Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

লেখকের মোটিভ - অমৃত মাইতি

লেখকের মোটিভঅমৃত মাইতি সম্পাদনা/ দেশ মানুষ ডেস্ক
         (এক)-----------------আমরা যখন লেখা শুরু করি তখন সাধারণভাবে একটি আবেগ আগ্রহ ইচ্ছা অনুভূতি কাজ করে। অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আমরা লেখা শুরু করি। কিন্তু যতদিন এগোয় লিখতে লি…



  লেখকের মোটিভ

অমৃত মাইতি 

সম্পাদনা/ দেশ মানুষ ডেস্ক


         (এক)-----------------

                

আমরা যখন লেখা শুরু করি তখন সাধারণভাবে একটি আবেগ আগ্রহ ইচ্ছা অনুভূতি কাজ করে। অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আমরা লেখা শুরু করি। কিন্তু যতদিন এগোয় লিখতে লিখতে স্বতঃস্ফূর্ততার জায়গায় মোটিভ কথাটি বা শব্দটি মগজে চলে আসে। আমরা কী মানুষের বা সমাজের কামনা-বাসনা ইত্যাদি ইচ্ছাকে সামনে রেখে বা তাদের মোটিভকে সামনে রেখে লিখি নাকি আমরাই মোটিভের বশীভূত হয়ে লিখতে শুরু করি। মানুষের মোটিভকে সম্মান দিয়ে একজন লেখক লিখতে পারেন। আবার মানুষের দিকে না তাকিয়ে সমাজের দিকে না তাকিয়ে আমার অন্তর্নিহিত যে দৃষ্টিভঙ্গি আছে তার দ্বারা পরিচালিত হয়ে আমি লিখি যার সঙ্গে সামাজিক বিষয় জড়িয়ে থাকে। মানুষের এবং সামাজিক বহু বিষয় আমাকে মোটিভেট করতে পারে। এবং সেখান থেকে আমার লেখার প্রেরণা আসতে পারে। বহু ঘটনাবলি আমাদেরকে প্ররোচিত করে তখন বাধ্য হয়ে আমরা কলম ধরি। মানবিক কারণে মনুষ্যত্বের দাবি নিয়ে আমরা বিবেকের তাগিদ অনুভব করে লিখতে বসি। বিবেকের চাবুক আমাদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়, সচেতন করে । যার যেমন বিবেকবোধ তিনি তেমন চিন্তাভাবনার লোক এবং সেখান থেকেই তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন ও মানুষকে শিক্ষা দেয়ার জন্য কলম ধরেন। আমরা দ্রুত গতিতে কাগজ-কলম খুঁজে নিয়ে বসে পড়ি লিখতে। আসলে আমাদেরকে পরিবেশ পরিস্থিতি ঘটনাবলী ভয়ংকর ভাবে চাপ দেয় লেখার জন্য, মানুষকে সচেতন করার জন্য। তাই কাগজ-কলম ধরার জন্য একটা মোটিভ কাজ করে।


মোটিভের যুক্তিসংগত অর্থ উদ্দেশ্য হতে পারে। কিন্তু তবুও মনে হয় মোটিভের একটা ব্যাপকতা আছে যার সঙ্গে আমাদের অন্তর্দৃষ্টির সংযোগ থাকে। খুব সূক্ষ্মভাবে আমরা রিলেট করতে পারি জনতার উদ্দেশ্যের পেছনে আমাদের এক সূক্ষ্ম মোটিভ কাজ করে। আমার মনে হয় মোটিভের পেছনে একটা তীব্র খোঁচা থাকে। তাই কোন কাজের পেছনে মোটিভ একটি চালিকাশক্তি। ভাবুক মনে এই সব নাড়া দেওয়া কথাগুলো আমাদের আচরণের দিকটি তুলে ধরার চেষ্টা করে। একজন ভাবুক মানুষ শুধু কী অলীক কল্পনা বা অলস ভাবনার মধ্যে বিচরণ করে থাকেন ? একজন ভাবুক মানুষ চরিত্রগতভাবে কাজের চাইতে অকাজ করেন না কখনো। ভাবুক মানুষ কিন্তু ভীষণভাবে সচেতন। কোন একটি থিম বা বিষয়কে বারবার ইঙ্গিত করার মধ্য দিয়ে লেখকের বিশেষ মোটিভ কাজ করে।


