Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ক্যাসিওপিয়া সাহিত্য পত্রিকা দৈনিক সেরা সম্মাননা

পশ্চাৎধাবন

অনির্বান মুখোপাধ্যায়

--------------------------------

উইলিয়াম শেক্সপীয়ার বলেছিলেন – নামে কি এসে যায়! তিনি নিশ্চয়ই আমার মত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন নি। হলে এত সহজে এ কথা বলতে পারতেন না। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই ঘটনার স্মৃতি…


পশ্চাৎধাবন

অনির্বান মুখোপাধ্যায়

--------------------------------

উইলিয়াম শেক্সপীয়ার বলেছিলেন – নামে কি এসে যায়! তিনি নিশ্চয়ই আমার মত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন নি। হলে এত সহজে এ কথা বলতে পারতেন না। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই ঘটনার স্মৃতিচারণায় যে দু-একটি কিঞ্চিৎ অশ্লীল শব্দের অবতারণা হয়েছে -- তার জন্যে এই মিয়াঁ একেবারেই দায়ী নয়। দায়ী যদি কেউ হয়, সে হলো নব্বই-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হোস্টেলের অত্যন্ত শুদ্ধ বাংলা শব্দভান্ডার।

আর বেশি ভনিতা না করে আসল কথায় আসা যাক। ১৯৯০ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হওয়ার সুবাদে আমাকে হোস্টেলে থাকতে হয়। রাগিং পিরিয়ডে সিনিয়রদের অসাধারণ আদরে আমরা প্রত্যেকে পিতৃদত্ত নাম ভুলে গেছিলাম। এক বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারের মত আমরা হোস্টেল-লাইফ কে পাগলের মত ভালোবেসেছি এবং সিনিয়রদের দেওয়া নামেই আমরা আজও একে অন্যকে ডেকে থাকি। বেশিরভাগ বন্ধুরই আসল নাম জিজ্ঞেস করলে আমাদের ঢোঁক গিলে হার মানতে হবে। আমি অনির্বান থেকে হয়ে গেছি হাসু, অমিতাভ হয়ে গেছে ব্রেক, পার্থ হয়ে গেছে লেদু , সুদীপ হয়ে গেছে পেড্রো -- এরকম অজস্র উদাহরণ আছে। সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই নামগুলো ভদ্র সমাজে ব্যবহারের অযোগ্য ছিল। আমরা সে সবের তোয়াক্কা না করেই অম্লানবদনে সে নাম ব্যবহার করতাম এবং সে নামের অধিকারীও সে ডাকে সাড়া দিতো।

পরিস্থিতি যে মাঝে মাঝে জটিল হয়ে উঠতো -- তা বলাই বাহুল্য। একবার পুজোর ছুটিতে বৌদির (শুভেন্দু) বাড়ি গেছি। কলিং বেল বাজাতেই এক ভদ্রলোক (বৌদির বাবা) বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন -- কি দরকার? আমি খুব বিনীত ভাবে বললাম -- বৌদি আছে? একটু দরকার ছিল। এ কথা শুনেই ভেতর থেকে এক ভদ্রমহিলা (বৌদির মা) বেরিয়ে এসে বললেন -- কি দরকার? আমি আবার বিনীত ভাবে বললাম -- বৌদি বাড়ি নেই? কাকু-কাকিমা যখন বেশ বিস্ময় আর বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, তখন হঠাৎ দেবদূতের মত ভেতর থেকে বৌদির আবির্ভাব হলো। আমাকে দেখেই উচ্ছসিত হয়ে বললো -- আরে, আয় আয়। তারপর বাবা-মার দিকে ফিরে বললো -- ও আমার কলেজের বন্ধু হাসু, না মানে, কি যেন নাম তোর? আমি তখন শুরুর ধাক্কা কাটিয়ে বলেছিলাম -- আমি অনির্বান মুখোপাধ্যায়। সেদিনই মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো -- বৌদির নাম শুভেন্দু বিকাশ মুখার্জী।

