Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

" পোড়া মোমবাতি ও সমাজ চেতনা"/ অমৃত মাইতি

ভিন্ন সময়ের ভাবনা________________অমৃত মাইতি১ ।। পোড়া মোমবাতিএকটি অসাধারণ উপমা আমাদের জীবনের অমোঘ প্রেরণা। একজন খাঁটি মানুষের সঙ্গে মোমবাতির উপমা যুক্তি যুক্ত। পোড়া মোমবাতির যৌক্তিকতা মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে এক আদর্শ জীব…

 


ভিন্ন সময়ের ভাবনা

________________অমৃত মাইতি

১ ।। পোড়া মোমবাতি

একটি অসাধারণ উপমা আমাদের জীবনের অমোঘ প্রেরণা। একজন খাঁটি মানুষের সঙ্গে মোমবাতির উপমা যুক্তি যুক্ত। পোড়া মোমবাতির যৌক্তিকতা মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে এক আদর্শ জীবনের সন্ধান দেয়। এমন একটি জীবনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন । সেবামূলক কাজে সামাজিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষ। মহা আনন্দেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। জীবনের অনেক দায়। সেই দায় দায়িত্ব পালনের জন্য মানুষ সদা সচেষ্টা। এই দায় পালন করতে না পারলে সে মানুষ পিছিয়ে পড়ে । কিন্তু পিছিয়ে পড়ার দলে  মানুষ থাকতে চায় না। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। এই এক মহামন্ত্র জীবন পথের এক অসামান্য চালিকাশক্তি। এই মহামন্ত্রের কোন তুলনা হয়না। তাইতো মানুষ জীবনকে উৎসর্গ করে মানুষের জন্য। গান লেখা হয় মানুষ মানুষের জন্য। জীবন জীবনের জন্য। একটা প্রাণ আর একটা প্রাণকে বাঁচাতে পারে। একটা প্রাণ অজস্র মানুষের পথের দিশা হতে পারে। তেমন দিশা দেখাতে পারলে মানুষের প্লাবন হতে পারে। মজে যাওয়া নদী প্লাবিত হয়। গান লেখা হয় এবার তোর মরা গাঙ্গে বান এসেছে জয় মা বলে ভাসা তরী। এই পচা গলা সমাজ থেকে উত্তরণের জন্য মানুষ নিজেকে উৎসর্গ করে মহাজাগরণের পথে টেনে নিয়ে যায় অন্য মানুষকে। তখন যে পরিবর্তন সুচিত হয় তার নাম বিপ্লব। আর এই চলার পথ বিপদসংকুল এবং কণ্টকাকীর্ণ । কুসুমাস্তীর্ণ নয়। এক একটা প্রাণ তাই এক একটা মোমবাতি। মোমবাতির জন্ম আলো  বিকিরণের জন্য। মোমবাতি হওয়াটা গর্বের আনন্দের। আমার তো মোমবাতি হওয়ার বড় স্বাদ চিরকালের। মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার এক মহৎ  সুযোগ।। যে বোঝে  সে বোঝে।  এ সুযোগ হাতছাড়া করতে পারেনা তাই নিজেকে মোমবাতি করে গড়ে তোলে। মোমবাতি জীবনকে আলোকিত করার শপথ। মানুষের জীবনে সমাজ জীবনে যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে তখন যুগে যুগে মনীষীরা আলো জ্বেলে দিয়েছেন। সার্চলাইটের মত পথ দেখিয়েছেন। অচল ব্যবস্থাকে সচল করে দিয়েছেন ।রামমোহন বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ নজরুল শরৎচন্দ্র সুকান্ত এরা গোটা সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন গভীর রাতে আলোকবর্তিকার মত। মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে টেনে তুলেছেন। সঠিক পথে সংস্কার মুক্ত পথে সমাজ পরিবর্তনের পথে জাগিয়ে রেখেছেন। একজন সচেতন আদর্শবান সমাজ সংস্কারক যদি সদা সর্বদা মোমবাতিকেই নিজের জীবন মনে করেন তাহলে তিনি আমাদের জীবন পথের দিশা। তিনি আমাদের পূজনীয়। আমরা যখন পিছিয়ে পড়ি তাঁদের পথনির্দেশিকা আমাদের গতিপথে তরান্বিত করে।  লাখো লাখো মানুষ রাত্রির অন্ধকারকে দূরীভূত করার জন্য মোমবাতি হাতে নিয়ে ভোরের দিকে এগিয়ে যায়। তখন হাজার হাজার সুকান্ত হাজার হাজার রানার হয়ে উঠে ।


নতুন সকাল ছিনিয়ে আনার কর্তব্যবোধে অটল সুকান্ত।


জনতা গান গায় নজরুলের। শিকল ভাঙার গান। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আগুন ব্যবহারের মন্ত্র শেখায়। আজ সারা পশ্চিমবাংলা জুড়ে রাতের অন্ধকার দূরীকরণের জন্য বদ্ধপরিকর আবাল বৃদ্ধ বনিতা।

"চল চল চল,-চল চল চল 

ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল 

নিম্নে উতলা ধরণী তল

অরুণ প্রাতের তরুণ দল,

 চল চল চল"

ইতিহাসের এক এক যুগ সন্ধিক্ষণে অজস্র মানুষ জ্বলে ওঠে মোমবাতির মত। মোমবাতি জ্বলে ওঠে অন্ধকার কুজ্ঝটিকায় আলোকবর্তিকা হয়ে, যেন সে জন্মেছে নিজেকে পোড়াবে বলে। আমাদের চেতনা শাণিত  করে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল।"কারার ঐ লৌহ কপাট ,ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট।"

উদ্দীপ্ত জনতা গাইছে"জাগো জাগো জাগো সর্বহারা অনশন বন্দি ক্রীতদাস শ্রমিক দিয়েছে আজি  সাড়া। 

জাগো জাগো জাগো সর্বহারা। এমন একটি সময় আজ সমাগত, আমাদের রাজ্যবাসীকে দেশবাসীকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে বিচারের আশায়। প্রতিবাদে প্রতিরোধে উত্তাল রাজপথ। মানুষ প্রতিদিন জোট বাঁধছে প্লাবন প্রতিজ্ঞায়।

ইতিহাস বিপ্লবীদের তৈরি করে। ক্ষুদিরাম প্রফুল্ল চাকী বিনয় বাদল দিনেশ বাঘা যতীন মাস্টারদা সূর্যসেন ভগৎ সিং প্রীতিলতা   কল্পনা দত্ত উল্লাস কর দত্ত সুকুমার সেনগুপ্ত ভুপাল পান্ডাদের। আজ আবার এমন নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার সুযোগ আছে প্রত্যক্ষ করছি। এভাবে মানুষ নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে। যুগ চেতনায় ভরপুর মানুষ প্রচলিত কোন বাধা মানে না। নিজেকে একটা মোমবাতির আগুনের মতো গড়ে তোলে। যে যার নিজের কর্ম ক্ষেত্রে ছোট বড় নানান মোমবাতির প্রজ্বলন।

 মোমবাতিরও কিছু আত্মকথা আছে। মোমবাতি নিজের জন্য জন্মায় না। মোমবাতি দেশ ও দশের জন্য উৎসর্গীকৃত। আমাদের সমাজে এমন মোমবাতি আছে। তারা সারা জীবন শুধু আলো বিকিরণ করে। নিজে পুড়তে থাকে আলোকিত করে অন্ধকারকে। এই দহন জ্বালা, যে পুড়ে সেই জানে। অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে। কোন ভ্রুক্ষেপ নাই মনে কোন বেদনা নাই। সবকিছু উৎসর্গ করে দেয় মানুষের জন্য। পোড়া মোমবাতি ফেলে দিতে হয়। এটাই নিয়ম। নিজেকে পোড়ানো এটা তার ধর্ম। এই পথ থেকে একটু সরে গেলে অন্ধকার দূরীকরণ হবে না। বুকের মধ্যে শত সহস্র যন্ত্রণা, দহন জ্বালা চেপে রেখে ইতিহাসের পথ ধরতে হয়। মোমবাতির কোন প্রত্যাশা নাই আলোকিত করা ছাড়া। কে তাকে মনে রাখবে, এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই তার। জানতে চায় না কখনো। যদি ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা, পুড়ে যাওয়া মোমবাতির ভবিষ্যতে কেউ মনে রাখবে কিনা ভাবতো তাহলে সে মোমবাতি হতে পারত না। মোমবাতি তাই অন্যের জন্য জন্মায়। আমরা সমাজ সচেতন মানুষ নিশ্চয়ই পুড়ে যাওয়া মোমবাতির অন্তর্গত যন্ত্রণার কথা ভাববো, উৎসাহ পাব, বিশ্লেষণ করবো। হয়তো কষ্ট পাবো কিন্তু এক আদর্শ আমাদেরকে দীক্ষিত করবে।

মানুষের বেঁচে থাকার সুষ্ঠু পরিবেশ রচনা আমরা করব। পরিবেশও আমাদের কথা মনে রাখবে। মোমবাতি আলো দেবে। আলোকিত পৃথিবী পোড়া মোমবাতির ইতিহাস লিখবে।

_____________


২।। শিশুর মুখে চৌম্বক শক্তি

ফুলের মতই শিশুর মুখ মানুষকে আকর্ষণ করে।  আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মন যখন ভারাক্রান্ত হয় তখন একটি শিশু সামনে হাজির হলে ,কেউ কোলে তুলে দিলে সব কিছু ভুলে যাই । মাথা হালকা হয়ে যায়। কোন চাপ থাকে না তখন। শিশু মুখ আমাদের দুঃখ শোক ভুলিয়ে দেয় ।মন হয়ে ওঠে আনন্দধাম। বারবার যখন কুচক্রী মানুষ দেখি, কুৎসিত ব্যবহারের মানুষ দেখি ,চতুর মানুষ দেখি ঠিক তখনই কিছু শিশুর মুখ ভেসে ওঠে আমার স্মৃতি বটে। কি সুন্দর দুষ্টু মিষ্টি মুখ  ও তাদের সারল্য মানুষের ভালবাসা নেওয়ার জন্য তাকিয়ে থাকে। হাত বাড়িয়ে দেয়। ঠিক তখনই হৃদয় কোমল হয়ে ওঠে। হৃদয় মাঝে শিশুর নরম তুলতুলে স্পর্শ অনুভূত হয়। পৃথিবীতে শিশুর মুখের বিকল্প খোঁজা যাবে না। একটি শিশু হেসে উঠলে পৃথিবীতে অন্ধকার দূরীভূত হয়ে  জ্যোৎস্নার হাসি ফুটে ওঠে। মাটির পৃথিবীতে সর্বত্র যেন ভালোবাসার ছড়িয়ে পড়ে। সবুজ গাছে জ্যোৎস্নার টুকরো টুকরো হাসি কেমন মনকে নিষ্কলুষ করে দেয়।  অদ্ভুত সৌন্দর্যে মন তীক্ষ্ণভাবে কি যেন খোঁজে। দেখি শুধু চতুর্দিকে আনন্দমেলা। পুলকিত হই। ফুলের চেয়েও অধিক কোমল ,শিশুর মুখ চোখ চাহনি সবসময় মুগ্ধ করে। এক মায়া টান অনুভব করি আমরা। শিশুর মুখ যত দেখি ততই দেখার তৃষ্ণা বাড়ে । নিষ্ঠুর অমানবিক হৃদয়ে শিশুর মুখের কোন প্রতিফলন হয় না। তাদের মন গলে না।নরম মনের মানুষের এবং মানবিক হৃদয়ে সব সময় দেখি এক স্নিগ্ধ আলো।  শিশু কিশোরেরা আমাদেরকে পবিত্র করে। আমাদেরকে উদার হতে শেখায়। আমাদের মনের জটিলতা কাটিয়ে সরলতার স্বর্গরাজ্যে উত্তীর্ণ করে। শিশু কিশোর এক কথায় সন্তান বাপ মায়ের সেতু বন্ধনের কাজ করে। মা-বাবাকে বিচ্ছিন্ন হতে দেয় না। স্বাভাবিক জীবনে কোন বিরুদ্ধতার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ঘটে নি।।  তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যের অধিকারী হয়। ভ্রমণপথে এমন অনেক শিশু কিশোরের দেখা আমি পেয়েছি। তাদের যে অভূতপূর্ব আকর্ষণীয় ক্ষমতা আমি দেখেছি তা উল্লেখ না করে পারিনা। বাংলাদেশের বহু পরিবারের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক। তারা আমাকে কোন সরকারি গেস্ট হাউসে থাকতে দেয় না। তাদের বক্তব্য ,আপনার বয়স হয়েছে ।আপনি আমাদের বাড়িতে সব সময় থাকুন। আপনার ভালো মন্দ সবসময় আমরাই দেখভালকরবো। আপনাকে আমরা অভিভাবক মনে করি।আপনি যতদিন এই ঢাকা শহরে আসবেন, ততদিন আমাদের বাড়িতেই থাকবেন। কথাগুলো বলেছিল, ফেরদাউসি কুইন। সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ নূহ - উল - আলম  লেলিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বিক্রমপুর। সেখানে তার একটি বিখ্যাত প্রজেক্ট আছে। নিছক বেড়ানোর জন্য সে আমাকে আমন্ত্রণ করেছিল। ধলেশ্বরী নদী পেরিয়ে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়ি দেখার পরে একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান পদ্মার পাড়ে গিয়ে থাকলাম। সূর্য ডোবার সময় পদ্মা ভ্রমণ করলাম। পরের দিন ফিরে এসে কুইন ও মুকুলের নির্দেশ মত তাদের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। ওদের বাড়িতে হাকিম নামে একটি ছেলে সুন্দর ফুটফুটে কম বয়স্ক সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে থাকে। ভীষণ অনুগত বুদ্ধিমান ছেলে। মানবিক গুণে ভরপুর। বাড়িতেই গেস্ট হাউস। আমার বিছানার পাশে টেবিলে জল বিস্কুট মুড়ি দেওয়া আছে। রাত্রির আহারের পরে সবাইকে বিদায় জানিয়ে শুয়ে পড়লাম। খুব ক্লান্ত ছিলাম। ঘুমে আচ্ছন্ন আমি। গভীর রাতে অনুভব করলাম কে যেন আমার গায়ে একটা হালকা চাদর ঘুড়িয়ে দিল। ঘুমটা ভেঙে গেল। চেয়ে দেখি হাকিম দাঁড়িয়ে আছে। বলল এসি চালানো আছে তো! আমার ঘুম ভেঙে যেতে ভাবলাম আপনার শীত করতে পারে। তাই তুমি নিজে না ঘুমিয়ে আমার ঘরে চলে এসেছো। বললে হ্যাঁ। সেই  মুহূর্তটি অত গভীর রাতে একমাত্র পৃথিবীতে মা বুঝতে পারে তার ছেলের শীত করতে পারে। ওই হাকিম নিজে না ঘুমিয়ে  অন্যের জন্য ,বাইরের অপরিচিত একজন অতিথির জন্য এই পরিষেবা ,যত্ন দিতে পারে আমি ভাবতে পারিনি। এক একটা মুহূর্ত সারা জীবন মন ধরে রাখে। সকালে ঘুম ভেঙে দেখি আমার মোবাইল চার্জে বসানো আছে। এটিও হাকিমের কাজ।কুইনের  বাড়িতে হাকিমের জন্যই আমি নিশ্চিন্তে থাকতাম। অনেকদিন হাকিমের সঙ্গে দেখা হয়নি। সে আমার প্রিয় মুখ। হাকিম আমার অন্তরে সিঁদিয়ে আছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এটি প্রসিদ্ধ জায়গা। বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে গেলাম চা খেতে। সবাই চা মিষ্টি খেলো। আমি তো মিষ্টি খাই না। শুধু চা আর পকেটের বিস্কিট। দোকানে কাজ করে এক অসাধারণ টুকটুকে সুন্দর মুখ চোখ ফেরানো যায় না তার দিক থেকে নাম সঞ্জয় দেবনাথ। সঞ্জয়কে দেখে যে কেউ আদর করবে। সে বললে আপনি মিষ্টি খাবেন না? আমি বললাম আমার তো মিষ্টি বারণ ।সুগার পেশেন্ট আমি। আমি তার মুখ থেকে কিছুতেই আমার দৃষ্টি সরাতে পারছি না। পৃথিবীর সব সৌন্দর্য তার মুখে খেলা করছে। অদ্ভুত একটি নিষ্পাপ মুখ। মন ভোলানো মিষ্টি চাহনি।সহানুভূতি ও সমবেদনায় ভরপুর ।অতিথি সেবায় কোন বিরক্তি নেই। হাসিমুখ। তাকে কাছে টেনে নিলাম। 

সে আমার আদরে আহ্লাদে আটখানা। ক্যামেরাবন্দি করল কমলেশ দাশগুপ্ত।  সঞ্জয়ের খুব আফশোস আমাকে সে সুগার ফ্রি মিষ্টি খাওয়াতে পারেনি। বিখ্যাত গল্প লেখক দেবাশিস ভট্টাচার্য। সঞ্জয় বারবার বলে উনি আবার কবে আসবেন। আমি ওঁর জন্য আগে থেকে সুগার ফ্রি মিষ্টি বানিয়ে রাখবো। আহা সঞ্জয় আমিও যে তোমার জন্য ব্যাকুল। জীবনে কি আর একবার দেখা হবে না তোমার সঙ্গে! আদর করে আসবো! মুখে তার চুম্বক বসানো আছে। আরেকটি ছেলে তার মুখটা কেউ যেন এঁকেছে নিখুঁতভাবে যত্ন করে। ছেলেটির নাম আকাশদীপ গিরি। তার মুখেও চুম্বক বসানো আছে। সে মিষ্টি দোকানে কাজ করে। আমি তার দাদু। আমার জন্য সে সুগার ফ্রি মিষ্টি বানায়। আকাশ যেন সত্যিই তারা ভরা আকাশ। খুব দুষ্টু। আমার কাছে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে আমার গালে হাত বুলিয়ে গাল টিপে দেয়। বলে দাদু আই লাভ ইউ। সে আমাকে দাদু বলে আমিও তাকে দাদু বলি, এটাই তার কাছে বড় তৃপ্তি এবং পাওনা। আকাশ জানে না তাকে দেখার জন্য আমিও ছটফট করি মাঝে মাঝে। এই শিশু-কিশোরেরা আরো অনেকে আছে। সবসময় ভাবি ওরা এত ভালো কিন্তু আমরা এত ভালো হতে পারিনি কেন ? আমার মত একজন ভবঘুরে  বাউন্ডুলে মানুষ কত শিশুকে যে জীবনে কাছে পেয়েছি ,।গাল টিপে দিয়েছি আদর করেছি। অবসর সময় তারা আমার মনের মনিকোঠায় জ্বলজ্বল করে। শিশুর সংস্পর্শে যত থাকবেন তত আপনি ভালো হয়ে যাবেন। আপনার মনটা হয়ে যাবে এক নিষ্পাপ নির্মল আকাশ। তাই বারবার বলতে ইচ্ছে করে শিশুর মুখে এক চৌম্বক শক্তি আছে।

________

৩ ।। শৈশবের শ্রেণী চেতনা

খুব ছোটবেলায় শ্রেণী বৈষম্য দেখেছি। যারা শ্রম করে ঘাম ঝরায় উৎপাদন করে তাদের দুবেলা দু মুঠো আহার জুটে না শিক্ষা স্বাস্থ্য চিকিৎসা বাসস্থানের ব্যবস্থা তাদের হয় না। তাদেরকে যারা বঞ্চিত করে তাদের শ্রমে যারা মুনাফার পাহাড় তৈরি করে তারাই সমাজের উঁচু জায়গায় বসে এবং সমাজটাকে শাসন করে, শোষণ করে, মাতব্বরি করে। গ্রামে হোক আর শহরেই হোক। সেদিন বুঝেছিলাম কোন দিকে থাকতে হবে। সেই শৈশব থেকেই শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছিল। আর সারা বিশ্বে একমাত্র লাল ঝাণ্ডাই এবং লাল ঝান্ডার নীতি আদর্শ মেহনতি মানুষের জীবন জীবিকার লড়াইর পাশে যুগ যুগ ধরে আছে থাকবে। বঞ্চনার বিরুদ্ধে ,শোষণের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করাই লাল ঝান্ডার কাজ। আমি সেই ঝান্ডা আজও ধরে আছি এবং আমি মনে করি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে লাল ঝান্ডা একমাত্র দিশা। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করে সরকার গড়ব আর তা সহজে পুজিপতিরা এবং তাদের সরকার মেনে নেবে এটা হতে পারে না। 


    আমরা বামপন্থীরা কিছুদিন সরকারি ক্ষমতায় ছিলাম তাই আবার সরকারি ক্ষমতায় যাওয়ার প্রবণতা আমাদের সবসময় মনের মধ্যে ঢুকে আছে। আমরা বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেছিলাম ।শোষণ পালটাতে পারিনি। নির্বাচনে শাসক বদলায় শোষণ বদলায় না। প্রায় এ কথাটাই আমরা শুনি এবারে আমরা সরকার গড়ব এবার আমাদের দিন  আসছে। এমন প্রচার এত ব্যাপক হয় মেহনতী মানুষও ভাবে "এবার জাগরণ যেভাবে হয়েছে নিশ্চয়ই পাল্টে যাবে সবকিছু" ।বঞ্চিত মেহনতি মানুষ শ্রমিক কৃষক প্রান্তিক মানুষ চাইলেই বামপন্থীদের সরকার হবে এই ধারণা আমার মনে হয় আমাদের চেতনাকে ভোঁতা করে দিচ্ছে।

নির্বাচনপ্রিয়তা আমাদের মধ্যে বেশি বেশি করে প্রভাব তৈরি করছে। আমরা কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোকে  ভেঙ্গে চুরমার করে শোষণমুক্ত রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করার জন্য বদ্ধপরিকর। এটাই কিন্তু মার্কসীয় দর্শনের শেষ কথা। আমরা কেন শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে যাব। আমরা এখনো ঠিকমতো করে শ্রেণী মিত্র শ্রেণি শত্রু নির্বাচন করে উঠতে পারছি না। নির্বাচনপ্রিয়তার এর পিছনে কারণও আছে। শোষণ অত্যাচার জনগণের উপর ভয়ঙ্কর  নিপীড়নের হাত থেকে  বাঁচার জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা আগ্রহ আমাদের তৈরি হয়। দলগড়ার এবং সংগঠন করার সমস্ত রকম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে সরকার। তাই আমাদের মনে হয় সরকার গঠন করতে পারলে সাময়িক হলেও মানুষের উপর  বল্গাহীন শোষণ অত্যাচার নিপীড়ন অন্তত বন্ধ করা যেতে পারে। এমন ধারণা থেকেও আমাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। কিন্তু আমরা অনেক সময় ভুলে যাই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাতে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাতে পুলিশ প্রশাসন আইএ এস  আইপিএস নির্বাচন কমিশন, আইন আদালত সবই পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে। এরা মেহনতী মানুষের রাজনৈতিক দলকে কখনোই পছন্দ করেনা। তাই সুবিচার পাওয়া সম্ভব নয়। মানুষ ভোট দিলেও, সুকৌশলে কারচুপি  করে হারিয়ে দেওয়ার ,এমনকি কাউন্টিং হলেও মোটা অংকের উৎকোচ গ্রহণ করে হারিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ কিছুতেই ভারতবর্ষের পুঁজিপতিরা আদানি আম্বানি সহ তাদের মাথায় যে সমস্ত রাজনৈতিক দল ছাতা দিয়ে বসে আছে তারা যে ছলে বলে কৌশলে, যেন তেন প্রকারে  ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করবে করছেও। প্রতিটা নির্বাচনে আমরা এসবই দেখি এবারকার নির্বাচনেও ব্যতিক্রম নয়। হয়নি। এমএলএ এমপি সরকারি ক্ষমতায় যাওয়াটা আমরা যেন প্রায়োরিটি না দিয়ে থাকি। আজকের যে যুবসমাজ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে তারা যেন গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দিকে নজর রাখে। না হলে হতাশা ঘিরে ধরবে। তাছাড়া ভোটে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা খরচ করে ভোটার কেনা যায়। বামপন্থীদের এসব নাই। বড়লোকদের কাছ থেকে পুঁজিপতিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ইলেকশন করবে ।অতিতেও হয়েছে এখনো হচ্ছে ;এটাই আইনি স্বীকৃতি।


গতানুগতিকতার বাইরে বামপন্থীদেরকে ভাবতেই হবে। আমরা যারা মার্কসবাদ বিশ্বাস করি আমরা নিশ্চয়ই জানি আবেদন নিবেদনে, নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল হয় না ।আর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল না হলে লাল ঝান্ডা ধরার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রচার প্রপাগান্ডাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। নির্বাচন থাক না থাক সারা বছর ধরেই তো আমরা বামপন্থীরা প্রোপাগান্ডার পথ ধরে হাঁটছি। প্রচুর উৎসর্গীকৃত কর্মী তৈরি হয়েছে। সর্বদা চেষ্টা করা দরকার কর্মীদের এবং অনুগামীদের নির্বাচন সম্পর্কে যাতে মোহমুক্তি ঘটে তদনুরূপ শিক্ষা শিবির এবং কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।আমাদের নির্বাচনে কোন মোহ নাই হতাশাও নেই। আমাদের মাথায় সব সময় থাকবে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার সংকল্প। আমরা পরিশ্রম করতে পারি ঘাম ঝরাতে পারি ত্যাগের আদর্শে আমরা দীক্ষিত। আমাদের কোন শর্টকাট রাস্তা নেই।


৩৪ বছর তো আমরা দেখেছি। দিল্লিতে একটা বৈরী সরকার আর রাজ্যে একটি বামপন্থী সরকার। অঙ্গ রাজ্যের কতটুকু ক্ষমতা আছে যে জনগণের শোষণ মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারবে? পারেনি পারবেনা। একটা আদর্শ সরকার তৈরি করা যায়। একটা উন্নত ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। কিন্তু শ্রেণীহীন শোষণহীন সমাজ তৈরি করার লক্ষ্যে আমাদের এগানো সম্ভব নয়। সে দিক থেকে বামফ্রন্ট বামফ্রন্ট সরকার তখনকার পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সারা ভারতবর্ষে এবং বিশ্বের কাছে নিশ্চয়ই সম্মানের দাবিদার। সবশেষে বলি আমাদের নেতৃত্ব ক্যাডারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে আমাদের প্রকৃত দিশা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যেন আরো বেশি বেশি করে চর্চা করেন ।তাহলে শ্রেণি ভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলতে পারা যাবে। শ্রেণী ও গণসংগঠন যত শক্তিশালী হবে তত বেশি বেশি জনমানষে আমাদের প্রভাব তৈরি হবে। মানুষ ও ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে নির্বাচন শেষ কথা নয়। সংগঠন সংগঠন এবং সংগঠন এবং এই সংগঠনকে হাতিয়ার করে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে দখল করা আমাদের একমাত্র দিশা। আমাদের ছাত্র যুবরা এবং কর্মী বাহিনী যথেষ্ট আন্তরিক এবং উদ্যোগী উদ্যমীও বটে। তারা অনেকেই ঘর ছেড়েছেন দলীয় কাজে অংশগ্রহণ করছেন সর্বক্ষণের জন্য।মাঠে ময়দানে তারা মানুষের কাছে বার্তা দিতে পারে। নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার কথা বলতে পারে। এই বিশ্বাস ও এই চেতনা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।


