন্যদিকে এলিয়টের কবিতায় যেমন আত্মজিজ্ঞাসা ,ক্লান্তির পুনরাবৃত্তি ও অস্পষ্ট ব্যর্থতার চিত্র আছে তেমন ‘লিখেছি তবু না পারার’-র অমৃত অনুভব ( একটা বই হবে )
______________
মতিন বৈরাগী। ( তিনটি লেখা)
সুস্নাত জানা। ( দুটি লেখা)
সুনীল মাজি।
হরিপদ মাইতি।
তাপস দেবনাথ ( সাংবাদিক ও আলোচক ডেইলি দেশের কথা ত্রিপুরা।)
আরিফ ইকবাল ( সাংবাদিক আনন্দবাজার )।ভাস্করব্রত পতি।
__________________________________
অমৃত মাইতির আড়ম্বরহীন
অসাধারণ কাব্য বয়ান ( দুই)
মতিন বৈরাগী ।। ঢাকা বাংলাদেশ
______________
অমৃত মাইতির কবিতা : অসম্পূর্ণ রেখা
‘খুবই সূক্ষ্ম ভাবে চেষ্টা করেছি
চেষ্টা করেছি একেবারে নিজেকে সমর্পণ করে
খুব চেষ্টা করেছি খোঁজার
মন উজাড় করে লিখেছি
যা পেয়েছি সবটাই লিখেছি।
না পারিনি, খোঁজার বিরাম নাই
ক্লান্ত হয়েছি, তবু পারিনি।
বারবার মনে হয়েছে
হয়তো কোথাও হারিয়ে গেছে কিছু
আমি আর কোনদিন খুঁজে পাবো না।
যেমন কত শব্দ ঘুমের ঘোরে জেগে উঠে
মুহূর্তের মধ্যে সে আবার হারিয়ে যায়
সারা জীবন চেষ্টা করেও তাকে পাই না।
আমি তো চেয়েছিলাম
যা কিছু ভেতরে আছে উজাড় করে দিয়েছি ।
"মানুষ একবার নগ্ন হয় জন্মের সময়
আর একবার নগ্ন হয় আগুনের পোশাক পরে
বাকি সময়টা সে নগ্ন নগ্ন খেলে
গাছেদের মত ছাল বাকল পরে কিনা জানি না
আসলে মানুষ প্রকৃত নগ্ন হতে ভয় পায়।"
মনের ভিতরে উঁকি ঝুকি মেরেছি
যা পেয়েছি সবটাই লিখেছি
তবু মনে হয়
নিশ্চয়ই কিছু থেকে গেল বাকি।
মূল্যবান কিছু কথা হারিয়ে
ক্লান্ত এক প্রাণ পড়ে আছি।
তাই,লেখার অপূর্ণতা নিয়ে
জাগতিক নিয়মে
পূর্ণচ্ছেদ টানতে হবে এখন।’
কাঠামোবাদ হলো ভাষা ও সাহিত্য বিশ্লেষণের একটি তত্ত্ব যেখানে লেখার অন্তর্নিহিত কাঠামোতে বিপরীত ধারণা, বাইওনারী অপজিশন, পুনরাবৃত্তি, ভাষা চিহ্ন এবং ভাষার গঠন বিশ্লেষণ করে অর্থ উন্মোচন করা হয়। এই তত্ত্ব অনুসারে, কোনো সাহিত্যকর্মকে এককভাবে বিশ্লেষণ না করে বৃহত্তর ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে বিশ্লেষণ যোগ্য। অমৃত মাইতির এই কবিতায় বাইওনারী অপজিশন বা দ্বিবিধ বিপরীত ধারণায় পূর্ণতা বনাম অপূর্ণতা কবিতার কিন্দ্রবিন্দুতেই আছে। এক গভীর আত্মেপলব্ধির মধ্যে তার উচ্চারণ ‘অসম্পূর্ণ যেমন “সবটাই লিখেছি” বলছেন, তেমনই “তবু মনে হয় ... কিছু থেকে গেল বাকি” । এই দ্বৈততার মধ্যে একটি কাঠামোগত টানাপোড়েন তৈরি হয়। উজাড় হওয়া বনাম হারিয়ে যাওয়া: “উজাড় করে দিয়েছি” এই আত্মসমর্পণের বিপরীতে আছে “মুহূর্তের মধ্যে সে আবার হারিয়ে যায়”। “চেষ্টা করেছি”, “লিখেছি”, “পারিনি” এই ধরণের পুনরাবৃত্তি একদিকে মানসিক ক্লান্তি ও সংবেদনশীলতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে কবিতার কাঠামোকে একটি বৃত্তাকার তৈরি করে, যেখানে ফিরে আসে চেষ্টা ও ব্যর্থতার ছায়া।
কবিতাটিতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সমগ্রীক হয়ে উঠবার প্রবণতা রয়েছে। “আমি তো চেয়েছিলাম...”, একটি দার্শনিক সার্বজনীন উপলব্ধি “মানুষ প্রকৃত নগ্ন হতে ভয় পায়।” এটি একটি চিহ্ন, হিসেবে কাজ করে যা মানুষ ও সমাজের দ্বিচারিতাকে বুঝতে সাহায্য করে। কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতায় কবিতাটি কোনো নির্দিষ্ট ধারণায় স্থির নয়, বরং ভাবনার প্রবহমান গতিকে অনুসরণ করেছে।, “যা পেয়েছি সবটাই লিখেছি”, আবার বলেন “তবু মনে হয় ... কিছু থেকে গেল বাকি” এই দ্বৈত উচ্চারণ দেরিদার তত্ত্বের বিনির্মাণের সুত্রকে অনুসরণ করে।“লিখেছি” আর “লিখতে পারিনি” এই দুই ঘোষণার মধ্যেই অর্থের নির্ভরতা ভেঙে যাচ্ছে। ’আনডিসাইবিলিটি’ মূলত ‘জাগতিক নিয়মে পূর্ণচ্ছেদ টানতে হবে এখন’।’দার্শনিক ‘ভাঙন’ আমাদেরকে বিনির্মাণ তত্ত্বের সংগে যুক্ত করে।
