Page Nav

HIDE

Post/Page

Weather Location

Breaking News:

latest

ক্যাসিওপিয়া-সাহিত্য-পত্রিকার-দৈনিক-সেরা-সম্মাননা

বিভাগ - গল্পশিরোনাম - হ্যাপি মাদার্স ডে কলমে - মৌমিতা ভট্টাচার্য্যতারিখ - 27.09.2020 
ক্লাস ওয়ানের ছোট্ট দিয়া, একেবারে শান্ত প্রকৃতির। ক্লাস টিচার হিসাবে দিয়াকে বেশ ভালোই লাগে রোহিনীর। কিন্তু আজ যেন মেয়েটা একটু বেশি রকমের চুপচাপ।…

 


বিভাগ - গল্প

শিরোনাম - হ্যাপি মাদার্স ডে 

কলমে - মৌমিতা ভট্টাচার্য্য

তারিখ - 27.09.2020 


ক্লাস ওয়ানের ছোট্ট দিয়া, একেবারে শান্ত প্রকৃতির। ক্লাস টিচার হিসাবে দিয়াকে বেশ ভালোই লাগে রোহিনীর। কিন্তু আজ যেন মেয়েটা একটু বেশি রকমের চুপচাপ। পড়াতে পড়াতে রোহিনী লক্ষ্য করে দুদিকে ঝুঁটি বাঁধা ফর্সা টুকটুকে দিয়ার পড়ায় একেবারেই মন নেই। হাতে পেন্সিল, সামনে খোলা খাতা, কিন্তু ক্লাস ওয়ার্ক করছে না। মাঝে মাঝেই মাথা নীচু করে ব্যাগে ঠেকাচ্ছে, আবার সোজা হয়ে বসছে।


  সবে মাত্র চতুর্থ বার ব্যাগে মাথাটা রেখেছে দিয়া ; রোহিনী পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ায় দিয়ার সামনে। হাল্কা স্বরে ডাকে,

- দিয়া.. 


  ম্যামের গলার শব্দ শুনে উঠে দাঁড়িয়ে তাকায় দিয়া,

- ইয়েস ম্যাম।


  দিয়ার চোখ দুটো ভীষণ লাল, রোহিনী বলে,

- তোমার শরীর কি অসুস্থ দিয়া?


  দিয়া মাথা নীচু করে চুপ করে থাকে। রোহিনী মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

- মন খারাপ দিয়া?


  দিয়ার কপাল ছুঁয়ে যায় রোহিনীর হাত। চমকে ওঠে রোহিনী। জ্বরে মেয়েটার গা পুড়ে যাচ্ছে। রোহিনী বলে, - তোমার তো ভীষণ জ্বর। কখন থেকে জ্বর এসেছে? স্কুল এলে কেন?


  উত্তর দেয় না দিয়া। বেঞ্চ থেকে দিয়ার হাত ধরে তাকে টিচার্স রুমে নিয়ে আসে রোহিনী। একটা চেয়ারে বসায়, বাচ্চা মেয়ে বাড়িতে কী ওষুধ খায় জানা নেই, স্কুলে ওই ভাবে ওষুধও দিয়ে দেওয়া উচিত নয়।রোহিনী নিজের ওড়নার একটু অংশ জলে ভিজিয়ে দিয়ার কপালে চেপে ধরে। টিচার্স রুমে সকলেই বলেন ওর বাড়িতে ফোন করে ওকে নিয়ে যেতে বলাই ভালো হবে।


  দিয়ার কপালটা জলপট্টি দিয়ে একটু ঠান্ডা হলেও জ্বরের ঘোরে মেয়েটা ঝিমিয়ে পড়ে আছে। ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে দিয়ার আই কার্ডে লেখা ফোন নম্বরে ফোন করে রোহিনী। বেশ কয়েকবার রিং হতেই শোনা যায় ওপারে পুরুষ কন্ঠ, দিয়ার বাবা। রোহিনী ঘটনা জানানোয় স্পষ্ট উদ্বিগ্ন স্বর,

- ম্যাডাম, আমি তো অফিসের কাজে সাইটে বেরিয়ে এসেছি, এখনই বেরিয়ে পড়লেও তিনটে - সাড়ে তিনটের আগে কিছুতেই পৌঁছতে পারব না। ওর স্কুল দুটোয় ছুটি হয় বলে যে মাসি ওকে দেখাশোনা করেন সে দেড়টার পর স্কুলে আনতে পৌঁছে যাবে, কিছুক্ষণ আপনারা ওকে স্কুলে রাখলে খুব ভালো হয়।


  সব শুনে বিরক্ত লাগে রোহিনীর, একটু বিরক্ত হয়েই প্রশ্ন করে,

- দিয়ার মা আসতে পারবেন না?