ধরুন বর্তমান যে সরকার দিল্লিতে আছে তাদের আগে পর্যন্ত আমি নিজে একজন হিন্দু হয়েই বলছি, হিন্দুরা কিন্তু নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটের মধ্যে পড়েন নি। এখনো কিন্তু হিন্দুদের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে কোন সংকট নেই। তাহলে কি শাসকগোষ্ঠীর বিশেষ মোটিভ আছে এই ধরনের বিষয়কে উস্কানি দেওয়া বা মানুষের মধ্যে প্রচার করার। আবার আমার বা আমাদের মোটিভ হল এই দৃষ্টিভঙ্গিকে একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়া। মানবিক এবং সংস্কার মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার ভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা আমাদের কিন্তু বিশেষ মোটিভ। কারণ আমরা যারা হিন্দু, হিন্দুরা সংকটে আছে এ কথা বিশ্বাস করি না। এখানে দু ধরনের মোটিভ কাজ করছে। তাই একজন লেখককে সবসময় সচেতনভাবেই কলম ধরতে হবে, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি মধ্যে কতটা সমতা আছে অথবা বৈপরীত্য আছে তা বলার বা বোঝানোর জন্য। মোটিভ শব্দের অর্থ যাই হোক না কেন সকলের মোটিভ সমান নয়। যিনি যেমন লেখক যেমন আদর্শে বিশ্বাসী,তার মোটিভ সেরকমই হবে।


        (দুই)---------------

        

একজন খুনীর মোটিভ এবং একজন লেখকের  মোটিভ এক নয়। একজন খুনির মোটিভ খুন করা নাও হতে পারে, পরিস্থিতিতে তিনি খুন করে ফেললেন এমনও হতে পারে। একজন ডাক্তারের মোটিভ বুঝতে অসুবিধা হয় না। একজন শিক্ষকের মোটিভ খুব সহজেই বোঝা যায়। একজন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষকে হারানো এবং আপনপক্ষকে জেতানোর মোটিভ নিয়ে খেলতে নামে। এই মোটিভ পেশার সঙ্গে সহজাত।


কিন্তু একজন লেখকের মোটিভ পূর্বপরিকল্পিত। মানুষকে মোটিভেটেড করে সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অসাম্যের বিরুদ্ধে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখক লিখতে বাধ্য হন।


একজন ব্যক্তির খুন করার অভিপ্রায় না থাকলেও টর্চার করতে করতে মাথায় খুন চেপে যায়। তখন মোটিভ নয় পরিস্থিতি বিচার্য বিষয়। পরিস্থিতি অনেক সময় প্ররোচিত করে। বাধ্য করায়। লেখক অনেক সময় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে যায় সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে।আর জি করের মত ঘটনার প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ানো নৈতিক কর্তব্য।পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে প্রতিবাদী হওয়ার জন্য মোটিভেটেড করে সমাজ সচেতন লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা। জনমত তৈরিতে এগিয়ে আসে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তি। মোটিভেটেড করার জন্য দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যোগ্যতাও চাই।দৈনন্দিন অভ্যাস অনুশীলন করতে হবে। একজন কৃতি মানুষ তার অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারে সময় কতটা সঠিক এবং উপযুক্ত। মানুষকে মোটিভেট করতে গেলে সেই মানুষ বা সমাজ কতটা উপযুক্ত হয়েছে, সেটিও যিনি মোটিভেট করবেন তার জ্ঞান থাকা উচিত। একজন কামারকেও অপেক্ষা করতে হয় ধৈর্য ধরে কখন আঘাত করবেন সেই উপযুক্ত সময়ের। এই শ্রেণীবিভক্ত সমাজে মানুষের হাজার সমস্যা। দৈনন্দিন ও ব্যবহারিক জীবনে খাওয়া পরা বেঁচে থাকার সমস্যাগুলো অনুধাবন করার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয় সমাজকর্মীদের। এই কারণে উদ্দেশ্য এবং মোটিভ ঠিকমতো অনুধাবন করা প্রয়োজন। না হলে কেন কী কারনে মানুষের মধ্যে কাজ করবেন, তার জন্য নিজের ভেতর থেকে তাগিদ অনুভব করা অসম্ভব হয়ে যাবে। যিনি মোটিভ নিয়ে কাজ করেন তিনি কিন্তু ভীষণভাবে সচেতন মানুষ। মানুষের মধ্যে কাজ করার জন্য তিনি কখনোই নিজেকে এক্সপোস করবেন না। তিনি খুবই সচেতনভাবে মানুষের মধ্যে কাজ করবেন, সমস্যা গুলো অনুধাবন করে সাধারণভাবে সহজভাবে উপায় উদ্ভাবন করে কাজে প্রবৃত্ত  হবেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যিনি মানুষের মধ্যে কাজ করবেন তার মানসিক প্রস্তুতি এবং আত্মত্যাগের মনোভাব থাকবে প্রবলভাবে। কখনো কোন অবস্থাতেই তাকে টোলানো যাবে না। তিনি দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করেন মানুষের মধ্যে। তিনি মানুষের চেতনার পারদ ভালোমতো বুঝতে পারেন। এভাবে তিনি নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলেন। কাজ করতে করতে তিনি অভিজ্ঞ হন। ভুল ভ্রান্তির সম্ভাবনা কমে যায়। একজন মোটিভেটেড মানুষ মানুষের দুর্বলতা সফলতা এবং চেতনা সম্পর্কে অভিজ্ঞ না হলে কাজ করতে পারবেন না। মানুষের মধ্যে কাজ করা তার ব্রত। তিনিও মনে প্রানে সেটা উপলব্ধি করেন। যেমন তিনি প্রতিকূলতাকে ভয় করেন না ঠিক তেমনি পিছুটানকে সহজেই অবহেলা করতে পারেন। তিনি যে সমাজের কাজকর্ম করার জন্য দায়বদ্ধ তা শুধু নিজেই জানেন। এইজন্য তিনি ঢাক ঢোল পিটিয়ে কখনো চলবেন না। নিজেকে জাহির করবেন না। ভেতরে ভেতরে বৈষম্য ও বাস্তবতা বুঝে মোটিভেটেড হবেন।