"হারাবার কিছু ভয় নাই ,শুধু শৃঙ্খল হবে হারা

জন কল্লোলে উত্তাল নদী মোহনায় দিশাহারা

হারাবার কিছু ভয় নাই ,শুধু শৃংখল হবে হারা।"

________________



৪ ।। বড় মনের গরীব মানুষ 


অনেক বছর আগেই লিখেছিলাম একটি কবিতা। 


আমার কোন খাতা নেই, জমি নাই ব্যাংক নাই লকার নাই আমি বেশ ভালো আছি। অর্থ অনর্থের মূল এই উক্তি আমার মস্তিষ্কে সবসময় ক্রিয়াশীল। অর্থ থাকলে সব সময় আগলে রাখতে হয়। কারণ হারিয়ে যাওয়া কিংবা চুরি  যাওয়ার সম্ভাবনা। অর্থ উপার্জনের জন্য মনোযোগ দিতে গেলে সময় অনেক নষ্ট হয়।যদিও একটি বাস্তব সত্য অর্থ ছাড়া মানুষের জীবন চলে না। তাই অর্থ সামর্থকে এড়িয়ে বেঁচে থাকা দুষ্কর। বেঁচে থাকার জন্য কোন না কোনভাবে অন্যের উপর নির্ভরশীল হতেই হবে। মানুষতো বাতাস খেয়ে থাকতে পারেনা। মোটা ভাগ মোটা কাপড় ,মাথার উপর একটি খড়ের ছাউনি অন্তত মাটির দেওয়াল থাকা চাই। গরিব মানুষের এটাই জীবন যাপন এবং নির্ভেজাল সুখের জীবন।  পথের ধারে খড়ের ছাউনি মাটির দেয়াল ছোট ছোট ঘর দেখলে আমার খুব লোভ হয়। বৃষ্টি বাদলের দিনে প্রকৃতির সাথে মাটির গন্ধ মাখা ঘর। মৃদু মৃদু বাতাস জল কনা সহ খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ে। গা চাটে প্রকৃতি। ঝড়ের সময় দেখুন গাছের মগ ডালে পাখির বাসা। আমার লোভী মন কবিতায় লিখে "জেনে নিতে ইচ্ছে করে/ পাখির ঘুমের গোপন তথ্য।" কেমন করে পাখি নিশ্চিন্তে ঘুমায় আর দোল খায়। অথচ আমাদের পালঙ্কে  ঘুম ধরে না। বেঁচে থাকার জন্য অর্থের প্রয়োজন। কারণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে মানুষকে থাকতে হয়। অর্থ ছাড়া জীবন যাপন সম্ভব নয়। উপার্জন দু রকমের। বেঁচে থাকার জন্য শ্রমের বিনিময়ে উপার্জন। এই উপার্জন সৎ ভাবে উপার্জন। দিনগুলি অতিক্রম করার জন্যই এই উপার্জন। হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম তাদের সম্পদ।


এখানে লোক ঠকিয়ে অতিরিক্ত উপার্জন করে নিজেকে লোভী করে তোলার সুযোগ নেই। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম প্রান্তিক মানুষের আনন্দ। কারণ কাজ পাওয়াটাই তাদের কাছে বড় খবর। বেঁচে থাকার জন্য উপার্জন আর  সম্পদ বাড়ানোর জন্য উপার্জন। দুটোকে এক করলে হবে না। দুই উপার্জনকারী মানুষের জন্য সমাজের জন্য দান করতে পারে। একজন সম্পদশালী লভ্যাংশের কতটা দান করবে সে ক্ষেত্রে নিখুঁত হিসেবে তাকে রাখতে হয়। এটাই তার ব্যবসায়িক নীতি। আর শ্রমের বিনিময়ে যেটুকু উপার্জন করে প্রান্তিক মানুষ তারা দান করে অন্তর থেকে হিসেব করে নয়। এই প্রান্তিক মানুষ সাধারণ শ্রমিক মানুষ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ইন্সট্রুমেন্টের মতোই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ গরিব মানুষ সৎ। গরিব হিসেবে বেঁচে থাকাটা সততার পরিচয়।


আমি অনেক গরীব মানুষ দেখেছি মনটা খুব বড়। পকেটে যা আছে দিয়ে দিতে পারে দরাজ হস্তে। যার মন খুব বড় তার মধ্যে একটা রাজা রাজা ভাব থাকে। নিজেদের দাতা মনে করে একজন সৎ গরিব মানুষ। কখনো সে সহজে গ্রহীতা হতে চায় না। একজন উন্নত চেতনার মানুষের অর্থ সামর্থ্যহীন থাকার মধ্যে এক ভিন্নতর অহংকার থাকে । এই অহংকার হল তার সততা,।নেপোলিয়ন ঠিকই বলেছেন "গরিব থাকার শ্রেষ্ঠ উপায়  সৎ হওয়া।" সেই ব্যক্তির দিকে কেউ আঙুল তুলে কথা বলতে পারবে না। যথেষ্ট লোভ সংবরণ করে দারিদ্র্যের জ্বালা সহ্য করে  জীবন যাপন   আয়ত্ত করা সহজ নয়। মানুষকে ঠকিয়ে শোষন করে বড়লোক হওয়া যায়। গরিব হয়ে থাকতে গেলে যথেষ্ট মনের জোর লাগে। জীবনের কত মূল্যবান সময় ও ব্যক্তি জীবনের বেঁচে থাকার সামগ্রী ত্যাগ করতে হয় একজন নির্লোভ গরিব মানুষকে। তার আদর্শ জীবন গড়ে ওঠে সততার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে , জীবনের গতিপথে।তাই গরিব হতে গেলে সৎ হওয়া চাই। পাশাপাশি বড়লোক হওয়ার জন্য সততার কোন প্রয়োজন নেই। বড়লোক মানে অসৎ।


অনেক বড় বড় সম্পদশালী ব্যক্তিরা দান করেন তা নিজের ওজন পরিচিতি বাড়ানোর জন্য সুনামের জন্য। আধুনিক প্রচার যন্ত্রও তার নাম প্রচার করে। একেবারে স্বার্থের কারণে দান করা। স্কুল-কলেজের জন্য বহু জমি জায়গা ধেনো জমিদাররা দান করেছে। লোক ঠকিয়ে যে ব্যাপক সম্পদ তারা তৈরি করে তার সামান্য কিছু অংশ কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য দিলে তাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু যারা প্রতিষ্ঠান গড়ার সময় নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ও শ্রাম দান যারা করে তারা প্রচারের আলোয় আসতে পারে না। গরিব মানুষই সৎ থাকতে পারে। এই দুই চরিত্রের মধ্যে গরিব মানুষের চরিত্র নিশ্চয়ই শিক্ষনীয় এবং আদর্শ। নেপোলিয়নের মতে "গরিব থাকার শ্রেষ্ঠ উপায় হল সৎ হওয়া"। জীবনে অনেক শুনেছি,' বড় মনের মানুষ","বড় মনের মানুষ" কিন্তু একজন সমাজ বিশ্লেষক এবং একজন চিন্তকের মতে বড় মনের মানুষ একজন সৎ গরিব মানুষ।

_____________

 ৫ ।। আমার গ্রাম আমার আবেগ আমার স্বর্গ

আমার গ্রাম আমার আবেগ আমার স্বর্গ। কত শত স্মৃতি জড়িয়ে আছে আমার জীবন নদীর এপারে ওপারে। জীবন ভেসে চলেছে মোহনার দিকে।

পশ্চাতে ফেলে আসা স্মৃতি মধুময় বাতাস কদম্ব

কেয়া শালুকের সুঘ্রাণ আর ভ্রমরের গুঞ্জন। ভালোবাসার জল কাদা প্যাচপেচে রাস্তা ,ভালোবাসার মাটি ভালোবাসার শিরীষের ছায়া বটের ঝুরি। এখানেই আমি রাখাল বালক । কোন সন্দেহ মনে রাখি না আমি রাখাল বালক নই। একটি বালক খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে দু হাত ছুঁড়ে দিয়ে বলতে পারে এখানে আমি রাজা। দায়মুক্ত রোগ মুক্ত ভয় মুক্ত যেন মুক্ত বিহঙ্গ। প্রকৃতির নিয়মে কালের নিয়ম এই জীবন পাওয়া যাবে না আর। কিন্তু এই জীবন ভালোবেসে, কোন মোক্ষ লাভের জন্য কোন কাল্পনিক স্বর্গরাজ্যের আকর্ষণে নয়,ফিরে আসা যেতে পারে এই মাটিতে অনাবিল আনন্দধামে।


এখনো আমার ভালো লাগে একটি আটপৌরে লুঙ্গি আর গামছা গায়ে দিয়ে বাজারে চলে যেতে। রাত্রি নটার পড়ে বাড়ি এসে পোশাক-পরিচ্ছদ খুলে লুঙ্গি গামছা পরে চলে যাই বাজার পাড়ায়। পাশাপাশি গ্রামের খোঁজ খবর  নিই। এ কেমন আছে। বাজার মানে কিছু সমস্যা থাকে। সে সম্পর্কে জানতে হয়। এইসব নিবিড় সম্পর্ক মাটির মানুষ ও গ্রাম জীবন। যখন রাত্রি বেলা টর্চ জ্বেলে বাজার থেকে রওনা হই বাড়ির দিকে যখন দূরের টর্চের আলো ফেলে দেখে নিই অন্ধকার কেমন দূরীভূত হয়। সবুজ গাছের পাতা আরো ঘন অন্ধকারে রাত্রির শোভা বাড়িয়ে দেয়। রাত্রিবেলা জোনাকির মেলা আর ঝিঝি পোকার ডাক রাত্রিকেকুহকিনী করে। তখন রাত্রি হয়ে উঠে আনন্দ ও উপভোগের আর এক অদ্ভুত অনুভবের উপলব্ধির পরিবেশ। রাত্রির মোহিনী রূপ ও সৌন্দর্য আমার গ্রাম জীবনকে মোহিত করে তুলে । আরো নিবিড় ও অন্ধকার অনুরাগী করে আমাকে।


  মনে পড়ে শৈশবের স্মৃতি।  নিজেকে দেখি আর অবাক হয়ে যাই।একটি দড়ি দেওয়া হাপ প্যান্ট পরে এবাড়ি ওবাড়ি এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়ানো। বড় বড় নারকেল গাছে উঠে ডাব নারকেল পেড়ে নিয়ে আসা।


বটের ঝুরিতে দোল খাওয়া। দুপুরবেলা শিরীষের তলায় ছায়াতে মার্বেল খেলা। ঘেমো গা নিয়ে পুকুর পাড়ে ঝুঁকে থাকা ক্ষীর কুলের উঁচু ডাল থেকে লাফিয়ে  পড়া। প্রকৃতিকে আপন করে নেওয়া দৈনন্দিন কর্মসূচি। বারবার ভাবি এই একাত্মতা এই ভালোবাসা এই আবেগ যেন কখনো কাছ থেকে দূরে সরে না যায়!


হয়তো এই সব হারিয়েছি আবার সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলে গেছে অনেক দূরে পায়ে পায়ে একটু একটু করে জীবনটাকে টেনে নিয়ে গেছি অন্তিমের দিকে। কিন্তু সেইসব স্মৃতি যেন রোপিত ফসল যা নিজস্ব। হৃদয়ের গোলা ভর্তি এইসব ফসল যেন প্রকৃত একটি সরস সবুজ জীবন। এভাবেই সম্বোধন করতে ইচ্ছে করে, "জীবন ছেড়ে যেওনা কখনো  আমাকে।" আমি যে তোমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছি। ভোরের নরম আদুরে রোদ প্রখর সূর্যতাপ বিকেলের কালবৈশাখী কোকিলের কুহু কুহু ডাক পাশাপাশি ডেকে চলেছে বউ কথা কও পাখি। আমার তো বন্ধুতা তোমাদের সাথেই। যে যেমন আমি তার কাছে তেমন। আমার কোন শত্রু ছিল না কোন বন্ধু ছিল না সকলেই আমার পারফেক্ট একেবারে নিখুঁত সঙ্গী। আমার গ্রামে এতকিছু ফ্রিতে পাওয়া যায়। এখানে ভালবাসার জন্য পয়সা লাগেনা ।সম্পর্কের জন্য কোন স্বার্থ কাজ করে না। গ্রামকে ভালোবাসা আর কবিতাকে ভালোবাসা গ্রামকে ভালোবাসা আর সুস্থ সংস্কৃতিকে ভালোবাসা একই বিষয়। গ্রামকে ভালোবাসলে মানুষকে ভালোবাসা যায় একথা বুঝেছি আমি জীবন প্রবাহের মধ্য দিয়ে । কখনো কখনো আমার অভিমান হয়েছে চলে গেছি দূরে। কিন্তু পরমুহুর্তে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি। কখনো কখনো গ্রাম আমাকে কষ্ট দিয়েছে কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেনি ।আমি কষ্ট পেয়ে অভিমানী হয়েছি কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেনি দেখে আরো নিবিড় হয়েছি গ্রামের প্রকৃতির সাথে। সুখ দুঃখ আমার জীবন নদীর দুটি তীর।


সেদিন মর্নিং ওয়াকের সময় একটি ছেলে সাইকেল থেকে নেমে ছুটে গেল মাস্টারমশাই দাঁড়ান। ছেলেটি মাস্টারমশাই বলছে কেন? আমি ভুলেই গিয়েছিলাম একটি স্কুলে মাস্টারি করতাম। কবে কত বছর আগে হয়তোবা ৪২/৪৩ বছর আগে। স্কুলটা ছেড়ে দিয়েছিলাম রাজনৈতিক কারণে।


সাত কিলো মিটারের মধ্যে কোন বাজার ছিল না।বাজারের বয়স ৫২ বছর। একটি নিজস্ব জায়গা আমার হাতে গড়া বাজার। যেখানে কর্মব্যস্ত জীবনে একটু সুযোগ করে অবসর বিনোদন করতে পারি। মানুষ বটগাছের নিচে জিরিয়ে নেয়। তেমনি এই বাজার ।অর্থাৎ একটি চারা গাছ রোপন করেছিলাম আজকের মহীরুহে পরিণত হয়েছে। নিজের আশ্রয় এই গ্রাম এই আবেগ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গিয়েছে।


আসলে গ্রামকে ভালবাসতে হয় গ্রামও ভালোবাসা দেয়। এখানেই জীবনানন্দ উৎসব মেলা ,একুশে ফেব্রুয়ারি সবই করেছি মানুষকে ভালোবেসে গ্রামকে ভালোবেসে। মানুষের সংস্কৃতিক চেতনা বিকাশে সহযোগিতা করেছে। অসংখ্য কাজের মধ্যে দিয়ে জড়িয়ে আছি গ্রামের মধ্যে। কত বেশি মনে পড়ে এক দুস্থ বিড়ি শ্রমিক। ঋষিকেশ প্রধান। হিরশি দা। সব দিন তার আহার জুটতো না। মায়ের কলসি থেকে প্যান্টের পকেটে চাল চুরি করে হিরসিদাকে দিতাম। পেটে খাবার না থাকলেও হাসি মুখটি ছিল তার। এইসব প্রাণের মানুষ চলে গেছে ,তার হাসিমুখ মায়াবী চোখ আর সবুজ প্রকৃতি খালপাড় ঝোপঝাড় জঙ্গল হারিয়ে গেছে। প্রকৃতিকে কাছে পাওয়ার অনাবিল আনন্দ। গ্রামে থাকা পুকুরে সাঁতার কাটা আপন করে নেওয়া প্রকৃতিকে ।এসব এক প্রাকৃতিক শিক্ষা। জানিনা প্রকৃতির কোলে ঝড় বৃষ্টির জলের মানুষ বলেই আজ পর্যন্ত জ্বর  সর্দি কাশি আমাকে কষ্ট দিতে পারিনি।


সেই কবে স্কুলে পড়তাম কোন অসুস্থ বন্ধুকে দেখে গেছি স্কুলে যাওয়ার পথে। ফেরার সময় কষ্ট করে স্কুলের পাশে দোকান থেকে একটা লেবু কিনে তাকে দিয়েছিলাম। সেইটুকুই দেওয়া। ভুলে যায়নি সে কখনো। মানুষকে জড়িয়ে থাকতে কি যে আনন্দ হয়। ভীমচরন বরকে গায়ের চাদরটা  দিয়েছিলাম। তার বয়স আমার চেয়ে অনেক বেশি। সেই ছোটবেলা থেকে সে আমাকে দাদা বলে। আজও সে আমাকে জড়িয়ে ধরে আবদার করে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। এদের কাছেই শিখেছি, ভালো নেই বলো না কখনো। আমার অনেক কষ্ট হয় অনেক যন্ত্রনা আমি কোনদিন কাউকে বলে নিজেকে ছোট করতে পারিনা। গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো এসবই তো শিখিয়েছে আমাকে।


এক এক সময় আমার মনে হয় আমার গ্রাম আমার আবেগ ।স্বর্গের চাইতেও বড়। জীবনানন্দের কথাই মনে পড়ে আমি থাকবো না বলে কি চালতাফুল শিশিরের জলে ভিজবে না? নিশ্চয়ই চালতা ফুল ভিজবে নিশ্চয়ই দোয়েল বসে থাকবে গাছের ডালে। ডালকে নয় নিজের ডানাকে বিশ্বাস করেই ভরসা করে বসে থাকবে। এসবই থাকবে। কোন কিছু আটকে যাবে না আমি না থাকলেও। কিন্তু আমার সম্পর্কটা এতটাই নিবিড় আমার বিশ্বাস প্রকৃতি হয়ত বলবে তুমি ছাড়া আমি ভালো নেই। এই বিশ্বাসের পৃথিবী এই নিবিড় সম্পর্কের প্রকৃতি আমি যখন থাকবো না সেও ভুলে যাবে এটুকু ভেবে বড় কষ্ট পাই।আমার জীবনের কোন অতীতকে আমি কখনই ভুলে যেতে পারিনা। কারন আমার অতীতও নিঃস্বার্থ সম্পর্কের ঘটনাবহুল জীবন।


একমাত্র স্বার্থপর মানুষ অতীতকে ভুলে যেতে চায়। তাদের কাছে বর্তমানটাই সবচাইতে মূল্যবান।


আমি মানুষকে ভালোবাসি গ্রামকে ভালোবাসি মাটিকে ভালোবাসি বিশ্বাস করি আমি প্রকৃতিকে। এ বিষয়ে আমার ষোল আনা ভরসা আছে গ্রাম আমাকে ভুলে যাবে না।


সম্পর্কের শিকড় কতটা গভীর তার উপর নির্ভর করে গ্রাম জীবনে বেঁচে থাকা। আমি যাদের কথা ভাবি  তারা কতটা আমার অভাব বোধ করে। কার মেয়ের বিয়ে ,কার ছেলের ফর্মের টাকা ,কে আছে হাসপাতালে এদের পাশে থাকা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। এইসব মানুষেরা প্রত্যাশা করে আমাকে যেমন, আমারও প্রতিদিনের কাজ ওরাই জুটিয়ে দেয়।


কোন প্রয়োজনে বাড়িতে কেউ না এলে নিজেকে নির্বান্ধব মনে হয়। এভাবেই জড়িয়ে থাকা মানুষের সঙ্গে এভাবেই আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নেওয়া।


খাদ্য ও জল গ্রহণের মত একটা অভ্যেস যা কিছুতেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একটু বেশি দিন বাইরে চলে গেলে মুহূর্তে শিকড়ের টান অনুভব করি। পড়িমরি করে পালিয়ে আসি গ্রাম মাটি ও ভালোবাসার টানে।

____________________



৬, ।। লেখক ও রাজনীতিবিদ



লেখক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে গুণগত আচরণগত কিছু পার্থক্য আছে। কোন কোন লেখক প্রত্যক্ষভাবে মাঠে ময়দানে রাজনীতি করেন। আবার একজন রাজনীতিবিদ তিনিও লেখালেখি করেন। অনেক লেখক আছেন প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি করেন না কিন্তু মানবিক মানুষ তিনি। তিনি প্রগতিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কার মুক্ত মানুষ। অনেক রাজনীতিবিদ আছেন যাঁরা লেখালেখি করেন না। কিন্তু লেখাপড়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, পড়াশোনা চিন্তা চেতনায় তারা যথেষ্ট অগ্রণী। দর্শন শাস্ত্রে অভিজ্ঞ বিশেষ করে বস্তুবাদী দর্শন সম্পর্কে তাঁদের প্রগাঢ় জ্ঞান। যে জ্ঞানের আলোকে তিনি দিশারী হয়ে উঠেন। অনেক লেখক বন্ধু আছেন যাঁরা সাহিত্যের সমস্ত শাখাতে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেন কিন্তু সময়ের চাহিদা কে উপেক্ষা করে মাঠে ময়দানে নামতে তাদের কুণ্ঠা আছে। তাদেরকে আমি প্রতিক্রিয়াশীল মনে করি না। কিন্তু তাঁরা সমাজ ও সময় সম্পর্কে  অভিজ্ঞ ও সচেতন হলেও জনতার দাবির প্রতি সোচ্চার হতে এবং প্রত্যক্ষভাবে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে দ্বিধাগ্রস্ত। পাশাপাশি একজন রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক কর্মী সময়ের আহ্বানকে উপেক্ষা করেন না মাঠ ময়দান কাঁপিয়ে দেন জনতার হাতে হাত মিলিয়ে। এমনকি তাঁরা মানুষ যে ভাষায় কথা বলে যে ভাষা বুঝতে পারে তাদের মতো করে সহজ সরল ভাবে রাজনীতি বিশ্লেষণ করেন লেখনীর মধ্য দিয়ে। একজন রাজনীতির মানুষ যখন কলম ধরেন তখন তাঁর লেখার মধ্যে বাস্তবতা ফুটে ওঠে। মানুষের শ্রেণী চেতনা বিকশিত করার জন্য সহজভাবে বোধগম্য করার জন্য তাঁরা যেভাবে যে ভাষায় মানুষের সঠিক জ্ঞান আছে তেমন করে মনের কথা ব্যক্ত করতে পারেন । তা কিন্তু একজন সাধারণ মানের লেখকের পক্ষে সম্ভব নয়। অর্থাৎ একজন রাজনীতিবিদ তত্ত্ব এবং প্রয়োগ রীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তাই তাঁর লেখার গুণমান নিঃসন্দেহে উন্নত। রাজনীতি লেখকরা সবসময় খেয়াল রাখেন জনগণকে শিক্ষিত করা এবং সাংগঠনিক শক্তি যাতে মজবুত করা যায় সে দিকে নজর থাকে লেখনীর মধ্যে। রাজনীতির লেখকদের খুবই সতর্ক এবং সজাগ থাকতে হয়। কারণ তাঁরা জনগণের দিশারী। যেমন দক্ষ মাঝি ঝড় তুফানেও ওপারে পৌঁছে দেয় নাবিকদের। রাজনৈতিক লেখক ঠিক তেমনি। সামান্য একটু পদস্খলন হলে বিপদ। অরাজনৈতিক  লেখকদের এসব দায়বদ্ধতা নেই। তাঁরা তাঁদের মত লিখবেন অবশ্যই শুদ্ধ সাহিত্য রচনায় তারা নিয়োজিত থাকবেন। এই শুদ্ধ সাহিত্য মানুষের উন্নত চেতনার প্রতিফলন। সুস্থ-সাংস্কৃতির জগতেও তাঁদের ভূমিকা লক্ষণীয়।


আমাদের সমাজে বহুবিধ বিষয়বস্তু আছে যে সম্পর্কে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী লেখক পন্ডিত মানুষ তাদের মেধার পরিচয় এবং জ্ঞানের আলো সমাজকে দিচ্ছেন। 


অর্থাৎ সব লেখককেই রাজনীতি করতে হবে বা রাজনৈতিক মতাদর্শ মেনে নিতে হবে এসব দাবি যুক্তিসঙ্গত নয়। আমাদের বিচার্য বিষয় হলো তিনি প্রগতিশীল কিনা, সংস্কার মুক্ত কিনা ,ধর্মনিরপেক্ষ কিনা। 


আমি সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করি এবং সময় সুযোগ মতো লেখালেখি করি বস্তুবাদী দর্শন মাথায় রেখে।


লেখক হিসেবে তেমন কোন জোরালো দাবি আমার নেই। কারণ বিশ্বের অগাধ জ্ঞানের ভান্ডার সেখানে প্রবেশ করা তো দূরের কথা ধারে পাশে আমি পৌঁছতে পারিনি। কিন্তু যতটুকু জ্ঞান ও বিশ্বাস আছে  তা দিয়ে কলম ধরাটা যুক্তিপূর্ণ। আমি যেমন পারি, যেমন জানি সেই জানাটা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমার দায়িত্ব। একজন লেখক হিসেবে এটাই আমার কর্তব্য মনে করি। তাই একই সঙ্গে রাজনীতি এবং সাহিত্য আমরা অনেকেই পছন্দ করি এবং নিজেদের জীবনে তাই করি। বিশ্বাস আছে, অগাধ জ্ঞানের অধিকারী না হতে পারি কিন্তু মেহনতী মানুষের জীবনে আমি বা আমরা যেন বহিরাগত না হই। তাদের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকতে পারি এটাই আমার একজন লেখক হিসাবে বাসনা। রাজনৈতিক দিশা কার্যকরী করার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে  অংশগ্রহণ করার পাশাপাশি কলম ধরাটাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি।


আমাদের সমাজ জীবনে প্রতিদিন কত কিছু ঘটে যাচ্ছে। হাজার হাজার অন্যায় অবিচার খুন ধর্ষণ রাহাজানি প্রতিনিয়ত দেখছি আমরা। বহু ক্ষেত্রে  সরকারি মদত আছে। বহু ক্ষেত্রে সরকার তার নিজের পাপ চাপা দেওয়ার জন্য ঘটনাকে আড়াল করছে কথার মারপাঁচে সময় নষ্ট করছে।সম্প্রতি আরজিকর হাসপাতালকে কেন্দ্র করে যা ঘটে গেল  সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে এখানে সরকার সরাসরি যুক্ত। সরকার নিজেকে বাঁচানোর জন্য কি নির্লজ্জ ভাবে আইন ও প্রশাসনকে ব্যবহার করছে। যাঁরা মাঠে ময়দানে সংগ্রামী ও প্রতিবাদী জনতার পাশে দাঁড়িয়েছেন সেই সমস্ত বন্ধু বুদ্ধিজীবী শিল্পী সাহিত্যিক কবি লেখকদের অভিনন্দন জানাই। তাঁরা তাঁদের মানবিক চেতনাকে কাজে লাগাচ্ছেন নির্ভীক ভাবে।


