Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ক্যাসিওপিয়া সাহিত্য পত্রিকার দৈনিক সেরা সম্মাননা

ভালোবাসা জীবনভর

পৃথ্বী ব্যানার্জী

ক্লাস ইলেভেনে যখন পড়ি তখন থেকে আমার প্রেম করার সখ। কিন্তু আমার সাথে কে আর প্রেম করবে! রোগা বেটে চোখে বোতল ভাঙা কাচের চশমা। গরীব প্রাইমারী  মাষ্টারমশাই এর ছেলে। চার ভাইবোনের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা।  পর…


ভালোবাসা জীবনভর

পৃথ্বী ব্যানার্জী
                                   
ক্লাস ইলেভেনে যখন পড়ি তখন থেকে আমার প্রেম করার সখ। কিন্তু আমার সাথে কে আর প্রেম করবে! রোগা বেটে চোখে বোতল ভাঙা কাচের চশমা। গরীব প্রাইমারী  মাষ্টারমশাই এর ছেলে। চার ভাইবোনের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা।  পরণে পায়জামা সার্ট। না গান গাইতে পারি। না খেলাধূলায় ভালো।মুখের ভাষায় বাঙাল টান।  গরীব উদ্বাস্তুদের স্কুলের ফার্স্ট বয়। কিন্তু ওতে প্রেমের বাজারে চিড়ে ভেজে না।
আমি যে স্কুলে পড়তাম সেই স্কুলেরই গার্লস শাখায় ক্লাস টেনে পড়তো মাধবী। বড় বড় চোখের এই লম্বা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মাধবীই ছিল আমার মানসী। আমরা দুজন একই কোচিং ক্লাসে পড়তাম। ওখানেই ওকে দেখতাম আর কবিতা লিখে আমার কবিতার খাতা ভরাতাম। কিন্তু কতদিন নীরব প্রেমিক হয়ে থাকবো।?মাধবীর মনোভাব  বুঝতে  পারতাম না। মাথা নিচু করেই থাকতো। 
কোচিং ফেরৎ এরকমই এক সন্ধ্যায় দুঃসাহসে ভর করে মাধবীর হাতে  প্রেমপত্র গুঁজে  দিয়েছিলাম। নিজের কবিতার উপর ভরসা না করতে পেরে রবীন্দ্রনাথের “তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা। তুমি আমারই সাধের সাধনা” দিয়ে শুরু করে মাধবীর নাম ঢুকিয়ে “হে মাধবী! । ভীরু  মাধবী এত দ্বিধা কেন?” পর্যন্ত আবেগে লিখেছিলাম।
 আমি খেয়াল করি নি। দমদম থানার একজন হোমগার্ড সেদিন মাধবীকে নিতে এসেছিল।মাধবীকে  চিঠি গুঁজে দেওয়ার ব্যাপারটা তার নজর এড়ায় নি। আসলে মাধবীর বাবা তখন দমদম  থানার জাঁদরেল সেকেণ্ড অফিসার। পরের দিন সকালে  থানায় আমার ডাক পড়েছিল।
“এই বয়সেই বদমাইশি শুরু করেছিস!ভদ্রঘরের মেয়েদের ফুসলাতে যাস। কেন বেশ্যাবাড়ি যেতে পারিস না?”বলতে বলতে রুলার দিয়ে মাধবীর বাবা আমাকে তার অফিস ঘরের দরজা বন্ধ করে মেরেছিলেন।   মারে আমার সর্বাঙ্গ  ফুলে গিয়েছিলো। বাড়ি ফিরে তিনদিন জ্বরে বেহুশ ছিলাম। এই আমার প্রথম প্রেমের  সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।                                               
 তিন বছর পরের কথা। প্রেসিডেন্সিতে ফিজিকস অনার্স  নিয়ে পড়ি। কলেজ ফেরৎ বাস থেকে নামতে হয় তিন রাস্তার মোড়ে আমার পুরনো কোচিং সেন্টারের সামনে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। ফাঁকা  রাস্তা। টিমটিম করে রাস্তার আলো জ্বলছে । পা চালিয়ে একটা পুরনো বটগাছের নীচে একটা জীর্ণ মন্দিরে কোনরকমে আশ্রয় নিয়েছি। বুকটা ধড়াস করে উঠলো। এক কোনে জড়সড়  হয়ে  মাধবী অাধভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বোধহয় কলেজ থেকে একা ফেরার পথে বৃষ্টিতে আটকে গেছে।  তখনো মাধবীকে ভালোবাসতে গিয়ে আমার প্রথম প্রেমের গ্লানি ভুলতে পারি নি। দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। একসময় আমিই নীরবতা ভাঙলাম,“মাধবী কেমন আছো?”মাধবী দু পা আমার দিকে এগিয়ে এলো। অস্ফুটে বলল,“আপনি আজো বোধহয়  আমায় ক্ষমা করতে পারেন নি।” "না তা নয়। আমি জানি তোমার কোন দোষ ছিল না। ”   “আমি সেদিন সারারাত  কেঁদেছিলাম। আজো আমি দূঃস্বপ্ন দেখি বাবা আপনার উপর অত্যাচার করছে।”মাধবী কাঁপা কাঁপা গলায বললো।
বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ভাঙা মন্দিরে শুধু আমি আর মাধবী।    কে যে আমার ভেতর থেকে বলাল,“মাধবী আমি আজো তোমায় ভালো------। ”পুরোটা শেষ করার আগেই মাধবী হাত দিয়ে আমার দুই ঠোট চেপে ধরলো,“না এরকম করে নয়। সারা জীবন ধরে একটু একটু করে বলবে ‘তোমাকে ভালোবাসি’। ” 
এই সংক্ষেপে  আমার প্রথম ও শেষ প্রেম।আসলে আজো আমার শেষ প্রেম শেষ হয় নি। মাধবী আজ আমার পয়ত্রিশ বছরের ঘরণী। আমরা দুজন দুজনকে আজো একটু একটু করে বলে চলেছি,“তোমাকে  ’ভালোবাসি‘। ”