     (তিন)---------------------

             

সমাজ জীবনে নেমে এসেছে নিকষ কালো অন্ধকার। তাই মোটিভেটেড লেখককে হতে হবে তিমির বিনাশী। তার বিশ্বাস আছে, অন্ধকারের কুজ্ঝটিকা  সরে যাবে, ধোঁয়াশাও সরে যাবে। ফুটে উঠবে ঝলমলে রোদ। জীবনানন্দের কথাই বলতে হয়, ফুটপাতে যারা থাকে তাদেরও বেডের প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে মৃত্যুর আগে বিশ্রামের। এই বোধ এই উপলব্ধি ছাড়া একজন মোটিভেটেড লেখককে প্রকৃত লেখক বলা যাবে না। লেখকের অন্তর আত্মা যদি ব্যাথিতের জন্য কেঁদে না উঠে তাহলে সেই লেখকের কোন দাম নেই। লেখক কোনরকম শখ মেটানোর জন্য লেখেন না। তাঁর সুনির্দিষ্ট মোটিভ থাকবেই। তিনি সব সময় গতানুগতিকতার বাইরে, দুর্যোগের মধ্য দিয়ে চলতে ভালোবাসেন। জনতার দুর্যোগের জীবনকে তিনি নিজের বলেই মনে করেন। নিজের জীবনের দুর্যোগকে অগ্রাধিকার না দিয়ে সামাজিক দুর্যোগের মোকাবিলা করা তার মোটিভ। কবি মনে করেন, "মানুষের মরুভূমি একখানা নীল মেঘ চায়"। --- একান্তভাবে এই অনুভব কবির মধ্যে থাকে। মানুষের মধ্যেই হাহাকার কান্নার রোল, নেই নেই সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এসবের মোকাবিলা করেই তো এগিয়ে যেতে হবে এবং দায়িত্ব নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। একজন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সমাজকর্মীর এটাই বদ্ধমূল ধারণা। কিছু সামাজিক সমস্যাকে এই সমাজে সংগতিসম্পন্ন লোকেরা ভাগ্যদাসের দোহাই দিয়ে গরিব মানুষকে দাবিয়ে রাখে । কবিগুরু তাই লিখেছেন--

"কিসের তরে অশ্রু ঝরে, কিসের লাগি দীর্ঘশ্বাস।

হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করবো মোরা পরিহাস।

রিক্ত যারা সর্বহারা, সর্বজয়ী বিশ্বে তারা,

গর্বময়ী ভাগ্য দেবীর নয়কো তারা ক্রীতদাস।

হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস।"