তাঁদেরকে আমরা প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ হিসেবে কুর্নিশ জানাই। কুর্নিশ জানাই যাঁরা তাঁদের  নিজস্ব অবস্থান এবং বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে সময়ের ডাকে সাড়া দিতে পেরেছেন। সারা পৃথিবীতে যত বড় বড় বিপ্লব হয়েছে সমস্ত ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার বৈপ্লবিক প্রেরণা তাঁরা দিয়ে গেছেন। তাইতো সংগ্রামের গান , বিপ্লবের গান শুনে মাঠে মানুষ নেমে পড়ে। পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে এ পথ চেনা। লেখক এবং রাজনীতিবিদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। যদি সেই লেখক বুদ্ধিজীবী ভীষ্ম দ্রোণাচার্য কৃপাচার্যের মতো না হয়ে জনতার পাশে থাকেন। তাহলে সমাজ পরিবর্তনে প্রগতিশীল লেখক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধন সুদৃঢ় হবে। এই মেলবন্ধন ইতিহাস গড়ে তুলবে।


রাজনৈতিক লেখকরা সামাজিক বিকাশ ও সামাজিক সত্যের উপর তাঁদের চিন্তাধারাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

_____________________ 


৭ ।। সম্পর্ক



সম্পর্ক একটি ছোট্ট শব্দ। কিন্তু এর বিশালতা পরিমাপ করা যাবে না।সম্পর্ক নিখুঁত ও স্থায়ী করার জন্য নিজের ক্ষতি করতে বাধ্য হয় যে ব্যক্তি তিনিই আদর্শ। যতই সম্পর্ক সম্পর্ক বলি না কেন আমার সুখ দুঃখের অংশীদার বা ভাগিদার যে হতে পারে না তার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক কোনদিনই ছিল না হবেও না। সারা জীবনে কত সম্পর্ক তৈরি হলো !প্রথম প্রথম কি মধুর সম্পর্ক। সকাল বিকাল দেখা না হলে, কথা না হলে বন্ধুর জন্য মন খারাপ করত। কতদিন বন্ধুর বাড়িতে থেকে গেছি রাত্রে সম্পর্কের টানে। বন্ধু বাড়ি ফিরতে পারেনি আমার বাড়িতে থেকে গেছে। কি যে গল্প সারারাত ধরে করতাম তার মাথা মুন্ডু কিছুই নেই। তবু দেখা হওয়া চাই কথা বলা চাই। দুপুরের সেই কাঠফাটা রোদ্দুরে কোন বটের ছায়ায় পৌঁছে যেতাম আমরা। ঘন্টার পর ঘন্টা এ কথা সে কোথায় সময় কেটে যেত। বিকেল গড়িয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতো , সন্ধ্যা তারা ফুটে উঠতো।তবু কথা ফুরোয় না। ফাঁকা মাঠ দিয়ে ভয়ে ভয়ে ফিরতাম বাড়ি । কত সম্পর্ক টিকিয়ে নি ফিকে  হয়ে গেছে। সব সম্পর্ক টিকেনি। স্কুল কলেজের পড়াশোনার পর,যে যার মত করে ব্যস্ত থাকার কারণেই ধীরে ধীরে দেখা সাক্ষাৎ কমে আসত। না আমি কোন প্রত্যাশা নিয়ে কারো সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করিনি। কি রাজনীতি কি সাহিত্য কি ব্যক্তি জীবনে। কত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে এবং  সে আমার একজন বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ সহচর এভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু যথাসময়ে দেখেছি, সে আমার কাছে নেই। স্বাভাবিক নিয়মে সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেছে। দোষ কারুর নেই । প্রত্যেকের নিজস্ব প্রয়োজন থাকে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা জগত তৈরি হয়ে যায়। মনে থাকে কিন্তু সেই শৈশব কৈশোরের সম্পর্কটা মলিন হয়ে যায়। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না থাকলেও বৈরিতা দেখিনি অনেক বন্ধুর সঙ্গে। পরস্পরের জন্য গর্ব অনুভব করতাম। দেখা হলে বলতাম দিনগুলো চলে গেল রে। পরস্পরের ভালো-মন্দ বিপদ-আপদ খোঁজ  খবর নেওয়া, সহানুভূতি দেখানোর ধারাবাহিকতা ছিল। চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয়। এসবই তো স্বাভাবিক। কিন্তু বহু সম্পর্ক এত তিক্ত এবং বেদনাদায়ক, বিপদজনকও বটে। তাও দেখছি আজকাল।পরবর্তীকালে দেখেছি সম্পর্কগুলো ভয়ংকর বিষাক্ত। ছোবল মারার সুযোগের অপেক্ষায় তারা থাকে। যেখানে লোহার দাঁড়ি পাল্লা ইঁদুর খেয়ে নেয় সেখানে বিশ্বাস ও সম্পর্কের ভিত্তি ভূমি সম্পর্কে কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। কোন সদুত্তরও  পাওয়া যাবে না। এই সম্পর্ক সকলের ক্ষেত্রে সমান নয়। এক এক জনের কাছে এক এক রকমের সম্পর্ক। সম্পর্কের বোঝাপড়া গভীরতা সকলের ক্ষেত্রে সমান হয় না। সম্পর্কে অবিশ্বাস তৈরি হলে ভেঙ্গে যায় আর জোড়া লাগে না। কখনো কখনো সেই সম্পর্ক বড্ড অসহ্য লাগে। যখন দেখি সে ধীরে ধীরে তার প্রত্যাশা পূরণ হয়ে গেলে অথবা প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার সুযোগ না থাকলে সরে যাচ্ছে কাছ থেকে। এইসব সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বার্থপরতা প্রকট । কাজের জন্য এলে আমি খুব কাজী। অর্থাৎ কাজের মানুষ বা উপকারী মানুষ।কাজ ফুরিয়ে গেলে আমি পাজি। খুব দেখেছি নিঃস্বার্থভাবে বিপন্নকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছি, তখন সে আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পরে তাকেই দেখেছি দুর্নাম বা কুৎসা করতে করতে সরে গেছে কাছ থেকে। মানুষ চিনতে আমরা ভুল করি। আসলে এটা আমাদের অভ্যাস। সব সময় যাচাই করা সময় হয় না। বিশ্বাস করা একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের অনেকের। যারা নির্লিপ্ত থাকে, অন্যের প্রতি কোন টান অনুভব করে না, নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে তাদেরকে সম্পর্ক কখনো পীড়া দেয় না। কারণ নির্লিপ্ত মানুষ কারুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে না। তারা কারুর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় না।যারা স্বভাব সিদ্ধ সামাজিক ও মানবিক, যারা একা চলতে চায় না ,বন্ধু খুঁজে বেড়ায়; বন্ধুত্ব তৈরি করে সম্পর্ক গড়ে তোলে তারা।


 আমরা প্রকৃতপক্ষে একজন একজনকে খুঁজে বেড়াই মনের মত করে পাওয়ার জন্য। কোন লুকোচুরি খেলা নয়। পরস্পরকে ঠিকমতো চিনে নেওয়া ,বুঝে নেওয়া অন্তরের গভীরে প্রবেশ করা। অন্তরের মধ্যে এক স্নিগ্ধ স্পর্শ থাকে আলো থাকে, অসাধারণ সারল্য থাকে তাই অনেক সময় সম্পর্ক টিকে যায়। আমরা প্রায়শই বলি মানুষ চিনতে ভুল করেছি। আসলে সব মানুষই তো দেখতে সমান। তবে সম্পর্ক একটি শাশ্বত বিষয়। পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি আছে। বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার যেমন অনেক কারণ থাকে ,শর্ত থাকে ;তেমনি বিচ্ছেদেরও অনেক যুক্তি থাকে। আসলে আমরা কেউ খাঁটি নই। তাই সম্পর্ক যে খাঁটি হবে এমন কোন কথা নেই। আমাদেরকে মানিয়ে নিতে হয়। সম্পর্ক একেবারে ধ্বংস না করে দিয়ে মানিয়ে নিয়ে চলতে চলতে একটা সময় হয়তো সম্পর্ক পুনরায় ফিরে আসতে পারে। অবিশ্বাস তৈরি হলে তখনই তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না এবং তাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না। শুধু আপনি নিজে সতর্ক হবেন।


বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক যত নিবিড় হোক না কেন সবসময় মনের কথা প্রকাশ করা উচিত নয়। নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে হয়। আমার অভিজ্ঞতা এরকমই। আমার মনের কথা সবটাই খোলামেলা আলোচনা করলে পরে সে অনেক কিছুই সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। আমি আমার নিজের জীবন থেকে এইসব শিক্ষা পেয়েছি।


বন্ধু তোমার কাছে অনেক কিছুই চায়। অনেক সময় তার ভেতরের কিছু যন্ত্রণা নিবিড় সম্পর্কের কারণেই খুলে বলতে চায় তোমার কাছে। যতই ব্যস্ত থাকো না কেন তুমি তাকে একটু সময় দিও। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গেলে এটুকু তো করতেই হবে। তবে নিছক ব্যক্তি সম্পর্কের বাইরে যদি নীতিগত আদর্শগত কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার স্থায়িত্ব কিন্তু অনেক বেশি। বিশেষ উদ্দেশ্য বা কোন কর্মসূচির কারণে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে, শেষ পর্যন্ত হাতে হাত দিয়ে কাঁধে কাঁধ দিয়ে পৌঁছানোটা একটি অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারের কারণেই স্বাধীনতা সংগ্রামীরা পরস্পরের প্রতি এতটাই নিবিড় ছিলেন। এ কারণেই তো ইতিহাস গড়ে উঠেছে। একজন সৈনিকের সম্পর্কের মত যুদ্ধক্ষেত্রে ফেলে দিয়ে চলে যাবে না বন্ধুকে। একটা বোঝাপড়া সম্পর্কের মধ্যে পরিচ্ছন্নভাবে না থাকলে সম্পর্ক গড়ে ওঠে না।


যে সম্পর্ক শক্তি যোগায় অনুপ্রেরণা দেয় সেই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হয়। সবশেষে একটি কথা বলব ,যদি কখনো তুমি অসহায় বোধ কর নিজেকে, কিংবা বিপন্ন বোধ কর তখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও একজন দুজন তিনজন তোমার কাছ থেকে যাবে সরে যাবে না । এ বিশ্বাস থাকা চাই।পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে। তারাই কিন্তু প্রকৃত বন্ধু এবং সেই সম্পর্কই সঠিক সম্পর্ক। যারা তোমার কাছে থেকে গেল তারাই সম্পর্কের মূল্য দিতে জানে। যাঁরা সম্পর্কের মূল্য দিতে জানেন তাঁরা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভালো মানুষ। মনে পড়ছে লালনের কথা,"মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি"।

_________________________

 ১১ ।। প্রত্যাশাহীন জীবন



প্রত্যাশাহীন জীবন, সুখী জীবন। জীবনপুরের পথিক আমরা। পথে নেমেছি কোন প্রত্যাশা নাই।তাই প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি নিয়ে মনের মধ্যে কোন চাপ তৈরি হয় না।  মন খারাপের কোন প্রশ্নই নেই।শৈশব কৈশোর থেকে শুরু হয় কর্মজীবন। কাজ করার জন্য এসেছি।কাজ করতে করতে চলে যাব । প্রত্যাশা যত বাড়বে তত প্রাপ্তির ভান্ডার শূন্য হবে। আর দুঃখ নেমে আসেবে জীবনে। এইটুকু বুঝতে পারলে আমাদের পক্ষে কাজের সুবিধা এবং গতি তৈরি হবে। তখন নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারবো আমরা। থমকে যাওয়া, বিরাম নেওয়ার প্রশ্ন উঠে না গতিময় জীবনে।এমন জীবনে সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি।। যখন বুঝি কাজটা করে যেতেই হবে তখন থমকে যাব কেন ! সিদ্ধান্তে অটল থাকলে কাজের গতি কিছুতেই কমবে না। কাজের নেশা পেয়ে বসে পথে নামা মানুষের।  কাজ পাগলা মানুষ কিছুতেই সময় নষ্ট করে না। কাজের মানুষের একটার পর একটা কাজ মুখিয়ে থাকে। অনেকে কাজ ছাড়া থাকতেই পারে না। তারা কাজের বিনিময়ে কি পাবে এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। 


 আপনজনদের কাছ থেকে মানুষ অনেক সময় সহানুভূতি বা স্বীকৃতি প্রত্যাশা করে। এই প্রত্যাশা স্বাভাবিক। কাজের লোক কাজ ফেলে রাখে না। কাজ তাকে করতেই হয়। কিন্তু স্বীকৃতিও খুব জরুরী প্রয়োজন। না হলে মন খারাপ করে ।মনে কষ্ট হয়। কাজের প্রতি আগ্রহ বা জেদ কমে যায়।কাজের স্বীকৃতি না থাকলে কাজের অগ্রগতি তো দূরের কথা কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইবে। আর একবার যদি হতাশা পেয়ে বসে তখন মাঝপথে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে।পরিশ্রমের পারিশ্রমিক না থাকলেও সমাদর তো প্রয়োজন আছে। মানুষতো গাধা নয়। নীতিবোধ ও আদর্শ বোধ থেকে যে কাজ আমরা করি তার মূল্যায়ন অবশ্যই হওয়া উচিত। কাজের মূল্যায়ন চাই ,বাহবা চাই স্বীকৃতি চাই। একটুখানি প্রশংসা বা তারিফ কাজের অগ্রগতিকে সহায়তা করে।যোগ্যতার মাপকাঠিতে একজন কর্মীর মূল্যায়ন হবে। এখানে বড় কথা হলো প্রত্যাশাহীন জীবন বলতে ব্যক্তিগত জীবনের কোন চাওয়া পাওয়া নয়। বহু মানুষ আছেন  সারা জীবন কাজ করে যান তাঁরা ।কিন্তু  বিনিময়ে কিছু চান না। কারণ তারা জানেন তাদের কাজের মধ্য দিয়ে একটা সামাজিক অগ্রগতি বা চেতনা বিকাশের বিষয় জড়িয়ে আছে। নিজের শ্রম ঘামের দাম প্রত্যাশা করো না। কাজের মধ্যে আনন্দ থাকে তৃপ্তি থাকে। তাই অপ্রাপ্তি জনিত কোন দুঃখ বেদনা কষ্ট বা মন খারাপ করে না। কারুর কাছে খুব বেশি প্রত্যাশা করতে নেই। আমরা অনেক ব্যক্তিগত কাজ করি অনেকের। এটা প্রায়শই দেখা যায়। সেক্ষেত্রে কিছু রিটার্ন না পেলেও মন খারাপ করতে নেই।সেবা মূলক কাজে কিছু পাওয়ার আশা করতে নেই। মানুষ মানুষের সেবা করবে এটা স্বাভাবিক নিয়ম বলেই মেনে নিতে হবে। অনেকে বলেন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে লাভ নেই। তারা স্বার্থপর। নিজেরটাই বোঝে। কিন্তু সে জানে না অন্যের স্বার্থত্যাগের মধ্য দিয়ে তার বাঁচা মরা  নির্ভর করে। আমি জানি স্বর্গ বলে কিছু নেই। স্বর্গ বলতে আমরা একটা ধারণা করি যেখানে শুধু আনন্দ আছে। তাই বলতে পারি প্রত্যাশাহীন জীবন স্বর্গের 

মতো ।


চলার পথ যদি ঠিক থাকে ভালো দিনের সন্ধান আমরা পাবই। অনেক খারাপ দিন অতিক্রম করতে করতে একটা সময় ভালো কিছুর সন্ধান পেতে পারি। নিছক চাওয়া পাওয়ার মধ্য দিয়ে যদি আমরা চলি ,ঈপ্সিত অধরা থেকে যাবে। 


তাই আসুন কাজের মধ্যে থাকি নিছক প্রত্যাশা বর্জন করি। ক্ষুদ্রকে বাদ দিয়ে সমগ্রের কথা ভাবি। আমাদের মাথা পরিষ্কার থাকা ভালো, সমগ্রের মধ্যে ক্ষুদ্র অবস্থিত। 


ক্ষুদ্রের মধ্যে সমগ্র থাকে না। তাই সমগ্রের বা সমষ্টির স্বার্থে কাজ করে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ এবং একজন প্রকৃত মানবতাবাদী মানুষের কাজ। কোন উৎপাদন মূলক কাজে বা প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক তার প্রাপ্য মজুরি  প্রত্যাশা করে। মজুরি পেলে কাজ করে না হলে কাজ করে না। কিন্তু সেবামূলক কাজে সমাজের গঠন মূলক কাজে ব্যক্তির কোন প্রত্যাশা থাকে না। প্রত্যাশাহীন জীবনে সুখ পাওয়া যায়


অনেকখানি। যেহেতু সামাজিক কাজ করতে করতে একটি আলোকিত সমাজের ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে, তাই আমরা কাজ করে যাই প্রত্যাশার কথা মনেই আসে না। ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন পূরণ একটা প্রত্যাশা। অনেকে জীবনে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বুঝতে পারে প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার নয়। তখন সেই ব্যক্তি প্রত্যাশার মৃত্যু ঘটায়। এবং প্রত্যাশা বাদ দিয়ে জীবনকে অন্যভাবে কাজের মধ্যে দিয়ে আনন্দে থাকে।। প্রত্যাশা সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকে। সমষ্টির উদ্দেশ্য সাধন হলো প্রকৃত প্রত্যাশা। আর সেই প্রত্যাশা পূরণ হলে সমাজ জীবনে উপচে পড়ে সুখ।


---------------------------------------------


১২ ।। যুদ্ধ সুখেরই অনুভূতি


সুখের অনুভূতির জন্যই প্রতিটি মুহূর্তে আমাদেরকে যুদ্ধ করতে হয়। কখনো এই যুদ্ধ মনের বিরুদ্ধে। কখনো এই যুদ্ধ পরিবেশের বিরুদ্ধে। অস্তিত্বের সংকট মোচনের জন্য যুদ্ধ করতে হয়। যুদ্ধ ছাড়া কোন জীবন টিকে থাকতে পারে না। জীবন মানে  আনন্দ। আর এই আনন্দ যুদ্ধ করতে বাধ্য করায়। প্রতিদিন মুহূর্ত তাই যুদ্ধের প্রস্তুতি।


অনেক সময় পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেরিয়ে আসতে হয় আগামীর স্বপ্ন সার্থক করার জন্য। ইতিহাসে এমন অনেক মনীষীর জীবনে ঘটেছে। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করতে পারলে আপনার জীবনের গতিপথ স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। ভয়ংকর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া একটি সুন্দর শান্ত পরিবেশের জন্ম দেয়। আমাদের জীবনের একটি সংকট মুহূর্ত অতিক্রম করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হয় একটু সুখের আলো দেখার জন্য। জীবন তো নদীর মতো। একটি নদী মাথা খুঁড়ে খুঁড়ে পাথর ভেঙে ভেঙে এগিয়ে যায়। নদী কখনো পিছু হটে না। জীবন দুরন্ত বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা পিছু হঠার কথা জীবন যদি ভাবে তাহলে তা আত্মহত্যা সামিল। ভবিষ্যতের সুখের অনুভূতির জন্যই জীবন নদী হয়ে ওঠে। তখন বলি গতীময় জীবন। সুন্দর মুহূর্তের কথা, আনন্দময় মুহূর্তের কথা ভাবতে ভাবতে বিরুদ্ধ পরিবেশ অতিক্রম করার জন্য মন যুদ্ধবাজ হয়ে ওঠে। মনটাকে যদি যোদ্ধা হিসেবে প্রস্তুত রাখি তাহলে যেকোন প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করতে পারব। আর এই অতিক্রম করার মধ্যে সুখ ও  আনন্দের অনুভূতির জন্ম নেয়। আমরা সবাই চাই এই সুখ ও আনন্দের অনুভূতির মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। অর্থ সম্পদ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ এনে দিতে পারে কিন্তু সুখ এনে দিতে পারে না। সুখ কোন বাহ্যিক বিষয় নয় ।মনের গভীরতম প্রদেশে তার বাস।


    আমাদের ফেলে আসা বহু সুখস্মৃতি জেগে থাকে মনে। ব্যথা ভরা জীবনের সেই সব সুখ স্মৃতিগুলি আমাদেরকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য উৎসাহিত করে।


আমাদের যোদ্ধা মন কিছুতেই হেরে যেতে চায় না। একবার সুখের স্বাদ পেয়ে গেলে জীবনকে সেই পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে চায়। সত্যিই তো যুদ্ধই জীবন। মনের বিরুদ্ধে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যুদ্ধ করতে হয়। বিবেককে তার সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দিতে গেলে ভয়ংকর ভাবে মানসিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্য দিয়ে আমাদের চলতে হয়। 


তাই জীবনের যুদ্ধ অনিবার্য। নিজের বোধ বুদ্ধিকে সজাগ রাখা ,শানিত করার জন্য একজন বিবেচক মানুষ যেকোনো সংঘাতে লিপ্ত হতে পারে। এই সংঘাত সেই বিবেচক মানুষ করবেই। তাই "জীবন -যুদ্ধ"বহুল প্রচারিত এবং ব্যবহৃত শব্দ।


সামাজিক জীবনে ,রাষ্ট্রীয় জীবনে আমাদেরকে অনেক লড়াই সংগ্রাম করতে হয়। শোষণের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে নতুন সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের জন্য।  অনেক বৈপ্লবিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা আমরা কম বেশি সকলেই জানি। আমি মূলত আলোচনা করছি আমাদের জীবনের প্রতিটি  বাঁক ও  মোড় কিভাবে আমরা অতিক্রম করছি। কিভাবে অতিক্রম করা যেতে পারে এই বিষয়ে আলোচনা করেছি।আমি আলোচনা করছি নিজের জীবনে কোথাও আটকে যাচ্ছি কিনা !সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা পাই কিনা ,তাই এই চর্চা। নিজের উপলব্ধিরি জগত শক্তিশালী করার একটা প্রয়াস নিজেই নিচ্ছি। এই যুদ্ধে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। যুদ্ধের শেষ হয় না কখনো। ছোটবেলা থেকে প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরুদ্ধে কেমন নিজের শরীরকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করেছি আমরা। তাই আমাদের জীবনের এই সব  অভ্যাস। সুন্দর দিনের জন্য লড়াই করছি। আর সুন্দর দিন আমাদের সুন্দর মনের জন্ম দিতে পারে। আমি কোন সামরিক যুদ্ধের কথা বলছি না। আমি বলছি আমাকে যুদ্ধ ভাবটি সবসময় স্পর্শ করে থাকে ।এজন্যই নিজের মনের বিরুদ্ধে প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সুখের অনুভূতির তাড়নায় জেগে আছি। প্রতিদিন খুঁজে বেড়াই সভা-সমিতি মিটিং মিছিলের অংশগ্রহণ করার সুযোগ। অর্থাৎ একটা পরিবেশ থেকে আর একটা পরিবেশে উত্তরণের ,গমনের সুযোগ খুঁজি। মনটাকে যোদ্ধার মত জাগিয়ে রাখার প্রয়াস। আর এই যুদ্ধ যুদ্ধ ভাবনা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, দীর্ঘজীবী করতে পারে।

______________


১৩ ।। রাজনৈতিক সান্নিধ্য



কোন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আলাপ থাকলে পরোক্ষ প্রভাব  সহকর্মীদের উপর পড়ে। সরাসরি তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা বা ব্যবহারিক রাজনৈতিক কর্মসূচি সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল করার জন্য তাঁর  উদ্যোগ আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর দৈনন্দিন জীবন যাপন কথাবার্তা পোশাক পরিচ্ছদও আমাদের আকৃষ্ট করে। ধীরে ধীরে জনতার নেতা হয়ে ওঠা, তাঁর ত্যাগ নিরহংকার আমাদেরকে কর্তব্য জ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। আমরা যে বাদবিরোধী আন্দোলনে অনেক কমিউনিস্ট নেতা অনেক বিপ্লবী আমি দেখেছি। যোগাযোগ হয়েছে পাশাপাশি থেকেছি। নিশ্চয়ই 


তাঁদেরকে দেখে দেখে নিজেকে তাঁদের মতো হওয়ার বাসনা পোষণ করেছি। শিখতে চাইলে প্রতিদিনই কিছু না কিছু আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। যেকোনো ব্যক্তির কাছ থেকে, সমাজ থেকে আমরা যদি সচেতন ও সক্রিয় থাকি তাহলে অবশ্যই শিখতে পারি। সবসময় প্রত্যক্ষ ভাবে না হলেও আমরা শিক্ষিত হই পরক্ষ ভাবেও।  এই বিষয় নিয়ে আমার কিছু আলোচনা করার আছে।


দেশের গনআন্দোলনে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে প্রথম সারির স্বনামধন্য বহু বামপন্থী নেতাদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য গড়ে উঠেছিল। তাঁদের নাম উচ্চারণ করা আমার নৈতিক কর্তব্য। তাঁদের মধ্যে অন্তত প্রত্যক্ষভাবে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এমন দুজনের কথা এখানে বলবো। আমার উপর তাঁদের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল। আমার বাবা প্রয়াত প্রতাপচন্দ্র মাইজির প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল আমার উপরে। ৪২ এর আগস্ট আন্দোলনের এবং তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আমার বাবা। যে দুজন সেলুলার জেল ফেরত বিপ্লবীর নাম এবং তাদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা বলতে চাই তাঁরা হলেন কমরেড সুকুমার সেনগুপ্ত এবং কমরেড ভূপাল চন্দ্র পাণ্ডা। তাঁদের সুদীর্ঘ কর্মময় জীবন আমি আলোচনা করছি না। আমার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়েই আলোচনা করব। বহুদিন আগের কথা তবু আজও  তাঁদের কথা আমি স্মরণ করি এবং সেইসব স্মৃতি খুবই সজীব। তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং তাঁদের যাপিত জীবন আমাকে এতটাই আকৃষ্ট করেছিল যা কোনদিন স্মৃতি থেকে অপরিচিত হতে পারে না । নেতারাই তো কর্মীর জীবন গড়ে দেয়।এই আলোচনা করে আমি আত্মতৃপ্তি অনুভব । দুঃসময়ে তাঁদের কথা ভাবি এবং নিজেকে ধন্য মনে করি।১৯৬৬ সাল থেকে অজস্র মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দাদা কাকা জ্যাঠা কি অসাধারণ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। বড়দের সঙ্গে চোঙ দিয়ে ঘোষণা করতাম। মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তো সেই ঘোষণা। মনে হলে পুলকিত হই। বিপ্লবী কমরেড সুকুমার সেনগুপ্ত এবং বিপ্লবী কমরেড ভূপাল পান্ডার কথাই বলি। ভূপাল পান্ডার সঙ্গে বাবার অন্তরঙ্গতা ছিল ।সেই কারণে তিনি আমার বাড়িতে আসতেন রাত্রিযাপন করতেন। আমাকে তিনি জেঠু বলতেন। রাত্রে তিনি কাছে নিয়ে আমাকে গল্প বলতেন।


