Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ক্যাসিওপিয়া সাহিত্য পত্রিকা দৈনিক সেরা সম্মাননা

#পারদ্ধ
চিন্তনে ও কলমে : কথা ছবি কর

নব্বই বছর বয়সে ধনপতি সরকার প্রভূত ধনসম্পদ  পুত্র পুত্রবধূ মেয়েজামাই নাতিনাতনি রেখে মারা গেলেন। এলাহী আয়োজনে তার শ্রাদ্ধশ্রান্তি মিটলো। সবাই ধন্য ধন্য করলো। কেউ কেউ আলোচনা করলো অনেক সৌভাগ্যে না…


#পারদ্ধ
চিন্তনে ও কলমে : কথা ছবি কর

নব্বই বছর বয়সে ধনপতি সরকার প্রভূত ধনসম্পদ  পুত্র পুত্রবধূ মেয়েজামাই নাতিনাতনি রেখে মারা গেলেন। এলাহী আয়োজনে তার শ্রাদ্ধশ্রান্তি মিটলো। সবাই ধন্য ধন্য করলো। কেউ কেউ আলোচনা করলো অনেক সৌভাগ্যে নাকি এমন মৃত্যু হয় । মৃত্যুকালে সবাইকে পাশে পেয়েও ছিলেন।

ধনপতির আত্মাকে নিয়ে যমদূত চললো পরপারে। পথে ক্লান্ত ধনপতি যমদূতকে বললো তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসছে জল দিতে । যমদূত জানিয়ে দিল , যতক্ষণ না পর্যন্ত যমরাজ তার কর্মফলের বিচার করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত  কিছু দেবার অনুমতি নেই । ধনপতি বললো তুমি কি জানো না আমি কত বড় প্রভাবশালী , প্রায় কুবেরের সমান ধনসম্পত্তির মালিক আমি । আমার এক ইশারায় দেশের বড় বড় নেতা মন্ত্রীরা প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলে আর তুমি আমাকে এক গ্লাস জল পর্যন্ত দিতে পারছোনা । আচ্ছা , বেশ মিনারেল ওয়াটার লাগবেনা , ডাবের জল লাগবেনা শুধু একটু জল তো দাও ....তেষ্টায় খুব কষ্ট হচ্ছে । যমদূত কোন উত্তর না দিয়েই চলতে লাগলো । পিছন পিছন চলছে ধনপতি সরকার , যিনি কিনা নিজেকে একসময় পৃথিবীর সরকার মনে করে গর্ববোধ করতেন।
পথ চলতে চলতে ক্লান্ত অবস্থায় তার মনে আসলো , একটা গান শুনেছিলেন ' সজন রে ঝুট মত বোলো ..খোদা কে পাস জানা হ্যায় ..না হাথি হ্যায় না ঘোড়া হ্যায় ..বাঁহা পায়দল হী জানা হ্যায় ....সজন রে ঝুট মত বোলো ' । মনে মনে ভাবছেন শরীরে যতদিন ছিলেন পৃথিবীতে গানটা কতবার শুনেছেন কিন্তু গানটার মর্মার্থ পুষ্টি ভিতরে হয়নি তাই নিজের ছোট বড়ো সামান্য থেকে সামান্য স্বার্থেও কত মিথ্যা বলেছেন , কোন কথাকে  রঙ মাখিয়েছেন , কোনটাকে নিজের সুবিধামতো কাটছাঁট করেছেন । সবার মতো তিনিও বেঁচে থাকতে মনেই করেনি যে পরপারের পথে কোন সঙ্গীসাথী পাবেনা , কোন যানবাহন থাকবেনা , একটা টাকাও সাথে নিতে পারবেনা ....অচেনা অজানা পথে একার যাত্রা ।
...আচ্ছা কোন পুকুর বা নোংরা নালার একটু জল দাও না ...খুব খুব কষ্ট হচ্ছে যমদূতের কাছে বিনতী করছেন ।
যমদূত কোন কথার কর্ণপাত না করেই  চলছেন ...পিছন পিছন ধনপতি ।
ধীরে ধীরে অন্ধকার বাড়ছে । কোথাও পথ কাঁটায় ভরা , কোথাও শক্ত পাথর , কোথাও জ্বলন্ত আগুন , কোথাও কাদায় ডুবে যাচ্ছে , কোথাও পিচ্ছিল ,  কখনো পচা গন্ধ , কখনো আঁশটে , কখনো ভয়ার্ত , ভয়াল , ভয়ঙ্কর রূপের মধ্যে দিয়ে ক্লান্ত পিপাসার্ত ক্ষুধার্ত হয়েই চলছে আঁধার পথে .....একা ....এই চলার শেষ কোথায় তাও জানা নেই ......
এখানে দিন নেই , রাত নেই । পৃথিবীর মতো  সময়ের হিসাব বছর মাসে নেই । না জানি কতকাল এভাবে অন্ধকার পথে আসার পর যমদূত তাকে নিয়ে এল যমরাজের সামনে । যমরাজের হিসাবরক্ষক চিত্রগুপ্ত প্রত্যেকের প্রতিটি কাজকর্ম , ভাবনাচিন্তারও হিসাব লিখে রাখেন ।
যথারীতি ধনপতির দীর্ঘ নব্বই বছরের জীবনের প্রতিটি মূহূর্ত্বের কাজ ভাবনা সমস্তটাই চিত্রপটে ফুটে উঠলো । অনেক ভাবনা , কাজের জন্য নিজেই লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল , অনেক অনুশোচনা হচ্ছিল , টেলিভিশনের পর্দায় সিরিয়াল দেখার মতো তার পুরো জীবনপঞ্জি ফুটে উঠলো । করে আসা ভালো কাজের জন্য আনন্দ হচ্ছিল , খারাপ কাজের জন্য দুঃখ হচ্ছিল ।