  আন্টির মুখে এই প্রশ্ন শুনে আলতো চোখ মেলে দিয়া, ক্লান্তিতে আবার চোখ বুজে ফেলে। ওপারে দিয়ার বাবা বলেন,

- দিয়ার মা নেই ম্যাডাম।


  রোহিনী চমকে ওঠে। সে ক্লাস টিচার অথচ একথা সে জানে না! চোখ বুজে পড়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটার মুখের দিকে একবার তাকায় রোহিনী। আবারও বলে,

- যে মাসির কথা বলছেন তাকেই একটু তাড়াতাড়ি আসতে বলুন, দিয়া অসুস্থ, খুবই অসুস্থ।


  ফোন রেখে দেয় রোহিনী। মেয়েটার মা নেই! একমাস প্রায় হতে চলল এই স্কুলে ওয়ানে ভর্তি হয়েছে দিয়া। এখনও ক্লাস টিচার হিসাবে স্টুডেন্টদের সব কিছু দিয়ার নখদর্পণে হয়ে ওঠেনি ঠিকই, তা বলে রোহিনী পেরেন্টস নেমের কলামে একটু লক্ষ্য করল না, যে এই বাচ্চাটির মা নেই!


  প্রিন্সিপাল ম্যাম খবর পেয়ে নেমে এসেছেন দিয়ার কাছে। তাকে সামনে পেয়ে রোহিনী সব কিছু জানায়। তবে দিয়ার সামনে তার মায়ের প্রসঙ্গে কোনও আলোচনা দুজনেই করেন না, এটা উচিতও নয়। রোহিনী বলে,

-কি করা যায় ম্যাডাম? এত জ্বর, ওষুধ না দিয়ে বেলা দুটো পর্যন্ত রাখা সম্ভব? এই তো মাত্র সাড়ে এগারোটা বাজে।

-তাই তো। তুমি কি ওর বাবার কাছে জেনেছ দিয়া জ্বরে কি ওষুধ খায়? তাহলে সেই ওষুধটুকু আমরা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। জ্বরটা তো আগে কমাতে হবে।


  রোহিনী বলে সেটা আমার জানা হয় নি, আমি আর একবার ফোন করে বরং জেনে নিচ্ছি। বলতে বলতেই রোহিনী দেখে দিয়া সেন্সলেস হয়ে পড়েছে। সকলে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন, দিয়ার চোখে মুখে জল দেয় রোহিনী। দিয়া একই ভাবে অচেতন। রোহিনী প্রিন্সিপালকে বলে,

-ম্যাডাম আপনি যদি পারমিশন দেন আমি তাহলে দিয়াকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই। আমার বাড়ির কাছেই একজন চাইল্ড স্পেশালিস্ট থাকেন, এই সময় তাকে আমি বাড়িতে পেয়েও যাব।


  প্রিন্সিপাল ম্যাম স্বস্তি পান। বলেন,

- তাই যাও। আমি দিয়ার বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি। তুমি ডাক্তার দেখিয়ে আমাদের সাথে যোগাযোগ করে নিও। আর কেয়াকে নিয়ে যাও, একা যেও না। আমার এখনই একটা মিটিং আছে, আমি তাই যেতে পারছি না। তোমরা আমার গাড়ি নিয়ে চলে যাও।


  দিয়াকে কোলে তুলে বেরিয়ে যায় রোহিনী আর কেয়া। ডাঃ মিত্র বাড়িতেই ছিলেন। দিয়াকে একটা ইঞ্জেকশন দেন। রোহিনী চোখ বন্ধ করে নেয়, বাচ্চাটার এই যন্ত্রণা সে চোখে দেখতে পারে না। ডাঃ মিত্র বলেন,

-ওষুধ যা দেওয়ার দিলাম। আশা করি কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে। টেম্পারেচার অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে।