‘বারবার মনে হয়েছে/হয়তো কোথাও হারিয়ে গেছে কিছু/আমি আর কোনদিন খুঁজে পাবো না।’এক ধরনের অবচেতন বা হারানোর ভয়। এই ভয় বা অতৃপ্তি ফ্রয়েডের ভাষায় অবদমিত আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত। এর মানে অসম্পূর্ণতা কবিতার পূর্ণতাÑÑ লেখক নয় । ‘হয়তো কোথাও হারিয়ে গেছে কিছু/আমি আর কোনদিন খুঁজে পাবো না।” আবার কত শব্দ ঘুমের ঘোরে জেগে উঠে... সারা জীবন চেষ্টা করেও তাকে পাই না” এটি স্পষ্টভাবে স্বপ্ন-অবচেতন সংক্রান্ত ফ্রয়েডীয় ধারণার প্রতিফলন। কবি এক অর্থে তার “স্বপ্নস্বরূপ আত্মচিত্র” নির্মাণ করছেন। কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের কিছু আধ্যাত্মিক ও আত্মজিজ্ঞাসামূলক কবিতা ‘জীবনস্মৃতি’, ‘অবশেষের,ভাবগত মিল আমরা লক্ষ করতে পারি, যেমন ‘যা কিছু হারায় তাই পাওয়া যায় এই অনুভব এখানে প্রাধান্যপায়। অন্যদিকে এলিয়টের কবিতায় যেমন আত্মজিজ্ঞাসা ,ক্লান্তির পুনরাবৃত্তি ও অস্পষ্ট ব্যর্থতার চিত্র আছে তেমন ‘লিখেছি তবু না পারার’-র মধ্যদিয়ে সেই বোধ তুলে ধরে। এই ধরণের কবিতা একদিকে ব্যক্তিগত কিন্তু তার কাঠামো সামগ্রিক মানবিক অভিজ্ঞতার বুননে সঙ্গবদ্ধ থাকে।
জ্যাক দেরিদা ভাষাকে এক অনিশ্চিত ও অবিচ্ছিন্ন ভাঙনের সূত্রে দেখেন। ভাষার কোনো স্থায়ি অর্থ নেই প্রতিটি চিহ্ন বা সাইন অন্য এক চিহ্নে পৃথক করে দেয়, এখানে লেখকের উদ্দেশ্য এক মাত্র অর্থের উৎস নয়। কবি বলেন যা পেয়েছি সবটাই লিখেছি, আবার বলেন তবু মনে হয়.. কিছু থেকে গেল বাকি, এই দ্বৈত উচ্চারণই বিনির্মাণের সূত্রকে সূত্রবদ্ধ করে। ‘তাই লেখার অপূর্ণতা নিয়ে/জাগতিক নিয়মে পূর্ণচ্ছেদ টানতে হবে এখন’ দার্শনিক ভাঙনটা এখানে। অবচেতনের ইচ্ছা ও ভয় প্রতিফলিত দেখি আমরা নিচের পঙক্তিগুলোতে ‘বারবার মনে হয়েছে/হয়ত কোথাও হারিয়ে গেছে কিছু/আমি আর কোনদিন খুঁজে পাবো না’ যা হারানোর ভয়কে স্মরণ করিয়ে দেয়।এটাকে ফ্রয়েডের ভাষায় অবদমিত আকাঙ্খার প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচনায় রাখা হয়। মানুষ একবার নগ্ন হয় জন্মের সময়/আর একবার নগ্ন হয় আগুনের পোশাকপরে’ এখানে নগ্নতা শারীরিক নয় বরং এক সাইকো সিম্বোলিক মোটিভ । এখানে নগ্নতা ইগো ও সত্তার দ্বন্দ্বের প্রতীক। এরদ্বারা মানুষ যে সত্যিকারের আত্মপ্রকাশে ভয়পায় তার একটা চিন্তা আমরা ভাবনায় নিতে পারি। ‘ক্লান্ত হয়েছি,তবু পারিনি’ এই উচ্চারণ একটি অবচেবতন এর মতো,বারবার চেষ্টা,কিন্তু ব্যর্থতার আত্মতাড়না অন্তহীন রেখায়।
রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতায় আত্মপ্রকাশ ও পরিপূর্ণতার ব্যর্থতা আছে যেমন ‘শেষের কবিতা’,‘জীবনস্মৃতি’ কবি মাইতির কবিতায় সহজেই চোখে পড়ে তেমন পরিপূর্ণতার ব্যর্থতার ক্রন্দন ।‘তবু মনে হয়/নিশ্চয়ই কিছু থেকে গেল বাকি’ এই দ্বিধা আমরা রবীন্দ্রনাথের গানেও লক্ষ করি। ‘মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে’ এখানে রয়েছে অপূর্ণতা থেকে বিষণ্নতার ছায়া। জীবনানন্দের কবিতায় অপ্রাপ্তি,বিস্মরণ,সময়ের ফাঁকে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ও শব্দের উচ্চ ও মৃদু তাললয়ের সারগম অনুভব করতে পারি।জীবনানন্দের ভাষা চিত্রকল্প ঘন ও অতলষ্পর্শী ,কবি মাইতির ভাষা সরাসরি,খোলামেলা। কিন্তু আত্মবেদনার তাড়না কাছাকাছি একইরকম সুরে বাজে। এলিয়ট ধর্ম,ইতিহাস ও সমাজচেতার ভাঙনের ভাষায় তার কবিতায় কথা বলেছেন আর মাইতি আত্মদহনময় শব্দগুলোতে ব্যক্ত করেছেন অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের বিষাদময়তা দিয়ে। আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব বিষয়টি দর্শন, সাহিত্য ও মনস্তত্বেও কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। হাইডেগার,সার্ত্র, ও ক্যামু এই আত্মপরিচয়ের সংকটকে কিভাবে দেখেছেন তার সংগে সামঞ্জস্যই বা কতটুকু তা নিয়ে দু একটি কথা বলে আলোচনার শেষ বিন্দুতে স্থির হওয়া যেতে পারে। হাইডেগার বলেছেন মানুষ যখন আত্মসচেতন হয়,তখনই সে উপলব্ধি করে মৃত্যুই তার অনিবার্য--জন্ম নেয় অস্তিত্বের সংকট। সার্ত্র মনে করেন মানুষ মুক্ত কিন্তু এই মৃক্তির ভারই তার জন্য যন্ত্রণার কারণ। আলবেয়ার ক্যামু মনে করেন ‘জীবন অর্থহীন, [এ্যাবসার্ড] আর এর মধ্যদিয়েই মানুষ জীবনের অর্থ অনুসন্ধান করে। এই অর্থ ও অর্থহীনতাই তার অস্তিত্বের স্বরূপ।কবি অমৃত মাইতি তার কবিতায় যেমন বলেন ‘খুব চেষ্টা করেছি খোঁজার/মন উজার করে লিখেছি..