Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ধারাবাহিক উপন্যাস চন্দ্র গোধূলি (পর্বঃ ৪)

ছবিঃ গৌতম মাহাতো
---------------------------
তাপস দত্তের ধারাবাহিক উপন্যাস চন্দ্র গোধূলি(পর্বঃ ৪)
******

 তােমার কবিতা দেহ মনে কেমন যেন কান্নার ঝংকারে—
ভরিয়ে দেয়।
-তুমি বলাে না চন্দ্র তােমার সেই কবিতা

স্নিগ্ধ নদীর তীরে আমি এক…

ছবিঃ গৌতম মাহাতো
---------------------------
তাপস দত্তের ধারাবাহিক উপন্যাস চন্দ্র গোধূলি(পর্বঃ ৪)
******

 তােমার কবিতা দেহ মনে কেমন যেন কান্নার ঝংকারে—
ভরিয়ে দেয়।
-তুমি বলাে না চন্দ্র তােমার সেই কবিতা

স্নিগ্ধ নদীর তীরে আমি একাকিনী
বসে শুধু বিরহের মালা মনে-মনে-বুনি।
কে তুমি নিশীথিনী?
থাক বৌদি থাক। আর বোলো না। আমার সত্ত্বাকে আমার কাছে থাকতে
দাও। প্লিজ ও কথা বন্ধ করে।

-জানাে চন্দ্র ও' শুধু মানে তােমার দাদা তখন এখানে থাকত। আমি
সারাদিন বাড়ির কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকতাম। আর ও যখন রাত্রিতে বাড়ি ফিরত,
ভাবতাম সারারাত দুজনে নীরব রাত্রির আকাশের দিকে তাকিয়ে গল্প করে কাটিয়ে
দেব। কিন্তু রাত্রি নামে, দিনের আলো ফোটে কিন্তু আশা শুধু আলেয়া হয়েই রয়ে
যায়।

আমার মনে হয় তোমার মাঝেই সব কিছু লুকিয়ে আছে। যা-কিছু পবিত্র
সত্ত্বা, কবিতা, সবকিছু। চন্দ্র তুমিই আমার সব। হয়ত আমি এতকাল তােমাকেই
খুঁজছি। জড়িয়ে ধরে চন্দ্রকে।
চন্দ্র চমকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।

-একি করছ বৌদি ? আমি পৃথিবীর একজন নিঃসঙ্গ সৈনিক। অনেক কষ্টে
এই আশ্রয় পেয়েছি। তুমি এটা ছিনিয়ে নিয়াে না।

-আমার মন, আত্মা, ভালবাসা সবই একজনকে দিয়েছি। প্লিজ বৌদি তুমি
আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার কোন দিন করো না।

তারপর দিন থেকে উষা বৌদি কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল।

-প্রায় একমাস পার হয়ে গেল। গােধুলির সঙ্গে দেখা হয়েছে বার কয়েক।
কিন্তু কোন কথা হয়নি। ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে পেরিয়ে গেছে চন্দ্র। দূর থেকে
দেখে ছিল চন্দ্র। হ্যাঁ, সেই গােধূলিই।

ওর পাশের দোতলা ঘরটার পশ্চিম পার্শ্বের রুমটাতে থাকে গোধূলি।
প্রায় রাতে চন্দ্র মুনাইকে পড়াশুনা করানাের পর খাওয়া সেরে মধ্য রাত্রি অবধি
জেগে থাকত। ওই সময় ডায়েরির পুরানো স্মৃতির পাতা উল্টাতে। পুরানো
দিনের স্মৃতির স্তর গুলো একে একে আবছা আঁধারে ভেসে উঠত

মুনাই-এর পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। হাতে এখন অফুরন্ত সময় চন্দ্র-এর।
সারাদিন রবীন্দ্র উপন্যাস, গল্প, কবিতা নিয়ে মেতে থাকে। প্রতিদিন মন্দিরের
পেছনের বয়ে যাওয়া সুবর্নরেখা নদীর বেলাভূমির ওপর হেঁটে বেড়ায়। জেলে
নৌকার পাল তুলে তরতরিয়ে চলে যাওয়া দেখতে চন্দ্র।