আমার বাড়িতে রাত্রিযাপন করলে আমি তাঁর কাছে ঘুমাতাম ।তেভাগা আন্দোলনের গল্প আমাকে ঠিক ঠিক ভাবে আকর্ষণ করেনি। কিন্তু সেলুলার জেলের লোমহর্ষ কাহিনী আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। জেদ চেপে যায় সেলুলার জেল দেখার। শিক্ষিত , উচ্চশিক্ষিত,  সামাজিক জীবনে কত বড় মাপের মানুষ তাঁরা। তাঁদেরকে চটের পোশাক পরিয়ে রাখা হতো । লোহার 


বেড়ি পরে থাকতে হতো তাঁদেরকে।নির্মম অত্যাচারের কথা শুনেছি জেঠুর কাছে । বিপ্লবীদের কাঠের ঘানি টানতে হতো। গরুর স্থান বিপ্লবীদের পূরণ করতে হতো।সুদূর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের নিয়ে আসা হতো কলকাতা বন্দরে। তারপরে আন্দামান জেল। চট্টগ্রামের বিপ্লবী গণেশ ঘোষ প্রাক্তন এমপি। তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল । আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর পার্টি ক্লাস শোনার।তিনিও ছিলেন আন্দামান জেলে। তবে আন্দামানের শিলার জেল সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে জেঠুর কাছ থেকে আমি জেনেছিলাম। তখন থেকেই বিপ্লবদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা এবং সেলুলার জেলকে তীর্থক্ষেত্র মনে করেছি। 


চট্টগ্রামও আমার তীর্থক্ষেত্র। এই দুই তীর্থক্ষেত্রের বাইরে আমার আর কোন তীর্থক্ষেত্র নাই। এ আমার অন্তরের বিশ্বাস। সেলুলার জেল এবং আন্দামান চোখে দেখার বহু আগেই আমি ছবির মত মনে গেঁথে নিয়েছিলাম।। আন্দামান থেকে ফিরে এসে ভূপাল পান্ডা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি এভাবে আন্দোলনের এক প্রতিষ্ঠিত নেতা হয়ে উঠলেন। তিনি বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এর সদস্য ছিলেন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ইংরেজদের হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করেছিলেন। এ কারণেই তাঁর কালাপানি সাজা হয়েছিল। সেই শৈশব থেকে তাঁকে  দেখেছি আমি। প্রত্যক্ষভাবে সান্নিধ্য লাভ করেছি প্রায় মৃত্যু পর্যন্ত। প্রায় বলছি এই কারণে মৃত্যুর সময় আমি তাঁর কাছে ছিলাম না। মৃত্যু ১৯৯৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তিনি একটি বাইসাইকেলে অবিভক্ত নন্দীগ্রামের সর্বত্র ঘুরে বেড়াতেন। যেখানে দুপুর গড়ে যেত সেখানে সুযোগ থাকলে খেয়ে নিতেন। মাঠের আলে বসে কৃষকের সঙ্গে গল্প করতেন । কৃষকের সঙ্গে বসে তামাক খেতেন। কৃষকের মনের মানুষ আপনজন হয়ে উঠলেন। অন্তত ৪০টি বছর তাঁকে খুব কাছ থেকে আমি পেয়েছিলাম। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। আমার বাবাও তাঁর সহকর্মী হিসেবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। কিন্তু আমার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছে ১৯৬৬ সালে সিপিআইএমের পার্টি সভ্যপদ লাভের মধ্য দিয়ে। তাঁর সঙ্গে ছিল আমার পিতা পুত্রের সম্পর্কের মত। আর একজন মানুষ বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা কমরেড সুকুমার সেনগুপ্ত। বার্জ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন সুকুমার দা। প্রথমে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল তারপর বিভিন্ন জেলে স্থানান্তরিত হয়ে হয়ে  ঢাকা ও আন্দামান ফেলুদার জেল। ১৯ বছর ৬ মাস তিনি জেলে কাটিয়েছেন। জীবনের এতোগুলো বসন্ত জেলেই কেটে গেল তাঁর। আন্দামানের সেলুলার জেলে প্রথম আমি যখন গেলাম অন্যান্য পরিচিত বিপ্লবীদের সঙ্গে ভূপাল পান্ডা এবং সুকুমার সেনগুপ্তের ছবি দেখে আমার যে কি অনুভূতি হয়েছিল তা প্রকাশ করতে পারবো না। এঁদের সান্নিধ্য আমার মত একজন মানুষ পেয়েছিল ;আমার কাছে  তা তাৎক্ষণিক অহংকার।


সুকুমারদা একজন আদর্শ বিপ্লবী। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯ ৯৩ সালের ১৬ ই সেপ্টেম্বর (তাঁর মৃত্যুদিন)পর্যন্ত আমি তাঁকে খুব কাছে পেয়েছিলাম। ১৯৬৭ সালে। মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে বেরিয়ে এলাম। তাঁর সঙ্গে দেখা হল অবিভক্ত মেদিনীপুরের জেলা পাটি অফিসে। আমার টি আই প্যারেড হয়েছিল এবং আমাকে থাকতে হয়েছিল একটি সেলের মধ্যে (৩২ নম্বর ডিগ্রী)। শুনে সুকুমার দার সে কি আনন্দ। সুকুমার দা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আমার পিঠে হাত চাপড়ে দিয়ে বললেন ,"সাবাস"। তারপর থেকে তাঁর ছত্রছায়ায় ছাত্র আন্দোলন যুব আন্দোলন কৃষক আন্দোলন করেছি। তারপর ১৯৮০ সালে আমি অতি মানসিক কষ্টে যৌবনে যে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছিলাম সেখান থেকে সরে এলাম। অসহায় অবস্থায় কিছুদিন কাটিয়ে আরএসপিতে অংশগ্রহণ করি। আমার সৌভাগ্য হল অবিয়াত্তা মেদিনীপুরের আর এস পি'র জেলা সম্পাদক হওয়ার ফলে বামফ্রন্টের শরীক হয়ে গেলাম।


সুকুমার দা সিপিআইএমের জেলা সম্পাদক আর আমি বামফ্রন্টের শরীক দলের জেলা সম্পাদক। তিন চার বছর ঘনিষ্ঠ ভাবে তাঁর সঙ্গে থেকেছি আমি। ভূপাল পান্ডা এবং সুকুমার সেনগুপ্ত দুই স্বাধীনতার সংগ্রামী এবং কমিউনিস্ট নেতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পেয়েছিলাম। আমি কি পেয়েছি তা আমি জানি। তাই বারবার।এঁদের কথা আমাকে মনে করিয়ে দেয় । আজও আমি রোমাঞ্চিত হই। কেমন করে বক্তৃতা দিতে হয় ,বক্তৃতার মধ্য দিয়ে জনতাকে  কিভাবে আকৃষ্ট করতে হয় এইসব বিষয় আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শিখেছিলাম। যত দেখি তত অবাক হই তাঁদের কর্মজীবন। পাশাপাশি যাওয়ার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। প্রমোদ দাশগুপ্ত জ্যোতি বসু হরেকৃষ্ণ কোনার বিনয় চৌধুরী দিনেশ মজুমদার মজুমদারমজুমদার শ্যামল চক্রবর্তী অনিল বিশ্বাস সুভাষ চক্রবর্তী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রমূখ প্রয়াত নেতাদের স্পর্শ পেয়েছি।


একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বহুবার কমরেড জ্যোতি।বসু এবং কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে অনেক বড় বড় সভা করেছি। ষোড়শী চৌধুরী মৃগেন ভট্টাচার্য যতীন মিত্র শিবরাম বোস ছায়া বেরা অমর গোস্বামী ধরণী ধর জানা  কুমেদ পাহাড়ী যতীন রায় ফণী ভুবন রায় কালিপদ সাঁতরা যতীন পাখিরা প্রমুখ আমার ঘনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন।এখনো যাঁরা সুস্থ আছেন, বেঁচে আছেন কমরেড বিমান বসু (বিমান দার সঙ্গে ১৯ ৬৯ সাল থেকে আমার একসাথে পাশাপাশি পথ চলা)সহ অন্যান্যদের সঙ্গেও আমার ঘনিষ্ঠতা আমাকেই উদ্দীভিত করে।


সম্পর্ক ছিল গীতা মুখার্জী কামাক্ষা ঘোষ প্রবোধ পান্ডা শক্তি বল কানাই ভৌমিক কামাক্ষা নন্দন দাসমহাপাত্র সরল মন্ডল প্রমুখ সিপিআই এর নেতাদের।


১৯৮০ সাল থেকে আরএসপি নেতাদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল (অনেকের সঙ্গে নিবিড় ভাবে)তাঁদের মধ্যে যাঁদের কথা এখনই মনে পড়ছে। কমরেড ত্রিদিব চৌধুরী মাখন পাল নিখিল দাস ননী ভট্টাচার্য যতীন চক্রবর্তী অশোক চৌধুরী সৌরীন ভট্টাচার্য দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায অবনী রায় অবিনাশ দাশগুপ্ত সুনীল রঞ্জন সেনগুপ্ত গীতা সেনগুপ্ত ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য গণেশ মন্ডল ক্ষিতি গোস্বামী বিশ্বনাথ চৌধুরী হিমাংশু মাইতি সুরেশ তালুকদার প্রতুল চৌধুরী সুশীল ভট্টাচার্য বেবি জন টি জে চন্দ্রচূড়ন (আমি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলাম এবং ওড়িশার চার্জে ছিলাম বলেই তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল)। ভোলা রায় বিবেক বোস আমার উপর এঁদের প্রভাব ছিল। ঘনিষ্ঠতা ছিল ত্রিপুরার সুদর্শন ভট্টাচার্যের সঙ্গে,। ত্রিপুরার কমিউনিস্ট নেতা মানিক সরকারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।এখনো বহু বামপন্থী নেতৃত্ব ও কর্মী যাঁরা বেঁচে আছেন সুস্থ আছেন তাঁদের সঙ্গে আমার প্রতিদিনের যোগাযোগ রয়েছে। প্রয়াত এবং জীবিত বহুনেতা কর্মীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আজও আমাকে স্মৃতি কাতর করে। সোসালিস্ট পার্টি নেতা জন্মেজয় ওঝার সঙ্গে আমার খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল।


বাম দলগুলির বাইরে অজয় মুখার্জি সুশীল কুমার ধাড়া সতীশ চন্দ্র সাহু এঁরা তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আলাপ ছিল এবং ঘনিষ্ঠতাও ছিল। 


এটুকু বুঝেছি ভালো মানুষের সান্নিধ্য লাভ করলে আপনাকে পিছন ফিরে তাকাতে হবে না। ওরাই আপনাকে টেনে নিয়ে  যাবে সামনের দিকে। আমি বুঝি ভালো মানুষের সঙ্গ লাভ আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মন্ত্র।


"আমরা চলি সমুখ পানে ,কে আমাদের বাঁধবে/


রইল যারা পিছুটানে, কাঁদবে তারা কাঁদবে।"(কবিগুরু)


সমস্যা সঙ্কুল জীবনে এইসব মূল্যবান স্মৃতিচারণ আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে। তখন মনে হয় ভালো আছি।


_________________________________________

১৪ ।। কাল রাতে



রাত্রি আমার আত্মীয়। চিরকালই আমি কম ঘুমানো লোক। আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলেই সময় চলে যায় আমার। প্রাণ চায় আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলি। সে আমার সঙ্গে কথা বলে। এই কথোপকথন থেকে কত কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হই। সিদ্ধান্তে উপনীত হলে তখন আর নির্ঘুম রাতের কষ্ট মনে হয় না । বেশ তৃপ্তি পাই। যে কোন সৃষ্টির পরে যেমন উল্লাস হয়; ঠিক তেমনি সৃষ্টির পিছনে যে কঠোর তীক্ষ্ণতা ও  শ্রম থাকে সে সব উপলব্ধি করার সময় হয় না ব্যস্ত থাকি তাই।রাত আমাকে সৃষ্টির পরিষেবা দেয়। কখনো কখনো আমার গভীর ঘুম হয় । কিন্তু  দীর্ঘস্থায়ী হয় না। চিন্তার বিষয়বস্তু হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে ঘুম ও ঘুমের সহোদর রাত্রি আমাকেই জাগিয়ে রাখে। রাতের সঙ্গে ঘুমের এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। আমি এক হাতে রাতকে আটকাই। আর এক হাতে ঘুমকে আটকাই। আমি ধীরে ধীরে রাতকে ব্যবহার করার কৌশল শিখে গেছি। আমি জেনে গেছি কিভাবে দুঃখ কষ্ট বেদনাকে কাজে লাগানো যায়। কারণ দুঃখ কষ্ট বেদনা এই সবই আমাদের জীবনের অঙ্গ।।হেলাফেলা করার মত নয় । এইসবই আমার চিন্তার খোরাক। বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন হয় তেমনি জীবনের সমস্ত সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো ক্ষতবিক্ষত অনুভূতিগুলো ভবিষ্যৎ জীবনের সৃষ্টির খোরাক। তাই রাতকে আমি যত্ন করতে শিখেছি। জীবনের গভীরতম প্রদেশ থেকে যা কিছু উঠে আসে তা সংরক্ষণ করতে শিখেছি। আমার চিন্তাশক্তি হয়তো ততটা দক্ষ নয়। তাই মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। নিজের শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে দোলাচল সৃষ্টি হয়।


পৃথিবীর রূপ সৌন্দর্য সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি। 


দেখছি ভ্রমণবিলাসী ,স্বপ্নবিলাসী মন কেমন করে রং মাখায় প্রকৃতিকে। দেখি কেমন করে স্বপ্ন রঙিন হয়!তবে সময় বারবার ভুলিয়ে দেয় সবকিছু। ক্ষতগুলো যখন মাথাচাড়া দেয় তখন সব রং মুছে যায় জীবন থেকে। যখ ভাবি একেবারে নির্লিপ্ত হয়ে যাওয়াই ভালো। মাঝে মাঝে গভীর রাত আরো আন্তরিকভাবে অন্ধকারের ডানায় আশ্রয় নেয়। অন্ধকারের গভীরতায় ভয় করে। সরে আসি সেখান থেকে। ভোর হয়। জটিল চিন্তা থেকে মুক্ত হই আমি।


তাই আজ নতুন করে মনে হচ্ছে পৃথিবীটা কত সুন্দর। 


রাতের গহ্বর থেকে ফিরে এলে কি তাই মনে হয়? কাজের বিকেলটা যখন ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসে সূর্য যখন ডুবুডুবু তখন অন্ধকার নেমে আসে। মনে হয় একটা দিন শেষ হয়ে গেল।  সারাদিনে কি কাজ করেছি! কোন দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি কিনা। কোন বিপন্ন বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে পেরেছি কিনা। কোন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি কিনা ।কিছু না হোক অন্তত প্রান্তজনের জন্য কলম ধরেছি কিনা! হয়তো অনেক কিছুই করেছি তবুও দিনের শেষে মনে হয় একটা দিন নষ্ট হয়ে গেল। সত্যি সত্যি আফশোস হয় দিনের শেষে । আসলে আমার চাহিদাটা অনেক বেশি। অনেকে সামান্য কিছু করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। আমার এই এক বদরোগ  কিছুতেই স্যাটিসফেকশন হয় না। বোধ হয় কাজে ঘাটতি থেকে গেল। নিজের প্রতি বিশ্বাসের অভাব  অনুভব করি। সময়কে ফাঁকি দিয়েছি কিনা বারবার নিজেকে প্রশ্ন করি। সব সময় মনে হয়, সময় অভাব। আরো কিছু বেশি করা উচিত ছিল। মনের মধ্যে আর একটা মন অভাব বোধ করে। তখন বুকটা খালি হয়। শুন্য বুক খালি থেকে যায়। কিভাবে কষ্ট বাড়ে। আবার পরে পরে সব জ্বালা যন্ত্রণা সয়েও যায় ।


এ আমার এক গতানুগতিক অভ্যাস। অস্থিরতা যেমন পেয়ে বসে ; তেমন নিজেকে বারে বারে চেঞ্জ করতে পারি। মানসিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারি।এভাবে দিন যায় রাত যায়। মাস গড়িয়ে বছর শেষ হয়। "কবে কবে সময় বুড়ো হয়ে গেল /মোহান্ধ আমি শুধু হেঁটে গেছি পাশে পাশে।"খুব বেশি চিন্তা করলে আমার ক্লান্তির ঘুম কিছুটা তো হয় । আমাকে অনেক কিছু বে -নিয়ম মেনে চলতে হয়। পুনরায় রাত্রির কোলে আশ্রয় নিই ।একমাত্র রাত্রি আমার বন্ধু। রাত্রির নীরবতা ভেঙ্গে ডাক দেয় ঝিঁ ঝিঁ পোকা।     জানালার ওপারের জোনাকির মেলা। রাত আমায় কোলে নিয়ে স্বস্নেহে ঘুম পাড়ায় । প্রতি প্রহরে প্রহরে শেয়াল ডাকে। বনবিড়ালির পেটে ব্যথা উঠলে কাঁউ মাউ করে। সব পাখির বাসা থাকে না। এ ডালে ও ডালে ঘুরে বেড়ায় । এই শো যাযাবর পাখিদের আমার খুব ভালো লাগে।তাদের ডানা ঝাপানোর শব্দ আমি শুনি। হয়তোবা ভোরের জন্য অপেক্ষা করে।আমি জেগে থাকি ।নিশাচর বাদুড় জেগে থাকে আর পেঁচা ডাকে। তবে লক্ষ্মীপেঁচা আমাকে ডাকে না।আমার একাকীত্ব অসীম শূন্যতায় ঘুরে বেড়ায়। ভাবি জীবনে অনেক কিছুই জেনেছি বুঝেছি অনুভব করেছি। তবু মনে হয় সবকিছু শূন্য । শূন্যই তো আমার জীবনে অপরিহার্য। শূন্যতা, খাঁ খাঁ,হাহাকার বুকের ভিতরের হৃৎপিণ্ডটাকে প্রবল আক্রোশে চেপে ধরে। তবু কি ভাবে হেঁটে যাচ্ছি ! থমকে যাই নি।কিন্তু স্তব্ধ হয়ে যাই নি কেন?কখনো কখনো মনুষের মন এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। জীবনের প্রতি ভীষণ বিতৃষ্ণা যদি তৈরি হয়।


কাল রাতে নিজেকে পারিবারিক জীবনে অযোগ্য মনে হয়েছিল এবং  বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছিল। জীবনের বহু দিক আছে। সবদিকে সাফল্য আসবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই । তবে নির্ভরতার কারণে এমন কিছু অতি প্রয়োজনীয় বিষয় ,নিবিড় সম্পর্কযুক্ত যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সেখানেই হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয় বেশি। আর সেই ক্ষত  ক্যান্সারে পরিণত হয়। কাল রাতে ভাবনাটা চলে এলো। ঘুমোতে পারছিলাম না। এখন আমার গতিময় জীবন ক্যান্সারে আক্রান্ত। এই ক্যান্সার নিরাময় হওয়ার নয়। আমি জীবনে পুরোপুরি বাস্তবকে মেনে চলা মানুষ। তবুও আবেগের রাশকে টেনে ধরতে পারিনি কখনো। ইচ্ছাকৃতভাবে আবেগের রাশকে টেনে ধরিনি। কারণ আবেগের মধ্যে একটা রোমান্স আছে। আমি রোমান্সের ভক্ত। রোমান্সকে কিছুতেই হাতছাড়া করতে পারিনি পারবোনা। রোমান্স তো বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে। রাত্রি যেমন আমার প্রিয় বন্ধু তেমনি রোমান্স আমার আশ্রয়।


একমাত্র আমার সহধর্মিনী অনেক বছর আগে বুঝেছিল আমার আবেগ আর রোমান্টিসিজম সম্পর্কে। সে বলেছিল তুমি আমার কাছে দেবতুল্য। তোমাকে আমি আদর্শ মনে করি।কিন্তু পারিবারিক জীবনে তুমি ভালো অভিভাবক হতে পারবে না। আমার স্বধর্মিনী  মালিনার কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হলো। কাল রাতে অন্ধকার পৃথিবী তার বিশাল ডানায় আমাকে নিয়ে উড়ে গিয়েছিল নিঃশব্দে।।


_______________________________________



১৫ ।। সন্তানকে শেষ চিঠি


তোকে অনেকগুলো চিঠি পাঠিয়েছি ।কোনটার উত্তর আসেনি। ঠিকানা তো ভুল ছিল না। কি জানি হয়তোবা তোর আপনজনেরা তোর হাতে চিঠিটা পৌঁছে দেয়নি। তুই তো জানিস তোর কাছে আমার কোন প্রত্যাশা নাই। অর্থের অভাবে তোদের স্বাচ্ছন্দের ব্যাঘাত করতে পারে ভেবে আমি কোনদিন তোকে কিছু বলিনি। কারন আমার প্রয়োজনের কথা ভেবে তুই বিব্রত হতে পারিস তাই।কখনো কিছু বলিনি। বাবা মা চিরকালই সন্তানের ভালো চায়। মা-বাবার দিকে নজর দিতে গেলে যদি সন্তানের কোন অসুবিধা হয়, তাই বাবা মা মুখ ফুটে কিছু বলে না। মা বাবাই তো সন্তানকে বড় করে। তাই মা-বাবা কখনোই সন্তানের দুঃখ দেখতে পারে না । সবসময় তাদের মুখে হাসি দেখতে চায়। চিঠির প্রসঙ্গেই আসি।


হয়তো মনে হতে পারে বাবার চিঠি তো? থাক পরে পড়বো। এমনও হতে পারে তুই তোর ছেলের আবদার শুনতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিস। ধরে নিতে হবে এটাই স্বাভাবিক বাবার চিঠিটা পড়ার সময় হলো না। আমার চিঠির কোন অগ্রাধিকার ছিল না তোর কাছে। তারপর খবরের কাগজের সঙ্গে আমার চিঠিটাও বিক্রি হয়ে গেল বাজারে একদিন। এসব তো হতেই পারে ভেবে নিয়ে চিঠির উত্তর প্রত্যাশা করিনা আমি। সন্তান সংসারী হলে নাকি পর হয়ে যায়। এই প্রচলিত কথাটি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কোন কোন সন্তান বাবা-মাকে খাইয়ে তারপর নিজে খায়। কোন কোন সন্তান আগে খেয়ে নেয় ওরে বাবা মার জন্য সময় দেয়। কোন কোন পরিবারে বাপ ঠাকুরদার পরেও নিজেরা একসাথে অর্থাৎ যৌথ পরিবারের আনন্দ উপভোগ করে। কোন কোন পরিবারে ছেলে বউ নিয়ে আসার পরেই পৃথক হওয়ার পরিকল্পনা শুরু করে। সংসারে সব সময় অসন্তোষ অশান্তি লেগেই থাকে। একটা সময় সংসারে বিস্ফোরণ হয় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। পারিবারিক ঐক্য এবং বন্ধন। কেউ দুঃখ পায় অনেকের কারণে কেউ আনন্দ পায়।


মনে হয় তুই আজকাল তোর নিজের পরিবারকে নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিস। এটাই তো স্বাভাবিক। তা নিয়ে আমার কোন দুঃখ নেই। ওটাও একটা বড় দায়িত্ব তোর কাছে। দায়িত্ব পালন করতেই হয়।তবে আমি তো বাবা। খোঁজ না করে থাকতে পারিনা। কতগুলো চিঠি দিলাম কোন উত্তর দিলি না।আজকের চিঠিটা শেষবারের মতো লিখলাম। শুধু মনের সান্তনার জন্য ।জানি এই চিঠিটাও তুই পাবি না। এই শেষ চিঠিটা লিখতে বসে অনেক কথাই মনে পড়ছে। অন্যান্য বাবাদের মত আমিও নিজে ভিজেছি তোর মাথায় ছাতাটা এগিয়ে দিয়েছি। তোর পকেটে পয়সা থাকলেও ভেবেছি তুই লজ্জায় বলতে পারছিস না তাই ধার করেও তোর পকেটে পয়সা গুঁজে দিয়েছি আমি কতদিন। তুই জানিস আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে আর হয় না। কবু তোর বাড়ি ফিরতে রাত হলে আমি জেগে থাকতাম দরজা খুলে দেওয়ার জন্য।


তোকে উপরের দিকে তুলে ধরার জন্য একটি সিঁড়ি ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে একবার আমার কাঁধে তুই পাটা রেখেছিলি। আমার যে কি আনন্দ হয়েছিল সে তোকে বোঝাতে পারবো না। ছোটবেলার কাঁধে চড়ার দৃশ্যটাই মনে পড়েছিল। ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেছিস তুই অনেক উপরে। তারপর আর সিঁড়ি দরকার হয়নি । পা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিস সিঁড়িটা। সিঁড়ি সহ আমি পড়ে গেলাম মাটিতে ।তুই আর ফিরে তাকাসনি। সময় কই তোরে তখন!এটাও স্বাভাবিক আমাকে  তোর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। পৃথিবীর কোন সন্তান জানেনা তার জন্ম মুহূর্ত কি ভয়ংকর। তোর জন্ম মুহূর্তের সেই ভয়ংকর সময়ের সাক্ষী আমি। মায়ের কাছে সন্তানের জন্ম এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সেদিন তোর মাকে দেখেছি তোকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য নিজের জীবনটাকে বাজি রেখেছিল। সেই সময় কোন ধাই ছিল না। কোন ডাক্তার ছিল না। প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে একটি ডাক্তার-খানা ছিল। ভ্যান রিক্সা চলতো না । পায়ে হাঁটারমাটির পথ । রাত্রিবেলা কারুর সাহায্য ছাড়াই তোকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিল তোর মা। সারা পৃথিবীর সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে  মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছ করে তোকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিল। যেমন সব মায়েরাই করে। সেদিন ভেবেছিলাম তোর মাকে বোধ হয় আর ফিরে পাবো না। আর বিশেষ মুহূর্তে তোর কান্নার শব্দ পেলাম। তোর মা তোর দিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিল। সেই সৃষ্টির মুহূর্ত আমি সৌভাগ্যবান দেখেছিলাম। মায়েরা কোথা থেকে এই ক্ষমতা পায়। তোর মায়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। পৃথিবীর সব মায়েদের প্রতি আমার সমান শ্রদ্ধা। পারে মায়ের এই পারে। কিন্তু সন্তান মনে করে তার জন্ম সহজ এবংস্বাভাবিক। এবং বেড়ে ওঠাও স্বাভাবিক। এর পিছনে কোন মেহনত নেই। যে সন্তান বোঝে সে ধন্য। যে সন্তান বোঝেনা সে এক অভাগা। যাই হোক তুই সাবধানে থাকিস ভালো থাকিস। শরীরের দিকে নজর রাখিস। তোর শরীর খারাপ হলে আমার যে কষ্ট হয় তুই তো জানিস। আসলে এসব কথা তোর মনে নেই কারণ তুই এখন খুবই ব্যস্ত তোর নিজের সংসার নিয়ে। যদি চিঠিটা কখনো সুযোগ পাস পড়বি ।দেখবি শুধু তোর ভালো থাকার প্রত্যাশাই করি আমি ।অন্য কোন চারিদা নাই আমার তোর কাছে। এটাই আমার প্রত্যাশা তুই ভালো থাকিস। চিঠিটা লিখছি তোর জন্য ।নিজের জন্য নয়। সন্তানের গায়ের গন্ধ মা বাবার যে কি প্রিয় একমাত্র বাবারাই জানে। তোর মা গেঞ্জির গন্ধ শুঁকে বলে দিত ছেলের না বাবার। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের বিনিময়ে মায়ের এই ঘ্রাণ হাজার গুণ মহার্ঘ।