তবু পারিনি,’ ক্যামুর অ্যাবসার্ড নায়ক সিসিফাসের মতো যে জানে পাথরটা উপড়ে তুলতে পারলেও আবার গড়িয়ে পড়বে। তবু সে ঠেলতে থাকে। সঙ্গত কারণে বলাই যায় ‘অসম্পূর্ণ লেখা’ কেবল একটি আত্মজৈবনিক কবিতা নয়। ভাষা, চেতনা ও অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব নিয়ে রচিত এক আধুনিক চিত্রপট। কাঠামোবাদ, ফ্রয়েডের অবচেতন তত্ত্ব এবং হাইডেগার-সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ করলে বোঝা যায় এই কবিতা অনন্য চেষ্টার দলিল, যেখানে ভাষা নিজেই নিজের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং কবি নিজের ভেতরের অপরিচিত সত্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। মাইতির কবিতায় আত্মবিশ্লেষণের দৃঢ়তা নেই, দুরূহতার স্পর্শও নেই তবে একটি নিরব, অস্পষ্ট, অথচ কাব্যময় অনুভব রয়েছে যা পাঠককে একটি অসম্পূর্ণ লেখার পূর্ণ অভিঘাতে স্পর্শ করে।
_____________________
কবি অমৃত মাইতি -- " মুক্তির সূর্য উঠবে কবিতায় "
( তিন )
মতিন বৈরাগী ।। ঢাকা : বাংলাদেশ
_______________________________
‘ব্যর্থতা তো দেখিনি কখনো /পিছন ফিরে তাকাইনি কোনদিন /এসবই কি শুধু প্রক্রিয়া । এগিয়ে যাওয়ার !/সাফল্যের সিঁড়ি আছে /কিন্তু সাফল্য কোথায় ?/সাফল্যটুকু বাকি থেকে গেল আমার জানার’ কিংবা ‘মুক্তির সূর্য উঠবে’কবিতায় তিনি বলেন ‘ দিগন্তে বিস্তৃত লাল রং ছেয়ে যাবে/পুরো আকাশটা লাল রঙে ছেয়ে যাবে/আমি জানি একদিন হবে /আমি জানি নিশ্চিত হবে/সূর্য লাল রক্ত লাল ঝান্ডা লাল’।ভাষা ও সাহিত্য আলোচনার ক্ষেত্রে মূলত ফার্দিনান্দ দ্য সসুরের ভাষাতাত্ত্বিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে কাঠামোবাদ, যেখানে বলা হয়, প্রতিটি সাহিত্যকর্ম একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কাজ করে এবং তার অর্থ নির্ধারণ হয় ভাষা, চিহ্ন ও সাংগঠনিক উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, উভয় কবিতায় একটি পূর্বনির্ধারিত কাঠামো রয়েছে যা ‘প্রগতি ও মুক্তি’ সংক্রান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বয়ানকে অনুসরণ করে।
০
মুক্তির প্রত্যাশা এবং বিপ্লবের চেতনার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কবিতাটি নির্মিত। এখানে “সূর্য”, “রক্ত লাল”, “ঝান্ডা”, “মুক্তির পায়রা” ইত্যাদি শব্দ চিহ্ন ‘সংগ্রামের প্রতীক।’ এই প্রতীকগুলোর অর্থ কেবল কবিতার অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মাধ্যমেই বৃহত্তর রাজনৈতিক/সমাজিক বয়ান। “সূর্য লাল রক্ত লাল ঝান্ডা লাল” ‘লাল’ সংগ্রামের প্রতীক। বার বার বলা হচ্ছে “আমি জানি একদিন হবে / আমি জানি নিশ্চিত হবে” নিশ্চয়তা ও প্রত্যাশার দ্বান্দ্বিক বিন্যাস রয়েছে এই কবিতায়। রোলাঁ বার্ত বলেন, ভাষা যখন পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে শব্দের সচারতাকে অতিক্রম করে তখন ভিন্ন অর্থদ্যোতনা পাঠকের মস্তিষ্কে নির্ধারিত ধাঁচ তৈরি করে । ‘সাফল্যের সিঁড়ি’ পর্যায়ক্রমে অগ্রসরমান ক্রিয়াকে সহগামী করে। “সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে / প্রতিটি ধাপ যত্ন করে পেরিয়েছি”। এই বক্তব্য একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সংহত। কবিতা দুটিতে বিপরীত মুখী প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেমন প্রক্রিয়া বনাম চূড়ান্ত সাফল্য -> ব্যক্তির প্রচেষ্টা বনাম সামাজিক স্বীকৃতি। “সাফল্যের সিঁড়ি আছে / কিন্তু সাফল্য কোথায়?” দৃষ্টযোগ্য, কবিতাটি সাফল্যের একটি প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সেই সাফল্য আসলে অধরা থাকে। লেভি-স্ট্রস বলেন সমাজ ও সংস্কৃতির সকল অর্থ বৈপরীত্যের মধ্যে গড়ে ওঠে। মাইতির কবিতার ভাষ্য এবং উপভাষ্য একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সংগঠিত , যেখানে প্রতীক, দ্বান্দ্বিকতা ও পুনরাবৃত্তি কখনও খণ্ডিত কখনও পূর্ণাঙ্গতা দেয়। ‘মুক্তির সূর্য উঠবে’ কবিতায় বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান, যেখানে মুক্তির প্রতিশ্রুতি ও সংগ্রামে এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। অন্যদিকে, ‘সাফল্যের সিঁড়ি’ কবিতায় জীবন ও সাফল্যের মধ্যকার কাঠামোগত সম্পর্ক তুলে ধরে।