  ওষুধ সব কিছু বুঝে নিয়ে দিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে আসে রোহিনী আর কেয়া। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে সব ওষুধ কেনে রোহিনী। গাড়িতে ফিরে এসে কেয়াকে বলে,

-এই অবস্থায় দিয়াকে নিয়ে আর স্কুল ফিরছি না। আমি দিয়াকে নিয়ে আমার বাড়িতে যাচ্ছি। তুমি প্রিন্সিপাল ম্যামকে একটু বলে দিও, আমি পরে ওনাকে ফোন করে নেব। আর দিয়ার বাবাকেও ফোন করে দিচ্ছি। রোহিনীর বাড়িতে দিয়াকে রেখে স্কুল ফিরে আসে কেয়া। রোহিনী তার বাড়ি থেকে দুটো বাড়ি পরের বাড়িতে গিয়ে রুমকির একটা ফ্রক চেয়ে নিয়ে আসে। দিয়ার স্কুল ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রক পরিয়ে দেয়। তার পাশে বসে মাথায় হাত বুলোতে থাকে। রোহিনী শাশুড়ি মা সবটা বুঝে উঠতে পারেন না। কাছে এসে বলেন,

-বৌমা, তোমার স্কুলের ছাত্রী বুঝতে পারছি, কিন্তু এভাবে বাড়িতে নিয়ে এলে! কি হয়েছে ওর?


  দিয়ার মুখের দিকে একই ভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রোহিনীর চোখ থেকে দু'ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ে দিয়ার উষ্ণ কপালে। রোহিনী বলে,

-মা দেখুন, আমায় ছেড়ে চলে যাওয়া আমার সেই মেয়েটা না? যাকে আমি পৃথিবীর আলো দেখাতে পারিনি। আজ আমার কাছে কেমন করে ফিরে এসেছে।


  রোহিনীর শাশুড়ি মায়ের চোখেও জল। দিয়ার জ্ঞান ফিরলেও ঘুমিয়ে ছিল মেয়েটা। চোখ খুলে ডাকে,

- মা।


  রোহিনী ঝুঁকে পড়ে দিয়ার সামনে,

- বল মা, বল। খুব কষ্ট হচ্ছে? কি হয়েছে বল?


  দিয়া রোহিনীর গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে,

- মা, মা..


  বিকাল প্রায় চারটে বাজে। দিয়ার বাবা রোহিনীর বাড়িতে আসেন হন্তদন্ত হয়ে। এসে দেখেন মেয়ের জ্বর অনেকটাই কম। বিছানায় বসে দিয়া তার আন্টির সাথে গল্প করে চলেছে, রোহিনী দুধের গরম গ্লাস হাতে বলে যাচ্ছে,

- একটু খেয়ে নাও, আর একটু খাও।


  দিয়ার বাবার বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে। রোহিনীকে অজস্র ধন্যবাদ জানিয়ে দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। রোহিনী ঝাপসা চোখে দিয়ার চলে যাওয়া দেখে।


  প্রায় মাস খানেক পর রোহিনী সবে মাত্র ক্লাসে রোল কল করা শেষ করেছে, গুটি গুটি পায়ে হেঁটে আসে দিয়া। হাতে একটা কার্ড, নিজে বানিয়েছে। রোহিনীর হাতে সেটা তুলে দেয়। কার্ডের সামনে ছবির দিকে তাকিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় রোহিনী। কার্ডে তিন জনের ছবি, ছবির নীচে তাদের নাম লেখা। ছবিতে একটি বাচ্চা মেয়ে একজনের কোলে, মেয়েটির নাম লেখা দিয়া ; মেয়েটি যার কোলে, সেখানে লেখা বাবা ; আর একটু দূরে দরজায় দাঁড়ানো একজন মহিলা, যার চোখে জল, দাঁড়িয়ে তাদের চলে যাওয়া দেখছে, সেখানে লেখা মা!


  কার্ডের ওপর লেখা, হ্যাপি মাদার্স ডে। ভিতরে লেখা, টু মা - ফ্রম দিয়া।


  কার্ডটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে রোহিনী। তারপরেই দিয়াকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে চুমোতে ভরিয়ে দেয়। দিয়া আস্তে করে ডেকে ওঠে,

- মা।


                                          - - - - - -