তোকে আর চিঠি লিখতে পারবো না রে। আমি এক্কেবারে চোখে দেখতে পাই না। যা কিছু দেখার সবকিছুই তো দেখলাম। একবার মনে করিস তোকে হাঁটতে শিখিয়েছিলাম আমি হাত ধরে। ওই ছোট ছোট পা গুলো ধুলো হয়ে গেলে ধুইয়ে দিতাম।


আমার জীবনের দুই নারী আমার মা আর আমার সহধর্মিনী। দুজনেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। অদ্ভুত সামঞ্জস্যপূর্ণ ঘটনা। আমার স্ত্রীকে রূপনারায়ণ নদী পেরিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতাম। অবশ্যই লঞ্চে। আর আমার মাকে তখন নরঘাটে মাতঙ্গিনী সেতু হয়নি।  ভাঁটার সময় নদীতে চড়া পড়ে গেলে হাঁটতে হত মাছ নদীতে। মাকে কোলে তুলে নিয়ে মাঝে নদীতে চড়া পেরিয়ে যেতাম। যেতাম তমলুকে ডাক্তারের কাছে। এ আমার এক সৌভাগ্য স্মৃতি। আজও মা আমার গায়ে লেপ্টে আছে। ছেড়ে যায়নি ছেড়ে যাবে না কোনদিন।


বিপর্যয় মোকাবিলা সে তো মায়েদের কাছ থেকেই শিক্ষা যা তোর মা তোর জন্ম মুহূর্তে আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে। দাঁতে দাঁত কামড়ে কষ্ট করে টিকে থাকো। জয় হবে নিশ্চয়ই।


_________________________________


১৬ ।। কাছে থাকা কিংবা সঙ্গে থাকা



কাছে থাকা আর সঙ্গে থাকা এক নয়। প্রশ্নটি আমার কাছে বার বার উঠে আসে। আমাকে যখন কেউ বলে এইতো তোমার কাছে আছি তখন আমি বুঝতে পারি হ্যাঁ সত্যি সে আমার কাছে আছে এবং অবশ্যই শারীরিকভাবে কাছে আছে।  কিছু কিছু অতি প্রয়োজনীয় বিষয় কাছে থাকলে মেটানো যায়। কিন্তু সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি  কেউ দিলে আমি অনেক বেশি উৎসাহ পাই এবং বন্ধুর সঙ্গ দেওয়ার বিষয়টিও অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। এবং একটা বিশ্বাস তৈরি হয়। বিশ্বাস ভরসা দুটোই পাই কেউ সঙ্গ দিলে। কারণ কাছে থাকলে শারীরিকভাবে সঙ্গ পাওয়া যায় আবার সঙ্গ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যখন পাই তখন বুঝতে পারি শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে দুই দিক থেকেই আমার বিশ্বাসের ও ভরসার মানুষ। কাছের মানুষ সবসময় কাছে থাকবে শারীরিকভাবে তা কিন্তু হয় না। কাছের মানুষের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে পরস্পর পরস্পরকে হারিয়ে ফেলে। তাই বলে থাকি আমরা, চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয়। চোখের সামনে থাকলে একটা দায়িত্ববোধ কাজ করে। আবার সেই মানুষটি যখন দূরে চলে যায় তখন তার দায়িত্ববোধ থাকে না। খোঁজখবর নেওয়া ছাড়া ব্যস্ততা থাকে না। তখন সে ধীরে ধীরে মনের আড়ালে চলে যায়। সঙ্গ দানকারী বন্ধু চোখের আড়াল হলেও মানসিকভাবে সে সঙ্গ দিয়ে থাকে।


সঙ্গ পেলে  শক্তি সঞ্চয় হয়। সাহস বাড়ে। কর্মে উদ্যম তৈরি হয়। মানসিকভাবে সঙ্গে থাকাটা খুব জরুরী। যারা কাছ থেকে সাহায্য করতে পারেনা তারা মনের মধ্যে জোর তৈরি করে , মনের জোর বাড়ায়। নিঃসঙ্গ মানুষকে সঙ্গ দেওয়া যে কোন কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক। 


কাছে থাকা বলতে শারীরিকভাবে কাছে থাকা। সঙ্গ দেওয়া শারীরিক মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই বোঝায়।


অনেক সময় "আমরা কাছাকাছি থাকি" বলতে শোনা যায়। অর্থাৎ ব্যবধান দূরের নয়। এখানে বন্ধুত্বের কোন প্রশ্ন ওঠেনা। প্রতিবেশী অথবা কোন ফ্যাটের বাসিন্দা বলতেই পারে। আমরা তো কাছাকাছি থাকি পাশাপাশি থাকি। এই কাছাকাছি পাশাপাশি থাকার ক্ষেত্রে কোন দায়বদ্ধতা থাকে না। আমরা একসঙ্গে থাকি একসঙ্গে বাস করি তখন এত অন্তরঙ্গতা একটা বন্ধুত্বের ভাব আমরা লক্ষ্য করি। যা পারস্পরিক পথ চলতে সহযোগিতা করতে পারে একে অপরকে। প্রকৃতপক্ষে উপকারও হয় অনেক। কাছাকাছি থাকি আর একসঙ্গে থাকি দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ। কাছে থাকলে বিপদে-আপদে দায়িত্ববোধ এসে যায়। তখন দায়িত্ব পালন করতেই হয় কোন উপায় থাকে না তাই। দূরে থাকলে মানসিকভাবে আমার যতই সঙ্গ দিই না কেন বিপন্ন বন্ধুকে সরাসরি সহযোগিতা করা ,পাশে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ থাকে না। কাছে থাকা আর সুখে থাকা একেবারে সমার্থক না হলেও দায়িত্ববোধন কর্তব্যবোধ কোন ক্ষেত্রে কম নয়। আমার মতে সঙ্গ দেয়ার মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক বোঝায়। ব্যাপক বন্ধন বোঝায়। কাছে থাকলে বা ধারে পাশে থাকলে একটা সামাজিক দায়িত্ববোধ লক্ষ্য করা যায়। কোন বন্ধুর সঙ্গে থাকা সঙ্গ দেওয়া দায়িত্ববোধের চাইতেও একটু বেশি। অবশেষে বলি আমার মতে কাছে থাকা সঙ্গ দেয়ার মধ্যে কোনটাকেই কম গুরুত্বপূর্ণ বলা যাবে না। নিজ নিজ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনই যথেষ্ট।

__________________


১৭ ।। চিন্তা পোকা


কিলবিল করছে সবসময় মাথার মধ্যে একটি চিন্তা পোকা। জীবনটা লম্বা না ছোট। এই এক প্রশ্ন কোথা থেকে মাথায় ঢুকেছে  এখন। ব্যাস শুরু হয়ে গেল এখন চিন্তা পোকার কাজ। ভাবলাম মাথা থেকে ফেলে দিই এই চিন্তা। কিন্তু একবার কোন প্রশ্ন মাথায় ঢুকলে তার যা আলোড়ন সৃষ্টি হয় সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া আমার পক্ষে খুবই কঠিন। প্রশ্ন এলে তার সমাধান চাই। ছোটবেলায় সরল অংক কষতে পারতাম উত্তর মিলে যেত। সমাধান হয়ে গেলে খুব আনন্দ পেতাম। কোন জটিল অংক মাথায় ঢুকতো না। অংকে আমি ডাহা ফেল। জীবনে শুধু বিয়োগ শিখেছি। যোগ শিখতে পারিনি। তাই আমার কাছে শূন্য খুব প্রিয়। শুন্য আমার জীবনে অপরিহার্য। 


যাক সে কথা শূন্য নিয়ে আমি ভালো আছি। শূন্য হাত খুব ভালো। শূন্য থেকে শুরু করা আরো ভালো। আমার এই অভ্যেসটি কিছুতেই গেল না। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাই। তাই আমার বহু আলোচনা আমারই মনঃপুত হয় না। এখন প্রশ্ন হল জীবনটা লম্বা না ছোট! 


আমি একজন অশীতিপর বৃদ্ধ। বিরাট লম্বা জীবন। কারণ সেকেন্ড মিনিট ঘন্টা দিন মাস বছর। এই সময়টা সত্যি কি কাজে লাগাতে পেরেছি। তারপর ৮০ বছর কেটে গেল। অনেক বড় লম্বা সময় এবং জীবন। পৃথিবীর গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি চলতে শিখতাম তাহলে কত কিছু করতে পারতাম। নিষ্ঠার সঙ্গে অনুশীলন করতে করতে কত প্রশ্ন মনে জাগত কত সমাধান করতে পারতাম ।কত কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম। অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তো অগ্রগতি। কমরেড লেনিন পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করে দেখিয়েছিলেন মাত্র ৪৬/ ৪৭ বছর বয়সে। এর মধ্যে জীবনের উপর দিয়ে ঝড়ঝঞ্ঝা গেছে কত। আমার বয়স ৮০ পেরিয়ে গেল। কি করেছি জীবনে। কিছু গণআন্দোলন আর মানুষকে সচেতন করার কাজে আত্মনিয়োগ। সফল হয়েছি কতটা তার মূল্যায়ন করার সাহস নেই। যদিও সময় দিয়েছি যথেষ্ট। জীবনের দাম দেয়ার চেষ্টা করেছি।নিষ্ঠা আন্তরিকতা অবশ্যই ছিল। প্রতিদিন কাজ করেছি। সফলতা নিয়ে সন্দেহ আছে নিজের মধ্যে। কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে হয়তো। কিছু সামাজিক কাজকর্ম সব মানুষকেই করতে হয় আমিও করেছি। বাকি থাকে সাহিত্য সংস্কৃতি। সাহিত্যের সব সাক্ষাতেই কমবেশি বিচরণ করেছি। আজও লেখালেখি থেমে থাকেনি। তবুও একদিনও মনে হয়নি কিছু করতে পেরেছি সাহিত্য সংস্কৃতিতে।, যদিও সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠান সাধ্যমত যা করেছি তা একেবারে উল্লেখযোগ্য নয় এ কথা বলা যাবে না। তবুও মনের মধ্যে অসন্তুষ্টি। 


তাহলে এত বড় জীবনে করলামটা কি? প্রতিদিনের রুটিন কাজকর্মের তালিকা হিসেবে করলে জীবনটা কিন্তু খুব লম্বা। আবার এক সময় মনে হয় আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে অনেক কাজ করতে পারতাম। তখন মনে হয় এত তাড়াতাড়ি জীবনটা ফুরিয়ে গেল। ঠিক যেমন পরীক্ষা দেওয়ার পরে মনে হতো আর কিছুটা।সময় পেলে আরও ভালো লিখতে পারতাম ।জীবনটা সত্যি কি খুব ছোট! এইতো সেদিন!পিছনের দিকে তাকালে মনে হয় ফনি মনসার ডালে ফড়িংএর বসে বসে রোদ খাওয়ার ছবি ভেসে উঠে। পড়ন্ত বিকেলে ধানি মাঠে ধান কেশরের গন্ধ শুঁকেছি।  ঐ তো।স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দড়ি দেওয়া হাফপ্যান্ট পরে স্কুলে যাচ্ছি কাদা ঘেঁটে। পাঠশালায় গুরু মশাইয়ের বকুনি পিটুনি খেয়েছি। হাই স্কুলের গণ্ডিতে জীবন হাঁপিয়ে উঠছিল। কবে বড় হব কলেজ জীবন ।মুক্ত জীবন পাব। স্কুলের গণ্ডি পেরোবার  পরে সব ছেলেরাই একটা স্বাধীন মনোভাব পোষণ করে। স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা স্বাধীনভাবে রাজনীতি করা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হইচই করা ।এমনটা সকলের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। যৌবনকে যে যেভাবে পারে কাজে লাগিয়েছে তার চিন্তা চেতনার মধ্যে। কেউ সামাজিক কাজে কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য যে যেমন পেরেছে জীবনকে উৎসর্গ করেছে। একটু পিছনের দিকে তাকালেই চোখে ভেসে উঠে সবকিছু। তাই জীবনটাকে আমরা কিছুতেই ছোট বলতে পারি না। প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের কাছে মূল্যবান।


যতই কাজের মধ্যে জীবন কাটাই না কেন তবু কোন কোন দিন মনে হয়েছে, আজকে তো কোন কাজ ছিল না। দিনটা নষ্ট হয়ে গেল! আসলে কাজ থাকে না তা নয়। কাজের লোকের কাছে কাজ এমনিতেই চলে আসে। নিদেন পক্ষে অন্তত দিনে এবং রাতের কোন একটা সময় একটি কবিতা বা কিছু লেখা যদি না করে থাকি তাহলেও মনে হতো দিনটা অপচয়। নিজেকে নিয়েই ভাবতে হবে জীবনটা লম্বা না ছোট। যে জীবন যেমন কেটেছে তার কাছে জীবন তার সঞ্জয় অগ্রগতির হিসেব সেভাবেই হবে। 


কেউ যদি পরচর্চায় পরনিন্দ্যায় কিংবা  জুয়ার।আসরে, মদের ঠেকে দিন কাটায় তাহলে তার কাছে জীবনের মানে একরকম। আর যিনি প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের জন্য সমাজের জন্য সময় দিতে পারেন তার কাছে জীবনটা আর একরকম। তাই জীবনটা ছোট না লম্বা ব্যক্তি বিশেষের উপর নির্ভর করে। আমার কিন্তু মনে দ্বন্দ্ব আছে । একবার মনে হয় জীবনটা খুব লম্বা। কাজে লাগাতে পারিনি তাই মনে হচ্ছে জীবনটা ছোট। আপাতত মাথার মধ্যে যে চিন্তা পোকাটি কিলবিল করছিল তাকে থামাতে পারলাম। জীবন একটা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। লম্বা জীবনেও কিছু হয় না আর খুব কম পরিসরেও অনেক কিছু ঘটাতে পারে এমন নিদর্শন সারা পৃথিবীর ইতিহাসে আছে। আসলে আমার মনে এই চিন্তা পোকাটি ঢুকেছিল আমার জীবনে আমার কিছু সাফল্য আছে কিনা। এই ভাবনা থেকেই এই নিবন্ধটির উৎপত্তি।

______________________________________

 ১৮ ।। সাফল্যের উপায়



নিজের কাজের উপর আস্থা বিশ্বাস ভরসা থাকা উচিত। কাজের শুরুতেই জেনে রাখা উচিত এবং মনে রাখা উচিত কাজটা আমি ঠিক করছি কিনা? কাজটির ভালোর দিক মন্দের দিক সব সময় মনে  থাকবে। সেই কাজের প্রভাব সুদূরপ্রসারী কিনা। সেই কাজের খারাপ প্রভাব অন্যের উপর পড়বে কিনা। তাহলে সেই কাজটা না করাই ভালো। আপনার কাজের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের চেতনা যদি নিম্ন মানের হয় তাহলে আপনি প্রতি পদে পদে বাধা পাবেন। এলাকার মানুষের চেতনার দিকটিও নজর রাখা উচিত অথবা যদি সংশোধন করে নিলে কুপ্রভাব না পড়ে অন্যের উপর সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।  আমরা সামাজিক মানুষ।    তাই সামাজিক মানুষের । সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজেও আজকাল মামলা হয়ে থাকে।আমার কাজের প্রতি নজরদারি থাকে। মানুষের নৈতিক সমর্থন আছে কিনা সেটাও আমাদের বিবেচনার মধ্যে থাকবে। কাজের শুরু থেকেই চোখ কান খোলার ঘি চলতে হবে।কাজটাই যেন পাখির চোখ হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে করতে শুধুই অন্যমনস্ক হওয়া যাবেনা। যেকোনো বিভ্রান্তিকর অথবা প্রতি ভুল অবস্থার মধ্যেও কাজ থেকে নজর কিছুতেই সরিয়ে নেয়া চলবে না। কাজটি সঠিকভাবে হচ্ছে দেখে কিছু বিরুদ্ধে প্রকৃতির মানুষ, হিংসুটে মানুষ বিব্রত করতে পারে। কারণ তারা চায় না আপনার সাফল্য। ডি -রেল হয়ে গেলে যেমন ভয়ঙ্কর এক্সিডেন্ট হয় ঠিক তেমনি সামান্য একটু ভুলের জন্য আপনার সমস্ত শ্রম ব্যর্থ হয়ে যাবে। তখন মানসিক বিপর্যয় দেখা দিবে। মানুষও আপনাকে ভবিষ্যতে কখনো বিশ্বাস করবে না। মানুষের কাছে আপনি অযোগ্য প্রমাণিত হবেন। তখন বিশ্বাসযোগ্য তৈরী করতে আপনার জীবন কেটে যাবে।স্টিয়ারিং আপনার হাতে। সব দায়িত্ব আপনার। আপনার পাশে দাঁড়াবে কিংবা সহযোগিতা করবে আশা করবেন না।কাউকে পাবেন না পাশে এটা ধরে নিতেই হবে। আপনার সৃষ্টির কাজ থেমে থাকবে না একেবারে লং ড্রাইভ দিতে হবে আপনাকে। ধনা বৈষম্যের যুগে আপনি আর্থিক সহযোগিতা পাবেন না ধরে নিতেই হবে। তাই সব সময় চেষ্টা করা দরকার যাতে ঘাটতি না হয়। সবদিক মানিয়ে নিয়ে চলতে গেলে এই চরম অর্থ সংকটের দিনে আপনি যে ব্যালেন্স করে চলতে পারবেন তা সম্ভব নয় নাও হতে পারে। পথে নামলে ভীষণ গুরুত্ব দিয়ে এই বিষয়টি মনে রাখা, মাথায় রাখা, সতর্ক থাকা জরুরী। 


লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন আপনার ক্ষেত্রে তা কিছুতেই হবে না। কারণ আপনার কাজ যদি সৃষ্টিমূলক হয়, সমাজ সেবামূলক হয়,সর্বজনীন হয় তাহলে কিছু মানুষ ভয়ংকর ভাবে বিরোধিতা করবে । কারণ আপনার সুনাম ও যোগ্যতা সমাজে প্রমাণিত হয়ে গেলে অনেকের অসহ্য হতে পারে।এমন হতে পারে পাশে দাঁড়ানোর উৎসাহ দেওয়ার লোক আপনি নাও পেতে পারেন। সবসময় এই আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে আপনি একাই একশ, আপনার ধারে পাশেই এই সমাজে কিছু এবং বেশ কিছু মানুষ সব সময় নেগেটিভ দিক থেকে আপনাকে বিচার করার চেষ্টা করবে। এবং আপনাকে তুচ্ছতাচ্ছিল করবে তারা। আড়ালে আবডালে বিরুপ প্রচার করবে। নিজেদের অপদার্থতা ঢাকার জন্য অযোগ্যতা আড়াল করার জন্য আপনার বিরুদ্ধে তারা সক্রিয় থাকবেই। শেষ হাসিটা আপনাকেই হাসতে হবে। তাই চলার পথে কোন কাজ করতে এসে কারুর কটুক্তি কারো অবহেলা কোন কুৎসা যেন আপনাকে স্পর্শ করতে না পারে সেদিকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। 


আপনি যদি চঞ্চল, অস্থির মস্তিষ্কের হয়ে থাকেন তাহলে আপনি কিছুতেই কোনো ভালো কাজ করতে পারবেন না।


আপনার কাজে নৈতিক সমর্থন পাবেন কিনা সেটিও আপনার শুরুতেই ভেবে নিতে হবে। কারণ নীতিগত ও আদর্শগত দিক আপনার চলার পথ এবং আপনার সৃষ্টিশীল কাজকে মানসিক শক্তি যোগাবে। দুর্বল চিত্তের  মানুষ পারবে না শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে। আপনি উদ্যোগী, নিজের উপর বিশ্বাসী ।তাই আপনিই পারবেন সাফল্য ছিনিয়ে আনতে। আছাড় খেয়ে পড়লেও আবার উঠে দাঁড়াবেন কারণ পথ চলাতেই আপনার আনন্দ। যে যত আছাড় খেয়ে পড়ে সে তত বেশি শিক্ষা নেয়। আছাড় খেয়ে পড়ে যাওয়াটা কিন্তু ব্যর্থতা নয়, সার্থকতার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া। মনে রাখতে হবে সিঁড়ির শেষ ধাপ হলো সাফল্য আর নিচ থেকে শুরু করা একটি প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়াকে সাফল্য মনে করা ভুল হবে। এই সব স্থুল মস্তিষ্কের মানুষের আত্মসন্তুষ্টি। আর কাজের মাঝে আত্মসন্তুষ্টি কোন সূক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের থাকে না। তাই প্রথম থেকেই আপনার সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পথ চলতে শুরু করা উচিত। উদ্দেশ্যহীন এলোমেলো চলার মানুষের দ্বারা কোন কাজ নিজের হোক, পরের হোক ,সমাজের হোক সম্ভব নয়। তাই আপনি পারেন আপনি পারবেন আপনার উদ্দেশ্য সফল করতে। কারণ আপনি একজন সূক্ষ্ম দৃষ্টি সম্পন্ন আত্মবিশ্বাসী ত্যাগী মানুষ। কুসংস্কার এবং কুশিক্ষাও  চলার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। অপনার দুটি চোখ। কিন্তু হাজারটা চোখ আপনাকে দেখছে আপনার ভুল ত্রুটি ধরার জন্য। আপনাকে উৎসাহ দেওয়ার চাইতে নিরুৎসাহ করার লোক জেগে থাকে। যুগ যুগ ধরে সৃষ্টিশীল মানুষকে বিব্রত হতে হয়েছে ,বিপন্ন হতে হয়েছে এমনকি মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তাই কাজ খুব কঠিন। মুখে অনেক কথা বলা যায় কিন্তু কাজটা করে দেখানোটাই সাফল্য। কাজের উপর আপনি যত শ্রম ঘাম মেধা সাহস যোগান দিবেন ততই আপনার সাফল্য দ্রুত এগিয়ে আসবে।

_______


১৯ ।। একজন প্রবীণ ব্যক্তি পুস্তকের সমান



একজন প্রবীণ ব্যক্তি পুস্তকের সমান ।এই অভিমত আমার ব্যক্তিগত। আমি সবসময় সদর্থক চিন্তা ভাবনার মানুষ। মানুষ মানুষকে দিতে পারে। সমাজকেও দিতে পারে। তবে সদিচ্ছার উপর নির্ভর করে সবকিছু। যদি মনে করেন সমাজের জন্য তিনি উৎসর্গীকৃত। তাহলে তিনি সময় ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন।


মানুষের মধ্যে জীববৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি এই দুইয়ের সমাহার রয়েছে। সব মানুষের মধ্যে জীববৃত্তি আছে। আমি এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি না। আমি যে ধরনের আলোচনার সূত্রপাত করেছি সেই ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তি মূল বিষয়বস্তু। একটি শিশু তার জৈবিক এবং শারীরিক বৃদ্ধি


বুঝতে পারে। সে দিনে দিনে বড় হচ্ছে। প্রতিটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি আছে। সামাজিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির উপর মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। বুদ্ধির বিকাশ বাইরের দিক থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু শারীরিক বিকাশ বোঝা যায়। মানুষের বুদ্ধাংক সমান নয়।


আই কিউ বা ইন্টেলিজেন্স কুইটেন্ট পরিমাপের পদ্ধতি আছে। মনোবিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে এই বিষয় একটি জরুরী সিলেবাস। মানুষের যত বয়স বাড়ে তার বুদ্ধি বৃত্তি এবং বুদ্ধাংক বাড়তে থাকে। এইসব ব্যবহারিক জীবনের বিকাশ। বয়স বাড়লে বুদ্ধি বাড়ে বা বুদ্ধাংক গভীর হয় 


একথা সবসময় খাটেনা। বুদ্ধাঙ্ক তীক্ষ হলেই তিনি মানবিক হবেন তিনি শিক্ষিত হবেন, জ্ঞানী হবেন এমন কোন কথা নেই। তাঁর জীবন যাপনের ব্যবহারিক দিক যদি খুব খাটো হয় বা ছোট হয়, তাঁর কাছ থেকে বড় কিছু আশা করা যাবে না এবং তিনি অন্য কোন মানুষকে পথ দেখাতে বা আলো দিতে পারবেন না। যদি তিনি আকাশের মত উদার হন তাহলে তিনি সামাজিক বহু ক্ষেত্রে বিজ্ঞ মানুষের পরিচয় দিতে পারবেন। তাঁর জীবন শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় হবে। তিনিও একটি বইয়ের মত সমাজের কাছে হয়ে উঠবেন।তোতা পাখির মতো পড়াশোনা করেও বুদ্ধি বাড়তে দেখা যায়নি বা বিচক্ষণতা  দেখা যায়নি। বয়সের তুলনায় অনেক কম হলেও , বুদ্ধাংক অনেকের চাইতে যথেষ্ট বেশি দেখা যায়।। তা সত্ত্বেও যদি ধরে নেওয়া যায় বয়স যত বাড়ে, মানুষ বয়সে যত প্রবীণ হয় তত জ্ঞান অভিজ্ঞতা বুদ্ধাংক বাড়ে। একজন প্রবীণ ব্যক্তির সারা জীবনের জ্ঞান অর্জন বিদ্যা বুদ্ধি সামাজিকতা ব্যবহারিক জ্ঞান সমাজ চেতনা সবকিছুই প্রণতা পায়।বহু বিষয়ে একজন প্রবীণ মানুষের পরিপূর্ণতা দেখা যায়। তখন তিনি একজন পুস্তক। অবশ্য একজন স্থূল বুদ্ধি সম্পন্ন প্রবীণের কাছ থেকে তেমন কিছু আশা করা যাবে না ,যা আপনাকে জ্ঞানী করে তুলতে পারে।একজন প্রবীণ ব্যক্তির সমস্ত গুণাবলী একটি ভরা পুকুরের মতো। পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি বই বিক্রি হয় কার্ল মার্কসের। তাঁর জীবনটাই একটি পুস্তক। রামমোহন বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র মাইকেল বিবেকানন্দ বঙ্কিমচন্দ্র জীবনানন্দ নজরুল সুকান্ত