০
পাভলো নেরুদা, নাজিম হিকমত ও রবীন্দ্রনাথের কবিতার সাথে মিলিয়ে বলা যায় তাঁদের কাব্যচিন্তা ও কাব্যরীতি একদিকে সমাজ-রাজনীতি ও মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যদিকে কাঠামোগতভাবে নির্দিষ্ট শৈলীর অন্তর্ভূক্ত । নেরুদার কবিতা মূলত বাস্তব অভিজ্ঞতার ভাষায় নির্মিত, যেখানে প্রেম, বিপ্লব, প্রকৃতি ও ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ কাঠামো গড়ে ওঠেছে। নেরুদার কবিতায় লাতিন আমেরিকার সংগ্রামকে উজ্জ্বল ভাবে তুলে ধরেছে। উপস্থিত আছে ইতিহাসের অনুষঙ্গ । এখানে ভাষা ও প্রতীকের কাঠামো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। “তোমার রক্ত দিয়ে আমি পথের মানচিত্র আঁকব/তোমার দেহের শিরা দিয়ে আমি নদীর ধারা টানব।”নেরুদার কবিতায় আমরা প্রাকৃতিক বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিপ্লব/ বনাম শোষণ, প্রেম বনাম/ নির্জণতা এই ধরনের দ্বান্দ্বিক কাঠামো দেখতে পাই, যা ক্লদ লেভি-স্ট্রসের কাঠামোবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
০
“আমি স্বপ্ন দেখি/একদিন আমার দেশের আকাশ নীল হবে/আর শিশুদের মুখে থাকবে হাসি। ‘আকাশ নীল হওয়া’ এবং ‘শিশুর হাসি’ আসলে সাম্য ও শান্তির প্রতীক, যা কাঠামোবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিরোধী বাস্তবতার বিপরীতে সম্ভাবনার ভাষা তৈরি করে। হিকমতের কবিতায় পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে দৃঢ় চেতনার গঠন লক্ষ করা যায়। “এখনও নয়, কিন্তু হবে/এখনও নয়, কিন্তু হবে” মাইতির কবিতায় তেমন পুনরাবৃত্তি দ্বারা চেতনাকে শানিত করা হয়েছে। অমৃত মাইতির "মুক্তির সূর্য উঠবে" এবং "সাফল্যের সিঁড়ি" কবিতায় প্রতীক, পুনরাবৃত্তি, দ্বান্দ্বিক কাঠামো ও প্রক্রিয়াবাদী বাস্তবতা রয়েছে যা কাঠামোবাদী তত্ত্বের সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মাইতির "সাফল্যের সিঁড়ি" কবিতায় লক্ষণীয় ‘ সাফল্যের ধারে পাশে আসতেই পারিনি’ এখানে সাফল্য একটি চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং একটি অন্তহীন পথ। এটি রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির দার্শনিক কাঠামোর সাথে সংহতি প্রকাশ করে। ‘যেমন তোমার পথের ধুলা হয়ে ছড়িয়ে যাবো’ কবি অমৃত মাইতি রাজনৈতিক পরিচয় আছে,আজীবন তিনি তাঁর আদর্শকে সমান ভাবে লালন করে আসছেন।
____________________________
অমৃত মাইতির প্রবন্ধ ইতিহাসের আকর
___________________
তাপস দেবনাথ ।। ত্রিপুরা
কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অমৃত মাইতির 'স্মৃতিচারণ' বইটিতে ৩০টি নিবন্ধ আছে। দুই তিন পাতা জুড়ে নিবন্ধগুলো এক জায়গায় জড়ো করলে তার জীবনি হয়ে যায়। আজীবন বামপন্থী এই মানুষটি সেই কবে কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছেন, পরে আর এস পির সঙ্গে যুক্ত হন, লালঝান্ডার আন্দোলন করতে গিয়ে চাকরি ছেড়েছেন, জেলে গেছেন, কবিতার জন্য পৃথিবীর নানা প্রান্তে গেছেন কিন্তু থেমে যাননি। ৭৮ বছরের জীবনে আজও লালঝান্ডা তুলে ধরে রেখে বিশ্বাস করেন, একদিন এই পচাগলা সমাজ পরিবর্তন হয়ে নতুন সমাজ তৈরি হবে। তিনি পৃথিবীর যেখানেই গেছেন, সেখানকার অভিজ্ঞতা, যে সব মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাদের সম্পর্কে লিখেছেন। মানুষের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। নিবন্ধগুলো পড়তে পড়তে এই সিদ্ধান্ত উপনীত হবেন পাঠক।