কত সহজেই একজন লেখকের মোটিভ সম্পর্কে ইঙ্গিত দেওয়া গেল। কবি সেইসময় সর্বহারা হতভাগ্যদের জন্য গান লিখেছিলেন। তাই লেখকের মোটিভ সম্পর্কে আমরা পরিষ্কার হয়ে গেলাম। কবি সর্বহারার জয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত। এই সমাজ যাদেরকে সর্বহারা করে দিয়েছে তাদের বলা হল জয় নিশ্চিত দেখা দেবে একদিন। চিরদিন ক্রীতদাস থাকবেনা তারা। অদৃষ্টের নাম দিয়ে যারা শোষণ বঞ্চনা অত্যাচার করে তাদের সরিয়ে অদৃষ্টকে জয় করবে, এটাই হবে একদিন বাস্তব ব্যবস্থা। কবি সংখ্যাগরিষ্ঠের জয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত। একজন লেখক যখন লেখেন তখন বাস্তব পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে গান গল্প কবিতা রচনা করেন। সুতরাং কলমের একটা বাস্তবতা, উদ্দেশ্য বা মোটিভ থাকবেই এবং থাকতে হবে। লেখকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আছেন। রবীন্দ্রনাথের এক আকাশের মত আদর্শবোধ আছে। তিনি যদি সর্বহারা শ্রেনীর পক্ষে কথা বলতে পারেন, আমরা কেন পারব না। তাকে অনুসরণ করে,"স্বীয় কীর্তি ধজা ধরে আমরাও হবো বরণীয় "। একমাত্র কীর্তিমান মানুষদের পৃথিবীতে বেঁচে থাকে। মানুষ তাদেরকেই সম্মান করে। কারণ তারা যে কোন প্রতিকূল অবস্থাতে সাহসী যোদ্ধা। নিজের জীবন বিপন্ন করেও তারা যুদ্ধ জয় করে। সেই সমস্ত যুদ্ধের পক্ষে রবীন্দ্রনাথ। সুতরাং কবির মোটিভ সম্পর্কে আমরা পরিষ্কার হয়ে যাই। তিনি আমাদের পথ প্রদর্শক। কী করতে হবে, এ কথা কবিগুরু বারবার বলে দিয়েছেন। আমরাও সাহসী যোদ্ধার মত হব। এই সংখ্যাগরিষ্ঠের জয়ের কথা মার্কসবাদীরাও বলেন। মনীষীরাও দৃঢ়তার সঙ্গে সে কথা স্বীকার করে  নিয়েছেন। তাই লেখক যখন কলম ধরেন তখন তার মোটিভের কথা আমাদের বুঝে নিতে হয়, বিশ্বাস করতে হয়। কীর্তি যশো স্ব জিবতি। অর্থাৎ কীর্তিবান লোকেরাই চিরজীবী হয়ে থাকেন। এমনকি তারা মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকেন। কর্মই ধর্ম। আমাদের ধর্ম আমাদের কাজ।


সংখ্যাগরিষ্ঠ নিপীড়িত মানুষের জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে সেটাই আমাদের সার্বজনীক ধর্ম। এর বাইরে অন্য কোন ধর্ম আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। ধর্ম সম্পর্কে এটাই আমাদের শেষ কথা হওয়া উচিত। এই বিশ্বাস নিয়ে লেখকেরা কলম ধরেন। তাই লেখকদের সুনির্দিষ্ট একটি মোটিভ আছে। উদ্দেশ্যহীন কোন পথ পরিক্রমা হয় না।

যিনি এগিয়ে যান তার সৎ সাহস থাকে। যিনি পারেন না বসে থাকেন তিনি জড়ত্ব প্রাপ্ত হন। যে পাথর গড়িয়ে যায় তার গায়ে শ্যাওলা জমে না। একথা বুঝতে পারি, একজন বিশেষ মোটিভের মানুষ ভীষণ জ্ঞানী হয়। জ্ঞানীরাই আলোকিত করেন। আলোর প্রতি মানুষের যাত্রা সুগম করেন। তখন একজন জ্ঞানী মানুষের মোটিভ কাজ করে এবং তিনি সহসা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এক দিক থেকে দেখতে গেলে ক্রিয়াশীল মানুষরাই মোটিভেটেড বেশি হয়।

এমন ধরনের মোটিভেটেড লেখকদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায় তত সমাজের অগ্রগতি দ্রুত ঘটতে থাকে। তারা খ্যাতিমান এবং বুদ্ধিমান। বুদ্ধিমান মানুষেরই তো বলবান হয়। উন্মত্ত সিংহও শশকের কাছে পরাজিত হয়। মোটিভেটেড মানুষরাই বলবান।


(চার)--------------


শ্রেষ্ঠলেখক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে এই অনুচ্ছেদটি রচনা করব। তাঁর লেখা আমাদের প্ররোচনা দেয়, আমরা মোটিভেটেড হই। যুগে যুগে তিনিই রবীন্দ্রনাথ। তিনি আমাদের কাছে একজন প্রত্যক্ষ মোটিভেটর। তাঁর হাত ধরে এগোতে চাই আমরা। পরিবেশ পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করে চলতে পারলে একজন মানুষ শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেন। ১৯৩২ সালে যখন দেশ খুব উত্তাল, কাজী নজরুল ইসলাম জেলে বসে লিখছেন,  শিকল ভাঙার গান " --- কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেল করে লোপাট"। ঠিক এমন এক উত্তাল সময়ে কবিগুরু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন মানুষের বিবেকের কাছে। কিভাবে একজন লেখক প্ররোচিত হন বা মোটিভেটেড হন লেখার জন্য, কবিগুরু তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

"আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রি ছায়ে-

হেনেছে নিঃসহায়ে।

আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন, শক্তের অপরাধে

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।"


এই মূল্যবান কথাগুলো তাকে বলতে হয়েছিল পরিস্থিতি অবলোকন করে। আজকের এই সময় দাঁড়িয়ে কবিগুরুর এই উচ্চারণ কতটা যুক্তিসঙ্গত এবং সঠিক, আমরা সকলেই তা হাড়ে হাড়ে অনুভব করতে পারছি। কবিতাটিতে একজন সংবেদনশীল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সৈনিকের মতোই অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। ১৯৩২ সালে ব্যাপক গণ আন্দোলনের জোয়ার বইছে পরাধীন ভারতবর্ষে । ইংরেজ শাসকের অত্যাচার তখন চরম সীমায়। বিনা কারণে বিপ্লবীদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। শাসক গোষ্ঠীর হিংসা ছড়িয়ে পড়ছে বিপ্লবীদের ঘরে ঘরে। কিন্তু তিনি দেখছেন তার কোন প্রতিকার নেই। বিচারে নির্দোষিরাই দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে। তাই তিনি লিখেছেন,"বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে"। যে বাঁশি সংগীতের সুরের মূর্ছনা মানুষকে উদ্বেল করে, সে বাঁশিও তখন যেন সুর হারিয়েছে। জাতির জীবনে নেমে এসেছে অমাবস্যার রাত। এইতো সময় সচেতন কলমচিদের কাজ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কলম ধরার। কবি জনতার কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। সমাজের বুকে যারা বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করছে, বায়ুকে দূষিত করছে, চারিদিকে বিরুদ্ধ পরিবেশ, সমাজের বুকে আলো নিভে যাচ্ছে সেই সমস্ত অপরাধীদের তুমি কি ক্ষমা করিয়াছো? যারা এই বদ্ধ পরিবেশ তৈরি করেছে তাদেরকে ভালোবাসা যায় না, ক্ষমাও করা যায় না। কবিগুরুর প্রশ্নের মধ্যে উত্তর রয়েছে। এই কবিতাটির কাব্যিক ভঙ্গিমা জনজীবনকে আলোকিত করেছে।


একজন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি যে কত সুদূরপ্রসারী তা কবিগুরুকে দেখেই বোঝা যায়। তাঁর সংগীত আমাদের মর্মে অনুরণিত হয়। তিনি শাশ্বত এক পরিপূর্ণ মানুষ। তাঁর কবিচিত্ত সমাজ ও মানুষের জন্য সর্বদা জাগ্রত। সত্যের সন্ধানে তিনি জীবন কাটিয়েছেন , কলম ধরেছেন। অবহেলিত পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য তিনি লিখেছিলেন "ওরা কাজ করে"। শ্রমিক শ্রেণীর পিঠে তো সৃষ্টির বোঝা থাকে তাই তিনি শ্রমিক শ্রেণীকে সম্মানিত করেছেন।

সময় ও স্বার্থের বাইরে একজন মানুষের হৃদয়ের প্রসারতায় যখন তিনি ডুবে থাকেন তখন তিনি রবীন্দ্রনাথ। "যাবার দিন "কবিতায় তিনি বলেন, --

"যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেতে চাই

যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।"

মানুষকে তিনি চির ঋণী করে গেলেন। তাঁর বিভিন্ন ভাবের বিভিন্ন চেতনার কথা বারবার আমাদেরকে প্ররোচিত করেন কলম ধরার।


    (পাঁচ)----------------

       