এবং দেশে-বিদেশে সমস্ত মনীষীরা কিন্তু এক একজন এক একটি পুস্তক। তাঁদের জীবনের নির্যাস তাঁদেরই রচিত বই। শৈশব থেকে উদার মনের মানুষরা সমাজকে যেভাবে দেখেছেন তার প্রতিফলন পুস্তকের মধ্যে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং পুরো জীবনটা অভিজ্ঞতালব্ধ। তাই আমার মনে হয়েছে একজন প্রবীণ মানুষ একটি পুস্তকের সমান। একটি পুস্তক পড়ে আমরা জ্ঞানী হই। আমাদের অভিজ্ঞতা বাড়ে। বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করতে পারি। তখন আমরা সমাজকে নানান ভাবে আলোকিত করার চেষ্টা করতে পারি। পুস্তক আমাদের বন্ধু দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক। ঠিক তেমনি মনীষীরা এমনকি অভিজ্ঞ এবং বিচক্ষণ জ্ঞানী প্রবীণ ব্যক্তিরাও আমাদের বন্ধু দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক। অন্ধকারে নিমজ্জিত সমাজকে, অজ্ঞ মূর্খ কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন মনীষীরা আর তাঁদের চেতনাকে বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে পুস্তকের বিরাট অবদান। প্রবীণ মানুষ আমাদের অভিভাবক এবং পুস্তকও আমাদের অভিভাবক। একজন প্রবীণ মানুষ সাধারণ অজ্ঞ মানুষের অশিক্ষা কুশিক্ষার সুযোগ নিয়ে কুসংস্কারে  আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে; আবার পাশাপাশি সেই প্রবীণ মানুষ জ্ঞানের আলো জ্বেলে দিতে পারে। তাঁদের জন্ম অন্ধ জনের আলো দেওয়ার জন্য। তাঁরা সমাজের বুকে জনজাগরণের ঢেউ তুলতে পারে। বর্তমানে সমাজের মধ্যে যেভাবে ধর্মীয় গোঁড়ামি 


মৌলবাদ মাথা চাড়া দিচ্ছে আর একটা রেনেসাঁসের প্রয়োজন হয়েছে।  ইতিহাসের বিভিন্ন সময়কার জাগরণের পথপ্রদর্শক হিসেবে পুস্তক এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে পুনর্জাগরণের পথ দেখাতে পারে।প্রবীণরাইতো বলবেন নবীদেরকে"ওঠো জাগো"। সময় হয়েছে মনের দরজা খোলো। পুস্তক খুলে দেখো ইতিহাস তৈরী করতে হবে মানুষকেই । সমস্ত জাগরণের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে পুস্তকে। একজন সংস্কার মুক্ত সচেতন ধর্মনিরপেক্ষ প্রবীণ মানুষ পুস্তকের সমান। 


শুধু বয়সে প্রবীণ হলেই হবে না। সেই প্রবীণ মানুষ যদি সত্যিই একটি পুস্তক হয়ে উঠতে পারেন তাহলে আমরা একটা নতুন যুগের সৃষ্টির ছবি আঁকতে পারবো। প্রবীণ নবীন উভয়কেই শক্ত করে হাত ধরে এই পচা গলা সমাজের হাল ধরতে হবে। গাইতে হবে রানারের গান ।

_______________



২০ ।। তর্ক না আলোচনা


আগে ঠিক করে নিতে হবে তর্ক করব না আলোচনা করব। তর্ক করে সময় নষ্ট করব না আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে আসব। দুজন অভিজ্ঞ মানুষ কোন বিষয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু সম্পর্কে উভয়ের সম্যক জ্ঞান থাকা চাই।ভালো তার্কিক হলে তর্ক করা যায়। তর্কের নিয়ম রীতি মেনে তর্ক করলে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সহজ। সাধারণত এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াকে তর্কযুদ্ধ বলা যায় না। আলোচনা বলা যেতে পারে। আমরা অনেক সময় তর্কে অবতরণ করি। কারুর না কারুর যদি জ্ঞানের ঘাটতি থাকে এবং যদি তার নিয়ম রীতি সম্পর্কে জ্ঞান কম থাকে তাহলে সেই তর্ক কোনদিন থামবে না। দুজনে যদি বুদ্ধিমান মানুষ হন যদি প্রকৃতপক্ষে তাঁরা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার মানসিকতা নিয়ে বসেন তাহলে কোন একজন নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবেন এবার থামা উচিত। একটি কথা প্রচলন আছে"বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর"। প্রকৃত তার্কিক যারা কোথায় থামতে হবে সেটুকু জ্ঞান তাদের আছে। তর্কের মধ্য দিয়েও জ্ঞানের আদান প্রদান জ্ঞানের গভীরতা নির্ণয় হয়। আসলে সবকিছু নির্ভর করে তার্কিকদের মেনে নেওয়া এবং মানিয়ে নেওয়ার উপর। পাশাপাশি কোন এক পক্ষ যদি মূর্খ অবিবেচক হয় এবং একগুঁয়ে প্রকৃতির হয় তাহলে তার সঙ্গে তর্ক করা বা আলোচনা করা একেবারেই উচিত নয়। অনেকে তর্ক বা আলোচনার আগে থেকেই ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত করে নিয়ে বসেন। তাকে আপনি যতই সহজ সরল ভাষায় যুক্তি দেখান না কেন সে কিছুতেই মানবে না।


পরাজয় স্বীকার করতে তাঁর ইগোতে বাধে। সিদ্ধান্ত গ্রহণটা তাদের কাছে বড় নয় ,তাদের কাছে বড়  হলো নিজের ভুল চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং নিজের পক্ষে কথা বলা। হেরে গেলেও সঠিক যুক্তিপূর্ণ কথা বা সিদ্ধান্ত তিনি মানবেন না। অনেক সময় বিপত্তি ঘটে উভয়ের জ্ঞান মানসিকতা চিন্তাধারার যদি গরমিল হয়। আলোচনা বা তর্কে বসার আগে মনটাকে যুক্তিবাদী করে নিতে হয়। অনেক সময় গোঁড়া মতবাদের বা কোন প্রাচীন ভ্রান্ত ধারণার বিশ্বাসী মানুষ কিছুতেই তার মানসিক অবস্থান থেকে সরে আসতে চাইবে না। যেমন কুসংস্কার একবার ঢুকে গেলে তার মাথা থেকে বের করা কঠিন। সে কোন যুক্তি মানে না তর্ক মানে না কোন আলোচনা মানে না। মান্ধাত্তার আমলের ভ্রান্ত ধারণাকে আঁকড়ে বসে থাকবে সে। সাপের কামড়ের তীব্র বিষ শরীর থেকে বের করা যাবে কিন্তু এদের মন থেকে কুসংস্কার বের করা যাবে না। মন্দিরের চারপাশে দন্ডি মাপা মেয়েদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করে দেখেছি সে আপনার কথা মন দিয়ে শুনছে কিন্তু তার মনের ধারণাকে কিছুতেই  বিসর্জন দিতে পারছে না। তর্ক বা আলোচনা যাই করি না কেন অনেক সময় সামাজিক অবস্থানের উপর কিন্তু নির্ভর করে। সামাজিক কু -প্রথা ও মন্দ প্রভাব থেকে মনকে যদ মুক্ত করতে না পারা যায় তাহলে তাদের সঙ্গে তর্ক করে পারা যাবে না। এই সমস্ত মানুষরা এক জোট বেঁধে আপনাকে বিব্রত করে  আপনাকেই মূর্খ বানিয়ে দিবে।


তর্কবিদ্যা না পড়েও অনেকে ভালো তর্ক করতে পারে। সেক্ষেত্রে কিন্তু পদে পদে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যারা তর্কবিদ্যা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান অর্জন করার পরে তর্কে অবতরণ করেন তাদের ভুলের সম্ভাবনা কম থাকে। একজন ভালো তার্কিক এবং আলোচক তার জ্ঞানের কারণেই নম্র বিনয়ী হয়। তাদের সঙ্গে যে কোন বিষয়ে তর্ক করা বা আলোচনা করা যুক্তিসঙ্গত। আপনারও জ্ঞান বাড়ে তাঁরও আপনার কাছ থেকে কিছু নেওয়ার থাকে। সর্বোপরি যুক্তি-তর্ক আলোচনা আমাদেরকেই সমৃদ্ধ করে। আমি দেখেছি অজ্ঞ মূর্খ গোঁয়ার লোকদের সঙ্গে এমনি সামাজিক সম্পর্ক রাখা ভালো কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনরূপ ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে কথা বলা ভালো নয়। কখন প্রয়োজন ছড়া সে আপনার সঙ্গে কথা বলবে না। সে আপনার কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে। কারণ আপনি তার মনের মত কথা বলতে পারছেন না।বরং সামাজিক সম্পর্ক নিবিড় করার মধ্য দিয়ে যদি তাকে কাছে টানতে পারেন, আমার মতে হয়তো সফল হতে পারবেন কোন একদিন।


_______________________________________


২১ ।। বিপর্যয়


বিপর্যয় সবার জীবনে আসে না। হিসেবী মানুষদের বিপর্যয় আসে না। কারণ তারা পা টিপে টিপে চলে। নিজের জন্য ভাবনা চিন্তা করে। নিজের পকেটটা সামলে রাখে। কোন ভিখিরিকে দিতে গেলে পকেটে হাত দিয়ে দেখে সবচেয়ে ছোট কয়েনটা কোনটা। তাকে কোনদিন সমস্যায় পড়তে হবে না। কিন্তু যে মানুষটি পকেটে হাত দিয়ে যতগুলো কয়েন পায় মুঠো ভর্তি করে ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে তুলে দেয  বিপদে পড়লে তাকেই পড়তে হয়। কারণ তার উদারতা তাকে হিসেবী হতে শেখায় না। একজন উদার মনের মানুষ পরোপকারী হওয়াটাই তার জীবনের লক্ষ্য। তিনি অবাস্তব না হলেও অন্যের প্রয়োজনের দিকে তাকানোই তার স্বভাব ধর্ম। এটাই তার স্বাভাবিক এবং সাবলীল জীবন যাপন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি মধ্যবিত্ত মানুষদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি।


মধ্যবিত্ত মানুষরা সামাজিক সমাজসেবী পরোপকারী। বড়লোকের স্বভাব চরিত্র আত্মকেন্দ্রিক। তারা মুঠো করতে জানে ভালো। মুঠো আলগা করতে পারেনা হৃদয়ের প্রসারতা নেই বলে। তারা সমাজ থেকে সবকিছুই নেয়। দিতে পারেনা । তাদের কার্পণ্য এবং আত্মকেন্দ্রিকতা তাদের মনকে প্রসারিত করতে দেয় না। তাই তারা বড় কিছু করতে পারেনা সমাজের বুকে।আবার প্রান্তিক মানুষের মধ্যে উদারতা সাধারণত দেখা যায় না কারণ তাদের অভাবজনিত কারণ। তাদের অর্থনৈতিক সংকটের ভয়। পরোপকারের জন্য সময় নষ্ট করলে খাদ্যের অভাব ঘটে তাদের। তাই নিম্নবিত্ত নৈতিক সমর্থন করলেও হাত টান তাদেরকে এগোতে দেয় না।


যুগ যুগ ধরে সমাজ সেবামূলক কাজ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলা যাত্রা দল অ্যামেচার পার্টি করে মানুষের সাংস্কৃতির চেতনা বিকশিত করার চেষ্টা করে আসছে মধ্যবিত্তরাই। সংগ্রাম আন্দোলনে মধ্য পরিবারের যুবকরা ঝাঁপিয়ে পড়ে অনেক বেশি। আমি ছোটবেলায় দেখেছি সঙ্গতি সম্পন্ন ধেনো -জমিদার বাড়ির যুবকরা উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য গ্রাম ছেড়ে চলে যেত বাইরে। আবার গরীব বাড়ির ছেলেরা পেটের ভাতের জন্য শ্রম করতো সময় অপচয় করতে পারত না। অর্থাৎ সমাজ সেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সময় ছিল না তাদের। তাই  মধ্যবিত্ত পরিবারের যুবকরা সমাজ সেবামূলক কাজ করতো। বাড়িতে মা-বাবা বলতেন ঘরের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানো ছেলে। উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের পরিবার গুলিতে উদারতা ত্যাগ মধ্যবিত্তদের মধ্যেই পরিলক্ষিত হতো। এভাবে বিভিন্ন আন্দোলনে, কৃষক আন্দোলনে প্রান্তিক মানুষদের গণআন্দোলনে মধ্যবিত্ত যুবকদেরকে এগিয়ে আসতে দেখেছি আমি স্বচক্ষে। চারিত্রিক গঠনটা এভাবেই তৈরি হতো। ফলে তারা যে কোন দায় ঝুঁকি নিতে পারত। উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তের মানুষরা তাদের বাড়ির যুবকরা সামাজিক কোনো কাজে এগিয়ে আসতো না। শ্রেণীগত অবস্থান তাদের সবচাইতে বড় বাধা। আর এই বাধা কাটিযে উঠতে পারতো মধ্যবিত্তরা। তাই নিজের পকেট সামাল দেয়ার অভ্যাসটা তৈরি হয়েছিল উচ্চবিত্তদের মধ্যে এবং নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্যে। সামাজিক যেকোনো বড় কাজে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল উদার প্রকৃতির মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের মধ্যে। অন্ধ কুসংস্কার বিমুখ যুবকরা গনশিক্ষা প্রচারের দিকে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখত। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোতে বিশেষ করে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো যে বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে চলছে তাতে মধ্যবিত্ত মানুষদের সংখ্যা দিনে দিনে কমছে। মধ্যবিত্তরা ক্রমশ অর্থনৈতিক দিক থেকে তলিয়ে যাচ্ছে। নিম্নবিত্তদের সংখ্যা বাড়ছে। আশঙ্কার কথা নিম্নবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষদের মধ্যে সমাজসেবামূলক উন্নতমানের চিন্তাভাবনার মানসিক খোরাক তাদের মধ্যে জন্মায় না। তাই বড় কোন উন্নয়নমূলক সাংগঠনিক কাজে সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার যুবকের সংখ্যা কমছে আমার বিশ্বাস। পারিবারিক ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর্মসংস্থান আর্থিক সংস্থান না থাকলে সমাজসেবামূলক কাজে উদারতা তৈরি হয় না। মধ্যবিত্তদের মধ্যে আত্মমর্যাদা প্রকট। তারা হাত পেতে গরিব মানুষের মতো সরকারি অনুদান সাহায্য নিতে কুণ্ঠা বোধ করে। মূলত অর্থনীতির কারণেই তাদের মধ্যে বিপর্যয় দেখা দেয়। কারণ তারা হিসেবী নয়। আবার তারা ১০০ দিনের কাজ করে কোন রকমে ঘাটতি পূরণ করতে এগিয়ে আসতো নাআমি নিজের চোখে দেখেছি এবং নিজেও অংশগ্রহণ করেছি প্রবল বন্যার সময় ভাঙ্গন প্রতিরোধে সাধারণ মানুষ এগিয়ে এলেও তাদের একটু টিফিনের ব্যবস্থা মধ্যবিত্ত যুবকরা পকেট থেকে দিয়েছে। সবাই পালিয়ে গেলেও কাজের শেষ পর্যন্ত তারাই বসে থাকতো। তাই মধ্যবিত্তদের প্রতি আমার চিরকালীন শ্রদ্ধাবোধ। আবার এই মধ্যবিত্তরাই  হারিয়ে যাচ্ছে ,বিপর্যস্ত হচ্ছে।


যখন সামাজিক বিপর্যয় ,অর্থনৈতিক বিপর্যয় রাষ্ট্রীয়ভাবে শুরু হয় তখন নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্তরা রেহাই পায় না। এই বিপর্যয় ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং বাড়তে থাকবে। বিপর্যয় মোকাবেলা করার হাজার চেষ্টা করেও লাভ হয় না। মধ্যবিত্ত পরিবার গুলিতে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা নেই।সুতরাং এই শ্রেণীবিভক্ত সমাজে বিপর্যয় আসবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিপর্যয়ে দাঁতে দাঁত চেপে মাটির কামড়ে পড়ে থাকতে হয়। বিপর্যয়টা শেষ কথা নয়। একটা সময় আসে যখন আপনি বিপর্যয়কে কাটিয়ে উঠতে পারবেন। কিছুতেই নিজেকে হারিয়ে ফেলা যাবে না।মাথা ঠান্ডা রেখে বিপর্যয় মোকাবেলা করা একজন পরিশ্রমী মেধাবী মানুষের কাজ।


যতই অন্ধকার কালো রাত হোক না কেন সূর্য উঠবেই। এই শ্রেণীবিভক্ত সমাজে বিপর্যয় মোকাবেলা করতে হবেই বিপর্যস্ত মানুষকে তারই শ্রেণী স্বার্থে। উচ্চ বর্গের মানুষ তার শ্রেণীর কথা ভাববে আর নিম্ন বর্গের মানুষ তার শ্রেণীর কথা ভাববে না তা কি করে হয়। আপনার পথের কাঁটা গাছ আপনাকেই সরাতে হবে। আর  কাঁটা গাছ সরাতে গেলে আপনাকেই অস্ত্র ধরতে হবে।


_____________________________

 ২২ ।। বাংলাদেশের জন্য মন ভালো নেই 



অনেক মন খারাপের মধ্যে একটি মন খারাপ কিছুতেই ভালো হচ্ছে না। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের আবেগের দেশ বাংলাদেশ। সবসময় মনে হতো নিজের বাড়ি নিজের ঘর নিজের দেশ আমার বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাটির সাথে মানুষের সাথে এমন নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল মন খারাপ হলেই চলে যেতাম ওপারে। যখন মানসিক বিপর্যয়, মানসিক অশান্তি অনুভব করতাম তখন মনে হতো এপারে অক্সিজেনের অভাব। চলে যাই ওপারে অক্সিজেন নিতে। গ্রাম শহর রিক্সাওয়াল রেস্টুরেন্ট চায়ের দোকান বইয়ের দোকান যেকোনো বাড়ি সব যেন নিজের। ইচ্ছামত বিচরণ করি যখন মন যেমন চায়। আমার এই বাংলাদেশ। ও আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।একাত্তরেরি মুক্তিযুদ্ধ এপারে বাঙ্গালীদের আবেগ তৈরি করেছিল যে কারণে লিখেছিলাম আমার দুটি তীর্থক্ষেত্র একটি আন্দামানের সেলুলার জেল ও বাংলাদেশ এবং চট্টগ্রাম। আমার অন্য কোন তীর্থক্ষেত্র নেই। ভাষার জন্য হাজার হাজার শহীদের রক্ত পিচ্ছিল পথ বেয়ে বাংলা ভাষার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র যারা তৈরি করেছে তাদেরকে স্যালুট করা সেই মাটিকে স্যালুট করা একজন ভাষা প্রেমিকের অবশ্য কর্তব্য। কিছুতেই ভুলতে পারিনা যেদিন প্রথম দেখা হল ভাষা মতীনের সঙ্গে সেদিন নিজেকে একজন অন্য মানুষ মনে হয়েছিল। তিনিও আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন বলেছিলেন কমরেড লাল সেলাম। আমি তোমাকে চিনেছি সংবাদমাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষার রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ। এমন লড়াই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বাংলাদেশ ছাড়া আর তেমন দৃষ্টান্ত আমার জানা নেই। যখন খুশি তখন চলে গেছি সেখানে। কোন কোন বছর পাঁচবার গিয়েছি, একবার গিয়েছি তিনবার গেছি। সাহিত্য সংগঠন গুলি প্রায় আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে ।আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ভাবতে পারিনি আমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এস সি তে আমার জন্মদিন উৎসব বন্ধুরা করতে পারে কোনদিন। বড় বড় ব্যানার টাঙানো হয়েছিল। এ যে বড় ঋণ। কানাডায় একুশের পদক প্রাপ্তিতে ঢাকার পাঠক সমাবেশে প্রয়াত কবি অসীম সাহা এবং আসলাম সানীর আহবানে সম্বর্ধনা যখন দেয়া হলো তখন নিজেকে গর্বিত মনে হয়েছে।  মঞ্চে লিখেছিলেন বাংলা ভাষার কবি অমৃত মাইতি। কেউবা বলেছেন মিছিলে হাঁটা কবি। শুধু ঋণ ঋণ আর ঋণ। আমার আটটা বই বাংলাদেশের বন্ধুরা প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রাম গিয়েছি মাত্র চারবার। ময়মনসিংহ চারবার ।টাঙ্গাইল আটবার। সোনারগাঁও গেয়েছি তিনবার। আরো কত জায়গায় গিয়েছি তার কোন হিসেব নেই। সংখ্যালঘুদের আজকের যে অবস্থা ভাবতে অবাক লাগে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে আজ। কোন ধর্মের প্রতি আমার বিদ্বেষ নেই ।আমি কবিতা লিখেছিলাম "ভালবাসি পদ্মার পানি" আমি হিন্দু নই মুসলিম নই। আমি একজন খাঁটি বাঙালি। এতটাই আবেগ ছিল আমার বাংলাদেশ সম্পর্কে। 


আজ সেখানে ভাবতে অবাক লাগে ,কষ্ট লাগে ,বুকে মোচড় দেয় কান্না ।বঙ্গবন্ধুর ছবি এবং স্মৃতি যারা নষ্ট করছে তারা শুধু মৌলবাদী নয় তারা দাঙ্গাবাজ এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী। তোরা নৈরাজ্যবাদী।আওয়ামী লীগপন্থী হিন্দু হোক মুসলিম হোক সকলের বিরুদ্ধে তারা বিদ্বেষ পোষণ করছে। নির্যাতন-নিপীড়ন খুনখারাবি করছে। কিছু বাংলাদেশ বিরোধী শক্তি এই কাজে মদদ দিচ্ছে। আমাদের আবেগ ও সুসম্পর্ককে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাংলা ভাষা যে সারা বিশ্বে পঞ্চম ভাষা এই অহংকারকে আঘাত করছে।   আমি বিশ্বাস করি একদিন বাংলাদেশ আবার ঐক্যবদ্ধ হবে । মৌলবাদ পরাস্ত হবে।হিন্দু মুসলিমের এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে বাংলাদেশ। এ দেশ ওদেশ সর্বত্রই মৌলবাদীরা মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে পুঁজিবাদের হাত শক্তিশালী করার জন্য।


সারা বিশ্বে পুঁজিবাদ তার স্বার্থে মৌলবাদীদের ব্যবহার করে। এই মৌলবাদ যেকোনো ধর্মের হতে পারে। সমাজে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি করার ক্ষেত্রে মৌলবাদকে দায়ী করা উচিত। কোন ধর্ম অন্য ধর্মের প্রতি অসহিষ্ণু নয়। অন্তত অসহিষ্ণু হওয়া উচিত নয়। ধর্ম নিয়ে খেলাটা কোন দেশের পক্ষে কোন জাতির পক্ষে রাজনীতির পক্ষেও মঙ্গলজনক নয়। সাধারণ মানুষ চায়না সম্প্রদায়ের সম্প্রদায়ের বিভেদ বিভাজন। শ্রেণী গত কারণে পুঁজিবাদের অদৃশ্য অঙ্গুলে হেলনে মৌলবাদীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সক্রিয়তা বর্তমানে বাংলাদেশে দেখা দিয়েছে। একজন বাঙালি হিসেবে বাংলা ভাষা প্রেমী হিসেবে আমার বাংলাদেশেরই অস্থিরতার জন্য কষ্ট হচ্ছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত হাসিনা নেতৃত্বে দেশটা অনেক ভাল ছিল। ভালো থাকতে দেওয়া হবে না বলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে কিছু বিদেশী শক্তির ইঙ্গিতে। আমি বাংলা ভাষার রাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিজের মাটির মতো করেই আজও ভালবাসি। সেখানে যেতে পারছি না এ যে কি ভীষণ যন্ত্রণা কাউকে বলতে পারব না। এই যন্ত্রণা আত্মীয়ের বাড়িতে না যেতে পারা ,বন্ধুর বাড়িতে না যেতে পারার বেদনা। যাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক আছে তারাই বুঝবেন এই মানসিক কষ্ট। আমি আজও এই নিমের সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছি।


 ওপারে এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর থেকে যতদিন থেকেছি বন্ধুরা তাদের নিজেদের গাড়ি বাড়ি সবকিছুই আমার জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছে। যেন নিজের বাড়িতেই আছি, নিজের দেশে আছি এমনটাই মনে হতো আমার। থাকা খাওয়ার কোন খরচ লাগত না। ভ্রমণের জন্য কোন খরচ লাগতো না আমার। আমার সঙ্গে এবারের অক্ষর কর্মীরা গিয়েছেন ।আতিথেয়তা পেয়েছেন অন্তরঙ্গতা পেয়েছেন। আমি একটি বিষয় জোর দিয়ে বলতে পারি আতিথিয়তা অন্তরঙ্গতা শিখতে হবে বাংলাদেশীদের কাছে। কোনরকম দায়সারা কর্তব্য পালন ওপরের বন্ধুরা করে নি। একেবারে ষোল আনা বাঙালিয়ানা ।একেবারে ষোল আনার উপর ১৮।আনা অন্তরঙ্গতা। খুব কষ্ট হচ্ছে যেতে পারছি না । বারবার মনে হয় ওপারের বন্ধুরা যেন ভালো নেই। বন্ধুদের কাছে খবর পাচ্ছি কে কেমন আছে । মনে কষ্ট হচ্ছে  ঠিকই পাশাপাশি এই ভেবে আশ্বস্ত হচ্ছি বাংলা ভাষার টানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ত্যাগ ,শেখ হাসিনার ত্যাগ ;দেশের প্রতি আন্তরিকতা আত্মত্যাগের কথা উচ্চারিত হচ্ছে বহু মানুষের মধ্যে। আজ বড় কষ্ট হচ্ছে যেতে পারবো না একবার শেষবারের মতো !এই ৮১ বছর বয়সে একবার কি পারবো না মাটি ছুঁয়ে আসতে। ৭১ সাল থেকে অপেক্ষা করতে করতে ২০০৩ সালে প্রথম বাংলাদেশের মাটিতে পা দিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়েছিলাম ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। লিখেছি " বাউল গন্ধ বাতাস/ আর সোঁদা গন্ধ মাটি/ধূসর হৃদয়ে মনে হয়/ আমি যেন খাঁটি বাংলাদেশী।" পদ্মা নদীর বক্ষে ছোট নৌকাতে ভ্রমণ করেছি। সে স্মৃতি কোনদিন ভোলা যাবে না।


২০০৩ সালে ঢাকার কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডে আমাদের জন্য দাঁড়িয়েছিল সালেম সুলেরী ,আল ফারুক প্রমুখ । চট্টগ্রামের এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকা কবি ও প্রাবন্ধিক কমলেশ দাশগুপ্ত। আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে চলে যাই সীতাকুণ্ড। উঠে যাই চন্দ্রনাথ পাহাড়ে। কখনো কক্সবাজারে সৈকতে শুয়ে থাকি।  ঢাকা সদরঘাট থেকে সারারাত লঞ্চে কলম নিয়ে লিখতে লিখতে চলে গেছি বরিশাল। টাঙ্গাইল গেছি ৮ বার। সাধারণ মানুষ কবি সাহিত্যিকরা বলেছেন আপনি তো আমাদের টাঙ্গাইলের মানুষ। ময়মনসিংহ স্মৃতি প্রতিমুহূর্তে মনে পড়ে। কিছুতেই এসব থেকে মন সরাতে পারছি না। আত্মীয় বিচ্ছেদ কি পরিমান পীড়া দিতে পারে একমাত্র ভুক্তভোগীই জানে।বাংলাদেশ সাম্প্রতিক কালে তার ভয়াবহ রূপ আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আমি বলে বোঝাতে পারবো না। ভাষাকে কেন্দ্র করে লড়াই করা মানুষ, ভাষাকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষার রাষ্ট্র যারা তৈরি করেছে সেই সমস্ত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ জেগে উঠুক সঠিক দিশা দেখাক ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে একটা সুন্দর রাষ্ট্র পুনরায় গঠিত হোক। দায়িত্ব নিক শেখ হাসিনা। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হোক বাংলাদেশ।