কিন্তু আজকের স্মৃতিচারণা পোঁদকে নিয়ে। না,না -- পোঁদ ওর আসল নাম নয়। ওর আসল নাম প্রদীপ বিশ্বাস। পশ্চাৎদেশ কিঞ্চিৎ মোটাসোটা হওয়ার সুবাদে সিনিয়ররা আদর করে ওর নাম রেখেছিলো পোঁদ। পোঁদের এ নিয়ে কোনো ক্ষোভ ছিল না। চারবছর ধরে ওকে পোঁদ বলেই ডেকেছি আর ও সে ডাকে সাড়াও দিয়েছে। শান্তশিষ্ট পোঁদের কাছে আমরা সবরকম সহযোগিতা পেতাম। রাগিং পিরিয়ড থেকে শুরু হওয়া চার বছরের অভ্যেসে ওর আসল নাম বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম।

তারপর কলেজ ছেড়ে আমরা কর্মজীবনে প্রবেশ করি। তখন সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। কতিপয় অতি ভাগ্যশালী লোক সবে মোবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করেছে। ইনকামিং কল মিনিটে ৭ টাকা ৫০ পয়সা। আউটগোয়িং কল করতে হলে কিডনি বিক্রি করতে হতো। একটা ছোট ডায়েরীতে সব বন্ধুর নাম-ঠিকানা লেখা ছিল -- পরে আবার যোগাযোগ করবো এই আশায়। কর্মজীবন শুরু হলো কলকাতায়। এমত অবস্থায় অফিস যাবো বলে সামনের গেট দিয়ে বাসে উঠেছি। বাসে বেশ ভিড়। হঠাৎ পেছনের গেটের ঠিক সামনে দেখি ব্লেজার গায়ে দিয়ে পোঁদ দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় বছর দুই পর ওকে দেখতে পেয়ে আমি স্বভাবতই উত্তেজিত। জগৎ-সংসার ভুলে চেঁচাতে শুরু করলাম -- এই পোঁদ, কেমন আছিস ? সারা বাসের সঙ্গে পোঁদও আমার দিকে ঘুরে তাকালো এবং তাকিয়েই না চেনার ভান করে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। এদিকে বন্ধুপ্রেমে আমি তখন প্রায় পাগল। ভিড় বাসের জনতাকে ঠেলে পেছন দিকে চললাম বলতে বলতে -- একটু জায়গা দেবেন প্লিজ, পোঁদের কাছে যাবো। সবাই একথা শুনে বেশ সম্ভ্রমের সঙ্গে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছিলো। পোঁদ কিন্তু চোয়াল শক্ত করে নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পোঁদের সঙ্গে দূরত্ব যখন মাত্র হাত দুয়েক এবং সারা বাস আগ্রহ নিয়ে দেখছে আমি পোঁদের কাছে পৌঁছোতে পেরেছি কি না, হঠাৎ প্রায় চলন্ত বাস থেকে পোঁদ নেমে গেলো। আমারও তখন জেদ চেপে গেছে। পোঁদ কি আমায় চিনতে পারেনি? আমিও মিনিট খানেকের মধ্যে ওই বাস থেকে নেমে পেছনদিকে হাঁটা দিলাম পোঁদের সন্ধানে। একটু দূরে পোঁদকে দেখতে পেয়ে যেই ডেকেছি -- এই পোঁদ দাঁড়া, দেখি ও উল্টোদিকে প্রায় দৌড়োতে শুরু করেছে। রাস্তার পাশে কয়েকজন বয়স্ক ভদ্রলোক চা খাচ্ছিলেন। আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন -- অসভ্য ছেলে, মেরে পোঁদের চামড়া ছাড়িয়ে নিতে হয় ! তাহলে কি পোঁদ এদের ভয়েই পালিয়ে গেলো !

এর প্রায় মাস ছয় পরে হঠাৎ প্রসের (প্রসেনজিৎ) সঙ্গে রাস্তায় দেখা। পোঁদ ওর রুমমেট ছিল। প্রসকে পোঁদের পলায়ন প্রসঙ্গ বলতেই ও বলেছিলো -- ওর ভালো নাম তো প্রদীপ বিশ্বাস। সেই নাম এখনও আমার মাথায় গেঁথে আছে।

এর প্রায় বছর দশেক পরে কলেজ রিইউনিয়ন-এ সহপাঠীদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা মারছি। দূর থেকে হাসিমুখে পোঁদকে আসতে দেখেই বলে উঠেছিলাম -- ওই দেখ, প্রদীপও এসেছে। বাকি সবাই সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিল -- সে মালটা আবার কে ?

"চুপ কর, শোন-শোন, বেয়াকুল হোসনে

ঠেকে গেছি বাপরে কী ভয়ানক প্রশ্নে!"