ত্রিপুরা তার দ্বিতীয় বাড়ি মনে করেন। মাঝে মাঝেই চলে আসেন আগরতলায়। দুদিন থেকে আবার চলে যান। তিনি প্রতিদিন লিখে চলেছেন। তার একটি প্রবন্ধ গ্রন্থের প্রকাশ করেন পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। এই বইতে ত্রিপুরা নিয়ে একটি প্রবন্ধ ও অন্য প্রবন্ধে তার ভালোলাগার কথা আছে। রাতুল দেববর্মণ, রামেশ্বর ভট্টাচার্য যেমন তার প্রিয় মানুষ তেমনি কবি মন্ত্রী প্রয়াত অনিল সরকারের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। দুর্গাবাড়ি সমবায় চা বাগানের কথা রয়েছে তার লেখায়। বাগানের প্রাণপুরুষ পানু মজুমদারের লড়াই দুর্গাবাড়ি চা বাগান নিয়ে তার প্রবন্ধ দেশের কথায় ছাপা হয়েছিল। এই বইতেও তার কথা আছে। পবিত্র কর সহ যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় সম্পর্কে যেমন বলেছেন, তেমনি কবি সাহিত্যিকদের বন্ধুত্বের কথা তুলে ধরেছেন। ত্রিপুরার পর্যটন স্থলগুলোর কথা এসেছে তার লেখায়। বহু ঘটনা বলতে যাওয়ায় সব ছুঁয়ে গেছেন। বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তাও উঠে এসেছে তার লেখায়।
কাব্য, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, নাটক, কাব্যনাটক, প্রবন্ধগ্রন্থ মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০০ ছুঁয়ে গেছে। দেশ বিদেশের সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষের কাছে অমৃত মাইতি পৌঁছুতে চান তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে। সারা জীবনের আন্দোলন, বিপ্লবের ডাক, লালঝাণ্ডার হাতছানির মধ্যে দাঁড়িয়েও তাঁর প্রেমের কবিতা মনের লাল উত্তাপের স্বাক্ষর।
জন্ম ১৯৪৭-এর ১৩ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম খানার শিবরামপুর গ্রামে। বাবা প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপচন্দ্র মাইতি, মা করুণাময়ী। অমৃত মাইতি একজন বামপন্থী আদর্শের সৈনিক, কৃষক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই তিনি অগ্রণী। সাহিত্য সাধনাতেও তিনি সমান সফল। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ থেকে তিনি একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। কানাডার মন্ট্রিগুলে কানাডা-বাংলাদেশ সলিডিটারির আমন্ত্রণে 'মহান একুশের বইমেলা'য় একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে 'একুশে পদক' গ্রহণ করেন। আগরতলা বইমেলার মঞ্চে গ্রহণ করেছেন, আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার।
জনগণের সঙ্গে থাকা বামপন্থী রাজনীতির মানুষের হাত থেকে যখন সাহিতা, শিল্পকলার মতো নন্দনতান্ত্রিক লেখা বেরিয়ে আসে, তখন আমরা একটু অন্যরকমভাবে তাঁকে ও তাঁর লেখাকে উপলব্ধি করতে চাই। একদিকে মেহনতি মানুষের জন্য সংগ্রাম, কৃষক, শ্রমিক, মজদুরের জন্য তাদের সঙ্গে থেকে তাদের মতো করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পর একজন চব্বিশ ঘণ্টার পার্টির সর্বক্ষণের কর্মীর অবসর সময়ে লেখা, কবিতায় প্রধানত সেই সংগ্রাম, আন্দোলনই ফিরে ফিরে আসে। অমৃত মাইতির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় নি।
শাক খেতে ভালোবাসেন। শুধু ডাল দিয়ে পেটপুরে ভাত খেতে পারেন। আবার মাইলের পর মাইল হেঁটে, অভূক্তপেটে থেকেও পার্টি কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে অন্যের খাবারে ভাগ বসাননি। টানা ২৪ ঘন্টা না খেয়েও কাটিয়েছেন। কিন্তু বাড়িতে খাবারের অভাব ছিল না। পার্টির নির্দেশে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে কাজ করার সময় বহুবার এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। এজন্য আজন্ম পেট ব্যাথাকে সঙ্গী করেছেন। কোথাও সামান্য শাকভাত, মাছ যাই মিলেছে তৃপ্তিভরে খেয়েছেন। সেই খাবার যে অমৃত সমান উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, এই খাবারের কথা আজীবন মনে থাকবে। মেদেনিপুরের একেবারে পিছিয়ে পড়া একটি গ্রামে থেকেও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা মানুষটিকে সালাম। মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে কিভাবে বিপদে পড়েছেন, কিভাবে গেরিলা কায়দায়, সংগঠন করতে হয় লেখাগুলোর পরতে পরতে রয়েছে তার ইতিহাস। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, সাদামাটা লেখা হলেও এই বইটি রাজনৈতিক ও সাহিত্যের ইতিহাসে আকর গ্রন্থের মর্যাদা পেতে পারে।
______________
_____________________
অমৃত অনুভব