আবার যাবো বাংলাদেশের দিনাজপুরে। যেমন করে একুশের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিলাম হিলির বর্ডার পেরিয়ে যে সাংবাদিকটি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। জিনাতের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সমস্ত রকম ব্যবস্থা করেছিল। আর জিনাত আমার বোন তাদের আতিথেয়তা অন্তরঙ্গতা আমাকে নিয়ে একুশে মিছিলে অংশগ্রহণ করিয়েছে ।ভাবতে অবাক লাগে কতগুলো অনুষ্ঠানে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল তারা। ঘুম থেকে উঠার সাথে সাথে জিনাত আমার জন্য কাঁচা হলুদ তুলসী পাতার রস ঠিক ব্যবস্থা রাখতো। এসব ভুলে যাই কি করে। ভাই ফোঁটার দিন দেয়ালে আমার নাম করে চন্দনের টিপ লাগিয়ে দিত জিনাত। ফেরদাউসি কুইন একেবারে নির্দেশ জারি করেছিল "তুমি ঢাকা শহরে কোনদিন আমার বাড়ি ছাড়া অন্যত্র থাকবে না। তোমার বয়স হয়েছে কখন কি হবে !আমার কাছে থাকলে আমি স্বস্তি অনুভব করব ।আমারও তোমাকে নিয়ে কোন টেনশন থাকবে না ।আমার গাড়ি আছে। কোন অভাব নেই আমার। তোমাকে ভিআইপির মত রাখতে পারব । ঢাকা এয়ারপোর্ট এর কাছে তো উত্তরাতে আজিজের বাড়িটাই ছিল আমার একটা ঠিকানা। আজিজের পুত্র পুত্রবধূ নাতি-নাতনি তার সহধর্মিনী আমাকে প্রতি মুহূর্ত  আন্তরিকতার ডোরে বেঁধে রাখত। অন্তত এক হাজার বন্ধুর কথা বলতে পারি যাদের সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এবং সে সম্পর্ক আজও আছে। 


আমাদেরকে ওপারের বন্ধুরা যেভাবে বুকে আগলে নিতো, আপন করে নিতে পারতো আতিথেয়তা দিয়ে আমরা হয়তো অতটা পারবো না। আমাদেরও বিশ্বাস আমরা সেভাবে আতিথেয়তা দিতে পারিনি। অবশ্য আমি বারবার তাদেরকে তাদের মত করে আতিথিয়তা দিতে চেষ্টা করেছি। এ কারণেই আমার কষ্টটা সবচেয়ে বেশি। আজ খুব অনুভব করি আলিঙ্গন অন্তরঙ্গতা। আমি যেখানেই থাকি না কেন সেখানে সবাই এসে হাজির হত আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। এসব আমার অনেক বড় পাওনা। কামাল লোহানী আমাকে ছাড়তে পারছেন না আমিও তাঁকে ছাড়তে পারছি না। আমি বামপন্থী মানুষ বলেই তিনি আমাকে খুব নিবিড় ভাবে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। রাত্রি একটা দেড়টা দুটো পর্যন্ত চলছে আমাদের কথাবার্তা।নির্মলেন্দু গুণ আমারই টানে চলে এসেছেন পাঠক সমাবেশে। আমি কৃতজ্ঞ। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এখন থাকে টরেন্টোতে।কিন্তু ২০০৩ সাল থেকে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠদের বন্ধুত্ব আজ রয়েছে। 'ভালবাসি পদ্মার পানি"" প্রবাসী পাখির গান"প্রকাশ করেছিল সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল প্রকাশ করেছিল। আপন ভাইয়ের মত প্রয়াত অসীম সাহা। অঞ্জনা সাহা ভাইফোঁটা দিয়েছিল । ভুলে যাই কি করে । তপংকর চক্রবর্তী আজও ডাকে। খুবই যোগাযোগ রাখে রোকেয়া ইসলাম। আমার জন্মদিনে একটি দৈনিক কাগজে আমাকে নিয়ে লিখেছিল রবীন্দ্র গোপ। তারই আমন্ত্রণে সোনারগাঁও বিরাট সাংস্কৃতিক মেলাতে একবার আমি একটি বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলাম।


আমার বিশ্বাস মৌলবাদ ধ্বংস হবে উগ্রপন্থীরা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে পরাভূত  হবে। আবার আমরা বাংলা ভাষাকে বাঙালিয়ানাকে সমৃদ্ধ করতে পারব। ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘিষ্ঠদের উপর অবিচার অতুলন করে। তাই সব সময় সংখ্যালঘুদের রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। রাষ্ট্রকেই সংখ্যালঘুদের সার্বিক বিকাশে সক্রিয় হতে হবে। আমরা দুই বাংলা আবার আত্মীয় হব।


________________________________________



২৩ ।। শীতকাতুরে 



শীতকাল কেন যে ভালো আমি জানিনা। আমার তো ভীষণ কষ্ট হয়। ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভয়ে সারাক্ষণ জড়োসড়ো হয়ে গরম জামা কাপড় গায়ে দিয়ে কুঁকড়ে কুঁকড়ে থাকা। দিন ছোট রাত বড়। কাজের সময় কম। শীত আর কুয়াশার কারণে মর্নিং ওয়াক করা বারণ। তারপরে আমার মত বৃদ্ধের কি ভীষণ কষ্ট বোঝাতে পারবো না। হাত-পা শরীরের চামড়া রক্ষা করার জন্য ক্রিম মাখা। ভালো করে চান করার সুযোগ কম। ভোর হয় দেরি করে আবার সন্ধ্যা হয় তাড়াতাড়ি। কেন যে শীতকাল ভালো আমি জানিনা। না বুড়ো হয়ে গেছি বলে নয় আমার কোনদিনই শীতকাল ভালো লাগেনা। কতটুকু সময় পাওয়া যায় কাজের! শীতকালে অবশ্য ভালো ভালো খাওয়ার পাওয়া যায়। ডাল ফুল কফি সিম বড়ি খেজুর গুড এইসব শীতেই ভালো। হরেক রকমের পিঠে পুলি খাওয়ার লোভে আমার ভাই এই অসহ্য কষ্টকর শীত চাই না।আর এখন তো সারা ঋতুতেই সব রকম সবজি পাওয়া যায,। তবে ছোটবেলায় শীতটা ভালো লাগতো। বেশ মজা লাগতো বাড়ির সামনে খড় জ্বেলে গা সেঁকা। তারপর ঝমঝম কুয়াশায় ঘটি হাতে খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা । খেজুর রস খাওয়ার জন্য শিউলিকে অনুরোধ করা। রাত্রিবেলা শালুক ডাঁটা খেজুর রসের কলসির মধ্যে দিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে রস খাওয়া বেশ মজার ব্যাপার। এসবের প্রতিযোগিতাও ছিল। তারপর দিনের বেলা মাঠের নাড়া ছিঁড়ে এক জায়গায় জড়ো করে রাখতাম। সন্ধ্যার পরে আলু বেগুন কচু পোড়া আর শীতপতিরোধ করার মধ্যে বেশ আনন্দ ছিল। শীত মনে হতো না। আসলে শীত প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিল।এখন এই বার্ধক্যে লেপ-কম্বল শ্রেয়। শীত উপভোগ করার জন্য আর কষ্ট করা যাবে না। এখন ওই শীতকাল নিয়ে গল্প কবিতা লেখা বিছানায় শুয়ে শুয়ে হতে পারে। কবে যে এই কনকনে ঠান্ডাটা যাবে! একটু গায়ে আলো বাতাস লাগিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে পারবো ,! মাঘ মাস  কবে আসবে।তারপর আসবে 'মাঘের আধে কম্বল কাঁধে খনার বচন বলতে পারব।তারপর বলব যাক এবার শীত যাবে শিবের ঝুলিতে। আর ভালো লাগছে না শীত,। শীতের কোন আদর্শ বোধ নেই। আমার নিজেরই শীত শরীর। অন্যকে উত্তাপ দেবো কি করে!



হ্যাঁ আমি স্বীকার করছি আমি খুব শীতকাতুরে। কিন্তু তাই বলে শীতকে আমন্ত্রণ জানাবো না তাই কখনো হয়? 


মৃত্যুকেও তো আলিঙ্গন করতে হয়। যেহেতু কোন উপায় থাকে না। তখন বলি "মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান"। রাধার একমাত্র টার্গেট শ্যাম। আমাদেরও টার্গেট মৃত্যু। বোঝার সুবিধার জন্য এই উপমা আমরা ব্যবহার করি। প্রতিটি ঋতুকে আমাদের প্রয়োজন হয় তাই আমন্ত্রণ জানাতেই হয়। প্রতিটি ঋতুর  ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র এবং ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রতিভাত হয় আমাদের সামনে। প্রতিটি ঋতুই আমাদের কাছে প্রিয়। প্রতিটি ঋতু সেই সময়কালে আমাদেরকে মুগ্ধ করে ।আমাদের প্রয়োজন মিটায়।


শীতকাতুরে বলে শীতকে কাছে ডাকবো না তা কি করে হয়। শীত নিয়ে আসে আমাদের বাঁচার রসদ । আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস শীতকালে সংগ্রহ করতে হয়।যার ঘরে রুম হিটার আছে এবং বাথরুমে গ্রীজার আছে প্রবল শীতেও তাদের শীতের আমেজ অনুভব করার সুযোগ হয়। আবার গ্রীষ্মে এয়ার কন্ডিশন যাদের থাকে তাদের গরমে কষ্ট হয় না। প্রবল ঠান্ডায় রুম হিটার থাকলে শীতের সুখ অনুভব করতে পারে। আমার মত শীতকাতুরের যদি এসব সুযোগ না থাকে তাহলে সে শীতকেই ভয় পায়। আসলে শীতে ভীষণ কষ্ট হয়। কখন সূর্য উঠবে উত্তাপ গায়ে মেখে নিতে পারবে সেই অপেক্ষায় রাত কাটে কত মানুষের। আবার শীতের এক অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য শীতভোরে আমরা দেখে মুগ্ধ হই। কবিরা কবিতা লিখে। লেখকরা সে রূপের বর্ণনা দেয়। 


সোনালী ধানের ক্ষেত। শিশির সিক্ত ধানের শীষ। ধানের শীষে শিশির সোনালী রোদে চিকচিক করে। একদিকে ফসলের প্রতি আমাদের মোহ এবং পাশাপাশি তার অপার সৌন্দর্য কনকনে ঠান্ডাতেও আমাদের মনকে রাঙিয়ে দেয়।তখন স্বভাব শীতকাতুরে মানুষটি গেয়ে ওঠে "ও আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি" শীতের এক অদ্ভুত আকর্ষনীয় ক্ষমতা আছে। শীত এবং প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখে মানুষের মনে যে আবেগ সঞ্চারিত হয় তা কবিগুরু সঠিকভাবেই তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছেন।


"শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে"। পূবের লাল টকটকে সূর্য নিথর প্রকৃতির কোলে যে লাবণ্য তৈরি করে তা দেখার সৌভাগ্য যারা শীতকাতুরে তাদের হয় না। আমি শীতকাতুরে ঠিকই কিন্তু শীত ভরে লাবণ্য অবলোকন করার জন্য ঝুঁকি তো নিতেই হয়।


শীত ভোরে কনকনে ঠান্ডায় যখন অন্নদাতাদের আঙুলগুলো বেঁকে যায় ধান কাটার সময় অথবা ধানের আঁটি বাঁধার সময় তখন একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে দেখা এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করা শুধু নয় নিজেকে তাদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগকে কিছুতেই হাতছাড়া করা যায় না। সরষে ক্ষেতের হলুদ রাঙা ফুল কার না মন টানে! হরেক রকমের সবজি বাগানের আবেগের ফসল। ধান সবজি গম সরষে ক্ষেত এসবই তো শীতের ফসল। আহা বলতে বলতে জিভে জল এসে গেল। এই শীতে কচু পালং শাক কলাই শাক মুলো সিম বিট গাজর দেশি বড়ী নকশা বড়ি ইত্যাদি। শীতকালে ধান জমি থেকে পাওয়া যায় চুনো পুটি ল্যাঠা শোল কৈ সিঙ্গি মাগুর মৌরালা।এই শীতেই তো পাওয়া যায়। এই শীতের সময় মাঠের জল যখন খাল নালার দিকে চলে যেত গড়িয়ে তার সঙ্গে প্রচুর পুঁটি মাছ ছোট ছোট ল্যাঠা মাছ গুলে মাছ চিংড়ি মাছ বাঁকিতে (মাছ ধরার একরকম সরঞ্জাম) আমরা ধরতাম। এগুলো এত পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যেত টাটকা  মাছ খাওয়ার পরেও বাড়তি কিছু শুকিয়ে রাখা হতো। আমরাই সুখা মাছ ভেজে অথবা পুড়িয়ে শীত ভোরে রোদে বসে বসে খেতাম। কি অসাধারণ টেস্ট । তাইতো মাঝে মাঝে মনে হয়, আবার শীতকাল কবে আসবে।কখনো কখনো  বাড়িতে বেগুন দিয়ে চচ্চড়ি হতো। ভাবলেই জিভে জল চলে আসে। শীতে যতই জুবু থুবু হয়ে থাকি না কেন সকালে হালকা রোদে উঠনে বসে এই মজার খাবার আর সঙ্গে থাকতো বড়ি পোড়া। উত্তরের গা হিম করা শীতের বাতাসক পাত্তা দিতাম না। মা গুড় পাক করে মুড়ি মিশিয়ে মোয়া করতেন। শীতের রোদ গায়ে লাগিয়ে বসে বসে কামড়ে কামড়ে খেতাম। এ তো শীতকালেই সম্ভব। শীতের পদধ্বনি শুনলেই সব চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যতই শীতে কষ্ট পাই না কেন আমি তো জিভের জল সামলাতে পারিনা। কি করব লোভী মানুষ। আমাদের যে সবকিছুই চাই। গ্রীষ্ম চাই বর্ষা চাই শীত চাই সবটাই চাই।



 শীতকাল ভোজন রসিকদের জন্যই উপযুক্ত।তাই শীত ঋতু না হলে মানুষবা বাঁচবে কি করে! তাই শীতের কষ্টটা কিন্তু আমাদেরই প্রয়োজনে সহ্য হয়ে যায় কারণ অন্নদাতারা আমাদের মুখে খাবার তুলে দেয়। তাই শীত ঋতুর গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা অকপটে মেনে নিতে হয়।  তাই শীত যতই কষ্টকর কঠিন হোক না কেন প্রকৃতির প্রেমে তন্ময় কবিগুরুর সাথে গাইতে হয়।"শীতের বনে কোন সে কঠিন আসবে ব'লে; শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে"। সারারাত জেগে জেগে মাটির পরে শিউলির বিছানা দেখে ছুটে যাই কুড়িয়ে নিই দুহাত ভ'রে ।মাটির 'পরে শিউলির বিছানার টানে ভোর ভোর উঠে পড়ি শীতকে অগ্রাহ্য করে। কবিগুরু যেন শীতের  সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন।"পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে চলে আয় আয় আয় "। শীত কালকে দুহাত বাড়িয়ে যারা আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে চায়, আমন্ত্রণ জানায় তাদের কাছে এবং সমগ্র সমাজের কাছে শীতের এক অপরিসীম ক্ষমতা রয়েছে। তাই আমি শীতকাতুরে একজন মানুষ বাধ্য হলাম শীতকে স্বাগত জানাতে। এই ক্ষেত্রে আমি হয়তো একটু প্রাচীনপন্থী কিন্তু শীত উদারপন্থী। তাই শীতের গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। সবশেষে বলি শীতকালে সবজি চাষিরা অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটাই গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে। গ্রাম থেকে শহরের দিকে ব্যাপক হারে সবজি ব্যবসায়ীরা ম্যাটাডোর লরি ভর্তি করে নিয়ে যায়। সবজি চাষের ফলে শ্রম দিবসও সৃষ্টি হয়। পুনরায় শীত ঋতুকে স্বাগত জানাই জনস্বার্থে।



বার্ধক্যে শীত প্রতিরোধ করা খুবই কষ্টকর। শীত প্রতিরোধ করার শক্তি ধীরে কমছে এবং বয়সকালে একেবারেই কমে যায়। হয়তো এই শীত প্রতিরোধ করতে পারছি না বলে নিজেকে শীতকাতুরে মনে হচ্ছে। আমি বহু বছর মর্নিং ওয়াক করছি। কিন্তু এখন একেবারে ভোরবেলা অন্তত এই বছরটা মর্নিং ওয়াক করছি না। শীতকালে কিন্তু শরীরকে ঠিক রাখতে গেলে আপনাকে হাঁটাহাঁটি করতেই হবে। প্রতিদিন এক ঘন্টা হাঁটুন আপনার শরীর ঠিক থাকবে। শরীর চাঙ্গা থাকবে।হাঁটাহাঁটি করলে শরীরটা সচল থাকে। মানব দেহের ৪২ টি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পায়ের তালু থেকে মাথা পর্যন্ত সবটা সক্রিয় থাকে হাঁটতে পারলে। এই ৪২ টি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সদা জাগ্রত থাকে বলেই মানুষ নিয়োগ এবং সুস্থ সবল থাকে। না হাঁটলে জড়তা পেয়ে বসে। শরীরের শিরা-উপশীরা ধমনী হাঁটাহাঁটি করলে খুব সক্রিয় থাকে। আপনি যত হাঁটবেন তত আপনার  শরীরে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়বে। আমি সতর্ক করছি বন্ধুদের অন্তত যারা বয়স্ক তাদেরকে বলছি শীতকালে কিন্তু স্ট্রোক হয় বেশি। শীতে এত সুন্দর সুন্দর লোভনীয় শাকসবজি পাওয়া যায়, খেতেও লোভ হয় সকলের। শীতকালের মত এত ডিলিসিয়াস ফুড অন্য সময় পাওয়া যায় না। আবার বয়স্ক মানুষদের লোভের বশবর্তী হয়ে একটু বেশি খেয়ে ফেলার অভ্যাস আছে। অন্তত বয়স্ক মানুষদের দুটো কাজ করার আমি পরামর্শ দেব। ভোরবেলা হাঁটতে বেরোলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। একবার কফ কাশি আপনাকে আক্রমণ করলে আপনি কিন্তু বিপদে পড়বেন। তাই একটু রোদ বেরোলে অর্থাৎ রোদের তাপটা একটু বাড়লে তখন হাঁটাহাঁটি করা ভালো। কোলস্টোরেলের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গেলে শারীরিক পরিশ্রম বিশেষ করে হাঁটা বাধ্যতামূলক। আমাদের মত বয়স্ক মানুষদের বিকেলের দিকে হাঁটতে পারলে শরীরটা অনেক বেশি চাঙ্গা থাকে। তখন শীত বা শীত জনিত কোন আক্রমণ আপনাকে কাবু করতে পারবে না। বিকেলে হাঁটার একটি বড় উপকারিতা হলো শরীরে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়। ফলে জড়তা ভাবটা থাকে না। শরীরে পরিশ্রম হয় বলে ঘুমও ভালো হয়।নিজেকে খুব সতেজ মনে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ আমি দিতে পারি তা হল দুপুর এবং রাত্রে খাওয়ার পরে এক গ্লাস করে গরম জল খাওয়া একান্ত জরুরী। গ্যাস অম্বলের হাত থেকে রক্ষা পাবেন। রক্তে কোলেস্টেরল জমবে না। স্ট্রোকের হাত থেকে বাঁচবেন। শীত ঋতুকে আপনি আটকাতে পারবেন না। সতর্ক থাকতে হবে ।শীতকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়াতে হবে শরীরে। খুব খুব সতর্ক থাকতে হবে। শীতকাল যত ভালো তত খারাপ। ঠান্ডায় কফ কাশি কাশি  খুব হয়। একবার যদি আপনার লাংসে কফ জমে যায় তাহলে কি ধরনের বিপদ হতে পারে নিশ্চয় বুঝিয়ে বলতে হবে না। শীতকে উপভোগ করুন সাবধানেও থাকুন। শীতকে ভয় করব না শীতকে জয় করব। আমার ৩২ বছর রক্তে শর্করা এবং উচ্চ রক্তচাপ। যেহেতু বয়স হয়েছে প্রোস্টেটের সমস্যাও আছে। ওরাও আছে আমিও আছি। সহাবস্থান করেই বেঁচে আছি। বয়স হলে রোগ বাসা বাঁধে শরীরে। তাই আমাদের মতো বুড়োদের খুবই সতর্ক থাকা দরকার। শীতের প্রকোপকে মেনে নিতে হবে মানিয়ে নিতে হবে। প্রকৃতি শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে আমাদের বন্ধু। বন্ধু ছাড়া বাঁচি কী করে। বন্ধু থাক, আমরাও থাকি।


 ______________________________________

 ২৪ ।। লেখাটা আমার অভ্যাস



লেখার গ্রহণযোগ্যতা ভেবে আমি লিখতে বসি না। লেখা আমার চিন্তা চেতনার নির্যাস। একজন লেখক চিন্তাশীল মানুষ। তাঁর জীবন ও জগৎ সম্পর্কে ধারণা বিশ্লেষণ চলমান জগতের ছবি তার মনকে তোলপাড় করে। সমাজের ঘটনাবলী তাঁর মনকে আলোড়িত করে। তিনি যেমন স্তরের মানুষ যেমন বিচার বিবেচনার এবং বোধের মানুষ তাঁর লেখা তেমনই হবে। তিনি মনে করেন না শুধু লেখার জন্যই লেখা। একজন চিন্তাশীল মানুষ তিনি সদা জাগ্রত সমাজ এবং সময় সম্পর্কে। তাই তাঁর কাছ থেকে সমাজ চেতনা এবং গঠনমূলক আলোচনা বেরিয়ে আসে। স্বাভাবিক কারণেই তাঁর লেখায় আমরা কিছু বার্তা পাই। যা গণমানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। শিক্ষিত করে । তিনি কখনোই লেখার সময় চপলমতি বা চঞ্চলমতি হন না,। তাঁর চিন্তা চেতনার ভিত্তি ভূমি যদি বস্তুবাদী দর্শন হয় তাহলে তাঁর লেখার সঙ্গে আমাদের বাস্তব জীবনের মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। এবং সেটাই হবে তাঁর লেখার গ্রহণযোগ্যতা। লেখা একটি অভ্যাস। লেখকের মাথায় বহু বিষয় খোঁচা দেয়, আঘাত করে, কিলবিল করে। বাধ্য হয়ে তিনি কলম ধরেন। নাহলে মাথার যন্ত্রণার লাঘব হয় না। তাঁর লেখার বিষয়বস্তুর প্রকাশভঙ্গিমা উপস্থাপনা যদি শিক্ষামূলক হয়ে থাকে তাহলে মানুষ সেই লেখা মনে রাখবে এবং নিজের জীবনের চলার পথে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে, কাজে লাগাবে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা লেখক শুধু নিজের জন্য লিখে তা নয়। লেখক লিখেন অন্যজনের জন্য সমাজের জন্য। তাঁর লেখা তিনি যেমন চিন্তাভাবনার মানুষ ,যেমন তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র সেসবের প্রতিফলন ঘটে তাঁর লেখার মধ্যে। লেখক কিছুতেই নিরপেক্ষ নন। লিখার সময় তিনি চোখ বন্ধ করে লিখেন না। একজন লেখক সব সময় সংস্কার মুক্ত, মুক্ত চিন্তার মানুষ। তাঁর বোধ বুদ্ধি প্রখর। শুধু প্রয়োজন লেখকের লেখার বাস্তবতা। তুমি যতই কাল্পনিক জগতে বিচরণ কর না কেন তোমার বিচরণের বাস্তব ভূমি কিন্তু এই মাটির পৃথিবী, এই চলমান জগত।  লেখার চৌম্বক শক্তি হলো এই বস্তু জগত। আর লেখার বিষয়বস্তু এই জগতের মানুষের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনাকে বাদ দিয়ে নয়। এখানেই লেখক চৌম্বক শক্তির মত আটকে থাকেন। 


আমার লেখার সময় কাল রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে অথবা ভোর বেলায় ।যখন চিন্তার জগতে নির্মল বাতাস বয়ে যায়। চিন্তাশক্তির মধ্যে শুভ্রতা থাকে। অন্য কোন বহিরাগত প্রভাব আমাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না তখনই আমি ছটফট করি লেখার জন্য। কিছু না কিছু লিখতে চাই। না লিখলে মনে হয় সময়টা নষ্ট হয়ে গেল। আমি সব সময় মনে করি লেখা কিন্তু গণসংযোগের একটি মাধ্যম। এখান থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে কিছুতেই পারি না।


লেখার মধ্যে থাকা, মানুষের সঙ্গে থাকা, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে যে সমস্ত মানুষের তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো  নিত্যদিনের অভ্যাস। খাদ্য জলবায়ু গ্রহণের মত আমারও এইসব অভ্যাসের মধ্যে থাকতে হয়। তাই আমি চেষ্টা করি প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখতে ।মনের তাগিদ থেকে লিখতে বসা। নিয়মের জগতে কোথাও অনিয়ম বা গরমিল হলে আমার মনের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। আমার মধ্যে যে ছটফটানি তৈরি হয় তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কলম ধরি। শুধু ফুল ফল পাখি নিয়ে বহু লেখা হয়েছে। এখন মানুষকে নিয়ে লেখার দায় অনুভব করি । কত ধরনের মানুষ আছে। সারাদিন নিজের এবং  নিজের নিকট জনের কথা ভাবতে ভাবতেই তাদের সময় চলে যায় ।কিছু মানুষের অভ্যাস হয়ে গেছে নিজের বৃত্তের  বাইরে অজস্র মানুষের কথা ভাবা। মানুষের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার বীজ রয়েছে। সেই বীজ প্রকৃত জলবায়ু পেলে অঙ্কুরিত হয় বৃক্ষে পরিণত হয়। মনের মধ্যে যে সৃষ্টির বীজ থাকে তাকে নিজের মত করে  অঙ্কুরিত করার আবেগ নিয়ে সময়কে কাজে লাগান।