একদিন মনে মনে ভাবল প্রতিদিন তার বেড়াতে যাই। আজ বেড়ার ওই ছােট
গরীব জেলের বস্তিতে। চন্দ্র এগিয়ে দেখে সামনে তালপাতার ছাউনি দিয়ে ছােট
ছােট কুঁড়ে ঘর বানানাে। ঘর বাড়ির সংখ্যা প্রায় ত্রিশ- চল্লিশ। সামনের উঠানে
খেলা করছিল হাড় জির জিরে ছেলেগুলাে। মাথায় রুক্ষ এলােমেলাে চুল, ল্যাংটো
তার মধ্যে একটি ল্যাংটো ছােট ছেলে হাতের নখ দাঁত দিয়ে কাটছে। অভাবের
করাল থাবায় বন্দি প্রাণীগুলোর মধ্যে হাসি যেন কোথায় উড়ে গেছে। ততক্ষনে
একটি ছেলে তার মাকে ডেকে নিয়ে এসেছে। ছেলেটির মা এসেই বলল-মাস্টার
মশাই আপনি?

-আপনি আমাকে চেনেন? চন্দ্র জিজ্ঞাসা করে।

-আপনি তো ভটচার্য মশাই-এর বাড়িতে মাস্টারি পেয়েছেন। আমাদের কি
ভাগ্যি আপনি এই আমাদের গরীব বস্তিতে। ওরে বুলু একটা তালাই নিয়ে আয়
তাে। সঙ্গে সঙ্গে একটি ছােট মেয়ে তালাই উঠোনে বিছিয়ে দিলাে।

-মাস্টার মশাই বসুন, বলল বউটি।
চন্দ্র জিজ্ঞাসা করল বউটিকে-তােমার নাম কি?
 আমার নাম সরমী।
তোমরা কি কর? চন্দ্র জিজ্ঞাসা করে।
- ওই তা আমার মরদ নদীতে নৌকা করে মাছ ধরে। আর মাল গঞ্জের হাটে বেচে।



-আচ্ছা সরমী বৌদি? তােমাকে বৌদি বলে ডাকছি, কিছু মনে করলে না
তাে?

-কি যে বলেন ? মুখ লজ্জায় নামিয়ে নিল সরমী বৌদি। -আপনি খুব ভাব
মাস্টার মশাই।

কেন? চন্দ্র জিজ্ঞাসা করে।
- সেদিন পাগলা ভিখারীটাকে যখন ওই দুকানের হরদয়াল পাজি নচ্ছারটা
মারছিল একটি রুটি চুরি করেছিলাে বলে, তখন আপনি ওকে রুটি দিয়েছিলেন।
কলমিদিদি দেখে এইছে।

চন্দ্র বলে- কলমি কে?

-তারা মামির বউ। ওই যে দুরে ছােট তালপাতা দিয়ে তৈরি ঘরটা দেখছেন
এইটা ওর ঘর।
-আচ্ছা সরমী সুখেন জেলের বাড়ি কোনটা?

-যেইটাতে আপনি রইছেন। সুখেনআমার মরদ, বলে লজ্জায় মুখ ঘোমটার

আড়ালে লুকিয়ে নিল।
-মাস্টার মশাই আপনি বসুন। আমি আইছি।.... বলে সরণি চলে গেল।
হাড় জিরজিরে ছেলেগুলাে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে চন্দ্রকে নিরীক্ষন করছে। ওর

মধ্যে একটি ছােট ছেলেকে ওর সামনে ডাকলে ছেলেটি কাছে এল।

-তােমার নাম কি? চন্দ্র জিজ্ঞাসা করে।
কান্তি। ছেলেটি বলে।
    ততক্ষনে সরমী দুটো অর্ধেক পোড়োরুটি একটু ডাল নিয়ে এলাে।
-নিন মাস্টার মশাই খেয়ে নেন।

আধপােড়া রুটি দেখে, এক নিমিষে মনে হলাে দারিদ্রতা কেমনভাবে খামচে
ধরেছে; ছেলেগুলাে রুটিগুলাের দিকে তাকিয়ে আছে।

-মা আমি দুদিন খাইনি, খিদে পেয়েছে ও মা খেতে দে।

বুলুর দিকে তাকিয়ে চন্দ্র-এর দুঃখ হল। চন্দ্রের চোখ জলে ভরে আসে। চন্দ্র
ছেলেগুলােকে কাছে ডাকল বুলুকে কোলে তুলে নিলাে, -তােমরা অনেকদিন খাওনি
? এইগুলো তুমি খাও।
-না না মাস্টার মশাই ওদের কেন দিচ্ছেন? ওরা তাে খায়।
হ্যাঁ,ওরা যে কি খায় তা শরীরের অবস্থা দেখে বােঝাই যাচ্ছে।
তােমরা কে কতদিন খাওনি ? কেউ দুই, এক পিছন থেকে এক রুগ্ন বুড়ি বলে
আমি ছয়দিন কিছুই খাইনি বাবা। ছােট ছেলেদের মধ্যে কখন যে বুড়িটা এসে
দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্য করেনি চন্দ্র। কি মনে করে ওদের বলল, তােমরা বসাে। আমি
আসছি, একটু পরেই একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে চন্দ্র ফিরে এলাে।
এই নাও তােমরা। যে যত খুশি খেতে পার। সরমী বৌদি তুমি প্রত্যেকে দিয়ে