‘ব্যর্থতা তো দেখিনি কখনো /পিছন ফিরে তাকাইনি কোনদিন /এসবই কি শুধু প্রক্রিয়া । এগিয়ে যাওয়ার !/সাফল্যের সিঁড়ি আছে /কিন্তু সাফল্য কোথায় ?/সাফল্যটুকু বাকি থেকে গেল আমার জানার’ কিংবা ‘মুক্তির সূর্য উঠবে’কবিতায় তিনি বলেন ‘ দিগন্তে বিস্তৃত লাল রং ছেয়ে যাবে/পুরো আকাশটা লাল রঙে ছেয়ে যাবে/আমি জানি একদিন হবে /আমি জানি নিশ্চিত হবে/সূর্য লাল রক্ত লাল ঝান্ডা লাল’।ভাষা ও সাহিত্য আলোচনার ক্ষেত্রে মূলত ফার্দিনান্দ দ্য সসুরের ভাষাতাত্ত্বিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে কাঠামোবাদ, যেখানে বলা হয়, প্রতিটি সাহিত্যকর্ম একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কাজ করে এবং তার অর্থ নির্ধারণ হয় ভাষা, চিহ্ন ও সাংগঠনিক উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, উভয় কবিতায় একটি পূর্বনির্ধারিত কাঠামো রয়েছে যা ‘প্রগতি ও মুক্তি’ সংক্রান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বয়ানকে অনুসরণ করে।
০
মুক্তির প্রত্যাশা এবং বিপ্লবের চেতনার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কবিতাটি নির্মিত। এখানে “সূর্য”, “রক্ত লাল”, “ঝান্ডা”, “মুক্তির পায়রা” ইত্যাদি শব্দ চিহ্ন ‘সংগ্রামের প্রতীক।’ এই প্রতীকগুলোর অর্থ কেবল কবিতার অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মাধ্যমেই বৃহত্তর রাজনৈতিক/সমাজিক বয়ান। “সূর্য লাল রক্ত লাল ঝান্ডা লাল” ‘লাল’ সংগ্রামের প্রতীক। বার বার বলা হচ্ছে “আমি জানি একদিন হবে / আমি জানি নিশ্চিত হবে” নিশ্চয়তা ও প্রত্যাশার দ্বান্দ্বিক বিন্যাস রয়েছে এই কবিতায়। রোলাঁ বার্ত বলেন, ভাষা যখন পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে শব্দের সচারতাকে অতিক্রম করে তখন ভিন্ন অর্থদ্যোতনা পাঠকের মস্তিষ্কে নির্ধারিত ধাঁচ তৈরি করে । ‘সাফল্যের সিঁড়ি’ পর্যায়ক্রমে অগ্রসরমান ক্রিয়াকে সহগামী করে। “সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে / প্রতিটি ধাপ যত্ন করে পেরিয়েছি”। এই বক্তব্য একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সংহত। কবিতা দুটিতে বিপরীত মুখী প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেমন প্রক্রিয়া বনাম চূড়ান্ত সাফল্য -> ব্যক্তির প্রচেষ্টা বনাম সামাজিক স্বীকৃতি। “সাফল্যের সিঁড়ি আছে / কিন্তু সাফল্য কোথায়?” দৃষ্টযোগ্য, কবিতাটি সাফল্যের একটি প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সেই সাফল্য আসলে অধরা থাকে। লেভি-স্ট্রস বলেন সমাজ ও সংস্কৃতির সকল অর্থ বৈপরীত্যের মধ্যে গড়ে ওঠে। মাইতির কবিতার ভাষ্য এবং উপভাষ্য একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সংগঠিত , যেখানে প্রতীক, দ্বান্দ্বিকতা ও পুনরাবৃত্তি কখনও খণ্ডিত কখনও পূর্ণাঙ্গতা দেয়। ‘মুক্তির সূর্য উঠবে’ কবিতায় বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান, যেখানে মুক্তির প্রতিশ্রুতি ও সংগ্রামে এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। অন্যদিকে, ‘সাফল্যের সিঁড়ি’ কবিতায় জীবন ও সাফল্যের মধ্যকার কাঠামোগত সম্পর্ক তুলে ধরে।
০
পাভলো নেরুদা, নাজিম হিকমত ও রবীন্দ্রনাথের কবিতার সাথে মিলিয়ে বলা যায় তাঁদের কাব্যচিন্তা ও কাব্যরীতি একদিকে সমাজ-রাজনীতি ও মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যদিকে কাঠামোগতভাবে নির্দিষ্ট শৈলীর অন্তর্ভূক্ত । নেরুদার কবিতা মূলত বাস্তব অভিজ্ঞতার ভাষায় নির্মিত, যেখানে প্রেম, বিপ্লব, প্রকৃতি ও ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ কাঠামো গড়ে ওঠেছে। নেরুদার কবিতায় লাতিন আমেরিকার সংগ্রামকে উজ্জ্বল ভাবে তুলে ধরেছে। উপস্থিত আছে ইতিহাসের অনুষঙ্গ । এখানে ভাষা ও প্রতীকের কাঠামো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। “তোমার রক্ত দিয়ে আমি পথের মানচিত্র আঁকব/তোমার দেহের শিরা দিয়ে আমি নদীর ধারা টানব।”নেরুদার কবিতায় আমরা প্রাকৃতিক বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিপ্লব/ বনাম শোষণ, প্রেম বনাম/ নির্জণতা এই ধরনের দ্বান্দ্বিক কাঠামো দেখতে পাই, যা ক্লদ লেভি-স্ট্রসের কাঠামোবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