    ভোরের আগে এই সময়টি আমাদের মাথা শুদ্ধ থাকে পরিচ্ছন্ন থাকে নিষ্কলুষ থাকে ।এই সময়টি সাধনার সময়। একজন লেখকের একজন কবির একজন চিন্তকের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এই সময়। যেকোনো ভালো কাজে মন দেওয়ার। এই সময়টি সূক্ষ্ম চিন্তার পক্ষে উপযুক্ত। এই সময় মানুষ সাধারণত অন্যমনস্ক থাকেন না,। (আধ্যাত্মবাদীদের পক্ষেও সময়টি ভালো যদিও আমি এই বিষয়ে কোনদিন আগ্রহ দেখাই না।) আমি বলতে চাই প্রাক ভোর অর্থাৎ সূর্যোদয়ের অন্তত এক ঘণ্টা আগে মনের মধ্যে একটা স্বচ্ছতা থাকে। তাই বাইরের কোলাহল মুক্ত এই সময়টি আমাদের পক্ষে, সৃজনের পক্ষে খুবই মূল্যবান ও উপযুক্ত। দিনের কোলাহল সৃজনের পক্ষে সাবলীল নয় ।  মস্তিষ্ককে বিব্রত করে পারিপার্শ্বিক অবস্থা। এইসব শৈশবের শিক্ষা এবং অভ্যাস। শৈশবে সারাদিন ব্যস্ত থাকা বেয়াড়াপনা ছেলেটিকে মা বলতেন "ঝন্টু ভোরবেলার পড়া খুব ভালো হয়। উঠে পড়। ভোরের পড়া মনে থাকে।"


অভিজ্ঞতা থেকে শেখা এবং আজও আমার মনে আছে। অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। যে শুইয়া থাকে তার ভাগ্যও শুইয়া থাকে। আমার জীবনে হাজারো সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে গেলে কলম আমার একমাত্র ভরসা। আমার নিজের লেখা নিয়ে নিজেরই সংশয় আছে। কিন্তু আমার লেখা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে ।এই অভ্যাস আমি ছাড়তে পারবো না। আমার একটি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছ। নদীতে জল স্রোতের মতো বয়ে যায়। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। মস্তিষ্ক ঠিক তেমনি। প্রতিদিন ভোর নতুন নতুন চিন্তা চেতনা ভাবনা নিয়ে উপস্থিত হয়। এই স্রোত কলম আটকে রাখতে পারে কাজে লাগাতে পারে।তাই লেখার বিষয়বস্তুও প্রায়ই পাল্টে যায় ,একই রকম থাকে না। অনেক সময় মনে হয় আর কি লিখবো? অনেক লেখা তো লিখলাম। পরক্ষণেই দেখি কিছু না কিছু বিষয় বস্তু মস্তিষ্ককে ধাক্কা দিচ্ছে। পুরনো লেখা পুরনোই থেকে যায় মনে হয় কিছুই লিখা হয়নি। তখনই ছটফট করি নতুন লেখার জন্য। লেখা আমাদের সৃজনশীলতা উৎকর্ষতা এবং মেধাকে শক্তিশালী করে। মনকে চন মনে রাখে। এবং সারাদিন লেখার আনন্দে মন মেঘমুক্ত থাকে।

__________________




২৫ ।। ছিন্নমূল মানুষ ও দুর্যোগের রাত 



বৃষ্টি বাদল দুর্যোগের রাত ও ঝিরঝিরে বৃষ্টির কারণে কনকনে শীত একসাথে হেনস্তা করতে চাইছে যার পর্যাপ্ত গরম পোশাক নেই ,রান্নাঘরে জল পড়ে, পকেটে পয়সার অভাব এমন ছিন্নমূল মানুষদের। দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করা ক্লান্ত মানুষ কেমন করে রাত কাটায় এবং দিনের পর দিন অসহায় অবস্থার মধ্যে তাকে তার পরিবারকে থাকতে হয় এই বিষয়  আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। আজ দুদিন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আমাকে অনেক কথাই মনে করিয়ে দেয়। এই অভিজ্ঞতা ছোটবেলা থেকেই। পরিবার-পরিজন যখন তাকিয়ে থাকে গৃহকর্তার দিকে তখন সেই মানুষটি ভিতরে কি কষ্ট পায় তা উপলব্ধি করার মত সুযোগ আমার হয়েছিল। অসহায় গৃহকর্তার  অন্তরবেদনা আমি অনুভব করি। যেহেতু গ্রামগঞ্জের মানুষের দিনমজুরি একমাত্র আয়ের উপায় 


তাই দু বেলা দুমুঠো ভাত একটু গরম পোশাক সংগ্রহ করা নিম্নবিত্তের বা প্রান্তিক মানুষের পক্ষে খুবই কষ্টকর। আমি দেখেছি এই শীত মরশুমে যখন নিম্নচাপ হোক বা যে কোনো কারণেই হোক বৃষ্টি ঝরে পড়ে তখন ঘরের চাল আটকাতে পারেনা বৃষ্টিও বাতাসের দাপট। জল পড়ে মাটির মেঝেতে। বাড়ির মধ্যেকার হাঁড়ি কলসি কড়াই পেতে দিতে হয় জল ধরে রাখার জন্য ।তখন সেই ছিন্নমূল মানুষগুলো  নিদারুন অসহায় অবস্থার কথাএকটু ভাবতে পারলেই যে কোন মানবিক মানুষের কষ্ট হবেই। এই হতদরিদ্র মানুষদের কষ্ট দেখে ,ছিন্নমূল মানুষদের অসহায় অবস্থা দেখে দরদী মানুষরা এই শ্রেণীর পক্ষে দাঁড়ায় । আমি যে দেখেছি ঝড় জলের রাতে  মুহুর্মুহু বিদ্যুতের ঝলকানি আর কর্দমাক্ত পথ দিয়ে দূরে কোন হাসপাতালে প্রসূতিকে নিয়ে যাচ্ছে দোলায় করে। সাময়িক হলেও তাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য একটু স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার জন্য মাঠে ময়দানে লড়াই করে। এই লড়াই করা মানুষগুলো সাধারণত লাল ঝান্ডা পার্টির পক্ষে কাজ করে। কারণ সেই সময় গ্রামগঞ্জে প্রতিবাদী রাজনৈতিক দল লাল ঝান্ডা। মানবিক কারণেই মধ্যবিত্ত যুবকরা প্রতিবাদী রাজনৈতিক দলের পক্ষে অংশগ্রহণ করেছে।আজকের দিনের লাল ঝান্ডা পার্টির চেহারা দেখে বিশ্লেষণ করা যুক্তিযুক্ত হবে  না। সেদিন কিন্তু অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও লাল ঝান্ডা পার্টি কাজ করেছে। লাল ঝান্ডা পার্টি যে গরিবের পার্টি তা ইতিহাসে পরিণত করতে পেরেছিল। আমি আমার শৈশবে মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মানবিক মূল্যবোধের মানুষজনকে এভাবেই হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখেছি। নিজেও অনুপ্রাণিত হয়েছি। অংশগ্রহণ করেছি তৃপ্তি পেয়েছি। হতাশাগ্রস্থ মানুষদেরকে  জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেচে লাল ঝান্ডা। গ্রামীন অধিপতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস যুগিয়েছে লাল ঝান্ডা ধরা মানুষগুলো। না আমি জোর দিয়ে বলছি অন্য কোন রাজনীতি দল এই কাজ করেনি। স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং বামপন্থী পরিবারের মানুষ আমি। শৈশব থেকেই আমার হৃদয় এই সব মানুষের মন ছুঁয়ে আছে।


শাল বা উলের চাদর নয় সুতির চাদরে গা গরম হয় না। শীতে ঠকঠক করে কাঁপে প্রান্তিক মানুষের বাড়ির ছেলে মেয়েগুলো । অপেক্ষায় থাকে কখন রোদ বেরোবে একটু উত্তাপ পাবে। এই নিম্নবিত্তের মানুষগুলো, প্রান্তিক মানুষ গুলো মেহনত করে উৎপাদন করে। এই  সমস্ত কারণে অবহেলা ও বঞ্চনা উপলব্ধি করার পর যে কোন মানবিক মানুষ প্রতিবাদী হবে এটাই স্বাভাবিক। আমিএকদিন মিটিং এর পর একজন কর্মীর বাড়িতে চা খেতে গেলাম। উঠোনে বসে চা খেলাম। দেখলাম দরজাগুলো শক্তপোক্ত নয়। বাঁশের দরজা। জানতে চাইলাম নিরাপত্তার অভাব হতে পারে। যদি ডাকাতি হতে পারে।তোমাদের ভয় করে না। উত্তর দিল কর্মীটি আমাদের বাড়িতে চুরি করার মতো কিছু নেই। আদিবাসী এলাকায় সাঁওতাল পল্লীতে আমি কাজ করেছি দিনের পর দিন। শুনেছি বাঁশের বেড়া সরিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পান্তা চুরি করে খেয়েছে। এমন ঘটনা রয়েছে অনেক। খাওয়ার জন্য পান্তা চুরি করেছে কিন্তু বাড়ি অন্য কোন কিছুতে হাত দেয় নি ক্ষুধার্ত মানুষ। তার প্রয়োজন পান্তা খাওয়া।শুধু চুরি করতে যায়নি! অদ্ভুত এই মূল্যবোধের মানুষগুলির জীবন। শীতের রাত হোক আর বর্ষার রাতই হোক ছিন্নমূল মানুষগুলোর রান্নাঘরের অবস্থা কেমন তার একটি ছবি আমি তুলে ধরতে পারি। খড়ের চালা মেরামতির অভাবে বৃষ্টির জল ধরে রাখতে পারেনা।যেখানে রান্না হয় সেখানে জল পড়ে। জ্বালানি ভিজে যায়। বর্ষাকালে সেই জ্বালানি শুকোনোর সুযোগ থাকে না। তখন গৃহিনির যে কি মনের দশা অনুভব করলে বেদনায় বুক ফেটে যায়। বাচ্চা ছেলে মেয়েদের স্বামী শশুরকে কি করে রান্না করে খাওয়াবে। অসহায় গৃহিণী কি মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে এসব সকলে অনুভব করতে পারে না। যারা অনুভব করে তারা দরদী মানুষ। সকলের মাথায় ছাদ নেই কেন? এ প্রশ্ন মানুষকে ভাবিয়ে তোলে প্রতিবাদী  করে ।মস্তিষ্কে আলোড়ন তৈরি করে ।তখন সেই মানুষ প্রতিবাদী না হয়ে পারে না। বেদনার বাস্তব ছবি দুটি একটি তুলে ধরতে পারি। প্রত্যক্ষ করেছি আমি। একটি কবিতাও লিখেছিলাম। বিধবা মা সারাদিন এ বাড়িও বাড়ি থেকে ভিক্ষা করে কিছু পায়। রাতে দুই শিশু সন্তানকে একটু গরম ভাত দিতে পারে। এমন দিন গেছে যেদিন ভাতের জন্য পীড়াপিড়ি  করেছে দুই শিশু। সেদিন চাল ছিল না বাড়িতে। তবু মাকে ছলনা করতে হয়েছে। উনুনে হাঁড়ি বসিয়ে দিয়েছে। ফুটন্ত জল বাষ্প হয়ে উঠে যাচ্ছে উপরের দিকে। শিশু  যে তাকিয়ে আছে কখন ভাত ফুটবে। ভাত ফুটে না চাল নেই বলে। খিদের জেলায় অপেক্ষা করে করে শিশু পুত্রদ্বয় ঘুমিয়ে গেছে। মায়ের চোখে জল। শহুরে মানুষদের এসব দেখার হয়তো সুযোগ হয় না। তাই নিবিড়ভাবে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর ছিন্নমূল মানুষগুলোর জীবন যাপন দেখার সুযোগ তারা পাননি। 


একদিন মাকে খুঁজতে গিয়ে পাশের বাড়িতে  গিয়ে দেখি মাটিতে শুয়ে আছে একটি শিশু। ঘুমিয়ে গেছে নাকে তার সর্দি ।মাছি ভন ভন করছে। মাদুর বা চাটাইতে বাচ্চাটা শুয়ে নেই। মায়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে গেছে। মা গেছে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে।এই যে মাটিতে পড়ে থাকা একটি শিশু অযত্নে অসহায়ের মতো পড়ে আছে । নিঃস্ব রিক্ত অবহেলিত একটা নাই নাই পরিবেশ মনকে টলিয়ে দেয়। মা বাচ্চাটিকে তুলে নিয়ে আসে বাড়িতে।আমার মনে দাগ কাটে। এই দাগ মিলিয়ে যায় না কোনদিন। 


এই যে গ্রামগঞ্জে ছন্নছাড়া জীবন। কোনরকমে বেঁচে থাকার জন্যই বেঁচে থাকে ।রোগা পটকা মানুষগুলোই তো অন্নদাতা। এরা বেগার খাটতো। অর্থাৎ চাষ ধান কাটার সময় বাদ দিয়ে বাকি সময় গুলো গ্রামীন ধেনো জমিদারদের বাড়িতে বিনে পয়সায় কাজ করতো। বাবু জাতীয় লোকেরা  এদেরকে সম্মান দিয়ে কথা বলতো না। অবহেলা বঞ্চনাকে বাস্তব জীবন বলেই মেনে নিয়েছিল। কালক্রমে তেভাগা আন্দোলন, ভাগ চাষী আন্দোলন মজুরি বৃদ্ধির লড়াই গ্রামে গঞ্জে শুরু হয়ে গেল লাল ঝাণ্ডার নেতৃত্বে। নিম্ন মধ্যবিত্ত ,প্রান্তিক মানুষদের জাগরণ। আমি আলোচনা শুরু করেছিলাম দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতে ছিন্নমূল মানুষদের জীবন যাপন সম্পর্কে কিছু কথা। অর্থাৎ অতীতের পিছিয়ে পড়া মানুষের অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। গরিব মেহনতী মানুষের জাগরণ হয়েছে। বামপন্থীদের সরকার হয়েছে আবার বামপন্থীদের পরাজিত করে দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতা দখল করেছে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এই ইতিহাস আলোচনার জন্য আমি কিন্তু লেখার সূত্রপাত করিনি। সম্প্রতি যে দুর্যোগ গেল ,তা দেখে আমার অতীতের ছবি ভেসে উঠেছিল মনে। তাই লিখতে বসেছিলাম। কথার পিঠে কথা চলে আসে। এভাবেই তো সময়ের দলিল তৈরি হয়। শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি শ্রেণী চেতনা ছোটবেলাতেই জেগেছিল। মার্কসবাদ আমাদের জ্ঞানের পরিপক্কতা এনে দিয়েছে। দর্শন এবং বাস্তবতা মিলিতভাবে চেতনা। যেকোনো অবস্থা বা দুরবস্থার মধ্যে থাকে না কেন এই চেতনা আমাকে জাগিয়ে রাখে। হাতে কলমে শিক্ষা কোনদিন মানুষ ভুলে যায় না। আমার কলমের শক্তি বা ধার থাক বা না থাক আমি কিন্তু কোন অবস্থাতেই নিজেকে সরিয়ে রাখি না। আমি বিশ্বাস করি সূত্র এবং প্রক্রিয়া যদি ঠিক থাকে অংকের সমাধান সঠিক হবে । ঠিক তেমনি শ্রেণী সংগ্রামের দর্শন যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে একদিন দর্শনের জয় হবে। এই শ্রেণী সংগ্রামের দর্শন নিয়ে বিশ্বাস নিয়ে আজও সজাগ আছি।


বিবেকানন্দের কথা দিয়ে শেষ করি। প্রশ্ন ছিল তাঁর কাছে। ব্রাহ্মণের দিন শেষ, ক্ষৈত্রের দিন শেষ,। বৈশ্যের (ব্যবসাদার পুঁজিপতি) দিনও শেষ হবে । শূদ্রের দিন কি সত্যি আসবে? বিবেকানন্দের দুটি শব্দে উত্তর। একদিন হবে। চাই চিন্তা চেতনাকে আরো শান দেওয়া। চাই শুধু আত্মবিশ্বাস। সুকান্তও জানতো এই অন্ধকার রাত কেটে যাবে, সূর্য উঠবে ।ভোর হবে। ছিন্নমূল মানুষের জয় হবে। ছিন্নমূল মানুষগুলো নবজাতকের জন্য জীবন বিপন্ন করে নতুন সমাজ গড়বে। প্রকৃত চেতনা সম্পন্ন মানুষ কখনো পরাজয়ের কথা ভাবেনা। সে শুধু জয়ের স্বপ্ন দেখে। এই স্বপ্ন দেখা তার অভ্যাস। আজও এই স্বপ্ন দেখি আমি, আপনিও দেখুন। জাত পাত সম্প্রদায় নয় চাই শুধু মানবতার জয়। ছিন্নমূল মানুষের জাতপাত সম্প্রদায় নেই। আছে শুধু ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই।


------------------------




২৬ ।। মৃত পাথরের দেশ 



চরম নিষ্ঠুর উক্তি হলো যখন অনেকের মধ্যে থাকার কথা তখনই মানুষ একা হয়ে যায়। শৈশব কৈশোর যৌবন বার্ধক্য হইচই করে মানুষের ভিড়ে থাকা যায়। সঙ্গীর অভাব হয় না । মানুষকে ঘিরে থাকে মানুষ। কিন্তু এমন একটা সময় আসে একজন অসহায় মানুষকে দেখে আর পাঁচ জনের করুণা হয়। পাশ কাটিয়ে চলে যায। অবশ্য সকলে তা নয়। কথা বলার কিছু মানুষকে পাওয়া যায় একটা সময় পর্যন্ত। যতক্ষণ তুমি শক্ত পোক্ত আছো ততক্ষণ তোমার ধারে পাশে কেউ না কেউ আছে। যখন তুমি ক্রমাগত দুর্বল হয়ে যাচ্ছ কিংবা অসহায় হয়ে যাচ্ছ তখন তুমি দলছুট সাথীহারা। আমাকে মেনে নিতে হয় প্রতিটি শক্ত-সমর্থ্য সক্রিয় মানুষের হাজারো কাজ আছে। তাদেরও ব্যস্ততা আছে। এ নিয়ে আমার কোন আফশোস বা অভিযোগ নেই। বাস্তববোধ আমাদের অনেক চিন্তার জটিলতা থেকে মুক্তি দেয়।


তুমি ভুলে গেছো পৃথিবীর গতি। কারণ তোমার এখন কোন গতি নেই। নদীর স্রোত দেখলে তোমার বুকের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর কষ্ট অনুভূত হয়। কারণ তোমার জীবনের সমস্ত স্রোত শুকিয়ে গেছে। ঝর্ণা শুকিয়ে গেলে নদী অস্তিত্বহীন। তুমি ঠিক তেমনি। তোমার জীবনের চিন্তা চেতনার সমস্ত সম্ভাবনার গতি হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়,।শুধু স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে আছো তুমি নদীর পাড়ে। গাংচিল উড়ে বেড়ায় ।তোমার চোখে জল । কারণ তোমার শক্তি সামর্থ্য একেবারেই তলানির দিকে ঠেকেছে। শরীর হয়ে গেছে ভারী। ভারী শরীরটাকে নিয়ে তুমি আর হাঁটাচলা করতে পারছ না। কল্পনার জগতে উড়ে যাওয়ার কথা তোমার মনেই আসেনা। এখন তোমার মন অন্যমনস্ক। তখন তোমার মন কবিগুরুকে আশ্রয় করে"ওপারেতে সোনার কূলে""দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া ",।তুমি যে এতটাই দলছুট হয়ে যেতে পারো কোনদিন কল্পনাও করনি। তোমার প্রতি কারুর আগ্রহ নেই। সংবেদনশীল দৃষ্টিতে তোমাকে কেউ বলে না "জেঠু কেমন আছো।" অতটা সময় দিতে কেউ পারে না তোমার জন্য। কারণ তখন তোমার কাঁপা কাঁপা অস্পষ্ট স্বর। গলা দিয়ে উত্তর বেরিয়ে আসতে সময় লাগে ।তোমার জন্যই বা কে এত সময় দিতে পারে বল! তোমার সবচাইতে খারাপ লাগবে যখন পথে তোমাকে কেউ দেখে করুনা করবে। সেটাই তোমার সবচাইতে মর্মান্তিক অবস্থা। তখন তুমি সারা পৃথিবীর এত সবুজ ঘাসের মধ্যে শুকিয়ে যাওয়া একটি ঘাস মাত্র। 


সবুজের নান্দনিক সৌন্দর্য নিয়ে একটি সবুজ ঘাস শুকিয়ে যায়। শুকিয়ে যায় এক বুক বেদনা তার সম্বল। এইতো সেদিন তোমাকেও দেখেছি শুয়ে আছো, দুঃখ ঘন ঘাসে। হয়তো আজ পৃথিবী তোমাকে ভারী মনে করছে। তুমি এখন ভাবতে শিখেছ নিজেকে।শুকিয়ে যাওয়া অপ্রয়োজনীয় খড়। তুমি আজ আর কারুর প্রয়োজনে এক ফোঁটা জল হতে পারোনি। হয়তোবা অভ্যাসবশত এক বিন্দু শিশির হয়ে রয়েছো। তাও তো শুকিয়ে যাওয়ার সময় বড় দ্রুত।


তখনই মনে হবে পৃথিবীতে তুমি একজন ভাড়াটিয়া মাত্র। নির্ধারিত সময় ফুরিয়ে গেলে ভাড়াটিয়াকেও ঘর ছেড়ে চলে যেতে হয়। এই নিয়মের পৃথিবীতে কোন ব্যতিক্রম নেই। তোমার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।তোমার ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা কামনা বাসনা ধীরে ধীরে কালের গর্ভে মিলিয়ে যায়। কেউ তার খোঁজ রাখে না। তুমি কখন এলে কখন বা চলে গেলে। ব্যস্ত পৃথিবীর এত সময় নেই খোঁজ নেওয়ার। ফুলের যতই সৌন্দর্য থাক না কেন তাকে ঝরে যেতেই হবে।আসা-যাওয়ার পথের ধারে কত ফুল ফোটে,। পথিককে বুঝে নিতে হয় তার এই সৌন্দর্য পিপাসাটুকু সাময়িক। এই নিয়মের পৃথিবীতে তোমার অধিকার একেবারে সীমিত। তুমি একেবারেই একজন দলছুট।


দলছুটের কোন দল থাকে না,। যখন একটা ফুল ফুটে থাকে তখন হাজার দৃষ্টি তার দিকে। ঝরে গেলে গাছেরও কোন দায় থাকে না। গাছ আবার ফুলের জন্ম দেয়। ঝরা ফুলের দায় কখনো গাছ বহন করে না। বৃন্তচ্যুত ফুল  নির্মম বাস্তবের এক স্মৃতি।


দলছুট হয়ে যাওয়ার পরে তোমার আর কোন দল থাকে না। তোমাকে নিয়ে কেউ দলও করবে না। নিষ্ঠুর পৃথিবীর সুঠাম কর্কশ শরীরে তুমি বিলীন হয়ে যাবে। তোমার প্রিয় মাটি  প্রেম ঘাস হয়ে গেছে তখন অন্যের। তাই দলছুটের কারুর জন্য কোন অপেক্ষা নাই আক্ষেপও নাই। আমি জানি আমি কোন দূরের আকাশের নক্ষত্র নই। আমার কোন আলো নেই। আমি এক মৃত পাথর। এমনি অনেকে আছে মৃত পাথরের দেশে। এইসব পাথর হয়তো দীর্ঘদিন থেকে থেকে ভেঙে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ধুলোতে পরিণত হচ্ছে। কোনোটি হয়তো আলো বিকিরণ করছে। পাথরের দেশেও সব পাথর সমান নয়। সেখানেও বৈচিত্র্য আছে।


_______________________________________

 (২৭)

ইতিহাস লেখা হয় রক্ত দিয়ে/অমৃত মাইতি


পৃথিবীতে যত বড় বড় ইতিহাস লেখা হয়েছে সবই রক্ত দিয়ে। কালি দিয়ে কখন ইতিহাস লেখা হয় না।

"ইতিহাস লেখা হয় রক্ত দিয়ে"—এই কথাটির অর্থ হলো বড় কোনো পরিবর্তন, বিপ্লব বা স্বাধীনতার পেছনে থাকে মানুষের চরম আত্মত্যাগ ও প্রাণহানির বেদনা।

বড় বড় ঐতিহাসিক ঘটনা বা স্বাধীনতা সহজলভ্য হয় না; এর পেছনে থাকে সংগ্রাম ও ত্যাগের এক রক্তাক্ত অধ্যায়।

এই কথার মূল তাৎপর্য নিম্নরূপ:

চরম মূল্য: বড় কোনো অধিকার বা মুক্তি অর্জনের জন্য জীবন দিতে হয়। জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্যের সমান মনে করে এবং তুচ্ছ জ্ঞান করে আত্মত্যাগের আদর্শকেই ইতিহাস সৃষ্টিকারীরা বেছে নেয়।

শহীদের অবদান: যাঁরা প্রাণ দেন, তাঁদের রক্তেই রচিত হয় জাতির ভবিষ্যৎ।

স্থায়ী প্রভাব: রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করে, যা ইতিহাস হয়ে থাকে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি স্মরণ করতে পারি।

মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাঙালি রক্ত দিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে।

স্বাধীনতা সংগ্রাম: ভারতের বা বিশ্বের অন্যান্য দেশের স্বাধীনতায় বীর সেনানীদের আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে।

সমগ্র বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে পাওয়া যাবে রক্তের বিনিময়ে বা জীবনের বিনিময়ে নতুন সমাজ বা নতুন ইতিহাস গড়ে ওঠে। সংসদীয় পদ্ধতিতে কখনো সমাজ পাল্টায় না। কারণ রাষ্ট্রের হাতে থাকে বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, আইনসভা এবং প্রশাসন। রাষ্ট্র কাঠামোএইসব পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্যই ব্যবহার করে। এই সংসদীয় পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। আর একদল এই বাধা অতিক্রম করতে চায়। বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে যেতে চায় । তাই সংগ্রাম সংঘর্ষ বাধে। এজন্যই বিপ্লবীরা বলে বাধা দিলে বাধবে লড়াই।

২৮

 কষ্ট সহ্য করা এক মানসিক অভ্যাস/অমৃত মাইতি 


কষ্ট সহ্য করতে করতে তা মানুষের জীবনে এক অদ্ভুত মানসিক অভ্যাসে বা শখে পরিণত হয়, যখন মানুষ আর প্রতিবাদ না করে নীরবতাকেই বেছে নেয়। এভাবেই

সহনশীলতা বৃদ্ধি পায় । বারবার আঘাত পেতে পেতে মন একসময় অসাড় হয়ে পড়ে। মনের অবস্থা তখন প্রত্যাশা শূন্য । মানুষ যখন বুঝতে পারে যে কষ্ট পাওয়ার কোনো শেষ নেই, তখন সে তা মেনে নিতে শেখে। কষ্টের মধ্যেই জীবন খুঁজে নেয়।

মন তখন আত্মরক্ষার পথ বেছে নেয়।নতুন করে আঘাত পাওয়ার ভয় থেকে মন নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং কষ্টকেই নিজের সঙ্গী করে নেয়। মন তখন আকাশ বাতাস বন জঙ্গল প্রকৃতিকে আশ্রয় করে নেয়। বেদনা ভোলার জন্য কেউ কেউ লেখালেখি করে। বেদনার পথেই লেখে। গল্প  কবিতা লেখে। কোন কোন পোড় খাওয়া মানুষ লিখে প্রবন্ধ। এই লেখালেখি এবং অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তার মধ্যে এক নতুন চেতনার আবির্ভাব ঘটে। তখন কষ্ট এক দার্শনিক চেতনায় উন্নীত হয়। সমাজ দেখে এক বেদনাহত চেতনাসম্পন্ন মানুষ।

___________________০___________________