সম্পূর্ণ দেখা শেষ । এবার যমরাজ বিচার করবেন ।

ধনপতি তুমি সুদীর্ঘকাল শারীরিক প্রায় সুস্থতা নিয়ে বেঁচে ছিলে । সেটার কারণ তোমার পূর্বজন্মের পারদ্ধ । তোমাকে তোমার পূর্বজন্মের কিছু অংশ মনে করিয়ে দিই । সেইজন্মে তুমি ডাক্তার হয়ে অনেক মানুষের সেবাশুশ্রুষা করেছো । বিনিময়ে কোন অর্থ নিতেনা তাই এইজন্মে ধনপতি হয়ে প্রচুর ধন আর দীর্ঘ সুস্থ জীবন পেয়েছিলে । এইজন্মে অনেক ভোগবিলাস পেয়েছো । কিন্তু ভোগবিলাসী জীবন কাটাতে কাটাতে তুমি অহংকারী হয়ে উঠেছিলে। মনে করছিলে তোমার ধন আছে তাই সব সব তোমার । তুমি সেই ভাবনা নিয়ে আরো আরো ধন ,  ক্ষমতা , প্রভাব বাড়াতে মগ্ন হয়ে ভুলে গিয়েছিলে এসব মাত্র কিছু সময়ের জন্য ..খুব বেশি জীবন পেলেও নব্বই বা একশো । তার আগেও তুমি ছিলে , এসব ছিলনা বা তার পরেরও তুমি থাকবে কিন্তু এসব থাকবেনা এই সাধারণ কথাটা ভুলে ছিলে । তাই মনে করতে আমার ছেলে , আমার মেয়ে , আমার নাতি , আমার ধন , আমার বাড়ি , আমার ডিগ্রী , আমার জ্ঞান , আমার সৃষ্টি ....আমি আমিত্ববোধে মোহান্ধ  হয়েছিলে । কিন্তু দেখো ধনপতির আগেও তোমার কতবার জন্ম হয়েছে । কতবার কত সন্তান , কত সৃষ্টি সঞ্চয় রেখে এসেছো । তুমি সেসব আজ মনেও করতে পারোনা । অথচ একদিন তাদের জন্য কত ভাবনা কত কিছু ..... যাদের জন্য তুমি ন্যায্য অন্যায়বোধও হারিয়েছিলে আজ তারা কেউ তোমার সাথে নেই , আজ তুমি তাদের চেনো না , কে তোমার মা , কে তোমার বাবা তাও তোমার জানা নেই । এই পারে এলে ওই পারের স্মৃতি মুছে যায় । ওপারের মানুষরাও এপারের কিছু জানতে পারেনা । তাই সবাই সবার পূর্ব পূর্ব বহু জন্মের কৃতকর্ম এবং চিন্তাভাবনার পারদ্ধ ফল অনুসারে জন্ম নেয় ....আবার পারদ্ধ সৃষ্টি করে ....মারা যায় ।
 যমরাজ ধনপতির বিচার করে বললেন , ধনপতি নামের জন্মে তুমি বেশিরভাগ কাজই করেছিলে নিজের স্বার্থে । তুমি বেশ কিছু স্কুল , মন্দির , মসজিদ বানিয়েছিলে । দুঃস্থদের অনেক অর্থ সাহায্যও করেছিলে ।  যদিও সেসব কাছের পিছনে প্রচ্ছন্নভাবে তোমার মনের মধ্যে ' আমি করেছি ' এই অহংবোধ ছিল তাই তোমার কৃত সব কাজ , সব চিন্তা কোনটা তামসিক কোনটা রাজসিক । মানুষের সমাজে তামসিক বা রাজসিক কাজে অনেক যশ , মর্যাদা , সম্মান , সুনাম , বদনাম কৃতিত্ব ইত্যাদি থাকে । তাই তোমার মৃত্যুতে অনেক মানুষ পৃথিবীতে শোক করছে , কেউ তোমার সুনাম করছে , কেউ ভাবছে ভালোই হয়েছে ...তোমার অধিষ্ঠিত চেয়ারের অধিকার এখন তার /তাদের হয়েছে । কেউ কেউ তোমার স্মৃতিতে তোমার নামে রাস্তার নামকরণ করছে , কেউ কেউ তো মন্দিরের ভগবানও বানিয়ে বসিয়েছে তোমার সেই ধনপতি শরীরটার স্থাপত্য বানিয়ে । কেউ গালমন্দও করছে , কেউ তোমার নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যবসা করছে , এসবও কিছুকালের জন্য । তুমি দেখতেও পাচ্ছোনা , জানতেও পারছোনা কে কি করছে । যারা যা করছে সেটাই তার পারদ্ধরূপে লিখে রাখা হচ্ছে চিত্রগুপ্তের খাতায় । তারাও সবাই একদিন আমার সামনে আসবে , তাদেরও বিচার হবে । এখানে কোন কারচুপি নেই । মনের প্রচ্ছন্নে যে ভাবনা থাকে সেটাও ধরা থাকে এখানে তা