০
“আমি স্বপ্ন দেখি/একদিন আমার দেশের আকাশ নীল হবে/আর শিশুদের মুখে থাকবে হাসি। ‘আকাশ নীল হওয়া’ এবং ‘শিশুর হাসি’ আসলে সাম্য ও শান্তির প্রতীক, যা কাঠামোবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিরোধী বাস্তবতার বিপরীতে সম্ভাবনার ভাষা তৈরি করে। হিকমতের কবিতায় পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে দৃঢ় চেতনার গঠন লক্ষ করা যায়। “এখনও নয়, কিন্তু হবে/এখনও নয়, কিন্তু হবে” মাইতির কবিতায় তেমন পুনরাবৃত্তি দ্বারা চেতনাকে শানিত করা হয়েছে। অমৃত মাইতির "মুক্তির সূর্য উঠবে" এবং "সাফল্যের সিঁড়ি" কবিতায় প্রতীক, পুনরাবৃত্তি, দ্বান্দ্বিক কাঠামো ও প্রক্রিয়াবাদী বাস্তবতা রয়েছে যা কাঠামোবাদী তত্ত্বের সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মাইতির "সাফল্যের সিঁড়ি" কবিতায় লক্ষণীয় ‘ সাফল্যের ধারে পাশে আসতেই পারিনি’ এখানে সাফল্য একটি চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং একটি অন্তহীন পথ। এটি রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির দার্শনিক কাঠামোর সাথে সংহতি প্রকাশ করে। ‘যেমন তোমার পথের ধুলা হয়ে ছড়িয়ে যাবো’ কবি অমৃত মাইতি রাজনৈতিক পরিচয় আছে,আজীবন তিনি তাঁর আদর্শকে সমান ভাবে লালন করে আসছেন।
____________________________
অমৃত অনুভব
অমৃত মাইতির প্রবন্ধ ইতিহাসের আকর
__ .....__.....____
তাপস দেবনাথ ।। ত্রিপুরা
কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অমৃত মাইতির 'স্মৃতিচারণ' বইটিতে ৩০টি নিবন্ধ আছে। দুই তিন পাতা জুড়ে নিবন্ধগুলো এক জায়গায় জড়ো করলে তার জীবনি হয়ে যায়। আজীবন বামপন্থী এই মানুষটি সেই কবে কমিউনিস্ট পার্টিতে এসেছেন, পরে আর এস পির সঙ্গে যুক্ত হন, লালঝান্ডার আন্দোলন করতে গিয়ে চাকরি ছেড়েছেন, জেলে গেছেন, কবিতার জন্য পৃথিবীর নানা প্রান্তে গেছেন কিন্তু থেমে যাননি। ৭৮ বছরের জীবনে আজও লালঝান্ডা তুলে ধরে রেখে বিশ্বাস করেন, একদিন এই পচাগলা সমাজ পরিবর্তন হয়ে নতুন সমাজ তৈরি হবে। তিনি পৃথিবীর যেখানেই গেছেন, সেখানকার অভিজ্ঞতা, যে সব মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাদের সম্পর্কে লিখেছেন। মানুষের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। নিবন্ধগুলো পড়তে পড়তে এই সিদ্ধান্ত উপনীত হবেন পাঠক।
ত্রিপুরা তার দ্বিতীয় বাড়ি মনে করেন। মাঝে মাঝেই চলে আসেন আগরতলায়। দুদিন থেকে আবার চলে যান। তিনি প্রতিদিন লিখে চলেছেন। তার একটি প্রবন্ধ গ্রন্থের প্রকাশ করেন পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। এই বইতে ত্রিপুরা নিয়ে একটি প্রবন্ধ ও অন্য প্রবন্ধে তার ভালোলাগার কথা আছে। রাতুল দেববর্মণ, রামেশ্বর ভট্টাচার্য যেমন তার প্রিয় মানুষ তেমনি কবি মন্ত্রী প্রয়াত অনিল সরকারের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। দুর্গাবাড়ি সমবায় চা বাগানের কথা রয়েছে তার লেখায়। বাগানের প্রাণপুরুষ পানু মজুমদারের লড়াই দুর্গাবাড়ি চা বাগান নিয়ে তার প্রবন্ধ দেশের কথায় ছাপা হয়েছিল। এই বইতেও তার কথা আছে। পবিত্র কর সহ যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় সম্পর্কে যেমন বলেছেন, তেমনি কবি সাহিত্যিকদের বন্ধুত্বের কথা তুলে ধরেছেন। ত্রিপুরার পর্যটন স্থলগুলোর কথা এসেছে তার লেখায়। বহু ঘটনা বলতে যাওয়ায় সব ছুঁয়ে গেছেন। বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তাও উঠে এসেছে তার লেখায়।
কাব্য, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, নাটক, কাব্যনাটক, প্রবন্ধগ্রন্থ মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০০ ছুঁয়ে গেছে। দেশ বিদেশের সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষের কাছে অমৃত মাইতি পৌঁছুতে চান তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে। সারা জীবনের আন্দোলন, বিপ্লবের ডাক, লালঝাণ্ডার হাতছানির মধ্যে দাঁড়িয়েও তাঁর প্রেমের কবিতা মনের লাল উত্তাপের স্বাক্ষর।