দাও।

-একি করছেন মাস্টার মশাই। এত চিড়ে, মিষ্টি এরা তাে কোনাে দিন খায়নি
একদিন না হয় খেল।

বুড়ির চোখে জলভরেএলাে। কাঁদতে কাঁদতে চন্দ্রের পায়ের কাছে বসে পড়ল।
বলতে লাগল তুমি মানুষ নও মাস্টারবাবু তুমি দেবতা।

-আরে আপনি আমার পা ছাড়ুন। আপনি আমার মায়ের সমান। আপনি
পা ছাড়ুন।

-সরমী বৌদি আজ সন্ধ্যে হয়ে আসছে আমি আসি।
    সত্যিই মাস্টার মশাই আপনি ভগবান।

নদীর বালির চর ধরে হাঁটতেলাগল চন্দ্র। সামনে জেলে নৌকার আলাে গুলো
মিটিমিটি করে জ্বলে উঠেছে। সূর্য নদীর গর্ভে আশ্রয় নিয়েছে। আনমনে চন্দ্র হেঁটে

চলেছে ধীরেধীরে। ফাগুনের দক্ষিনা বাতাস চুলগুলোতে স্নেহের পরশ দিয়ে যাচ্ছে
কোন দিন উষা বৌদিকে টাকা হাত পেতে চায়নি চন্দ্র। বৌদি নিজেই দিয়েছে
আজ চাইবে চন্দ্র এই গরীবদের জন্য। ওদের এক মুঠো ভাতের জন্য। সত্যই
নিজেকে ভাবতে অবাক লাগল চন্দ্রের নিজে ভিখিরী আবার, ভিক্ষে দানের শখ।

এক মাস হয়ে গেছে গােধূলি বাড়ি এসেছে। গােধূলি অনেক ভেবেছি।হ্যাঁ,
দেখা হয়েছে ওই চন্দ্রের সঙ্গে। কিন্তু মনে পড়ছে না কোথায়?

গােধূলি ভাবতে লাগল , তাই যদি হয়, চন্দ্রও চিনতে পারতাে। ও প্রায় মাথা
নিচু করে চলে যায়। হয়ত বা আমার ভুলই হচ্ছে। হয়ত সে অন্য কেউ ছিল। ও
দেখেছে, প্রায় চন্দ্র কেমন যেন উদাসীনতায় ছেয়ে থাকে। কোন চঞ্চলতা নেই।
অস্থিরতা নেই। কেমন যেন, ওই আকাশের নীল ধ্রুবতারার মতো স্থির। আজ
কথা বলবেই গোধূলি। কিন্তু কী কথাবলবে ? মনে যে দুর্বলতা বাসা বেঁধেছে। তাই
যে আমি তােমায় ভালবাসি। দুর আমি বলতে পারব না। কেমন লজ্জ্বা করে।
আবার ভয়ও করে। একটি চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে গােধূলির হৃদয় থেকে।

এই তো আজ এসেছিল কথা বলবে বলে। কিন্তু দক্ষিণ-এর দোতলার দরজা
হাট করে খােলা। চন্দ্রকে কাছাকাছি দেখা গেল না। চারিদিকে শুধু বই ছড়ানে
রয়েছে খাটের ওপর। বিছানাও অনেক দিন পরিষ্কার করেনি। গােধূলি এক এক
করে সব গােছায়, বই, বিছানা। ঠিক করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় চোখ পড়ল
জানালার দিকে। জানালার নিচের তাকের ওপর একটা মােটা ডায়েরী। প্রথমে
ভাবল পড়বে। কিন্তু পরক্ষনেই ভাবল পরের ডায়েরী দেখা উচিত নয়। কেউ ছাদে
আসতে পারে, এই ভেবে গােধূলি দোতলার বারান্দায় এলাে।
*************
 ........ চলবে