জীবন হলো যাত্রা, গন্তব্য নয়/অমৃত মাইতি জীবন হলো যাত্রা এবং গন্তব্যের একটি সুন্দর মেলবন্ধন, তবে মূলত এটি একটি চলমান পথচলা বা যাত্রা। জীবনের আসল আনন্দ ও শিক্ষা লুকিয়ে থাকে প্রতিদিনের পথচলার মধ্যে—শেখা, লড়াই করা, ভুল থেকে সংশোধন এব…
জীবন হলো যাত্রা, গন্তব্য নয়/অমৃত মাইতি
জীবন হলো যাত্রা এবং গন্তব্যের একটি সুন্দর মেলবন্ধন, তবে মূলত এটি একটি চলমান পথচলা বা যাত্রা। জীবনের আসল আনন্দ ও শিক্ষা লুকিয়ে থাকে প্রতিদিনের পথচলার মধ্যে—শেখা, লড়াই করা, ভুল থেকে সংশোধন এবং বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া। গন্তব্যের কথা ভেবে ভবিষ্যতে আটকে না থেকে প্রতিটি বর্তমান মুহূর্তকে উপভোগ করাই হলো জীবন। তাই জীবন হল যাত্রা, কোন গন্তব্য নয়। কোন কিছুরই শেষ বলে কিছু নাই। ব্যক্তি জীবনের শেষ হতে পারে কিন্তু একজন সৃজনশীল মানুষের চিন্তা চেতনার কোন শেষ নেই।
লক্ষ্য ও দিশা: গন্তব্য বা লক্ষ্য (যেমন—পড়াশোনা শেষ করা, ক্যারিয়ার গড়া, স্বপ্ন পূরণ) আমাদের জীবনে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনা ও সঠিক দিশা দেয়।সাফল্যের তৃপ্তি: নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যে পৌঁছানো বা সাফল্য অর্জন আমাদের মনে আত্মবিশ্বাস ও নতুন প্রেরণা যোগায়। গন্তব্য আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া বা যাত্রাই আমাদের জীবনকে রূপ দেয়। গন্তব্য কেবল একটি সাময়িক বিরতি, আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে পথ চলায়। জীবনের যাত্রা পথ হল এক দর্শন।অনেক দার্শনিক চিন্তাভাবনার মানুষ আছে যারা মনে করে জীবন একটি গন্তব্য নয়, এটি একটি যাত্রা, যার মানে হল হল, আসুন আমরা পথ উপভোগ করি এবং গন্তব্য নিয়ে চিন্তা না করি। আসলে, জীবন একটি যাত্রা এবং এক অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা। গন্তব্যের কোন শেষ নাই শিক্ষারও কোন শেষ নাই।
প্রসঙ্গক্রমে আমার বিচারে দার্শনিক কবি জীবনানন্দ দাশের সুচেতনা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারি।
#সুচেতনা#
সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ
বিকেলের নক্ষত্রের কাছে;
সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে
নির্জনতা আছে।
এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা
সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।
কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে;
তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।
আজকে অনেক রূঢ় রৌদ্রে ঘুরে প্রাণ
পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো
ভালোবাসা দিতে গিয়ে তবু
দেখেছি আমারি হাতে হয়তো নিহত
ভাই বোন বন্ধু পরিজন প’ড়ে আছে;
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।
কেবলি জাহাজ এসে আমাদের বন্দরের রোদে
দেখেছি ফসল নিয়ে উপনীত হয়;
সেই শস্য অগণন মানুষের শব;
শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময়
আমাদের পিতা বুদ্ধ কনফুশিয়সের মতো আমাদেরো প্রাণ
মূক ক’রে রাখে; তবু চারিদিকে রক্তক্লান্ত কাজের আহ্বান।
সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে— এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;
সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;
এ-বাতাস কি পরম সূর্যকরোজ্জ্বল;
প্রায় তত দূর ভালো মানব-সমাজ
আমাদের মতো ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে
গ’ড়ে দেবো, আজ নয়, ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে।
মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভালো হ’তো অনুভব ক’রে;
এসে যে গভীরতর লাভ হ’লো সে-সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে;
দেখেছি যা হ’লো হবে মানুষের যা হবার নয়—
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।
অনাদি অনন্তকাল ধরে সূর্যোদয় ঘটবে। মানুষের যাত্রা, পথেরও কোন শেষ নেই। প্রকৃতপক্ষে কোন গন্তব্য নেই। গন্তব্যের পরেও আবার এক গন্তব্য অপেক্ষা করছে এইভাবে চলতে থাকবে। গন্তব্যকে যদি একমাত্র সত্যি ধরে না নিই:একমাত্র উপায় হিসেবে জীবন বেছে নেয় তাহলে সমস্ত গতিকে অস্বীকার করতে হয়। তাই বলবো গন্তব্য বলে একজন সৃষ্টিশীল মানুষের কাছে শেষ সত্য নয়। যাহা শেষ সত্য মনে করছি তারপরেও সত্য লুকিয়ে আছে। তাই জীবনানন্দ আমাদের কে একটি অমোঘ শিক্ষা দিয়ে গেলেন।"শেষ সত্য বলে কিছু নাই"।
____________