জন্ম ১৯৪৭-এর ১৩ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম খানার শিবরামপুর গ্রামে। বাবা প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রতাপচন্দ্র মাইতি, মা করুণাময়ী। অমৃত মাইতি একজন বামপন্থী আদর্শের সৈনিক, কৃষক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই তিনি অগ্রণী। সাহিত্য সাধনাতেও তিনি সমান সফল। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ থেকে তিনি একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। কানাডার মন্ট্রিগুলে কানাডা-বাংলাদেশ সলিডিটারির আমন্ত্রণে 'মহান একুশের বইমেলা'য় একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে 'একুশে পদক' গ্রহণ করেন। আগরতলা বইমেলার মঞ্চে গ্রহণ করেছেন, আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার।
জনগণের সঙ্গে থাকা বামপন্থী রাজনীতির মানুষের হাত থেকে যখন সাহিতা, শিল্পকলার মতো নন্দনতান্ত্রিক লেখা বেরিয়ে আসে, তখন আমরা একটু অন্যরকমভাবে তাঁকে ও তাঁর লেখাকে উপলব্ধি করতে চাই। একদিকে মেহনতি মানুষের জন্য সংগ্রাম, কৃষক, শ্রমিক, মজদুরের জন্য তাদের সঙ্গে থেকে তাদের মতো করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পর একজন চব্বিশ ঘণ্টার পার্টির সর্বক্ষণের কর্মীর অবসর সময়ে লেখা, কবিতায় প্রধানত সেই সংগ্রাম, আন্দোলনই ফিরে ফিরে আসে। অমৃত মাইতির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় নি।
শাক খেতে ভালোবাসেন। শুধু ডাল দিয়ে পেটপুরে ভাত খেতে পারেন। আবার মাইলের পর মাইল হেঁটে, অভূক্তপেটে থেকেও পার্টি কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে অন্যের খাবারে ভাগ বসাননি। টানা ২৪ ঘন্টা না খেয়েও কাটিয়েছেন। কিন্তু বাড়িতে খাবারের অভাব ছিল না। পার্টির নির্দেশে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে কাজ করার সময় বহুবার এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। এজন্য আজন্ম পেট ব্যাথাকে সঙ্গী করেছেন। কোথাও সামান্য শাকভাত, মাছ যাই মিলেছে তৃপ্তিভরে খেয়েছেন। সেই খাবার যে অমৃত সমান উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, এই খাবারের কথা আজীবন মনে থাকবে। মেদেনিপুরের একেবারে পিছিয়ে পড়া একটি গ্রামে থেকেও সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা মানুষটিকে সালাম। মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে কিভাবে বিপদে পড়েছেন, কিভাবে গেরিলা কায়দায়, সংগঠন করতে হয় লেখাগুলোর পরতে পরতে রয়েছে তার ইতিহাস। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, সাদামাটা লেখা হলেও এই বইটি রাজনৈতিক ও সাহিত্যের ইতিহাসে আকর গ্রন্থের মর্যাদা পেতে পারে।
___________________________________________&
অমৃত অনুভব
শ্ৰীযুত অমৃত মাইতি মহাশয় একজন স্বীকৃত
স্বনামধন্য সাহিত্যিক হিসাবে দেশে ও বিদেশে খ্যাত।
তাঁর নামে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক উন্নয়ন সমিতির প্রাঙ্গণে "অমৃত গ্রন্থাগার " নামে একটি লাইব্রেরী হয়েছে। শ্রদ্ধা ও সম্মানের নিদর্শন হিসাবে অমৃত গ্রন্থাগারটি এই যোগ্য ব্যক্তির নামে উৎসর্গ করেছেন জেনে আমি সত্যি আনন্দিত। এই অমূল্য জ্ঞান ভাণ্ডারটি জনসাধারণের এবং বিশেষভাবে তরুণ-তরুণীদের জ্ঞান পিপাশা বৃদ্ধি ও বিকাশের স্বার্থে অবশ্যই সহায়ক হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
আন্তরিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করে একুশে ফেব্রুয়ারি : ২০২৫ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন এবং “অমৃত গ্রন্থাগার” উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। জেনে আরো খুশি হলাম তাঁকে নিয়ে কিছু বিশিষ্ট মানুষজন তাঁদের অনুভবের কথা লিখেছেন। অমৃত বাবুর প্রতি আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইলো।
☐
বিনীত
মানিক সরকার
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।। ত্রিপুরা
____________________________________________