শ্রেণী বিভক্ত সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের ঐক্যকে সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে যে মুষ্টিমেয় ধনীক শ্রেণী তাদের সম্পর্কে কবিগুরু খুবই সচেতন ছিলেন। ভাগ্যের দোষে মানুষের দারিদ্র, এই কথা একসময় ধনিক শ্রেণী ও সামন্ত প্রভুরা প্রচলন করেছিলেন। মানুষও তার অজ্ঞতার জন্য এইসব বিশ্বাস করতেন। কবিগুরু এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন আমাদেরকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য, প্রকৃত বাস্তব বিষয়টি বোঝার জন্য। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে ধন বৈষম্যের কারণ সম্পর্কে উপদেশ দিয়ে মানুষকে যখন অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হতো তখন কবিগুরুকে অভ্রান্ত প্রবচন ভীষণভাবে বিচলিত করে। তিনি বিচলিত হয়েছেন পীড়িত হয়েছেন ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়ে গেছেন। " " "হতভাগ্যের গান" কবিতায়। ভাগ্যের বিধান তিনি অস্বীকার করেছেন। গন চেতনার কবি বাস্তবিকই ধর্ম সম্পর্কে মোহমুক্ত ছিলেন। সত্যান্বেষী কবি ,তাই

"ধর্ম মোহ"কবিতায় বলেছেন---

"ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে

অন্ধ যে জন মারে আর শুধু মরে।"


কবিতাটি শেষ করলেন এভাবে--


"হে ধর্মরাজ, ধর্মবিকার নাশি

ধর্মমূঢ়জনেরে বাঁচাও আসি।

যে পূজার বেদী রক্তে গিয়েছে ভেসে

ভাঙ্গো ভাঙো আজি ভাঙ্গো তারে নিঃশেষে,

ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,

এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো,"


বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে বস্তুজ থেকে উপাদান নিয়ে কল্পনার রঙে রাঙিয়ে বিষয়বস্তুকে কাব্যিক করে গ্রহণযোগ্য ও বোধগম্য করে তোলাই আসল মুন্সিয়ানা।


কবি জীবনানন্দ বাস্তব থেকে খুব সহজেই পরাবাস্তবতায় পাড়ি দিয়েছেন। "সুচেতনা তুমি এক দূরতম দ্বীপ/বিকেলের নক্ষত্রের কাছে/সেইখানে দারুচিনি বনানীর ফাঁকে/ নির্জনতা আছে"।


কবিগুরু "শেষ খেয়া"কবিতায় জীবনের এই টানাপোড়নের মাঝে দৃষ্টি যখন অনেক দূরে চলে যায় ভাবালুতা পেয়ে বসে তখন মানসিক অবস্থা যে স্তরে পৌঁছায় তারই প্রতিচ্ছবি এখানে ফুটে উঠেছে--

"দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া/

ধুলালোরে ভুলালো মোর প্রাণ।"


কবিতাটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়,  মনের এক আচ্ছন্নভাব তৈরি হয় এক বিশেষ মানসিক অবস্থানের মধ্যে। তবুও কখনো অবাস্তবতার মধ্যে তিনি বিচরণ করেননি। জীবন সায়াহ্নে সব মানুষের মধ্যেই স্বাভাবিক ভাবান্তর তৈরি হয়। এখানে থাকে ক্লান্তি অবসাদ আর নিষ্ক্রমণের এক সৌন্দর্যময় আকাঙ্ক্ষা। একজন পরিপূর্ণ মানুষের মধ্যে এইসবের ব্যর্থতা, প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তি ,সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার বেদনা ইত্যাদি ক্রিয়াশীল থাকে। কোন কিছুই একজন লেখকের মন এড়িয়ে যায় না। তিনি বস্তু জগতকে এড়িয়ে যাননি বলেই শুধু কবিগুরু নন, জনগণের একজন শিক্ষক ও বটে। ধুলা মন্দির কবিতায় তিনি প্রচলিত সংস্কারে বিরুদ্ধে অকর্মণ্যদের উদ্দেশ্যে এভাবেই মানুষকে কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য কলম ধরেছেন। মানুষকে সচেতন করেছেন তার কারণ একটি বিশেষ শ্রেণীর মানুষ সাধারণ মানুষের মধ্যে কুসংস্কার ঢুকিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। শ্রেণীগত কারণে এই সংখ্যালঘিষ্ঠরা ব্রাহ্মণ সমাজ এবং মাতব্বর শ্রেণী শুধুমাত্র নিজেদের শ্রেণী স্বার্থে মানুষকে অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। একজন লেখক হিসেবে কবিগুরু সেজন্যই এক  জোরালো যুক্তির অবতারণা করেছেন।


"ভজন পূজন সাধন আরাধনা সমস্ত থাক পড়ে ।

রুদ্ধ দ্বারে দেবালয়ের কোণে কেন আছিস ওরে

অন্ধকারে লুকিয়ে আপন মনে

কাহারে তুই পূজিশ সংগোপনে

নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে দেবতা নেই ঘরে।

তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙ্গে করছে চাষা চাষ

পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ

খাটছে বারো মাস।"


