অরুণ কুমার সাউ, তমলুক :চৈত্র সংক্রান্তি বা গাজন উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো নীলের ব্রত। শিবের মাথায় জল ঢেলে সন্তানের মঙ্গল কামনা করা এই লোকায়ত উৎসবের মূল রীতি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ঐতিহ্যে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যা…
অরুণ কুমার সাউ, তমলুক :চৈত্র সংক্রান্তি বা গাজন উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো নীলের ব্রত। শিবের মাথায় জল ঢেলে সন্তানের মঙ্গল কামনা করা এই লোকায়ত উৎসবের মূল রীতি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ঐতিহ্যে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে— মাটির ঘট বা কলসির জায়গা দখল করে নিচ্ছে সস্তার বিভিন্ন রঙের প্লাস্টিক বা পিভিসি ঘট।এক সময় গাজন বা নীলের ব্রত মানেই ছিল কুমোর পাড়ায় ব্যস্ততা। মাটির কলসি তৈরির চাকা ঘুরত দিন-রাত। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্রটা অনেকটাই বদলে গেছে। গঙ্গার ঘাট থেকে শুরু করে মন্দিরের চত্বর— সবখানেই এখন রঙিন প্লাস্টিকের ঘটের রমরমা। শাস্ত্রীয় মতে, পূজা-পার্বণে মাটি বা তামার পাত্র ব্যবহারই শুদ্ধ বলে গণ্য করা হয়। প্লাস্টিকের মতো কৃত্রিম উপাদানের অনুপ্রবেশ লোকসংস্কৃতির মৌলিকত্বকে কিছুটা হলেও ম্লান করছে। কেন বাড়ছে প্লাস্টিকের এই ঘট? -তমলুকের এক দশকর্মা দোকানদারকে এ প্রশ্ন করলে তিনি জানান, প্লাস্টিকের ঘট জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হল - মাটির কলসি সহজেই ভেঙে যাওয়ার ভয় থাকে, কিন্তু প্লাস্টিকের ঘট হালকা এবং হাত থেকে পড়ে গেলেও ভাঙে না। দূর-দূরান্ত থেকে জল বয়ে আনার ক্ষেত্রে এটি ব্রতীদের কাছে বেশি সুবিধাজনক। আবার মাটির ঘটের তুলনায় প্লাস্টিকের ঘটের দাম অনেক কম হয় ।উজ্জ্বল রঙের প্লাস্টিক ঘটগুলো দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় সাধারণ মানুষের নজর কাড়ে দ্রুত। এই পরিবর্তন সুবিধাজনক মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় বিপত্তি, পরিবেশ ও ঐতিহ্যের ওপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। ব্রত শেষে অনেক সময় এই প্লাস্টিকের ঘটগুলো মন্দির সংলগ্ন পুকুর বা গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়। প্লাস্টিক পচনশীল না হওয়ায় তা জল দূষণ ঘটায় এবং ড্রেনেজ সিস্টেম আটকে দেয়। প্লাস্টিকের আধিপত্যে গ্রাম বাংলার প্রাচীন মৃৎশিল্পীরা আজ কোণঠাসা। তাদের হাতের তৈরি শৈল্পিক মাটির কলসির চাহিদা কমে গেছে। পরিবেশ কর্মীদের মতে উৎসব হোক আনন্দের ও মঙ্গলের। কিন্তু সেই আনন্দ যেন প্রকৃতির জন্য বিষ হয়ে না দাঁড়ায়। পরিবেশ সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, ঐতিহ্যের শুদ্ধতা বজায় রাখতে এবং পরিবেশকে রক্ষা করতে পুনরায় মাটির পাত্রে ফেরার সময় এসেছে।প্লাস্টিক বর্জন করে মাটির ঘট ব্যবহার করলে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে বেঁচে থাকবে আমাদের প্রান্তিক মৃৎশিল্পীরা।