তিনি এইসব লিখেছেন কেবলমাত্র নিজস্ব আবেগ বা ভেতরে তাগিদ অনুভব করে নয়। তিনি কলম ধরেছেন আসলে  তাঁর উত্তরসূরী লেখকদের সচেতন করার এবং কী করতে হবে সাধারন মানুষের জন্য, এটা তারই শিক্ষা।


একজন বর্তমান সময়ের লেখকের কাছে সামনের পথ পরিষ্কার। শুধু তার মোটিভটি ঠিক করে নিতে হবে। একজন লেখকের কাছে শুধু ফুল ফল পাখি আকাশ বাতাস এসবই লেখার একমাত্র বিষয় নয়। একজন লেখকের লেখার বিষয়বস্তু মানুষ মানুষ আর মানুষ। মানুষ কেমন আছে? সে মানুষের অভাব কী? প্রয়োজন কী? ব্যথা কী বা বেদনার গভীরতা এসবই জানতে হবে। ধর্ম যে কী পরিমান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কবিগুরু পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। আমাদের মত লেখকদের তিনি পথনির্দেশ করে দিয়ে গেছেন। আমাদের মধ্যে অনেক লেখক আছেন যারা শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে থাকেন উপঢৌকনের আশায়। তিনি প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন লেখক সাধারণত প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই থাকেন। তিনি নিজে নাইট উপাধি ত্যাগ করে প্রমাণ করলেন মানুষের চাহিদার দিকে নজর দিয়ে চলতে হবে। মানুষ চান না ইংরেজের পক্ষে থাকা। তিনিও থাকেননি। আজকের সমাজে অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় গোড়ামির যে দল শাসন ক্ষমতায় আছে তাদের পক্ষে ওকালতি করছে শিক্ষিত মানুষজন। এই সমস্ত অর্ধশিক্ষিতরা সমাজকে ডুবাচ্ছেন। তিনি সতর্কবাণী করে গেছেন তাঁর কবিতায় --

"নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস

শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস--

বিদায় নেবার আগে তাই

ডাক দিয়ে যাই

দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে

প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে"।


এই সতর্কবাণী বস্তুবাদী দার্শনিক ছাড়া আর কে করতে পারে? সাম্রাজ্যবাদী শাসন শোষণ এবং এই সমাজ কাঠামো কবিগুরুকে মোটিভেটেড করেছিল। তাই তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন মানুষকে জাগিয়ে তোলার। কবিগুরু প্রকৃতপক্ষে একজন চেতনার কবি, একজন দার্শনিক কবি, একজন মানবতাবাদী মানুষ। তাঁকে ছাড়া আমরা বাঁচি না। তিনি আমাদের লড়াইয়ের মন্ত্র তিনি আমাদের চেতনার অস্ত্র।


   (ছয়)-----------------

  

লেখক সমাজসংস্কারক শিক্ষক বস্তুবাদী চেতনার আলোকে আলোকিত এক মানুষ বিবেকানন্দ।

পরিবেশ পরিস্থিতি এবং মানুষ তাঁকেও মোটিভেটেড করেছিল। তিনিও মানুষকে মোটিভেট করেছিলেন।

তার মোটিভ সম্পর্কে কিছু কথা আমাদের আলোচনা হওয়া দরকার। একদিন পাঞ্জাব থেকে দুজন এসেছিলেন তাঁর কাছে কিছু আধ্যাত্মবাদী আলোচনা করার জন্য। তখন পাঞ্জাবে ভয়ংকর খাদ্য সংকট। সেই সমস্যা জটিল রূপ ধারণ করেছে, চারিদিকে হাহাকার শুরু হয়ে গেছে। বিবেকানন্দ তাদের ইচ্ছা পূরণ না করে খাদ্য সমস্যার কারণ নিয়ে আলোচনা করলেন। এখনকার সন্ন্যাসীরা এমন প্রস্তাব কেউ নিয়ে এলে বসে যাবেন আধ্যাত্মবাদ নিয়ে আলোচনায় কিন্তু দেশে যে ভয়ংকর সংকট চলছে, সে সব নিয়ে আলোচনা করবেন না। তিনি বলেছিলেন যে,  যতক্ষণ একটি কুকুরও অভুক্ত থাকবে ততক্ষণ আমি ঈশ্বর বিশ্বাস করি না। বিবেকানন্দের মোটিভ বুঝতে অসুবিধা হয় না। তিনি বলেছিলেন গোটা দেশটা বারুদখানায় পরিণত হয়েছে। শুধু চাই একটু অগ্নিশ্ফুলিঙ্গ। আমি আমার জীবদ্দশাতেই বিপ্লব দেখে যেতে চাই। প্রকৃতপক্ষে তিনি কিন্তু বাস্তব জগতের উপর দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলেছেন। আমি তাকে বারবার বস্তুবাদী বলে থাকি। তিনি কতখানি বস্তুবাদী ছিলেন বোঝা যায় রাশিয়া এবং চীনের বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যে। রাশিয়ায় বিপ্লব হয়েছিল ১৯১৭সালে। অন্তত কুড়ি বছর আগে তিনি বলতে পেরেছিলেন এই দুটি দেশে বিপ্লব হবে, এখানকার যা পরিস্থিতি আমি বুঝেছি। কোনটা আগে হবে আমি জানিনা। তবে হবে যে কোন একটিতে অথবা দুটিতে।


একজন লেখক হিসাবেও আমরা বিবেকানন্দকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ,'জাগ্রত দেবতা"। এই কবিতায় তিনি লিখেছেন----

"ওরে মূর্খদল!

জীবন্ত দেবতা ঠেলি’,

অবহেলা করি’

অনন্ত প্রকাশ তাঁর এ ভুবনময়,

চলেছিস ছুটে মিথ্যা মায়ার পিছনে

বৃথা দ্বন্দ্ব কলহের পানে—

কর তাঁর উপাসনা, একমাত্র প্রত্যক্ষ দেবতা,

ভেঙে ফেলো আর সব পুতুল প্রতিমা।"


তখন ধর্মীয় প্রাবল্য এত ব্যাপকতা লাভ করেছিল, তিনি বাধ্য এইসব কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় আগামী পঞ্চাশ বছর পুতুল প্রতিমাকে সরিয়ে দাও। বাধ্য হয়েই মন্তব্য করেছিলেন, দেব দেবী নয়, মানুষই শেষ কথা । জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। তিনি বুঝেছিলেন ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াই, দেশীয় রাজন্যবর্গের বিরুদ্ধে লড়াই, কোটি কোটি গরিব মানুষকে করতে হলে ধর্মকে বাদ দিতে হবে। স্পষ্ট উচ্চারণ করেছিলেন স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে ধর্মকে বাদ দাও।


তাই বারবার বলতে ইচ্ছে করে বিবেকানন্দের মত স্পষ্ট বস্তুবাদী বক্তা আমাদের সমাজে বিরল। তিনি একজন বস্তুবাদী বিপ্লবী। কোন ভাববাদী মানুষ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বন্ধুক কেনার কথা ভাবতে পারেননি। বিবেকানন্দ যদি শুধুমাত্র ভাববাদী হতেন তাহলে এই ধরনের ঐতিহাসিক নির্দেশ দিতেন না--"ভুলিও না- নিচ জাতি, মূর্খ দরিদ্র অজ্ঞ মুচি মেথর তোমার রক্ত তোমার ভাই"এই ঐতিহাসিক নির্দেশ আমরা ভুলে যাই কী করে।

বিবেকানন্দের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রখর বিপ্লববাদী। সেই বিষয়ে ১৯২৮ ২৯ খ্রিস্টাব্দে বিবেকানন্দের ভ্রাতা ডক্টর ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত সোসালিস্ট বিবেকানন্দ নামে একটি বই লিখেছিলেন। বস্তুত পক্ষে বিবেকানন্দ জাগরণের পূজারী।


একটি অসাধারণ কবিতা জীবনানন্দ দাশের।

"এখানে বিশেষ কিছু হয়নি অনেকদিন/ ক্রমাগত মানুষের মরণ হয়েছে"।


কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতিটি লেখাতে রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। একেবারে নিপীড়িত মানুষের পেটের ভাতের কথা বলা আছে। পিছিয়ে পড়া মানুষের কথাই তিনি লিখেছেন বেশি বেশি করে। তিনি বিপ্লব বিশ্বাসী ছিলেন। গরীব মানুষকে সংগঠিত করা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জোরালো যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করাই ছিল তাঁর মোটিভ।তিনি ক্ষমতার পাশে কোনদিন থাকেন নি। শাসকের বিরুদ্ধে থেকেই তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্য হয়েছেন।। সুকান্তের মোটিভ  সম্পর্কে আমাদের ধারণা পরিস্কার।


এইসব লেখাই তো আজ আমাদের লিখতে হবে। একজন লেখকের মোটিভ থাকতেই হবে, সেটা ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে হতে পারে। জনকল্যাণের পক্ষে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছেটাই

আসল মোটিভেশন।

__________________________________________